📄 ছোটগিলিয়া ব্যক্তির কাছে যদি ধারে দেয়া মালামাল হুবহু পাওয়া যায়
যখন কোনো ব্যক্তি দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যক্তির কাছে তার ধারে দেয়া সামগ্রী হুবহু পেয়ে যায় তবে তার কয়েকটা অবস্থা রয়েছে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে।
১. যে ব্যক্তি তার দেয়া সামগ্রী হুবহু ও অক্ষত অবস্থায় দেউলিয়ার কাছে পেয়ে যায়, সে অন্য সকল পাওনাদারের তুলনায় তা ফেরত পাওয়ার অধিক হকদার। কেননা রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: "যে ব্যক্তি দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যক্তির কাছে তার ধার দেয়া দ্রব্য হুবহু ও এমন অপরিবর্তিত অবস্থায় পেয়ে যায় যে, বাড়েও নাই, কমেও নাই, সে অন্য পাওনাদারের চেয়ে তার বেশি হকদার।' (বুখারি ও মুসলিম)।
২. প্রাপ্ত দ্রব্য যদি কম-বেশি হয়ে পরিবর্তিত হতে থাকে, তাহলে তার মালিক অন্যান্য পাওনাদারের চেয়ে অধিকারের পাওনা; বরং তার সমপর্যয়ের পাওনাদার গণ্য হবে।
৩. সে যদি দ্রব্যটি বিক্রয় করে দিয়ে মূল্য আংশিক হস্তগত করে থাকে, তাহলে সে অন্য পাওনাদারদের সমপর্যায়ের গণ্য হবে এবং অধিকাংশ আলেমের মতে সে বিক্রীত পণ্য ফেরত পাওয়ার হকদার হবেনা। তবে ইমাম শাফেয়ীর দুটি মতের মধ্যে এই মতটিই অগ্রগণ্য যে, বিক্রয়কারীই অগ্রাধিকার পাবে।
৪. ক্রেতা যদি মারা গিয়ে থাকে এবং বিক্রয়কারী মূল্য হস্তগত না করে থাকে, অতঃপর বিক্রয়কারী তার বিক্রীত দ্রব্য পেয়ে যায়, তবে উপযুক্ত হাদিসের আলোকে সে তা ফেরত পাওয়ার অধিক হকদার। এর পেছনে এই যুক্তিও রয়েছে যে, মৃত্যু ও দেউলে হওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এ মতটি ইমাম শাফেয়ীর।
আবু হুরায়রা (রা) বলেন: ‘আমি অবশ্যই তোমাদের মধ্যে রসূলুল্লাহ (সা) এর মত বিচার করবো: যে ব্যক্তি দেউলে হয়েছে বা মারা গেছে, অতঃপর কোনো ব্যক্তি তার নিকট তার দ্রব্য অপরিবর্তিত অবস্থায় পেয়েছে, সেই তার অধিক হকদার।’
📄 অপ্রাপ্তবয়স্কের উপর হিজর নেই
দেউলিয়ার উপর হিজ্বর আরোপিত হবে তখনই, যখন তার অভাবগ্রস্ত হওয়া স্পষ্ট হয়না। যদি স্পষ্ট হয়ে যায় সে অভাবগ্রস্ত, তাহলে তাকে আটক করাও হবেনা। তার উপর হিত্রও (লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা) আরোপিত হবে না এবং পাওনাদাররা তার পেছনে লেগে থেকে ক্রমাগত চাপও দেবে না, বরং তার স্বচ্ছলতা ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ও তাকে সময় দেয়া হবে। কারণ আল্লাহ্ বলেন: 'যদি খাতক অভাবগ্রস্ত হয় তবে সচ্ছলতা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেয়া বিধেয়।' ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি কিছু ফল কিনে মুসিবতে পড়ে গেল। ফলে তার দায়দেনা এতো বৃদ্ধি পেল যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) জনতাকে অনুরোধ করলেন তাকে সক্কা দিতে। লোকেরা সদকা দিল। কিন্তু তাতেই ঋণ পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ সংগৃহীত হলোনা। তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) তার পাওনাদারদেরকে বললেন: তোমরা যা পেয়েছ তাই নিয়ে যাও। এর চেয়ে বেশি পাবে না।'
অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে অবকাশ দেয়ার সওয়াব বহুগুণ বেশি। বারিদা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্তকে অবকাশ দিলো, সে প্রতিদিনের জন্য দ্বিগুণ সক্কার সওয়াব পাবে।'
📄 খাতককে যতোটুকু দেয়া দেয়াল জরুরি
শাসক যখন দেউলিয়ার সম্পত্তি বিক্রয় করে পাওনাদারদের ঋণ পরিশোধ করে, তখন তার জীবন ধারণের জন্যে ন্যূনতম যা প্রয়োজন, তা তার জন্যে ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব। যেমন তার বাড়িটি বিক্রয় করা যাবেনা। কেননা বাড়ি ছাড়া তো তার মাথা গোঁজার ঠাই নেই। অনুরূপ, তার সম্পত্তি থেকে ততোটুকু পরিমাণ ছেড়ে দেয়া জরুরি, যতোটুকু দিয়ে সে তার মত ব্যক্তির উপযোগী একজন চাকর রাখতে পারে। খাতক যদি ব্যবসায়ী হয়, তবে ব্যবসায়ের ন্যূনতম সম্বল তার জন্য ছেড়ে দিতে হবে। আর যদি সে পেশাদার হয়, তবে তার পেশার প্রয়োজনীয় সাজ-সর াম ও যন্ত্রপাতি তাকে ছেড়ে দিতে হবে। আর তার জন্য ও তার উপর নির্ভরশীলদের জন্যে তার মতো ব্যক্তির উপযোগী ন্যূনতম খাদ্য ও বস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ইমাম শওকানি বলেন: খাতকের ও তার উপর নির্ভরশীলদের জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য বাসস্থান, পরিধানের ও শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার বস্ত্র ও ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় ব্যতীত তার কাছে যা কিছু পাওয়া যায়, তার সব কিছু নেয়া পাওনাদারদের জন্য বৈধ। তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি মুয়ায (রা) এর হাদিস উল্লেখপূর্বক বলেন: এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, পাওনাদাররা মুয়াযের পরিধানের পোশাক নিয়ে গেছে, তাকে তার বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে বা তিনি ও তার উপর নির্ভরশীলরা তাদের জীবন ধারণের ন্যূনতম অবলম্বন ছেড়ে চলে গেছে। এ জন্যেই আমি বলেছি যে, এই জিনিসগুলো কোনো অবস্থায়ই খাতকের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া যাবেনা। এটা ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদের মত। ইমাম শাফেয়ির মতে, তার বাড়ি এ অবস্থায় বিক্রয় করা যাবে।
📄 নির্বোধের উপর হিজর
নির্বোধ ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হলেও তার নির্বুদ্ধিতা ও কান্ডজ্ঞানহীন তৎপরতার কারণে তার উপর হিত্র আরোপিত হবে। মহান আল্লাহ্ বলেন: وَلا تُؤْتُوا السُّفَمَاءَ أَمْوَ لَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللهُ لَكُمْ قِيماً .
'তোমাদের সম্পদ, যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে উপজীবিকা করেছেন, তা নির্বোধদের হাতে অর্পণ করোনা।' (সূরা নিসা: আয়াত ৫)।
এ আয়াত দ্বারা নির্বোধ ব্যক্তির উপর হিজ়ের বৈধতা প্রমাণিত।
আল্লামা ইবনুল মুনন্যির বলেন: 'অধিকাংশ আলেমের মতে যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ নষ্ট করে, সে প্রাপ্তবয়স্ক হোক বা না হোক, তার উপর হি আরোপ করা হবে।
ইমাম আবু হানিফা বলেন: বয়োপ্রাপ্তির সময় যে ব্যক্তি স্বাভাবিক বিবেকবুদ্ধির অধিকারী ছিলো, সে পরে নির্বোধ হয়ে গেলেও তার উপর হিজর আরোপ করা হবে না। তবে নিজের সম্পদ নষ্ট করতে দেখা গেলে. হিন্দ্র আরোপ করা হবে। সে ক্ষেত্রে তার বয়স পঁচিশ বছর না হওয়া পর্যন্ত তার কাছে তার সম্পত্তি অর্পণ করা হবেনা। পঁচিশ বছর হলে চাই সে নষ্ট করুক বা না করুক, তার সম্পত্তি তার কাছে অর্পণ করা হবে। ইমাম মালেক বলেন: বয়োপ্রাপ্ত হয়েও যদি স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা অর্জিত না হয়, বুড়ো হয়ে যাওয়ার পরও তার উপর হিজ থাকবে।
'নাইলুল আওতর' গ্রন্থে 'আল-বাহর' থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে: 'হিজরের যোগ্য নির্বুদ্ধিতা হলো পাপকার্যে কিংবা যে কাজে দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো কল্যাণ নেই, এমন কাজে অর্থ ব্যয় করা, যেমন এক দিরহামের সামগ্রী একশো দিরহাম দিয়ে খরিদ করা। ভালো খাদ্য, ভালো পোশাক ও ভালো সুগন্ধী ইত্যাদি খরিদ করা কোনো নির্বুদ্ধিতার কাজ নয়। আল্লাহ্ সূরা আ'রাফের ৩২ নং আয়াতে বলেন: قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَتِ مِنَ الرِّزْقِ ۚ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَمَةِ.
'বলো, আল্লাহ্ স্বীয় বান্দাদের জন্য যে সব শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে নিষিদ্ধ করেছে? বলো, পার্থিব জীবনে বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে এসমস্ত তাদের জন্য যারা ঈমান আনে। এরূপে আমি জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করি।' তদ্রূপ, ধনীর কার্যকলাপে খরচ করাও নির্বুদ্ধিতার লক্ষণ নয়।