📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সন্তানদের প্রতি সম আচরণের ধরন

📄 সন্তানদের প্রতি সম আচরণের ধরন


কিন্তু এই দশটি জবাবই ভুল। এই জবাবগুলো হাফেজ ইবনে হাজর 'ফাতহুল বারি' গ্রন্থে উদ্বৃত করেছেন। শওকানি 'নাইলুল আওতারে'ও উদ্ধৃত করেছেন:
এক: ইবনে আব্দুল বার বর্ণনা করেন যে, নুমান ইবনে বশিরকে তার পিতা যে উপহার দিয়েছিল, তা ছিলো তার সমগ্র সম্পত্তি। অথচ হাদিসটি একাধিক সূত্রে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে: তাতে স্পষ্ট যে, ওটা সমগ্র সম্পত্তি ছিলনা, বরং তার একটা অংশ মাত্র। ইমাম মুসলিমের বর্ণনায়ও বলা হয়েছে: 'আমার পিতা আমাকে তার সম্পত্তির একটা অংশ দিলেন।' অন্য হাদিসে বলা হয়েছে যে, একটি ভৃত্য দিয়েছিলেন।
দুই: উল্লিখিত উপহারটি বাস্তবে দেয়া হয়নি, শুধু প্রস্তাব করা হয়েছিল। বশির ঐ বিষয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) এর পরামর্শ নিতে এসেছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) এটা না করার পরামর্শ দিলে তিনি এটি পরিহার করেন। এটা তাবারীর বর্ণনা।
এর জবাব এই যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক উপহার প্রত্যাহারের আদেশ থেকে বুঝা যায়, উপহার দেয়া হয়েছিল। উমরা কর্তৃক রসূল (সা) কে সাক্ষী করার অনুরোধ থেকেও অনুরূপ ধারণা পাওয়া যায়।
তিন: নুমান প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং তিনি তখনো উপহারটি হস্তগত করেননি। তাই তার পিতা সেটি প্রত্যাহার করতে পেরেছিলেন। এটা ইমাম তাহাবির বর্ণনা। হাফেজ ইবনে হাজর বলেন: এটা অধিকাংশ বর্ণনার বিপরীত। বিশেষত রসূলুল্লাহ্ (সা) এর উক্তি: 'ফেরত নাও' প্রমাণ করে যে, আগেই উপহারটি হস্তগত করা হয়েছিল। তা ছাড়া অধিকাংশ বর্ণনা থেকে জানা যায়, নুমান তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং সে কারণে তা তার পিতার কাছেই সংরক্ষিত ছিলো। তাই রসূল (সা) তাকে উক্ত উপহার ফেরত নেয়ার আদেশ দেন। কেননা পিতার কাছে থাকলেও তা সন্তানের দখলে থাকার সমার্থক ছিলো।
চার: রসূলুল্লাহ্ (সা) এর উক্তি 'উপহারটি ফেরত নাও' উপহার দেয়ার বৈধতা প্রমাণ করে। যদি বৈধ না হতো তাহলে ফেরত নেয়া বৈধ হতোনা। তিনি ফেরত নেয়ার আদেশ এ জন্যেই দিয়েছিলেন যে, পিতা সন্তানকে যা দেয় তা ফেরত নেয়ার অধিকার তার থাকে। অবশ্য তা না করাই উত্তম। তবে সন্তানদের প্রতি সমান আচরণ করা মুস্তাহাব হওয়ায় তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। হাফেজ ইবনে হাজর বলেন: এই যুক্তি ভ্রান্ত। রসূলুল্লাহ্র উক্তি 'ফেরত নাও' এর অর্থ হিবাটি কার্যকর করোনা। আর এ দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, হিবাটি ইতোপূর্বে বৈধ ছিলো।
পাঁচ: 'আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে এ ব্যাপারে সাক্ষী কর' কথাটা দ্বারা এ কাজে সাক্ষী রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তিনি নিজে সাক্ষী হতে চাননি তার কারণ এই যে, তিনিই সর্বোচ্চ শাসক। সর্বোচ্চ শাসকের পক্ষে সাক্ষী হওয়া মানায়না। তিনি তো ফায়সালাকারী। এটা তাহাবির বর্ণনা।
এর জবাব এই যে, শাসকের সাক্ষী হওয়া মানায়না বলে তিনি যখন সাক্ষী হয়েই গিয়েছেন তখন সাক্ষী হওয়া থেকে বিরত থাকা তার জন্য জরুরি নয়। হাদিসের অবশিষ্ট অংশ থেকে প্রমাণিত হয় যে, অন্যকে সাক্ষী করার অনুমতি দান আসলে তার ক্ষোভ প্রকাশের সমার্থক। ইবনে হাজর বলেন: অধিকাংশ ফকিহের মত এটাই।
ছয়: রসূলুল্লাহ্ (সা) এর উক্তি: 'তুমি কি সকল সন্তানের সাথে সমান আচরণ করনি? থেকে প্রমাণিত হয় যে, সমান আচরণের আদেশ যে হাদিসে আছে, তার অর্থ মুস্তাহাব এবং নিষেধাজ্ঞার অর্থ মাকরূহ তানন্যিহি। কিন্তু বর্ণনায় ইবনে হাজর বলেন: এ জবাবটি সঠিক হতো যদি অপর বর্ণনায় সরাসরি এরূপ নির্দেশ না থাকতো: 'সন্তানদের মধ্যে সমান আচরণ কর।'
সাত: নুমান বর্ণিত হাদিসে 'সন্তানদের মধ্যে নৈকট্য বজায় রাখ' বলা হয়েছে, 'সমতা বজায় রাখ' নয়। তবে জবাবে বলা হয়েছে যে, আপনারা তো সমতা ও নৈকট্য কোনোটাই জরুরি মনে করেন না।
আট: সন্তানদের প্রতি ইনসাফ ও সমআচরণের সাথে পিতার প্রতি সন্তানদের যত্ন সমাদরের তুলনা প্রমাণ করে যে, সমআচরণের আদেশ মুস্তাহাব অর্থবোধক। এই জবাব ভুল এ জন্যে যে, সমান আচরণ না করাকে যুলুম আখ্যায়িত করা ও অগ্রাধিকার দিতে নিষেধ করা প্রমাণ করে যে, সমআচরণ করা ওয়াজিব।
নয়: অন্য হাদিস থেকে জানা যায়, আবু বকর (রা) আয়েশা (রা) কে উপহার দিয়েছেন এবং তাহাবির বর্ণনা থেকে জানা যায়, উমর (রা) আসেমকে উপহার দিয়েছেন, অন্যান্য সন্তানকে দেননি। অগ্রাধিকার দেয়া নাজায়েয হলে এই দুই খলিফা তা করতেন না। এর জবাব এই যে, উভয় ক্ষেত্রে অন্যান্য সন্তানের সম্পত্তি ছিলো। তা ছাড়া রসূলুল্লাহ (সা) এর উক্তির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হলে আবু বকর (রা) ও উমা (রা) যাই করুন না কেন, তা গ্রহণযোগ্য হবেনা।
দশ: এটা সর্বসম্মত মত যে, সন্তান ছাড়া অন্য কাউকে নিজের সম্পত্তি দান করা জায়েয। সকল সন্তানকে বঞ্চিত করে অন্যকে দেয়া যখন জায়েয, তখন কতক সন্তানকে বঞ্চিত করা তো জায়েয হবেই। ইবনে হাজর বলেন: এ বক্তব্য ভুল। কেননা কুরআন বা হাদিসের সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকা অবস্থায় কিয়াস গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং সন্তানদের প্রতি সমান আচরণ ওয়াজিব এবং বৈষম্য হারাম।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হিবা ফেরত দেয়া

📄 হিবা ফেরত দেয়া


যারা সম আচরণ ওয়াজিব মনে করেন, তারা এর ধরন নির্ণয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। মুহাম্মদ, আহমদ, ইসহাক এবং শাফেয়ি ও মালেকি ফকিহদের কেউ কেউ বলেন: উত্তরাধিকারের ন্যায় পুরুষ সন্তানকে কন্যা সন্তানের দ্বিগুণ দেয়াই ন্যায়বিচার। তাদের যুক্তি এই যে, বাবা মারা গেলে তো সন্তানরা এ রকমই পেতো। অন্যদের মত হলো, ছেলে ও মেয়েতে কোনো পার্থক্য নেই। যেহেতু হাদিসে স্পষ্টভাবে সমতার উল্লেখ রয়েছে, তাই সমতাই শিরোধার্য।
হিবা ফেরত নেয়া: অধিকাংশ আলিমের মতে হিবা ফেরত নেয়া হারাম, চাই তা ভাইবোনদের বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই হোক না কেন। তবে পিতা সন্তানকে যা হিবা করে তা ফেরত নিতে পারে।
ইমাম মালেক বলেন: পিতা সন্তানকে দেয়া সামগ্রী ততক্ষণই ফেরত নিতে পারে, যতক্ষণ তা পরিবর্তিত না হয়। পরিবর্তিত হয়ে গেলে ফেরত নিতে পারবে না। ইমাম আবু হানিফা বলেন: শুধু রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় নয় এমন ব্যক্তিকে দেয়া সামগ্রী ফেরত নেয়া যায় না। ইমাম আবু হানিফার এ মত হাদিসের পরিপন্থী হওয়ায় শক্তিশালী নয়।
আবুদাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'কোনো ব্যক্তির জন্য এটা বৈধ নয় যে, কাউকে কোনো সামগ্রী দান করার পর তা ফেরত নেবে। কেবল পিতা সন্তানকে দেয়া সামগ্রী ফেরত নিতে পারে। যে ব্যক্তি কাউকে কিছু দেয়ার পর তা ফেরত নেয় সে সেই কুকুরের মত, যে তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পর বমি করে এবং পরক্ষণে তার বমি খেয়ে নেয়।' (তিরমিযি এ হাদিসকে সহিহ বলেন।) এ হাদিস থেকে আরো জোরদারভাবে প্রমাণিত হলো যে, সন্তান ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে প্রদত্ত সামগ্রী ফেরত নেয়া হালাল নয়।
অনুরূপ প্রতিদান পাওয়ার জন্যে যে হিবা করা হয়, তা প্রতিদান না পেলে ফেরত নেয়া যায়। সালেম বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: যে ব্যক্তি কাউকে কোনো সামগ্রী হিবা করলো, সে যতোক্ষণ তার প্রতিদান না পায় ততোক্ষণ তা ফেরত পাওয়ার জন্যে সে অধিকতর হকদার।' ইবনুল কাইয়িম 'আলামুল মুকিইন' গ্রন্থে এই মতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলেন: 'শুধু সেই হিবাকারীর জন্যে হিবাকৃত জিনিস ফেরত নেয়া হারাম, যে কোনো রকম প্রতিদানের আশা ব্যতীতই হিবা করে। যে হিবাকারী প্রতিদান লাভের জন্যে হিবা করে এবং প্রতিদান পায়না, সে তার হিবাকৃত জিনিস ফেরত নিতে পারে। রসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাত পুরোপুরিভাবে পালন করা উচিত, আংশিকভাবে নয়।'

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যে সকল হিবা ও হাদিয়া ফেরত নেয়া যায় না

📄 যে সকল হিবা ও হাদিয়া ফেরত নেয়া যায় না


১. ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: তিনটি হিবা ফেরত নেয়া যায়না: বালিশ, সুগন্ধি দ্রব্য ও দুধ। (তিরমিযি)।
২. আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (SAW) বলেন: যাকে কোনো ফুল দেয়া হয় সে যেন তা ফেরত না দেয়। কারণ তা সহজে বহনযোগ্য এবং সুগন্ধিযুক্ত। -মুসলিম।
৩. আনাস (রা) বলেন: রসুলুল্লাহ (সা) কোনো সুগন্ধি প্রত্যাখ্যান করতেন না।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হাদিয়াদাতার প্রশংসা করা ও তার জন্য দোয়া করা

📄 হাদিয়াদাতার প্রশংসা করা ও তার জন্য দোয়া করা


১. আবু হুরায়রা (রা) সুত্রে বর্ণিত, রসূল (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনা। (আহমদ, তিরমিযি)।
২. জাবির (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'যে ব্যক্তিকে কোনো উপহার দেয়া হয়, সে যদি তার প্রতিদান দিতে সক্ষম হয় তবে তা দেয়া উচিত। আর সক্ষম না হলে তার প্রশংসা করা ও ধন্যবাদ দেয়া উচিত। যে প্রশংসা করে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর যে প্রশংসা গোপন করে সে অকৃতজ্ঞ। আর যে ব্যক্তি এমন জিনিস দ্বারা সাজসজ্জা করে যা তাকে দেয়া হয়নি, সে যেন প্রতারণার পোশাক পরে। (আবুদাউদ, তিরমিযি)।
৩. উসামা ইবনে যায়দ (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: যার প্রতি সৌজন্য প্রকাশ করা হলো এবং সে সৌজন্য প্রকাশকারীকে বললেন: আল্লাহ্ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন সে প্রচুর প্রশংসা করলো। (তিরমিযি)।
৪. আনাস (রা) বলেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) মদিনায় এলেন, তাঁর কাছে মুহাজিরগণ এসে বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমরা এখানে যাদের কাছে এসেছি, তাদের চাইতে অকাতরে ধন-সম্পদ দানকারী এবং সহানুভূতিশীল মানুষ আর দেখিনি। তারা আমাদের জন্যে প্রচুর পরিশ্রম করে এবং তাদের প্রাচুর্যে আমাদেরকে শরিক করে। ফলে আমাদের আশংকা জন্মেছে যে, আখিরাতের সমস্ত সওয়াব তারাই নিয়ে যাবে। তিনি বললেন: না, যতোক্ষণ তোমরা তাদের প্রশংসা করবে ও তাদের জন্যে দোয়া করবে ততোক্ষণ তোমরাও সওয়াবে শরীক থাকবে।' (তিরমিযি)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00