📄 সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
শরিয়তের বা ফিকহের পরিভাষায় হিজর বলা হয় কারো সম্পদের ব্যবহার ও লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। হিজর দুই প্রকার:
১. অন্যের অধিকার রক্ষার্থে হিজর। যেমন: সেই দেউলিয়া ব্যক্তির উপর হিজর, যার পুরো সম্পত্তি ঋণে আটকা পড়েছে। এ ধরনের ব্যক্তিকে তার সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখা হয়, যাতে তার ঋণদাতাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকে অর্থাৎ তাদের ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত থাকে। রসূলুল্লাহ (সা) মুয়াযের উপর হিজর (নিষেধাজ্ঞা) আরোপ করেছিলেন এবং তার সম্পত্তি বিক্রয় করে তার ঋণ পরিশোধ করেন। (সাঈদ ইবনে মানসূর কর্তৃক বর্ণিত)
২. ব্যক্তির স্বীয় স্বার্থ রক্ষার্থে হিজর: যেমন কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও পাগলের উপর হিজর। এতে এদের সম্পত্তি রক্ষা পায়।
📄 ছোটগিলার উপর হিজর
দেউলিয়া সে ব্যক্তি, যার নিজের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের উপযোগী সম্পদ নেই। তার কিছু সম্পত্তি থাকলেও যেহেতু সে গোটা সম্পত্তিই ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা প্রয়োজন, তাই তার সম্পত্তি কার্যত পাওনাদারদের প্রাপ্য। কাজেই কার্যত সে নিঃস্ব। ফকিহদের ভাষায় সে এমন এক ব্যক্তি, যার ঋণ এতো বেশি হয়ে গেছে যে, তা সে শোধ করতে পারেনা। তাই শাসক তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে।
📄 ঋণ পরিশোধে সক্ষম হয়েও গড়িমসি করা
যে ব্যক্তি তার ঋণ পরিশোধে সক্ষম এবং পরিশোধের সময়ও সমাগত, অথচ পরিশোধ করেনা, তাকে অত্যাচারী গণ্য করা হয়। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'ধনীর ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা যুলুম।' এ হাদিসের আলোকে অধিকাংশ আলেম বলেন: ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা কবীরা গুনাহ। তাকে ঋণ পরিশোধের আদেশ দেয়া শাসকের উপর ওয়াজিব। তথাপি পরিশোধ না করলে এবং ঋণদাতা দাবি করলে তাকে গ্রেফতার করা হবে। রসূল (সা) বলেছেন: 'ধনীর গড়িমসি তার সম্মান ভূলুণ্ঠিত করে এবং তার জন্য শাস্তি বৈধ করে।' ইবনুল মুনির বলেন: অধিকাংশ আলেম ও বিচারকের মতে ঋণের দায়ে খাতককে আটক রাখা হবে। উমর ইবনে আব্দুল আযীয ঋণগ্রস্তের সম্পত্তি পাওনাদারদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন, তাকে গ্রেফতার করতেন না।
লায়েসও একই মত পোষণ করেই বলেন: এরপরও যদি সে ঋণ পরিশোধ না করে এবং তার সম্পত্তি বিক্রয় না করে তবে শাসক তা বিক্রয় করবে এবং পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করে তাকে আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে।'
📄 ছোটগিলার উপর লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা ও তার সম্পত্তি বিক্রয় করা
যে ব্যক্তির ধন-সম্পদ আছে, তথাপি ঋণ পরিশোধ করে না, তার পাওনাদাররা সবাই বা কতক পাওনাদার চাইলে শাসক তার উপর লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, যাতে তারা ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়। অধিকন্তু সে যদি অনুমতি পেয়েও নিজের সম্পত্তি বিক্রয় না করে তবে শাসক তার সম্পত্তি বিক্রয় করতে পারবে এবং তার বিক্রয় বৈধ হবে। কেননা শাসক তার স্থলাভিষিক্ত। এর প্রমাণ সাঈদ ইবনে মানসূর, আবু দাউদ ও আব্দুর রাজ্জাক কর্তৃক আব্দুর রহমান ইবনে কা'ব সূত্রে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিস:
'মুয়ায ইবনে জাবাল একজন দানশীল যুবক ছিলেন। তিনি নিজের জন্যে কিছুই সঞ্চিত রাখতেন না। ফলে ঋণগ্রস্ত হতে হতে এক সময় তার গোটা সম্পত্তিই ঋণের দায়ে ডুবে যায়। তখন তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট এসে তাকে অনুরোধ করলেন যেন তার পাওনাদারদেরকে বুঝিয়ে তার জন্য অবকাশ সৃষ্টি করেন। কারণ পাওনাদাররা যদি কাউকে অবকাশ দিত তবে রসূলুল্লাহ্ (সা) এর খাতিরে মুয়াযকেই দিত। কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সা) মুয়াযের সম্পত্তি বিক্রয় করে দিলেন। ফলে মুয়ায একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়লেন।'
‘নাইলুল আওত্বা’র গ্রন্থে বলা হয়েছে: ‘মুআয়্যার উপর লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে প্রমাণিত হয় যে, যে কোনো ঋণগ্রহস্তের উপর লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা বৈধ। তাছাড়া ঋণগ্রহস্তের ঋণ পরিশোধের জন্য তার সম্পত্তি বিক্রয় করা শাসকের জন্য জায়েয, চাই তার ঋণ তার গোটা সম্পত্তিকে গ্রাস করুক বা না করুক।’ এভাবে যখন দেউলে ঋণগ্রহস্তের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়, তখন তার প্রধান সম্পত্তির উপর তার যে কোনো হস্তক্ষেপ অচল ও অকার্যকর হবে। কেননা এটা হিজরের দাবি। ইমাম মালিকের মত এবং ইমাম শাফিয়ীর দুই মতের মধ্যে অগ্রগণ্য মত এটাই।
শুধু সে সব পাওনাদারের ঋণ হিস্যা অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে যারা ঋণ পরিশোধের দাবি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে এবং যাদের ঋণের মেয়াদ শেষ হয়েছে। যে পাওনাদার উপস্থিত কিন্তু পরিশোধের দাবি করছে না, যে পাওনাদার অনুপস্থিত এবং কোনো প্রতিনিধি নিয়োগ করেনি এবং যে উপস্থিত বা অনুপস্থিত এবং দাবিদার বা অ-দাবিদার পাওনাদারের ঋণের মেয়াদ শেষ হয়নি, সে এর আওতাভুক্ত হবেনা এবং তার ঋণ পরিশোধ করা হবেনা। এটা ইমাম আহমদের মত ও ইমাম শাফিয়ীর দুই মতের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ মত।
পক্ষান্তরে ইমাম মালেকের মত হলো, ঋণ যদি অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য হয় তাহলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সাথে সাথেই ঋণ পরিশোধ করা হবে। আর যে দেউলে মুতাবাবণ করেছে, তার ঋণ সকল পাওনাদারকেই পরিশোধ করতে হবে, তাই সে উপস্থিত হোক বা অনুপস্থিত, ঋণ পরিশোধের দাবি করুক বা না করুক এবং ঋণ দীর্ঘমেয়াদী হোক বা ত্বরিত পরিশোধযোগ্য হোক।
ঋণ পরিশোধ করার সময় সর্বাগ্রে আল্লাহর হক অতঃপর বান্দার হক পরিশোধ করা হবে। কেননা রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: ‘আল্লাহর ঋণ সর্বাগ্রে পরিশোধযোগ্য।’
ইমাম আবু হানিফা বলেন: ঋণগ্রহস্তের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাও জায়েয নেই, তার সম্পত্তি বিক্রয় করাও বৈধ নয়। ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত শাসক তাকে আটক রাখবে। তবে প্রথমোক্ত মতটি হাদিসের অনুকূল বলে অগ্রগণ্য।