📄 ওসিয়তের শর্তাবলী
অসিয়তের জন্যে একজন অসিয়তকারি, যার জন্য অসিয়ত করা হয় এবং যা দেয়ার অসিয়ত করা হয় তা থাকা প্রয়োজন। আর তিনটির জন্যেই কিছু শর্ত নির্দিষ্ট রয়েছে। শর্তগুলো নিম্নে উল্লেখ করা যাচ্ছে:
📄 ওসিয়তকারীর জন্য শর্ত
অসিয়তকারীর জন্য শর্ত হলো, তার মধ্যে দান করার পূর্ণ যোগ্যতা থাকতে হবে। একজন মানুষ সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং নির্বুদ্ধিতা হেতু লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত না হলে সে দান বা অসিয়ত করার পূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী। সে যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক, পাগল, দাস, কারো বলপ্রয়োগের অধীন, কিংবা লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ব্যক্তি হয়, তবে তার অসিয়ত শুদ্ধ হবেনা। কেননা তার দান বা অসিয়ত করার পূর্ণ যোগ্যতা নেই।
কেবল দুটি ক্ষেত্র এর ব্যতিক্রম:
১. ভালোমন্দ বাছবিচারের যোগ্যতা সম্পন্ন অপ্রাপ্তবয়ষ্ক শিশু যখন নিজের কাফন-দাফন সম্পর্কে অসিয়ত করে তখন সে অসিয়ত যতোক্ষণ কল্যাণকারিতার সীমার মধ্যে থাকবে, ততোক্ষণ তা বৈধ গণ্য হবে।
২. নির্বুদ্ধিতাবশত হিন্দ্র (নিষেধাজ্ঞা) আরোপিত ব্যক্তি যদি সৎ ও জনকল্যাণমূলক কাজে যথা কুরআন শিক্ষা, মসজিদ নির্মাণ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির জন্যে অসিয়ত করে তবে সে অসিয়ত শুদ্ধ ও বৈধ গণ্য হবে।
এ ধরনের অসিয়তকারীর উত্তরাধিকারীরা যদি অনুমতি দেয় তবে তার অসিয়ত তার সমগ্র সম্পত্তি থেকে বাস্তবায়ন করা হবে। অনুরূপ যদি তার কোনো উত্তরাধিকারী একেবারেই না থাকে তাহলেও তার সমগ্র সম্পত্তি থেকে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু যদি তার উত্তরাধিকারী থাকে এবং এই অসিয়তকে তারা অনুমোদন না করে তাহলে তা তার সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ থেকে বাস্তবায়িত হবে। এটা হচ্ছে হানাফি মযহাবের মত। ইমাম মালেক এই মতের বিরোধিতা করেন এবং স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্নের ও আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের অর্থ বলে এমন অপ্রাপ্ত বয়স্কের অসিয়ত বৈধ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন: 'আমাদের নিকট সর্বসম্মত মত হলো, যার বুদ্ধি কম, যে নির্বোধ এবং যে অসুস্থ মস্তিষ্ক ব্যক্তি মাঝে মাঝে সুস্থ মস্তিষ্ক হয়, তারা যদি তাদের কৃত অসিয়তের মর্ম উপলদ্ধি করে, তবে তাদের অসিয়ত বৈধ হবে। অনুরূপ, অপ্রাপ্তবয়ষ্ক শিশু বা বালক যখন তার অসিয়তের অর্থ বোঝে এবং কোনো প্রলাপোক্তি বা অশালীন উক্তি করেনা তখন তার অsiয়ত বৈধ ও কার্যকর।' মিশরের আইনে সংশ্লিষ্ট বিচার বিভাগ অনুমতি দিলে নির্বোধের অসিয়তও বৈধ।
📄 যার জন্যে ওসিয়ত করা হয় তার শর্তাবলী
যার জন্য অসিয়ত করা হয় তার মধ্যে নিম্নোক্ত শর্তাবলী থাকা জরুরি:
১. সে যেন অসিয়তকারীর উত্তরাধিকারী না হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা বিজয়ের বৎসর ঘোষণা করেন: কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত চলবে না। (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি)।
এ হাদিস সকল আলেমের নিকট গৃহীত এবং তার উপর ইজ্যা হয়েছে।
সূরা বাকারার ১৮০ নং আয়াতে যে পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের জন্যে অসিয়ত করার আদেশ দেয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে অধিকাংশ আলেমের মত হলো: আয়াতটির বিধি মাসুখ বা রহিত। আর ইমাম শাফেয়ি বলেন: আল্লাহ্ তায়ালা অসিয়তের আয়াতও নাযিল করেছেন, উত্তরাধিকারের আয়াতও নাযিল করেছেন। এখন অসিয়তের আয়াত উত্তরাধিকারের পাশাপাশি কার্যকর থাকতে পারে, আবার উত্তরাধিকারের আয়াত অসিয়তকে রহিতও করতে পারে। এমতাবস্থায় আলেমগণ অনুসন্ধান করেছেন, উক্ত দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনো একটিকে অগ্রাধিকার দেয়ার উপযুক্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কিনা। অনুসন্ধান করে তারা পেয়েছেন, রসূল (সা) মক্কা বিজয়ের বছর বলেন: কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত চলবে না।
যার জন্য অসিয়ত করা হয়, সে অসিয়তকারীর মৃত্যুর দিন উত্তরাধিকারী হতে পারে এ ব্যাপারে আলেমগণ একমত। ফলে অসিয়তকারীর যদি ছেলে না থাকে এবং অসিয়তকারী তার উত্তরাধিকারী ভাই এর জন্য অসিয়ত করে, অত:পর মৃত্যুর পূর্বে যদি তার ছেলে জন্মে, তবে উক্ত ভাই এর জন্য তার অসিয়ত বৈধ হবে। আর যদি অসিয়তকারীর ছেলে থাকা অবস্থায় সে তার ভাইয়ের জন্যে অসিয়ত করে, অত:পর ছেলেটি অসিয়তকারীর মৃত্যুর পূর্বেই মারা যায়, তাহলে এ ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী ভাইয়ের জন্য কৃত অসিয়ত বহাল থাকবে।
২. হানাফি মযহাবের মত হলো, যার জন্য অসিয়ত করা হয়, সে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে তার জন্যে অসিয়ত শুদ্ধ হওয়ার শর্ত এই যে, তাকে অসিয়তের সময় উপস্থিত থাকতে হবে। অর্থাৎ হয় তাকে সশরীরে ঐ সময় উপস্থিত থাকতে হবে, নচেৎ ঐ সময় তাকে কার্যত উপস্থিত থাকতে হবে। যেমন কোনো মহিলার গর্ভস্থ সন্তানের জন্যে অসিয়ত করা হলো এবং অসিয়তের সময় তার পেটে সন্তান বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু যার জন্যে অসিয়ত করা হয়েছে তা যদি কোনো ব্যক্তির সাথে নির্দিষ্ট না হয়, তাহলে অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় তার বাস্তব অথবা কার্যত উপস্থিত জরুরি।
অসিয়তকারী যখন বলবে: অমুকের সন্তানদের জন্যে আমার বাড়িটি অসিয়ত করলাম। কিন্তু সন্তানদের পরিচয় নির্দিষ্ট করলো না। অত:পর অসিয়ত প্রত্যাহার না করে মারা গেল, এমতাবস্থায় অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় যে সব সন্তান বিদ্যমান ছিলো, তারা বাড়িটি পাবে, চাই তারা সবাই বাস্তবে উপস্থিত থাকুক কিংবা কার্যত উপস্থিত থাকুক, যেমন গর্ভস্থ সন্তান চাই অসিয়ত করার সময় তারা থাকুক বা না থাকুক। অসিয়তের সময় বা অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় গর্ভস্থ সন্তানের বিদ্যমান ধর্তব্য হবে তখনই, যখন অসিয়তের সময় বা অসিয়তকারীর জন্যে সময় থেকে ছয় মাসের পূর্বে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। অধিকাংশ আলেম বলেন: অসিয়তকারী যদি অছি (লেনদেনে হিজর আরোপিত ব্যক্তির তত্ত্বাবধায়ককে) যেখানে ভালো মনে করে সেখানে তার সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ দান করার অসিয়ত করে তবে অসিয়ত শুদ্ধ হবে। অছির কর্তব্য হবে সৎ কাজ ও কল্যাণমূলক খাতে তা ব্যয় করা, তা থেকে নিজে এক কপর্দকও ভোগ না করা এবং কোনো উত্তরাধিকারীকে কিছু না দেয়া।'
আবু সাওর এ মতের বিরোধিতা করেন। শওকানি 'নাইলুল আওতা'র গ্রন্থে তার এ মত তুলে ধরেন।
৩. যার জন্য অসিয়ত করা হয়েছে সে যেন অসিয়তকারীকে সরাসরি অবৈধ হত্যা না করে। তা করলে অসিয়ত বাতিল হবে। কারণ যে ব্যক্তি কোনো প্রাপ্য স্বাভাবিকভাবে উপযুক্ত সময় হওয়ার আগেই পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করে, তাকে তা থেকে বাতিল করে শাস্তি দেয়া হয়। এটা আবু ইউসুফের মত। আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ বলেন, অসিয়ত বাতিল হবে না; বরং উত্তরাধিকারীদের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল থাকবে।
📄 যে সামগ্রীর ওসিয়ত করা হয় তার শর্তাবলী
যে জিনিসটি দেয়ার জন্যে অসিয়ত করা হয়, সেটি অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর কাউকে তার মালিক বানানো যায়, এরূপ হওয়া জরুরি, চাই তা যেভাবেই হোক না কেন, তাই এমন যে কোনো জিনিসের অসিয়ত করা বৈধ, যার আর্থিক মূল্য আছে অথবা যা দ্বারা সেবা বা উপকার গ্রহণ করা যায়। কারো গাছে যে ফল হয় বা কারো গাভীর পেটে যে বাছুর রয়েছে, তা দেয়ার অসিয়ত সে করতে পারে। কারণ উত্তরাধিকারী সূত্রে এই দুটোরই মালিকানা লাভ করা সম্ভব। কাজেই অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় যে জিনিসের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে বিদ্যমান, সে জিনিসের মালিকানা যার নামে অসিয়ত করা হয়, সে লাভ করতে পারে। কিন্তু যে জিনিসের অস্তিত্ব নেই, তার অসিয়ত অচল ও অশুদ্ধ। ঋণ দান বা ঘরে বসবাস করতে দেয়ার জন্যে অসিয়ত শুদ্ধ। যে জিনিস সম্পদ পদবাচ্য নয়, যেমন মৃতদেহ, তার অসিয়ত অবৈধ। অনুরূপ মুসলমানদের জন্যে মদের অসিয়তও বৈধ নয়। কেননা এটা দুই পক্ষের কারো জন্যেই সম্পদ নয়।