📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হিবাকৃত সামগ্রীর দখল

📄 হিবাকৃত সামগ্রীর দখল


কোনো কোনো ফকিহ্ মনে করেন, যাকে হিবা করা হয়েছে নিছক হিবার চুক্তি বলেই হিবাকৃত সামগ্রীটি তার পাওনা হয়, দখল করা মোটেই শর্ত নয়। কেননা সকল চুক্তির ক্ষেত্রে এটাই মূলনীতি যে, দখলের শর্ত ছাড়াই তা বৈধ হয়, যেমন বিক্রয়। এটা ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ, আবু সাওর ও যাহেরি মযহাবের মত। এ মূলনীতির ভিত্তিতে দাতা বা যাকে দান করা হয়েছে সে জিনিসটি দখলে নেয়ার আগে মারা গেলে হিবা বাতিল হবে না। কেননা শুধু চুক্তির বলেই সে জিনিসটির মালিক হয়ে গেছে। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ি ও সাওরি বলেন: হিবাকৃত সামগ্রী দখলে নেয়া হিবার বৈধতার শর্ত। যতোক্ষণ হিবাগ্রহীতা তা দখল না করবে, ততোক্ষণ তা দাতার জন্যে বাধ্যতামূলক নয়। তাই দখলের পূর্বে দাতা বা যাকে দান করা হয়েছে সে মারা গেলে হিবা বাতিল হয়ে যাবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সম্পত্তি দান করা

📄 সম্পত্তি দান করা


অধিকাংশ আলেমের মতে কোনো মানুষ তার সমগ্র সম্পত্তি অন্যকে দান করে দিলে তা বৈধ। কিন্তু ইমাম মুহাম্মদ ও কোনো কোনো হানাফি ফকিহ্ বলেন: সমগ্র সম্পত্তি দান করা বৈধ হবে না, চাই তা যত বড় সৎ কাজেই করা হোক। এ ধরনের কাজ যে করবে তাকে তারা নির্বোধ গণ্য করেছেন এবং তার সমস্ত লেনদেনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ওয়াজিব বলে মত প্রকাশ করেছেন। 'আর রওযাতুন নাদিয়‍্যাহ' গ্রন্থের লেখক এ সম্পর্কে বলেন:
'অভাব অনটন ও অসচ্ছলতায় যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে পারে তার জন্যে নিজের অধিকাংশ বা সমগ্র সম্পত্তি দান করা বৈধ। কিন্তু যে ব্যক্তি অভাবে পড়লে অন্যের কাছে ভিক্ষার হাত পাতে, তার জন্যে অধিকাংশ বা সমগ্র সম্পত্তি দান করা বৈধ নয়।' এ মতটি দ্বারা এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তির বেশি দান করা বৈধ প্রমাণকারী ও অবৈধ প্রমাণকারী হাদিসগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব বলে মনে করা যেতে পারে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হাদিয়া বা উপহারের প্রতিদান

📄 হাদিয়া বা উপহারের প্রতিদান


হাদিয়ার প্রতিদান দান করা মুস্তাহাব, চাই তা যত উঁচু স্তরের ব্যক্তির পক্ষ থেকে যত নিম্ন স্তরের ব্যক্তিকেই দেয়া হোক। কেননা ইমাম আহমদ, বুখারি, আবুদাউদ ও তিরমিযি আয়েশা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং তার প্রতিদান দিতেন।' ইবনে আবি শায়বার বর্ণনা মতে প্রাপ্ত হাদিয়ার চাইতে উৎকৃষ্ট মানের প্রতিদান দিতেন, যাতে কারো পক্ষ থেকে প্রদর্শিত সৌজন্য ও মহানুভবতায় তিনিও সমান অংশীদার হতে পারেন এবং কেউ এ জন্যে তাকে খোঁটা দেয়ার সুযোগ না পায়।
ইমাম খাত্তাবি বলেন: কিছু সংখ্যক ফকিহ্ হাদিয়া প্রদানের ক্ষেত্রে মানুষকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেন: ১. ভৃত্য প্রভৃতি নিম্নতর শ্রেণির লোকের মনিব বা অনুরূপ কোনো উচ্চতর পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষ থেকে হাদিয়া প্রাপ্ত। এটা স্নেহের নিদর্শন। এর প্রতিদান দেয়া জরুরি নয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সন্তানদের কাউকে অগ্রাধিকার দিয়ে হিবা করা

📄 সন্তানদের কাউকে অগ্রাধিকার দিয়ে হিবা করা


২. নিম্নতর পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি কর্তৃক উচ্চতর পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিকে হিবা বা হাদিয়া প্রদান। এটা সাধারণত সহানুভূতি ও কৃপা দৃষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রতিদান দেয়া জরুরি।
৩. সমমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিকে হিবা বা হাদিয়া প্রদান। এ ক্ষেত্রে প্রধানত প্রীতি ও নৈকট্য লাভই কাম্য হয়ে থাকে। কেউ কেউ বলেন: এতে প্রতিদান দেয়া যেতে পারে। কিন্তু যে ক্ষেত্রে হিবার প্রতিদান দেয়া শর্ত, সে ক্ষেত্রে প্রতিদান দেয়া জরুরি।
সন্তানদের কাউকে অগ্রাধিকার দিয়ে হিবা করা: সন্তানদের কাউকে অন্য সন্তানের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে কিছু হিবা বা হাদিয়া করা অবৈধ। কেননা এতে পরিবারে বিভেদ, বিদ্বেষ ও শত্রুতার বীজ বপন করা হয় এবং যে পারস্পরিক সম্পর্ককে আল্লাহ্ মজবুত করার আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করা হয়। এটা ইমাম আহমদ, ইস্হাক, সাওরি, তাউস ও কোনো কোনো মালেকি ফকিহের মত। তারা বলেন: 'সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করা ও একজনকে অপরজনের উপর অগ্রাধিকার দান বাতিল ও যুলুম এবং যে ব্যক্তি এ কাজ করে স্বয়ং তারই এটা রহিত করা ওয়াজিব। ইমাম বুখারি এ মতটি দৃঢ়তার সাথে প্রকাশ করেছেন এবং প্রমাণ স্বরূপ ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত এ হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন; 'সন্তানদের মধ্যে দানের বেলায় সমতা অবলম্বন কর। আমি যদি কাউকে অগ্রাধিকার দিতাম তবে মেয়েদেরকে দিতাম।' (তাবরানি, বায়হাকি)
ইমাম আহমদের মত হলো, বিশেষ কোনো কারণ না থাকলে সন্তানদের মধ্যে কাউকে কারো উপর অগ্রাধিকার দেয়া হারাম। কিন্তু অগ্রাধিকার দেয়ার কোনো কারণ বা প্রয়োজন থাকলে এটা দূষণীয় নয়। 'আলমুনি' গ্রন্থে বলা হয়েছে: পিতা যদি কোনো সন্তানকে এমন কোনো কারণে অগ্রাধিকার দেয়, যা অগ্রাধিকার দাবি করে, যেমন কোনো সন্তানের পরমুখাপেক্ষিতা, বিকলাঙ্গতা বা প্রতিবন্ধিতা, অন্ধত্ব, অধিক সন্তান, জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকা, অথবা অনুরূপ কোনো উত্তম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া, কিংবা কোনো সন্তান ফাসিক বা অবেদাতী হওয়া, বা পিতার দেয়া হিবা বা হাদিয়াকে গুনাহ্ কাজে ব্যবহার বা ব্যয় করার কারণে উক্ত সন্তানকে কোনো হিবা থেকে বঞ্চিত করাকে ইমাম আহমদ অনুমোদন করেন বলে কোনো কোনো বর্ণনা সূত্রে জানা গেছে।
ইমাম শাবি সূত্রে বর্ণিত, নুমান ইবনে বশির বলেন: 'আমার পিতা আমাকে একটা উপহার দিলেন। এই হাদিসের জনৈক বর্ণনাকারী ইসমাইল ইবনে সালিম বলেন: নুমান ইবনে বশিরকে তার পিতা একটা ভৃত্য দিয়েছিল। তখন তার পিতাকে আমার মাতা উমরা বিনতে রওয়াহা বললেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে যাও এবং তাকে সাক্ষী রাখ। সে রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট গিয়ে তাঁকে ব্যাপারটা জানালো। সে বললো: আমি আমার ছেলে নুমানকে একটা উপহার দিয়েছি। এ ব্যাপারে আপনাকে সাক্ষী রাখতে উমরা আমাকে পরামর্শ দিয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: নুমান ছাড়া তোমার আর কোনো সন্তান আছে? সে বললো: আছে। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: নুমানকে যা দিয়েছ, তাদের প্রত্যেককে কি তদ্রূপ উপহার দিয়েছ? সে বললো: না। অত:পর এই সব বর্ণনাকারীর কেউ কেউ নুমানের পিতাকে বললো: এটা অন্যায়। আবার কেউ কেউ বললো: এটা অন্যায় আসকারা। কাজেই আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে এ ব্যাপারে সাক্ষী রাখ। মুগীরা বললেন: তোমার সন্তানরা সবাই তোমার নিকট সমান স্নেহধন্য ও তোমার প্রতি সমান যত্নশীল হোক, তা কি তুমি চাওনা? সে বললো: হাঁ। তখন মুগীরা বললেন: তাহলে এ কাজে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে সাক্ষী রাখ। মুজাহিদ তাকে বললেন: তোমার সন্তানদের তোমার কাছ থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অনুরূপ তোমারও তাদের কাছ থেকে সদাচার ও যত্ন লাভের অধিকার রয়েছে।'
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম বলেন: 'যে ন্যায়বিচারের আদেশ আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে দিয়েছেন, যে ন্যায়বিচারের উপর আকাশ ও পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, এবং যে ন্যায় বিচারের উপর ইসলামী শরিয়ত দণ্ডায়মান, সে ন্যায় বিচারের একটা বিশদ বিবরণ এই হাদিসটিতে পাওয়া যায়। পৃথিবীতে যত রকমের যুক্তিতর্ক আছে, তার সব কিছুর চাইতে এ হাদিস কুরআনের সাথে অধিকতর সংগতিশীল এবং এটি একটি অকাট্য প্রমাণ।' হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি ও অধিকাংশ ফকিহের মত হলো, সন্তানদের মধ্যে সমতা অবলম্বন করা মুস্তাহাব এবং কাউকে কারো উপর অগ্রাধিকার দেয়া মাকরুহ, হারাম নয়। কেউ যদি অগ্রাধিকার দেয় তবে তা কার্যকর হবে। নু'মান ইবনে বশিরের হাদিসের তারা দশটি জবাব দিয়েছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00