📄 হিবা সম্পর্কে শরিয়তের বিধি
আল্লাহ্ হিবাকে শরিয়তসিদ্ধ করেছেন। কারণ এতে মানুষের পরস্পরের প্রতি মমত্ব ও প্রীতি জন্মে এবং ভালোবাসার সম্পর্ক মজবুত হয়। আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'তোমরা পরস্পর হাদিয়া লেনদেন কর, পরস্পরে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।' (বুখারি, আল আদাবুল মুফরাদ, বায়হাকি)। রসূলুল্লাহ্ (সা) হাদিয়া গ্রহণ করতেন ও তার প্রতিদান দিতেন। তিনি হাদিয়া গ্রহণ করতে অনুরোধ ও উৎসাহিত করতেন। ইমাম আহমদ খালিদ ইবনে আদি (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: যার কাছে তার ভাই এর কাছ থেকে কোনো প্রকারের অনুরোধ বা দাবি ছাড়াই কোনো উপহার আসে, তার সেটি গ্রহণ করা উচিত এবং ফেরত দেয়া উচিত নয়। কেননা সেটি আল্লাহ্র দেয়া একটি নিয়ামত, যা তিনি (অযাচিতভাবেই) তার কাছে পাঠিয়েছেন।' আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ্ (সা) বলেন: আমাকে যদি একটা জন্তুর পায়ের নিচের অংশটা হাদিয়া পাঠানো হয়, তবে আমি তাও গ্রহণ করবো, আর যদি তা খাওয়ার জন্যে আমাকে দাওয়াত করা হয় তবে আমি তাও কবুল করবো।' (আহমদ, তিরমিযি)
আয়েশা (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ্, আমার দু'জন প্রতিবেশী। তাদের মধ্যে কোন্ জনকে হাদিয়া (উপহার) পাঠাবো? রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: যার দরজা তোমার কাছ থেকে অধিক নিকটে।' আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: পরস্পরে উপহার বিনিময় কর। এটা মনের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে। কোনো প্রতিবেশিনী তার অপর প্রতিবেশিনীকে তাচ্ছিল্য করা উচিত নয়, যদিও সে একটা ছাগলের পায়ের একাংশ পাঠায়।' রসূলুল্লাহ্ (সা) কাফেরদের হাদিয়াও গ্রহণ করতেন। রোম সম্রাট, পারস্য সম্রাট ও মুকাওকিসের উপহার গ্রহণ করেছেন। অনুরূপ তিনি কাফেরদেরকে হাদিয়া ও দানসামগ্রী পাঠাতেন।
তবে ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযি বর্ণনা করেন: ইয়ায রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট একটা উপহার পাঠালেন। রসূলুল্লাহ (সা) তাকে বললেন: তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ? সে বললো: না। তিনি বললেন: আমাকে মুশরিকদের উপহার গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।' এ হাদিস সম্পর্কে খাত্তাবি বলেন: হাদিসটি সম্ভবত রহিত হয়েছে। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সা) একাধিক মুশরিকদের হাদিয়া গ্রহণ করেছেন।
ইমাম শওকানি বলেন: ইমাম বুখারি তার সহিহ হাদিস গ্রন্থে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকদের হাদিয়া গ্রহণ করা জায়েয। হাফেয ইবনে হাজর আসকালানি 'ফাতহুল বারী' গ্রন্থে বলেন: 'উল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত উপহারদাতা মুশরিক। কাজেই হাদিয়া ফেরত দেয়ার ঘটনা কোনো কিতাবির ক্ষেত্রে ঘটেছে বলার অবকাশ নেই।'
📄 হিবার মূল উপাদান
কোনো বিনিময় ছাড়াই প্রদত্ত সামগ্রীটির মালিক বানানো হচ্ছে- এ কথা বুঝা যায় এমন যে কোনো বাক্য প্রয়োগে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হলেই হিবা শুদ্ধ হবে। যেমন: দাতা বলবে: তোমাকে দিলাম, উপহার দিলাম বা দান করলাম ইত্যাদি। আর অপরজন বলবে, গ্রহণ করলাম। ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ি মনে করেন, হিবার ক্ষেত্রে কবুল বলাটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো কোনো হানাফি ফকিহের মতে শুধু দাতার ইজাবই (প্রস্তাব) যথেষ্ট। প্রকৃতপক্ষে শেষোক্ত মতটাই সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ। হাম্বলি ফকিহগণ বলেন: পারস্পরিক লেনদেন দ্বারাই হিবা শুদ্ধ হবে। রসূলুল্লাহ্ (সা) হাদিয়া পাঠাতেন ও গ্রহণ করতেন। সাহাবিরাও তদ্রূপ করতেন। তারা ইজাব ও কবুলের কোনো শর্ত আরোপ করতেন বলে শোনা যায়নি।
📄 হিবার শর্তাবলী
হিবার জন্যে একজন হিবাকারী, একজন হিবা গ্রহণকারী এবং হিবা সামগ্রী প্রয়োজন। এই তিনটির প্রত্যেকটির জন্যে কিছু শর্ত রয়েছে।
📄 হিবাকারীর শর্ত
হিবাকারীর মধ্যে নিম্নোক্ত শর্তাবলী থাকা জরুরি:
১. প্রদত্ত সামগ্রীটির মালিকানা।
২. এমন কোনো ব্যক্তি না হওয়া, যাকে কোনো কারণে আইনত লেনদেন করতে নিষেধ করা হয়েছে।
৩. তার প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া। কেননা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি লেনদেনের যোগ্য নয়।
৪. তার স্বেচ্ছায় ও স্বত:স্ফূর্তভাবে ও বলপ্রয়োগ ব্যতিরেকে হিবা করা। কেননা হিবার চুক্তি স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে সম্পাদিত হওয়া জরুরি।