📄 যার জন্যে ওসিয়ত করা হয় তার শর্তাবলী
যার জন্য অসিয়ত করা হয় তার মধ্যে নিম্নোক্ত শর্তাবলী থাকা জরুরি:
১. সে যেন অসিয়তকারীর উত্তরাধিকারী না হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা বিজয়ের বৎসর ঘোষণা করেন: কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত চলবে না। (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি)।
এ হাদিস সকল আলেমের নিকট গৃহীত এবং তার উপর ইজ্যা হয়েছে।
সূরা বাকারার ১৮০ নং আয়াতে যে পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের জন্যে অসিয়ত করার আদেশ দেয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে অধিকাংশ আলেমের মত হলো: আয়াতটির বিধি মাসুখ বা রহিত। আর ইমাম শাফেয়ি বলেন: আল্লাহ্ তায়ালা অসিয়তের আয়াতও নাযিল করেছেন, উত্তরাধিকারের আয়াতও নাযিল করেছেন। এখন অসিয়তের আয়াত উত্তরাধিকারের পাশাপাশি কার্যকর থাকতে পারে, আবার উত্তরাধিকারের আয়াত অসিয়তকে রহিতও করতে পারে। এমতাবস্থায় আলেমগণ অনুসন্ধান করেছেন, উক্ত দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনো একটিকে অগ্রাধিকার দেয়ার উপযুক্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কিনা। অনুসন্ধান করে তারা পেয়েছেন, রসূল (সা) মক্কা বিজয়ের বছর বলেন: কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত চলবে না।
যার জন্য অসিয়ত করা হয়, সে অসিয়তকারীর মৃত্যুর দিন উত্তরাধিকারী হতে পারে এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। ফলে অসিয়তকারীর যদি ছেলে না থাকে এবং অসিয়তকারী তার উত্তরাধিকারী ভাই এর জন্য অসিয়ত করে, অত:পর মৃত্যুর পূর্বে যদি তার ছেলে জন্মে, তবে উক্ত ভাই এর জন্য তার অসিয়ত বৈধ হবে। আর যদি অসিয়তকারীর ছেলে থাকা অবস্থায় সে তার ভাইয়ের জন্যে অসিয়ত করে, অত:পর ছেলেটি অসিয়তকারীর মৃত্যুর পূর্বেই মারা যায়, তাহলে এ ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী ভাইয়ের জন্য কৃত অসিয়ত বহাল থাকবে।
২. হানাফি মযহাবের মত হলো, যার জন্য অসিয়ত করা হয়, সে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে তার জন্যে অসিয়ত শুদ্ধ হওয়ার শর্ত এই যে, তাকে অসিয়তের সময় উপস্থিত থাকতে হবে। অর্থাৎ হয় তাকে সশরীরে ঐ সময় উপস্থিত থাকতে হবে, নচেৎ ঐ সময় তাকে কার্যত উপস্থিত থাকতে হবে। যেমন কোনো মহিলার গর্ভস্থ সন্তানের জন্যে অসিয়ত করা হলো এবং অসিয়তের সময় তার পেটে সন্তান বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু যার জন্যে অসিয়ত করা হয়েছে তা যদি কোনো ব্যক্তির সাথে নির্দিষ্ট না হয়, তাহলে অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় তার বাস্তব অথবা কার্যত উপস্থিত জরুরি।
অসিয়তকারী যখন বলবে: অমুকের সন্তানদের জন্যে আমার বাড়িটি অসিয়ত করলাম। কিন্তু সন্তানদের পরিচয় নির্দিষ্ট করলো না। অত:পর অসিয়ত প্রত্যাহার না করে মারা গেল, এমতাবস্থায় অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় যে সব সন্তান বিদ্যমান ছিলো, তারা বাড়িটি পাবে, চাই তারা সবাই বাস্তবে উপস্থিত থাকুক কিংবা কার্যত উপস্থিত থাকুক, যেমন গর্ভস্থ সন্তান চাই অসিয়ত করার সময় তারা থাকুক বা না থাকুক। অসিয়তের সময় বা অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় গর্ভস্থ সন্তানের বিদ্যমান ধর্তব্য হবে তখনই, যখন অসিয়তের সময় বা অসিয়তকারীর জন্যে সময় থেকে ছয় মাসের পূর্বে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। অধিকাংশ আলেম বলেন: অসিয়তকারী যদি অছি (লেনদেনে হিজর আরোপিত ব্যক্তির তত্ত্বাবধায়ককে) যেখানে ভালো মনে করে সেখানে তার সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ দান করার অসিয়ত করে তবে অসিয়ত শুদ্ধ হবে। অছির কর্তব্য হবে সৎ কাজ ও কল্যাণমূলক খাতে তা ব্যয় করা, তা থেকে নিজে এক কপর্দকও ভোগ না করা এবং কোনো উত্তরাধিকারীকে কিছু না দেয়া।'
আবু সাওর এ মতের বিরোধিতা করেন। শওকানি 'নাইলুল আওতা'র গ্রন্থে তার এ মত তুলে ধরেন।
৩. যার জন্য অসিয়ত করা হয়েছে সে যেন অসিয়তকারীকে সরাসরি অবৈধ হত্যা না করে। তা করলে অসিয়ত বাতিল হবে। কারণ যে ব্যক্তি কোনো প্রাপ্য স্বাভাবিকভাবে উপযুক্ত সময় হওয়ার আগেই পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করে, তাকে তা থেকে বাতিল করে শাস্তি দেয়া হয়। এটা আবু ইউসুফের মত। আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ বলেন, অসিয়ত বাতিল হবে না; বরং উত্তরাধিকারীদের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল থাকবে।
📄 যে সামগ্রীর ওসিয়ত করা হয় তার শর্তাবলী
যে জিনিসটি দেয়ার জন্যে অসিয়ত করা হয়, সেটি অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর কাউকে তার মালিক বানানো যায়, এরূপ হওয়া জরুরি, চাই তা যেভাবেই হোক না কেন, তাই এমন যে কোনো জিনিসের অসিয়ত করা বৈধ, যার আর্থিক মূল্য আছে অথবা যা দ্বারা সেবা বা উপকার গ্রহণ করা যায়। কারো গাছে যে ফল হয় বা কারো গাভীর পেটে যে বাছুর রয়েছে, তা দেয়ার অসিয়ত সে করতে পারে। কারণ উত্তরাধিকারী সূত্রে এই দুটোরই মালিকানা লাভ করা সম্ভব। কাজেই অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় যে জিনিসের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে বিদ্যমান, সে জিনিসের মালিকানা যার নামে অসিয়ত করা হয়, সে লাভ করতে পারে। কিন্তু যে জিনিসের অস্তিত্ব নেই, তার অসিয়ত অচল ও অশুদ্ধ। ঋণ দান বা ঘরে বসবাস করতে দেয়ার জন্যে অসিয়ত শুদ্ধ। যে জিনিস সম্পদ পদবাচ্য নয়, যেমন মৃতদেহ, তার অসিয়ত অবৈধ। অনুরূপ মুসলমানদের জন্যে মদের অসিয়তও বৈধ নয়। কেননা এটা দুই পক্ষের কারো জন্যেই সম্পদ নয়।
📄 এক তৃতীয়াংশের ওসিয়ত
ইবনে আব্দুল বার বলেন: প্রাচীন মনীষীদের মধ্যে যারা অসিয়তকে ওয়াজিব মনে করেন তারা কতটুকু সম্পত্তিতে অসিয়ত ওয়াজিব হয় এবং যারা মুস্তাহাব মনে করেন তারা কতটুকু সম্পত্তিতে মুস্তাহাব হয় তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। আলি (রা) থেকে কেউ কেউ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: ছয়শো বা সাতশো দিরহাম পরিমাণ সম্পত্তিতে অসিয়ত করা যায়না। আবার কেউ কেউ বর্ণনা করেন আলি (রা) বলেছেন: এক হাজার দিরহাম পরিমাণ সম্পত্তিতে অসিয়ত করা যায়। ইবনে আব্বাস বলেন: আটশো দিরহামে অসিয়ত চলে না। আয়েশা (রা) বলেন: যে ব্যক্তির চারটি সন্তান আছে এবং তিন হাজার দিরহাম আছে, তার সম্পত্তিতে অসিয়তের অবকাশ নেই। ইবরাহিম নাখয়ী বলেন: এক হাজার দিরহাম থেকে দেড় হাজার দিরহাম পর্যন্ত অসিয়ত চলে না। কাতাদার মতে এক হাজার দিরহাম বা তার উপরে অসিয়ত চলবে। আলি (রা) বলেন: যে ব্যক্তি অল্প সম্পত্তি রেখে যায়, তার পক্ষে ঐ সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের জন্যে রেখে যাওয়াই উত্তম। আয়েশা (রা) বলেন: আটশো দিরহামে অসিয়ত চলবে না।
এক তৃতীয়াংশের অসিয়ত: এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তির অসিয়ত বৈধ। এর চেয়ে বেশি বৈধ নয়। এর চেয়ে কম উত্তম। এটা সর্বসম্মত মত। বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস সূত্রে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: আমি মক্কায় রুগ্ন থাকা অবস্থায় রসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে দেখতে এলেন। যে জায়গা থেকে আমি হিজরত করেছি সেখানে মৃত্যু বরণ করা আমার পছন্দ ছিলনা। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আল্লাহ্ ইবনে আফরাকে কৃপা করুন। আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ্, আমি কি আমার সমগ্র সম্পত্তি অসিয়ত করে দেব? তিনি বললেন: না। আমি বললাম: তাহলে অর্ধেক? তিনি বললেন: না। আমি বললাম: তিন ভাগের এক ভাগ? তিনি বললেন: ঠিক আছে। এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত কর। এক তৃতীয়াংশও অনেক। তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে অমুখাপেক্ষী অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদেরকে পরমুখাপেক্ষী অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে ভাল। তারা দরিদ্র থাকবে ও অন্যের কাছে হাত পাতবে এটা কাম্য নয়। তুমি তোমার পরিবারের উপর যা কিছু খরচ করবে তা সদকা। এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে যে খাদ্যের গ্রাস তুলে দেবে তাও সদকা। অচিরেই এমন দিন আসবে যখন আল্লাহ্ তোমাকে সমৃদ্ধি দেবেন, তখন তোমার দ্বারা অনেকে উপকৃত হবে এবং অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ সময় সাদের একটি মেয়ে ছাড়া কোনো সন্তান ছিলনা। (ওয়াকেদির মতে, পরবর্তীকালে সাদের চারটা ছেলে হয়।)
📄 এক তৃতীয়াংশে হিসাব করা হবে সমুদয় সম্পত্তি থেকে
অধিকাংশ আলিমের মতে অসিয়তকারীর পরিত্যক্ত সমুদয় সম্পত্তি থেকে তিন ভাগের এক ভাগ হিসাব করা হবে। ইমাম মালেক বলেন: অসিয়তকারী যে সম্পত্তির কথা জানে তা থেকে এক তৃতীয়াংশ হিসাব করা হবে। যে সম্পত্তির কথা তার জানা নেই বা নতুন অর্জিত হয়েছে কিন্তু তার অজানা, তা বাদে অসিয়ত করা হবে।
মালেক, নাখয়ি ও উমর ইবনে আব্দুল আযীযের মতে পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ হিসাব করা হবে অসিয়তের সময় থেকে। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা, আহমদ ও ইমাম শাফেয়ির দুটি মতের মধ্যে যেটি বিশুদ্ধতর তা হলো, তার মৃত্যুর সময়কার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে এক তৃতীয়াংশ হিসাব করা হবে। এটা আলি (রা) ও কিছু সংখ্যক তাবেয়ির মত।