📄 সাহাবিদের ওসিয়ত
রসূলুল্লাহ্ (সা) ইন্তিকাল কালে কোনো অসিয়ত করে যাননি। কারণ তিনি অসিয়ত করা যায় এমন কোনো সম্পত্তি রেখে যাননি। ইমাম বুখারি ইবনে আবি আওফা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) কোনো অসিয়ত করে যাননি। আলেমগণ এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন: কেননা তিনি তার পরে কোনো সম্পত্তি রেখে যাননি। তার যে জমি ছিলো, তা তিনি আল্লাহর পথে দান করে গেছেন। অস্ত্র ও খচ্চর সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন যে, এ দুটো উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরিত হয়না। এটা ইমাম নববীর বর্ণনা।
সাহাবিগণ তাদের সম্পত্তির অংশবিশেষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে অসিয়ত করে যেতেন। তাদের উত্তরাধিকারীদের জন্যে তারা লিখিতভাবে উপদেশ দিয়ে যেতেন।
আব্দুর রাজ্জাক বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন, আনাস (রা) বলেন: সাহাবিগণ তাদের অসিয়তের শুরুতে লিখতেন:
বিস্মিল্লাহির রহমানির রহিম,
'অমুকের পুত্র অমুক অসিয়ত করছে যেন সে সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্র রসূল, কিয়ামত সংঘটিত হবেই এতে কোনো সন্দেহ নেই, এবং আল্লাহ্ কবরে যারা থাকবে তাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। সে তার পরিত্যক্ত পরিবার-পরিজনকে অসিয়ত করছে যেন তারা আল্লাহকে ভয় করে, নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ভাল করে, এবং তারা মুমিন হয়ে থাকলে যেন আল্লাহ্ ও তার রসূলের আনুগত্য করে। ইবরাহিম ও ইয়াকুব (আ) তাদের সন্তানদেরকে যে অসিয়ত করেছিলেন সেই অসিয়ত করছে যে, আল্লাহ্ তোমাদের জন্য এই দীন মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমরা এই দীনের কাছে আত্মসমর্পণকারী না হয়ে মৃত্যু বরণ করোনা।'
📄 ওসিয়তের যৌক্তিকতা
রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: আল্লাহ তোমাদের ধনসম্পদের এক তৃতীয়াংশ তোমাদের সদকা স্বরূপ দিয়েছেন, যাতে তোমাদের আমল বৃদ্ধি পায়। সুতরাং তোমরা এই সম্পদকে যেখানে ইচ্ছা বা যেখানে পছন্দ কর ব্যয় কর।'
হাদিসটি দুর্বল। এর মর্ম হলো, অসিয়ত মানুষের শেষ জীবনে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। যাতে তার পুণ্য বৃদ্ধি পায় কিংবা ক্ষতিপূরণ হয়। তাছাড়া এতে মানুষের উপকার করা ও মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা হয়।
অসিয়তের বিধান: শরিয়তের দৃষ্টিতে অসিয়তের বিধান সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, যার সার সংক্ষেপ নিম্নে তুলে দিচ্ছি:
প্রথম মত: ইমাম যুহরি, আবু মিজলায, ইবনে হাম্, ইবনে উমর, তালহা, যুবায়ের, আব্দুল্লাহ, ইবনে আবি আওফা, তালহা ইবনে মুতারাফ, তাউস ও শা'বির মতে, কম হোক বা বেশি, যে ব্যক্তি কিছু সম্পত্তি রেখে মারা যায়, তার জন্যে অসিয়ত করা ওয়াজিব। তারা এ ব্যাপারে উপরে উল্লেখিত সূরা বাকারার ১৮০ নং আয়াত দ্বারা প্রমাণ দর্শান।
দ্বিতীয় মত: এই মত অনুযায়ী পিতামাতা ও যেসব আত্মীয় উত্তরাধিকার হয়না তাদের অসিয়ত করা ওয়াজিব। এটি মাসরূক, ইয়াস, কাতাদা, ইবনে জারির ও যুহরির মত।
তৃতীয় মত: এটা চার প্রধান ইমাম ও যায়দি মযহাবের মত। মতটি হলো, সম্পত্তি রেখে গেলেও অসিয়ত করা সবার উপর ফরয নয়। পিতামাতা ও অনুত্তরাধিকারী আত্মীয়দের জন্য অসিয়ত করাও ফরয নয়। অবস্থাভেদে এর বিধান পরিবর্তিত হয়ে থাকে। এটা কোথাও ওয়াজিব, কোথাও মুস্তাহাব কোথাও হারাম, কোথাও মাকরূহ এবং কোথাও মুবাহ।
ওয়াজিব: অসিয়ত করা সেই ক্ষেত্রে ওয়াজিব যেখানে মানুষের উপর শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কোনো কর্তব্য থাকে এবং অসিয়ত না করলে তা বিনষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে। যেমন তার উপর যাকাত ফরয ছিলো, যা সে দেয়নি, হজ্জ ছিলো যা সে করেনি। তার কাছে আমানত ছিলো যা প্রত্যর্পণ করেনি, কোনো ঋণ ছিলো যা সে পরিশোধ করেনি এবং সে ছাড়া আর কেউ যা জানেওনা, অথবা কোনো সাক্ষী ছাড়া তার নিকট কারো সম্পদ গচ্ছিত ছিলো।
মুস্তাহাব: আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ, দরিদ্র আত্মীয়দের কল্যাণ এবং সৎলোকদের উপকার করার জন্যে অসিয়ত করা মুস্তাহাব।
হারাম: অসিয়ত দ্বারা উত্তরাধিকারদের ক্ষতি হলে অসিয়ত করা হারাম। আব্দুর রাজ্জাক আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: কোনো ব্যক্তি যদি সত্তর বছরও নেক কাজ করে, অত:পর কোনো অসিয়ত করে কারো উপর যুলুম করে এবং এভাবে তার জীবনের শেষ কাজটি অসৎ কাজ হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে। আবার কোনো ব্যক্তি যদি সত্তর বছরব্যাপী খারাপ কাজ করতে থাকে, অত:পর একটা সুবিচারমূলক অসিয়ত করে এবং এভাবে তার জীবনের শেষ কাজটি ভাল কাজ হয়, তবে সে জান্নাতে যাবে। আবু হুরায়রা (রা) বলেন: তোমরা ইচ্ছা করলে এ আয়াতটি পড়তে পারো: حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا এটি 'এগুলো হচ্ছে আল্লাহ্র সীমারেখা। সুতরাং এগুলো তোমরা লংঘন করোনা।' (সূরা বাকারা ২: আয়াত ২২৯)।
সাঈদ ইবনে মানসুর বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন, ইবনে আব্বাস (রা) বলেন: 'অসিয়তে কারো ক্ষতি সাধন কবীরা গুনাহ।' হাদিসটি নাসায়িও বর্ণনা করেন। যে অসিয়ত দ্বারা কারো ক্ষতি সাধন করা উদ্দেশ্য, তা বাতিল, যদিও তা সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশের চেয়ে কম হয়।)
অনুরূপ মত, গির্জা নির্মাণ বা প্রমোদশালা নির্মাণের অসিয়ত হারাম।
মাকরূহ: অসিয়ত সেই ক্ষেত্রে মাকরূহ যখন অসিয়তকারী স্বল্পবিত্তশালী হয় এবং তার এমন উত্তরাধিকারী থাকে যারা তার মুখাপেক্ষী। অনুরূপ, কোনো ফাসেককে অসিয়ত করা সেই ক্ষেত্রে মাকরূহ, যখন প্রবল ধারণা জন্মাবে যে, তারা এ দ্বারা পাপ কাজে শক্তি সঞ্চয় করবে, কিন্তু যখন মনে হবে যার জন্য অসিয়ত করা হবে সে এ দ্বারা সৎ কাজে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হবে তখন এটা মুস্তাহাব।
📄 ওসিয়ত কখন প্রাপ্য হয়
মুবাহ: অসিয়ত সে ক্ষেত্রে মুবাহ্, যখন তা কোনো ধনী ব্যক্তির জন্য করা হয়।
প্রধান উপাদান: অসিয়তের প্রধান উপাদান হলো ইজাব অর্থাৎ অসিয়তকারীর উদ্যোগ তথা প্রস্তাব। এমন যে কোনো শব্দ ব্যবহার করলে ইজাব সম্পন্ন হবে যা দ্বারা মৃত্যুর পরে বিনিময় ব্যতীত কোনো জিনিসের মালিকানা দান করা হয়। যেমন আমি আমার মৃত্যুর পরে অমুককে অমুক জিনিসটি দেয়ার অসিয়ত করলাম। বা আমার পরে তা অমুককে দান করলাম বা অমুককে তার মালিক বানালাম।
অসিয়ত যেমন কথা দ্বারা সম্পন্ন হয় তেমনি তা লেখা বা বোধগম্য ইশারা দ্বারাও সম্পন্ন হয়, যখন অসিয়তকারী কথা বলতে অক্ষম হয়। আর যখন অসিয়ত অনির্দিষ্ট হয়, (অর্থাৎ ব্যক্তি বিশেষের জন্য নির্দিষ্ট না হয়) যথা- মসজিদ, সরাইখানা, বিদ্যালয় বা হাসপাতালের জন্য হয়, তখন তার কবুলের প্রয়োজন হয়না। বরং শুদ্ধ ইজাব দ্বারাই অসিয়ত সম্পন্ন হয়। কেননা এটা এ ক্ষেত্রে সৎকার্য পরিণত হয়। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তির সাথে নির্দিষ্ট হয়, তখন তা যার জন্য অসিয়ত করা হয়, অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর তার পক্ষ থেকে বা সে নির্বোধ হলে তার অভিভাবকের পক্ষ থেকে কবুল হওয়া প্রয়োজন। সে যদি কবুল করে তবে অসিয়ত সম্পন্ন হবে। আর প্রত্যাখ্যান করলে বাতিল হবে এবং অসিয়তকারীর উত্তরাধিকারীদের মালিকানা বহাল থাকবে।
আর যে সব বিষয়ে লেনদেনের চুক্তি বৈধ সে সব বিষয়ে অসিয়ত করা হলে অসিয়তকারীর জন্য তা পরিবর্তন করা বা তা সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রত্যাহার করা বৈধ। প্রত্যাহার সরাসরি কথার মাধ্যমে করতে পারে, যেমন: 'আমি অসিয়ত প্রত্যাহার করলাম'। আবার তার কাজ দ্বারাও করা হতে পারে, যেমন সে যা অসিয়ত করেছিল, তা বিক্রয় করে দিলো।
অসিয়ত কখন প্রাপ্য হয়: একমাত্র অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর ও তার ঋণ পরিশোধের পরই যার জন্য অসিয়ত করা হয় অsiয়ত তার প্রাপ্য হয়। যদি ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে পরিত্যক্ত সম্পত্তির পুরোটাই নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে আর যার জন্য অসিয়ত করা হয়, তার কিছুই প্রাপ্য হবেনা। কেননা আল্লাহ্ বলেন: 'অসিয়ত প্রদান বা ঋণ পরিশোধের পরেই' (উত্তরাধিকারীর বণ্টন করা হবে।')
📄 শর্তযুক্ত ওসিয়ত
শর্ত যদি বৈধ হয় তবে শর্তযুক্ত অসিয়ত বৈধ হবে। বৈধ শর্ত দ্বারা এমন শর্ত বুঝায়, যা অসিয়তকারী বা যার জন্য অসিয়ত করা হয় তার জন্যে কল্যাণকর হয় অথবা অন্য কারো জন্যে মংগলজনক হয়, নিষিদ্ধ না হয় বা শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী না হয়। আর শর্ত যখন বিশুদ্ধ ও বৈধ হয়, তখন যতোক্ষণ তার উপকারিতা ও কল্যাণকারিতা বহাল থাকে ততক্ষণ তা মেনে চলা জরুরি। শর্ত যদি বৈধ না হয়, বা তার উপকারিতা বহাল না থাকে তবে তা মেনে চলা জরুরি হবে না।