📄 ওয়াকফ কত প্রকার
ওয়াক্ফ কখনো পৌত্র, প্রপৌত্র, আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ দরিদ্র মানুষের জন্য করা হয়ে থাকে। একে পারিবারিক বা বংশগত ওয়াক্ফ বলা হয়। আবার কখনো সর্বপ্রকার কল্যাণমূলক কাজে ওয়াক্ফ করা হয়। একে বলা হয় দাতব্য বা কল্যাণধর্মী ওয়াক্ফ।
📄 ওয়াকফের বৈধতা
মহান আল্লাহ ওয়াক্ফকে একটি মুস্তাহাব কাজ হিসেবে প্রবর্তন করেছেন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। জাহেলী যুগের আরবরা এর সাথে পরিচিত ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম এটির প্রচলন করেন, এ দিকে সকলকে আহ্বান করেন ও এটিকে জনপ্রিয় করেন, যাতে দরিদ্র ও অভাবক্লিষ্ট মানুষ উপকৃত হয়।
আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: মানুষ মারা গেলে তিনটি কাজ ব্যতীত তার আর সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে যায়: চলমান দান বা সদকায়ে জারিয়া, উপকারী বিদ্যা এবং নেককার সন্তান, যে মৃতের জন্য দোয়া করতে থাকে। এ সদকায়ে জারিয়ার-ই অপর নাম ‘ওয়াক্ফ’। হাদিসটির মর্মার্থ হলো: মৃত ব্যক্তি যতো সহজভাবে সৎকাজ করুক, তার মৃত্যুর সাথে সাথে তা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এই তিনটি কাজ এমন যে, এ দ্বারা ক্রমাগত সওয়াব হতে থাকে এবং তা ক্রমাগতভাবে চালু থাকে। তার সৎ সন্তান, তার রেখে যাওয়া ও শিখিয়ে যাওয়া উপকারী বিদ্যা এবং সদকায়ে জারিয়া, এগুলো তারই চেষ্টার ফল। অথচ মৃত্যুর পর এগুলোর সুফল বন্ধ হয়না।
ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: ‘মুমিনের যে সব সৎ কাজ মৃত্যুর পরও তার কাছে পৌঁছাতে থাকে তা হচ্ছে ১. তার প্রচারিত সৎ বিদ্যা, ২. তার রেখে যাওয়া কোনো নেক সন্তান ৩. তার নির্মিত কোনো মসজিদ, ৪. তার নির্মিত কোনো মুসাফিরখানা, ৫. তার খনন করা কোনো জলাশয়, ৬. তার জীবদ্দশায় তার সম্পত্তি থেকে দান করা কোনো সদকা, যা তার মৃত্যুর পরও তার কাছে পৌঁছতে থাকে।’
এই সাতটির সাথে আরো তিনটি জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লামা সুয়ূতির ভাষায় সে তিনটি হচ্ছে; ৮. কোনো ফলের গাছ লাগিয়ে যাওয়া ৯. কোনো সীমান্তে প্রহরা দেওয়া, ১০. আল্লাহর স্মরণের (ইসলামী অনুষ্ঠান করার) জন্য কোনো ঘর নির্মাণ করে যাওয়া।
রসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবিগণ মসজিদ, জমি, পুকুর, বাগান ও ঘোড়া ওয়াক্ফ করেছেন, তাদের অনুসরণে পরবর্তী কালে জনগণ বহু সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে এসেছে এবং আজও করছে। রসূলুল্লাহ (সা) এর আমলের কিছু ওয়াক্ফের দৃষ্টান্ত নিম্নরূপ:
১. আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) মদিনায় পদার্পণ করত মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিয়ে বললেন: হে বনুনাজ্জার, তোমরা তোমাদের এই বাগানটি আমাকে মূল্যের বিনিময়ে দেবে? তারা বললো: আমরা ওটার মূল্য শুধু আল্লাহর কাছে চাই। অতঃপর তারা ওটা বিনামূল্যে দিয়ে দিল এবং রসূলুল্লাহ (সা) তার উপর মসজিদ নির্মাণ করলেন। (তিনটি সহিহ হাদিসগ্রন্থ)।
২. উসমান (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: যে ব্যক্তি রুমার কূপ খনন করবে, তার জন্য জান্নাত রয়েছে।’ উসমান (রা) বলেন: তখন আমি কূপটি খনন করলাম। (বুখারি, তিরমিযি, নাসায়ি)। বর্ণনাকারীর বর্ণনায় রয়েছে: ‘রুমার কূপটি বনু গিফারের একজনের মালিকানাধীন ছিলো। সে তা থেকে এক মশক পানির এক মুদ্দ গমের বিনিময়ে বিক্রি করতো। তখন রসূলুল্লাহ (সা) তাকে বললেন: বেহেশতের একটি ঝর্ণার বিনিময়ে তুমি এটি আমার কাছে বিক্রি করবে? সে বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমার ও আমার পরিবারের এটি ছাড়া আর কিছু নেই। ব্যাপারটা উসমান (রা) জানতে পেরে তিনি পঁয়ত্রিশ হাজার দিরহাম দিয়ে সেটি ক্রয় করলেন। তারপর রসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট এসে বললেন: আপনি ঐ লোকটির জন্য যা বরাদ্দ করেছেন (অর্থাৎ বেহেশতের ঝর্ণা) তা কি আমার জন্যও বরাদ্দ করবেন? রসূল (সা) বললেন: হ্যাঁ। তখন উসমান (রা) বললেন: ওটা মুসলমানদের জন্য দান করলাম।’
৩. সাদ ইবনে উবাদা (রা) বললেন: হে রসূলুল্লাহ্ সা'দের মা মারা গেছে। কোন্ সাদকটি সর্বোত্তম হবে? তিনি বললেন: পানি। তখন তিনি একটি পুকুর খনন করলেন এবং বললেন: এটি সাদের মা'র জন্য।
৪. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: মদিনায় আবু তালহা সবচেয়ে বিত্তশালী আনসারী ছিলেন। 'বায়রাহা' (মসজিদে নববীর পার্শবর্তী একটা খেজুরের বাগান) তার সবচেয়ে প্রিয় সম্পত্তি ছিলো। সেটি মসজিদের সামনেই অবস্থিত ছিলো। রসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ বাগানে যেতেন এবং সেখানকার একটা সুপেয় পানির কূপ থেকে পানি পান করতেন। যখন এ আয়াতটি নাযিল হলো:
لَنْ تَنَالُو الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ 'তোমরা যা ভালোবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করতে পারবে না।' (সূরা আলে ইমরান: আয়াত ৯২)। তাল্হা রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট গিয়ে বললেন: আল্লাহ্ তো তাঁর কিতাবে বলেছেন: 'তোমরা যা ভালোবাস তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত পুণ্য লাভ করতে পারবেনা। আমার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ হচ্ছে 'বায়রাহা'। ওটা আল্লাহ্র জন্য সদকা করে দিলাম। আমি এর প্রতিদান আল্লাহ্র কাছে সঞ্চিত থাকার আশা করি। হে রসূলুল্লাহ্, আপনি এটি যেভাবে ইচ্ছা কাজে লাগান। রসূল (সা) বললেন: চমৎকার। এটা একটা লাভজনক সম্পত্তি। এটা একটা লাভজনক সম্পত্তি। তুমি এটি সম্পর্কে যা বলেছ তা শুনলাম। আমি মনে করি, তুমি এটি তোমার আত্মীয়স্বজন ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দাও। অত:পর আবু তালহা সেটি তার আত্মীয়স্বজন ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন।' (বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি)
ইমাম শওকানি বলেন: জীবিত ব্যক্তি যদি মৃত্যু পূর্ব রোগাবস্থা ছাড়া অন্য সময় নিজের সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশের বেশি দান করে তবে তা জায়েয। কারণ আবু তালহা যে সম্পত্তিটা দান করেছিলেন, তার পরিমাণ কত, সেটা রসূলুল্লাহ্ (সা) জানতে চাননি। তিনি সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস্ক তার রোগাবস্থায় বলেছিলেন: এক তৃতীয়াংশ অনেক।
৫. ইবনে উমর (রা) বলেন: উমর (রা) খয়বরে কিছু জমি পেলেন। সে সম্পর্কে আদেশ ও পরামর্শ লাভের জন্য তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট গেলেন। তাঁকে বললেন, হে রসূলুল্লাহ্, আমি খয়বরে একটু জমি পেয়েছি। এত ভাল সম্পত্তি আমি ইতোপূর্বে কখনো পাইনি। এ ব্যাপারে আপনি আমাকে কী নির্দেশ দেবেন? রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: ইচ্ছা করলে মূল জমি তুমি রেখে দাও এবং ওর ফসল দান করে দাও। অবশেষে উমর (রা) ফসল সদকা করে দিলেন। ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি বিক্রয় করা যায়না, দান করা যায়না এবং উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরিত হয়না। উক্ত জমির ফসল দরিদ্র, আত্মীয়-স্বজন, দাস মুক্ত করণ, আল্লাহ্র পথে জিহাদ, পথিক ও অতিথিদের জন্য দান করা যায়। যে ব্যক্তি এর তত্ত্বাবধান করবে, সে ন্যায়সংগতভাবে তা থেকে খেতে পারে এবং কাউকে খাওয়াতেও পারে। তবে নিজের মালিকানাভুক্ত করতে পারবোনা।'
ইমাম তিরমিযি বলেন: সাহাবায়ে কিরাম ও অন্যান্য আলেমগণ এ হাদিস অনুযায়ী ওয়াক্ফ্ফ সম্পত্তির কার্য পরিচালনার পক্ষপাতী। কেউ এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন বলে জানা যায়না। এটাই ছিলো ইসলামে প্রথম ওয়াক্ফ্ফ।
৬. ইমাম আহমদ ও বুখারি আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: যে ব্যক্তি একটি ঘোড়া আল্লাহর পথে ওয়াক্ফ্ফ করবে ঈমানের সাথে ও আল্লাহ্র সুন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য, কিয়ামতের দিন ঐ ঘোড়ার সমস্ত খাদ্য, মল-মূত্র তার পাল্লায় পুণ্য কাজ হিসেবে মাপা হবে।'
৭. খালেদ বিন ওলিদের বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: খালিদ তার সমস্ত যুদ্ধ সরঞ্জাম আল্লাহ্ পথে ওয়াক্ফ্ফ করে দিয়েছে।
📄 ওয়াকফ কিভাবে সম্পন্ন হবে
ওয়াক্ফ্ফ দু'টি উপায়ে কার্যকর হবে:
১. এমন কাজ দ্বারা, যা দ্বারা ওয়াক্ফ্ফ বুঝা যায়। যেমন মসজিদ নির্মাণ ও তাতে নামাযের জন্য আযান দেয়া। এ জন্য কোনো শাসকের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই। অথবা, ২. কথা দ্বারা, কথা দু প্রকার: স্পষ্ট কথা বা ইংগিতপূর্ণ কথা। স্পষ্ট কথার উদাহরণ: ওয়াক্ফ্ফ করে দিলাম, আল্লাহ্র ওয়াস্তে দিলাম, চিরতরে দিলাম ইত্যাদি।
ইংগিতপূর্ণ কথার উদাহরণ: সক্কা করে দিলাম। তবে এ দ্বারা তার নিয়ত থাকা চাই ওয়াক্ফ করার। তবে কেউ যদি নিজের মৃত্যুর শর্তে ওয়াক্ফ করে, যেমন বলে: 'আমার বাড়িটা আমার মৃত্যুর পরে ওয়াক্ত রইল।' এরূপ ওয়াক্ত ইমাম আহমদের মতে জায়েয। কেননা এটা এক ধরনের অসিয়ত, যা মৃত্যুর পরেই কার্যকর হয়।
📄 ওয়াকফ কখন বাধ্যতামূলক হয়
যে কাজ বা কথা দ্বারা ওয়াক্ফ বুঝা যায়, সে কাজ যখন কেউ করে বা সে কথা যখন কেউ বলে, তখন সে যদি প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক, স্বাধীন ও জোরজবরদস্তির আওতামুক্ত হয়, তবে ওয়াক্ত বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে এবং যার বা যে প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়াক্ফ করেছে তার কবুল করা শর্ত নয়। আর ওয়াক্ফ যখন বাধ্যতামূলক হবে তখন ওয়াকফকারীর জন্য ওয়াকফকৃত সম্পত্তি বিক্রয়, দান বা এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে তা ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বহাল থাকতে পারে না, বৈধ হবে না। ওয়াকফকারী মারা গেলে ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি তার উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টিত হবে না। কেননা এটাই ওয়াফ্ফের দাবি। ইতোপূর্বে ইবনে উমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসেও রয়েছে যে, ওয়াকফকৃত সম্পত্তি বিক্রয় দান ও উত্তরাধিকার হিসেবে হস্তান্তর করা যায়না।
ইমাম আবু হানিফার মতে, ওয়াক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করা বৈধ। ইমাম আবু ইউসুফ বলেন: ইবনে উমার (রা) এর উক্ত হাদিস যদি আবু হানিফার নিকট পৌঁছতো তাহলে তিনি তদনুযায়ীই রায় দিতেন। ইমাম শাফেয়ির মযহাবের অগ্রগণ্য মত হলো, ওয়াকফকৃত সম্পত্তির মালিকানা আল্লাহ্র নিকট হস্তান্তরিত হয়ে যায়। তাই তা আর ওয়াক্ফ্ফ্ফারীরও সম্পত্তি থাকে না, যার নামে ওয়াকফ্ করা হয় তারও সম্পত্তি থাকে না। ইমাম মালিক ও আহমদ বলেন: যার নামে ওয়াকফ্ করা হয় মালিকানা তার কাছে হস্তান্তরিত হয়।