📄 ছোটগিলার উপর লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা ও তার সম্পত্তি বিক্রয় করা
যে ব্যক্তির ধন-সম্পদ আছে, তথাপি ঋণ পরিশোধ করে না, তার পাওনাদাররা সবাই বা কতক পাওনাদার চাইলে শাসক তার উপর লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, যাতে তারা ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়। অধিকন্তু সে যদি অনুমতি পেয়েও নিজের সম্পত্তি বিক্রয় না করে তবে শাসক তার সম্পত্তি বিক্রয় করতে পারবে এবং তার বিক্রয় বৈধ হবে। কেননা শাসক তার স্থলাভিষিক্ত। এর প্রমাণ সাঈদ ইবনে মানসূর, আবু দাউদ ও আব্দুর রাজ্জাক কর্তৃক আব্দুর রহমান ইবনে কা'ব সূত্রে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিস:
'মুয়ায ইবনে জাবাল একজন দানশীল যুবক ছিলেন। তিনি নিজের জন্যে কিছুই সঞ্চিত রাখতেন না। ফলে ঋণগ্রস্ত হতে হতে এক সময় তার গোটা সম্পত্তিই ঋণের দায়ে ডুবে যায়। তখন তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট এসে তাকে অনুরোধ করলেন যেন তার পাওনাদারদেরকে বুঝিয়ে তার জন্য অবকাশ সৃষ্টি করেন। কারণ পাওনাদাররা যদি কাউকে অবকাশ দিত তবে রসূলুল্লাহ্ (সা) এর খাতিরে মুয়াযকেই দিত। কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা) মুয়াযের সম্পত্তি বিক্রয় করে দিলেন। ফলে মুয়ায একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়লেন।'
‘নাইলুল আওত্বা’র গ্রন্থে বলা হয়েছে: ‘মুআয়্যার উপর লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে প্রমাণিত হয় যে, যে কোনো ঋণগ্রহস্তের উপর লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা বৈধ। তাছাড়া ঋণগ্রহস্তের ঋণ পরিশোধের জন্য তার সম্পত্তি বিক্রয় করা শাসকের জন্য জায়েয, চাই তার ঋণ তার গোটা সম্পত্তিকে গ্রাস করুক বা না করুক।’ এভাবে যখন দেউলে ঋণগ্রহস্তের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়, তখন তার প্রধান সম্পত্তির উপর তার যে কোনো হস্তক্ষেপ অচল ও অকার্যকর হবে। কেননা এটা হিজরের দাবি। ইমাম মালিকের মত এবং ইমাম শাফিয়ীর দুই মতের মধ্যে অগ্রগণ্য মত এটাই।
শুধু সে সব পাওনাদারের ঋণ হিস্যা অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে যারা ঋণ পরিশোধের দাবি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে এবং যাদের ঋণের মেয়াদ শেষ হয়েছে। যে পাওনাদার উপস্থিত কিন্তু পরিশোধের দাবি করছে না, যে পাওনাদার অনুপস্থিত এবং কোনো প্রতিনিধি নিয়োগ করেনি এবং যে উপস্থিত বা অনুপস্থিত এবং দাবিদার বা অ-দাবিদার পাওনাদারের ঋণের মেয়াদ শেষ হয়নি, সে এর আওতাভুক্ত হবেনা এবং তার ঋণ পরিশোধ করা হবেনা। এটা ইমাম আহমদের মত ও ইমাম শাফিয়ীর দুই মতের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ মত।
পক্ষান্তরে ইমাম মালেকের মত হলো, ঋণ যদি অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য হয় তাহলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সাথে সাথেই ঋণ পরিশোধ করা হবে। আর যে দেউলে মুতাবাবণ করেছে, তার ঋণ সকল পাওনাদারকেই পরিশোধ করতে হবে, তাই সে উপস্থিত হোক বা অনুপস্থিত, ঋণ পরিশোধের দাবি করুক বা না করুক এবং ঋণ দীর্ঘমেয়াদী হোক বা ত্বরিত পরিশোধযোগ্য হোক।
ঋণ পরিশোধ করার সময় সর্বাগ্রে আল্লাহর হক অতঃপর বান্দার হক পরিশোধ করা হবে। কেননা রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: ‘আল্লাহর ঋণ সর্বাগ্রে পরিশোধযোগ্য।’
ইমাম আবু হানিফা বলেন: ঋণগ্রহস্তের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাও জায়েয নেই, তার সম্পত্তি বিক্রয় করাও বৈধ নয়। ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত শাসক তাকে আটক রাখবে। তবে প্রথমোক্ত মতটি হাদিসের অনুকূল বলে অগ্রগণ্য।
📄 ছোটগিলিয়া ব্যক্তির কাছে যদি ধারে দেয়া মালামাল হুবহু পাওয়া যায়
যখন কোনো ব্যক্তি দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যক্তির কাছে তার ধারে দেয়া সামগ্রী হুবহু পেয়ে যায় তবে তার কয়েকটা অবস্থা রয়েছে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে।
১. যে ব্যক্তি তার দেয়া সামগ্রী হুবহু ও অক্ষত অবস্থায় দেউলিয়ার কাছে পেয়ে যায়, সে অন্য সকল পাওনাদারের তুলনায় তা ফেরত পাওয়ার অধিক হকদার। কেননা রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: "যে ব্যক্তি দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যক্তির কাছে তার ধার দেয়া দ্রব্য হুবহু ও এমন অপরিবর্তিত অবস্থায় পেয়ে যায় যে, বাড়েও নাই, কমেও নাই, সে অন্য পাওনাদারের চেয়ে তার বেশি হকদার।' (বুখারি ও মুসলিম)।
২. প্রাপ্ত দ্রব্য যদি কম-বেশি হয়ে পরিবর্তিত হতে থাকে, তাহলে তার মালিক অন্যান্য পাওনাদারের চেয়ে অধিকারের পাওনা; বরং তার সমপর্যয়ের পাওনাদার গণ্য হবে।
৩. সে যদি দ্রব্যটি বিক্রয় করে দিয়ে মূল্য আংশিক হস্তগত করে থাকে, তাহলে সে অন্য পাওনাদারদের সমপর্যায়ের গণ্য হবে এবং অধিকাংশ আলেমের মতে সে বিক্রীত পণ্য ফেরত পাওয়ার হকদার হবেনা। তবে ইমাম শাফেয়ীর দুটি মতের মধ্যে এই মতটিই অগ্রগণ্য যে, বিক্রয়কারীই অগ্রাধিকার পাবে।
৪. ক্রেতা যদি মারা গিয়ে থাকে এবং বিক্রয়কারী মূল্য হস্তগত না করে থাকে, অতঃপর বিক্রয়কারী তার বিক্রীত দ্রব্য পেয়ে যায়, তবে উপযুক্ত হাদিসের আলোকে সে তা ফেরত পাওয়ার অধিক হকদার। এর পেছনে এই যুক্তিও রয়েছে যে, মৃত্যু ও দেউলে হওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এ মতটি ইমাম শাফেয়ীর।
আবু হুরায়রা (রা) বলেন: ‘আমি অবশ্যই তোমাদের মধ্যে রসূলুল্লাহ (সা) এর মত বিচার করবো: যে ব্যক্তি দেউলে হয়েছে বা মারা গেছে, অতঃপর কোনো ব্যক্তি তার নিকট তার দ্রব্য অপরিবর্তিত অবস্থায় পেয়েছে, সেই তার অধিক হকদার।’
📄 অপ্রাপ্তবয়স্কের উপর হিজর নেই
দেউলিয়ার উপর হিজ্বর আরোপিত হবে তখনই, যখন তার অভাবগ্রস্ত হওয়া স্পষ্ট হয়না। যদি স্পষ্ট হয়ে যায় সে অভাবগ্রস্ত, তাহলে তাকে আটক করাও হবেনা। তার উপর হিত্রও (লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা) আরোপিত হবে না এবং পাওনাদাররা তার পেছনে লেগে থেকে ক্রমাগত চাপও দেবে না, বরং তার স্বচ্ছলতা ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ও তাকে সময় দেয়া হবে। কারণ আল্লাহ্ বলেন: 'যদি খাতক অভাবগ্রস্ত হয় তবে সচ্ছলতা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেয়া বিধেয়।' ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি কিছু ফল কিনে মুসিবতে পড়ে গেল। ফলে তার দায়দেনা এতো বৃদ্ধি পেল যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) জনতাকে অনুরোধ করলেন তাকে সক্কা দিতে। লোকেরা সদকা দিল। কিন্তু তাতেই ঋণ পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ সংগৃহীত হলোনা। তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) তার পাওনাদারদেরকে বললেন: তোমরা যা পেয়েছ তাই নিয়ে যাও। এর চেয়ে বেশি পাবে না।'
অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে অবকাশ দেয়ার সওয়াব বহুগুণ বেশি। বারিদা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্তকে অবকাশ দিলো, সে প্রতিদিনের জন্য দ্বিগুণ সক্কার সওয়াব পাবে।'
📄 খাতককে যতোটুকু দেয়া দেয়াল জরুরি
শাসক যখন দেউলিয়ার সম্পত্তি বিক্রয় করে পাওনাদারদের ঋণ পরিশোধ করে, তখন তার জীবন ধারণের জন্যে ন্যূনতম যা প্রয়োজন, তা তার জন্যে ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব। যেমন তার বাড়িটি বিক্রয় করা যাবেনা। কেননা বাড়ি ছাড়া তো তার মাথা গোঁজার ঠাই নেই। অনুরূপ, তার সম্পত্তি থেকে ততোটুকু পরিমাণ ছেড়ে দেয়া জরুরি, যতোটুকু দিয়ে সে তার মত ব্যক্তির উপযোগী একজন চাকর রাখতে পারে। খাতক যদি ব্যবসায়ী হয়, তবে ব্যবসায়ের ন্যূনতম সম্বল তার জন্য ছেড়ে দিতে হবে। আর যদি সে পেশাদার হয়, তবে তার পেশার প্রয়োজনীয় সাজ-সর াম ও যন্ত্রপাতি তাকে ছেড়ে দিতে হবে। আর তার জন্য ও তার উপর নির্ভরশীলদের জন্যে তার মতো ব্যক্তির উপযোগী ন্যূনতম খাদ্য ও বস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ইমাম শওকানি বলেন: খাতকের ও তার উপর নির্ভরশীলদের জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য বাসস্থান, পরিধানের ও শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার বস্ত্র ও ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় ব্যতীত তার কাছে যা কিছু পাওয়া যায়, তার সব কিছু নেয়া পাওনাদারদের জন্য বৈধ। তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি মুয়ায (রা) এর হাদিস উল্লেখপূর্বক বলেন: এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, পাওনাদাররা মুয়াযের পরিধানের পোশাক নিয়ে গেছে, তাকে তার বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে বা তিনি ও তার উপর নির্ভরশীলরা তাদের জীবন ধারণের ন্যূনতম অবলম্বন ছেড়ে চলে গেছে। এ জন্যেই আমি বলেছি যে, এই জিনিসগুলো কোনো অবস্থায়ই খাতকের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া যাবেনা। এটা ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদের মত। ইমাম শাফেয়ির মতে, তার বাড়ি এ অবস্থায় বিক্রয় করা যাবে।