📄 পিতা পিতা আবশ্যক হলে ছেলের খোরপোশের জন্য দায়ী
সচ্ছল পিতার ভরণ-পোষণের জন্যে যেমন সচ্ছল সন্তান দায়ী, ঠিক তেমনি অসচ্ছল সন্তানের ভরণ-পোষণের জন্যে সচ্ছল পিতা দায়ী। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সা) হিন্দকে (আবু সুফিয়ানের স্ত্রী) বলেছিলেন: 'তোমার ও তোমার ছেলের যতোটা প্রয়োজন, ততোটা তার (স্বামীর) সম্পত্তি থেকে গ্রহণ কর।' ইমাম আহমদ বলেন: সন্তান যদি অসচ্ছল অবস্থায় অথবা বেকার অবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং তার কোনো সম্পত্তি বা উপার্জন না থাকে, তবে পিতা তার ভরণ-পোষণের দায় থেকে অব্যাহতি পাবেনা।
📄 সকল আত্মীয়দের ভরণ-পোষণ
সচ্ছল আত্মীয়রা অসচ্ছল আত্মীয়দের ভরণ-পোষণের জন্য দায়ী কিনা, সে বা্যাপারে ফকিহদের বিপুল মতপার্থক্য রয়েছে। একদল বলেন: এটা বাধ্যতামূলক নয়, তবে রক্তের বন্ধন রক্ষা ও সদাচার হিসাবে যতোটা দরকার করা উচিত। ইমাম শওকানি বলেন: রক্ত সম্পর্ক রক্ষা করতে যতোটা প্রয়োজন, তার বেশি আত্মীয়ের প্রতি আত্মীয়ের কোনো দায় নেই। রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় ছাড়া অন্য কোনো পর্যায়ের আত্মীয়ের ভরণ পোষণ জরুরি না হওয়ার কারণ এই যে, এর স্বপক্ষে কুরআন বা হাদিসে কোনো প্রমাণ নেই। বরঞ্চ কিছু হাদিসে শুধু রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তা বজায় রাখার নির্দেশনা আছে। তবে সেগুলো সাধারণ ধরনের। আর যে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের ভরণ পোষণ অন্যের মুখাপেক্ষী, সে আত্মীয়ই আত্মীয়তা নিবিড় করণের অধিক হকদার। আল্লাহ্ সূরা তালাকের ৭ নং আয়াতে বলেছেন:
لِيُنْفِقُ ذُوْسَعَةٍ مِّنْ سَعَتِهِ وَمَنْ قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَلْيُنْفِقْ مِمَّا أَتَهُ اللهُ - لَا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلَّا مَا أَتَهَا سَيَجْعَلُ اللهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا
'বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ্ যা দান করেছেন তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ্ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। আল্লাহ্ কষ্টের পর স্বস্তি দেবেন।' এবং সূরা বাকারার ২৩৬ নং আয়াতে বলেন:
وعَلَى الْمُوْسِعِ قَدَرُهُ وَعَلَى الْمُقْتِرِ قَدَرَهُ
বিধিমত খরচের ব্যবস্থা করবে।'
শাফেয়ি মযহাবের মত হলো: সচ্ছল আত্মীয় মুসলমান হোক বা অমুসলমান, তার উপর বাপ, দাদা, থেকে যত ঊর্ধ্বের হোক এবং পুত্র ও পৌত্র থেকে যত নিম্নের হোক, তাদের ভরণ-পোষণ দেয়া ওয়াজিব। এই দুই শ্রেণী ব্যতীত আর কোনো আত্মীয়ের ভরণ-পোষণ দেয়া ওয়াজিব নয়।
মালেকি মযহাবের মত হলো: পিতা, মাতা, ছেলে ও মেয়ে ছাড়া আর কোনো আত্মীয়ের ভরণ-পোষণ ওয়াজিব নয়। দাদা, পৌত্র ও অন্য কোনো আত্মীয়ের ভরণ-পোষণ ওয়াজিব নয়। ধর্মের পার্থক্য ভরণ-পোষণ বাধ্যবাধকতার অন্তরায় নয়। হাম্বলি মযহাবের মত হলো: যে সচ্ছল আত্মীয় দরিদ্র আত্মীয়ের মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়, সেই সচ্ছল আত্মীয়ের উপর দরিদ্র আত্মীয়ের ভরণ পোষণ ওয়াজিব। এটা উত্তরাধিকারের পাশাপাশি অপ্রতিহত গতিতে চলতে থাকে। কেননা আয় দ্বারাই ব্যয় নির্বাহ হয়। তাছাড়া অধিকারগুলো দ্বিপক্ষীয় বিষয়, একতরফা বিষয় হয়। পিতামাতা ও তদূর্ধ্বের সকলের জন্যে এবং ছেলে ও তদনিম্নের সকলের জন্যে ভরণ পোষণ জরুরি। তাদের মতে, রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় যারা উত্তরাধিকারের অংশ পায়না এবং যারা পিতার দিকের আত্মীয় নয়, তারা যদি ও ঊর্ধ্বতনদের ও নিম্নতনদের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে কোনো ভরণ-পোষণ পাবেও না, কাউকে দিতেও বাধ্য নয়। কেননা একেতো তাদের আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল, তদুপরি কুরআন ও সুন্নাহতে তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো আদেশ নেই। ইবনে হাযম বিষয়টিকে ব্যাপকতর রূপ দিয়ে বলেন:
'যার ভরণ-পোষণ দেয়ার সামর্থ্য আছে সে তার পরমুখাপেক্ষী ও অস্বচ্ছল পিতামাতা, দাদাদাদী ও ঊর্ধ্বতনদের এবং ছেলে মেয়ে পৌত্র দৌহিত্র ও নিম্নতনদরে ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য থাকবে। অনুরূপ সে ভাই বোন ও স্ত্রীদেরও ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য থাকবে। এই সকল ব্যক্তিবর্গকে সমভাবে ভরণ-পোষণ দেয়া ওয়াজিব। এদের কাউকে কারো উপর অগ্রাধিকার দেয়া হবেনা। এদের ভরণ পোষণের পর কিছু যদি উদ্বৃত্ত থাকে, তবে তা রক্ত সম্পর্কীয় মুহাররমদের ও যাদের উত্তরাধিকার সে পাবে (তাদের মৃত্যুর পর) তাদের ভরণ-পোষণ দিতে তাকে বাধ্য করা হবে, যদি উল্লিখিত আত্মীয়রা নিস্ব ও উপার্জনহীন হয়। এ সব আত্মীয় হচ্ছে চাচা, ফুফু ও ঊর্ধ্বতন, মামা, খালা ও ঊর্ধ্বতন, ভাইয়ের সন্তানেরাও নিন্মতল। এদের মধ্য থেকে যারা আয়-রোজগারে সক্ষম হবে, চাই তা যত সামান্যই হোক, তারা আর ভরণ পোষণের অধিকারী হবে না। তবে পিতামাতা, দাদাদাদী ও স্ত্রীরা সর্বাবস্থায় ভরণ-পোষণের হকদার থাকবে। এ সব আত্মীয়কে অপর্যাপ্ত উপার্জনের উপর নির্ভরশীলতা থেকে রক্ষা করতে সে অসমর্থ হলে তাকে তা করতে বাধ্য করা হবে। প্রয়োজনে তার উদ্বৃত্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় করা হবে।
📄 জীব জন্তুর ভরণপোষণ
জীবজন্তুর জীবন ধারণে যা কিছু খাদ্য ও পানীয় অপরিহার্য, তা যোগান দেয়া তার মালিকের উপর ওয়াজিব। যদি না দেয় তবে শাসক তা দিতে অথবা জীবগুলো বিক্রয় বা যবাই করতে তাকে বাধ্য করবে। অন্যথায় শাসক যা অপেক্ষাকৃত কল্যাণকর তা করবে।
১. ইবনে উমার (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: জনৈকা মহিলাকে এজন্যে আযাব দেয়া হয়েছিল যে, সে একটা বিড়ালকে আটক রেখেছিল। এর ফলে শেষ পর্যন্ত বিড়ালটি মারা যায়। আটক অবস্থায় তাকে কিছু খেতেও দেয়নি, কিছু পানও করায়নি। আর তাকে ছেড়েও দেয়নি যে মাটির উপর পড়ে থাকা আজেবাজে জিনিস খাবে। এজন্যে মহিলাটি দোযখে যায়।
২. আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে পিপাসায় কাতর হয়ে পথিপার্শ্বে একটা কুয়া দেখে তাতে নেমে পানি পান করলো। পান করে যখন উপরে উঠলো, দেখলো একটা কুকুর পিপাসায় ছটফট করছে ও ভিজে মাটি চেটে খাচ্ছে। লোকটি মনে মনে বললো পিপাসায় আমার যে শোচনীয় অবস্থা হয়েছিল কুকুরটার তদ্রূপ অবস্থা হয়েছে। তখন সে আবার কৃয়ায় নামলো, নিজের পায়ের মোজায় করে পানি ভরে মুখ দিয়ে চেপে ধরে উপরে এনে এবং কুকুরকে পান করালো। আল্লাহ্ এজন্যে তার শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন এবং তার গুনাহ মাফ করলেন।' লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ্ জীবজন্তুর সেবা করলেও আমরা সওয়াব পাবো?' রসূলুল্লাহ (সা) বললেন: যে কোনো প্রাণীর সেবা করলেই সওয়াব রয়েছে।