📄 ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধানকারী জন্য ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েয
ওয়াক্ফ সম্পত্তি দেখাশুনা ও তদারকীর দায়িত্বশীলদের জন্য তা থেকে পারিশ্রমিক নেয়া বৈধ। কারণ ইতোপূর্বে ইবনে উমরের বর্ণিত হাদিসে রয়েছে: ‘ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক ন্যায়সংগতভাবে তা থেকে পারিশ্রমিক নিতে পারবে।’ এখানে ‘ন্যায় সংগত’ বলতে সেটাই বুঝায়, যা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য। ইমাম কুরতুবী বলেন: ‘তদারককারী ওয়াক্ফ সম্পত্তির ফসল থেকে নিজের পারিশ্রমিক নেবে এটাই প্রচলিত রীতি। এমনকি ওয়াক্ফকারী যদি তদারককারী কিছু নেবেনা-এই শর্ত আরোপ করে, তাহলে তা হবে অন্যায় শর্ত।
📄 ওয়াকফ সম্পত্তির ফসল বা শস্যদানের উষত অংশ অনুরূপ কাজে ব্যয় করা হবে
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: ‘ওয়াক্ফ সম্পত্তির ফসল থেকে যা উদ্বৃত্ত থাকবে এবং যা নিষ্প্রয়োজন বিবেচিত হবে তা অনুরূপ অন্যান্য কাজে ব্যয়িত হবে। যেমন মসজিদের জন্য ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তির ফসল তার প্রয়োজনে ব্যয় করার পর যা উদ্বৃত্ত থাকবে তা অপর মসজিদে ব্যয় করা হবে। কারণ ওয়াক্ফকারীর উদ্দেশ্য হলো সমপর্যায়ের কাজ। যদি এরূপ বিবেচিত হয় যে, প্রথম মসজিদ বিরান হয়ে গেছে এবং তা দ্বারা এখন আর কেউ উপকৃত হতে পারছে না, তাহলে তার ফসল বা লব্ধ সম্পদ অন্য মসজিদ নির্মাণে বা মেরামতে ব্যয় করা হবে। অনুরূপ, যখন তার প্রয়োজন পূর্ণ করার পর কিছু উদ্বৃত্ত থাকবে তখন তা অনুরূপ অন্য কোনো মসজিদে ব্যয় করা হবে। অলস ফেলে রাখা হবেনা।’
📄 মানুষ ও ওয়াকফের সম্পত্তির ক্ষতি হয় এমন আকারে রূপান্তর
যে জিনিস ওয়াক্ফ বা মান্নত করা হয়, তা পরিবর্তন করে তার চেয়ে ভাল জিনিস ওয়াক্ফ বা মান্নত করা দুই রকমের:
১. অনিবার্য প্রয়োজনবশত পরিবর্তন করা। যেমন তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেল, তাই তা বিক্রয় করে তার মূল্য দ্বারা তার বিকল্প ক্রয় করা। উদাহরণ স্বরূপ, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতকৃত ঘোড়া। এই ঘোড়া যদি যুদ্ধে ব্যবহারের যোগ্য না থাকে, তাহলে তা বিক্রয় করা হবে এবং তার বিকল্প ক্রয় করা হবে। অনুরূপ, মসজিদের পরিবেশ যখন এত খারাপ হয় যে, মসজিদ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়, তখন তা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হবে অথবা বিক্রয় করা হবে এবং তার মূল্য দিয়ে বিকল্প মসজিদ নির্মাণ করা হবে। আর যখন ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি ব্যবহারপূর্বক ওয়াক্ফকারীর উদ্দেশ্য সফল করার সম্ভবনা না থাকে, তখন তা বিক্রয় করে তার মূল্য দ্বারা তার বিকল্প ক্রয় করা হবে। আর যখন ওয়াক্ফ করা ভবন নষ্ট হয়ে যায় তখন তা বিক্রয় করা হবে এবং সে মূল্য দিয়ে তার বিকল্প খরিদ করা হবে। এ সবই বৈধ।
২. অগ্রাধিকারযোগ্য বা বৃহত্তর স্বার্থে পরিবর্তন করা, যেমন কুরবানীর জন্য পরিবর্তন করে তার চেয়ে ভাল জন্তু খরিদ করা। অনুরূপ মসজিদের পরিবর্তে এলাকার লোকদের জন্য অধিকতর উপযোগী অন্য মসজিদ নির্মাণ করা ও প্রথমটি বিক্রয় করা। এ কাজ এ ধরনের কাজ ইমাম আহমদের মতে জায়েয। ইমাম আহমদ এর প্রমাণ দর্শনে বলেন, উমার ইবনে খাত্তাব (রা) কুফার প্রাচীন মসজিদকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করেছিলেন। তখন প্রথম মসজিদটি খেজুর বিক্রেতাদের বাজারে পরিণত হয়। উমার (রা) যখন জানতে পারলেন যে, কুফার বাইতুল মালকে ছিদ্র করা হয়েছে, তখন তিনি সা’দ (রা) কে লিখলেন: খেজুর বিক্রেতাদের নিকট যে মসজিদ রয়েছে, সেটি সরিয়ে নাও এবং বাইতুল মালকে মসজিদের ভেতরে নাও। কেননা মসজিদে সব সময়ই কোনো না কোনো নামাযী থাকে। এটা মসজিদের জায়গা পরিবর্তনের পর্যায়ভুক্ত। মসজিদের ভিত্তিও অন্য ভিত্তি দ্বারা পরিবর্তন করে নেয়া যায়। কেননা উমার (রা) ও উসমান (রা) মসজিদে নববীকে তার পূর্ববর্তী ভিত্তির পরিবর্তে অন্য ভিত্তির উপর তৈরি করেছিলেন এবং তাকে আরো সম্প্রসারিত করেছিলেন।
অনুরূপ মসজিদুল হারামের বেলায়ও ঘটেছে। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) আয়েশা (রা) কে বললেন: ‘তোমাদের জনগণ যদি জাহিলিয়াত থেকে সদ্য উদ্ধারপ্রাপ্ত না হতো তাহলে আমি কা’বা শরিফকে ভেঙ্গে ফেলতাম, ওটিকে মাটির সাথে যুক্ত করতাম এবং ওর দুটো দরজা বানাতাম, একটা দিয়ে মানুষ প্রবেশ করতো আর অপরটা দিয়ে বের হতো।' সুতরাং অগ্রাধিকারযোগ্য বিপরীত চিন্তা না থাকলে রসূলুল্লাহ্ (সা) কা'বা শরীফের ভিত্তিও পাল্টে ফেলতেন। কাজেই ওয়াক্ফ্ সম্পত্তির ভিত্তির আকৃতি পাল্টানো বৈধ। বৃহত্তর স্বার্থে এটা করা যায়। জমি বা প্রাঙ্গণ পাল্টানোও ইমাম আহমদ প্রমুখ বৈধ মনে করেন। কারণ সাহাবিগণ, বিশেষত উমর (রা) এরূপ করেছেন এবং সেটা ব্যাপক প্রচার লাভ করেছে। কেউ তার বিরোধিতা করেনি। কেবল শস্যাদির জন্য যে জমি ওয়াকফ্ করা হয়, তা যদি তার চেয়ে উত্তম বিকল্প জমি দিয়ে পাল্টানো হয়, তবে তাও জায়েয। অনুরূপ যদি ঘর, দোকান, বাগান বা গ্রাম ওয়াকফ্ করা হয় এবং তার প্রাপ্তি খুব কম হয়, তবে ওয়াক্ফের জন্য অধিকতর লাভজনক ঘর বা দোকান ইত্যাদি দিয়ে তা পরিবর্তন করা যায়। ইমামদের মধ্যে আবু সাওর ও মিশরের বিচারক আবু উবায়েদ এটিকে বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। ইমাম আহমদ বৃহত্তর কল্যাণের লক্ষ্যে মসজিদের জমি পরিবর্তন জায়েয বলে যে উক্তি করেছেন, তার আলোকে কিয়াস করে আবু সাওর ও আবু উবায়েদ উপর্যুক্ত মত দিয়েছেন। তবে ইমাম আহমদের শিষ্যদের মধ্য থেকে কেউ কেউ মসজিদ, কুরবানীর জন্তু ও ওয়াক্ফকৃত জমি পরিবর্তনের বিপক্ষে। ইমাম শাফেয়ি এবং ইমাম মালেকও এর বিপক্ষে। কিন্তু হাদিস, আসার ও যুক্তি এর বৈধতাই প্রমাণ করে। মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।
📄 উত্তরাধিকারীদের স্বার্থের ক্ষতি হয় এমন ওয়াকফ হারাম
কোন ব্যক্তির এমন ওয়াকফ্ করা হারাম, যা দ্বারা উত্তরাধিকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: ইসলামে কারো ক্ষতি করারও অবকাশ নেই, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারও সুযোগ নেই।' সুতরাং এ ধরনের ওয়াকফ্ করা হলে তা বাতিল হবে। আর 'রওযাতুন নাদিয়া' গ্রন্থে রয়েছে:
'মোট কথা, আল্লাহ্ যে সম্পর্কগুলো জুড়ে রাখার আদেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত ফরযসমূহের বিরোধিতা করা যে ওয়াফ্ফের উদ্দেশ্য, তা বাতিল এবং কোনোক্রমেই তা গ্রহণযোগ্য হবেনা। যেমন কেউ তার কন্যা সন্তানদের বাদ দিয়ে শুধু পুরুষ সন্তানদের নামে ওয়াকফ্ করলে তা বাতিল হবে। কারণ এ ধরনের ওয়াফ্ফের উদ্দেশ্য আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করা নয়, বরং আল্লাহর হুকুম লংঘন করা এবং আল্লাহ্ তার বান্দাদের জন্যে যেসব অধিকার নির্ধারণ করেছেন তা হরণ করা। বস্তুত এটা একটা তাগুতি ওয়াকফ্, যা শয়তানের উদ্দেশ্য সফল করার সহায়ক। কাজেই পাঠক! আপনার এটা স্মরণ রাখা উচিত, এ যুগে এগুলো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনুরূপ যে ব্যক্তি শুধু নিজের সম্পত্তিকে নিজের বংশধরের মধ্যে গুটিয়ে নেয় এবং তাদের বাইরে যেতে না দেয়ার উদ্দেশ্যে শুধু নিজের বংশধরের নামে ওয়াক্ফ্ করে, আল্লাহর বিধানের বিরোধিতাই তার উদ্দেশ্য। আল্লাহ্র বিধান হলো, উত্তরাধিকারের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর এবং উত্তরাধিকারীকে তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে যেমন খুশি হস্তান্তর বা লেনদেন করার স্বাধীনতা প্রদান। উত্তরাধিকারীরা ধনী না গরীব সেটা দেখা ওয়াক্ফকারীর ইখতিয়ার নয়, বরং আল্লাহ্র ইখতিয়ার। নিজের সন্তান ও বংশধরদের জন্য ওয়াকফ্ করায় আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্য থাকা খুবই বিরল। সুতরাং প্রত্যেক ওয়াক্ফকারীর সূক্ষ্মভাবে এ বিষয়টি বিবেচনা করা কর্তব্য। এই সাথে এ কথাটাও মনে রাখতে হবে যে, নিজের বংশধরদের মধ্যে যারা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বা ইসলামী জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত, তাদের নামে সম্পত্তির একটা অংশ ওয়াক্ফ্ করলে তা ন্যায়সঙ্গত এবং তা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ নিশ্চিত হতে পারে। কিন্তু এ উদ্দেশ্যে খুব কম লোকই ওয়াকফ্ করে থাকে। তাই আল্লাহ্ সম্পদ বণ্টনের যে বিধান তার বান্দাদের জন্যে চালু করেছেন এবং যে বিধান তাঁর মনোনীত, সে বিধানকে কার্যকর করাই সর্বোত্তম পন্থা।