📄 হবি তোলা ও মূর্তি বানানো
বহু সংখ্যক সহিহ হাদিসে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রাণীর ছবি তোলা ও মূর্তি বানানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, চাই তা মানুষ, পশু বা পাখি হোক। যে সব জিনিসের প্রাণ নেই যেমন গাছ, ফুল ইত্যাদি, সে সব জিনিসের ছবি তোলা বৈধ।
১. ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো ছবি বানাবে, কিয়ামতের দিন তাকে ঐ ছবিতে প্রাণ সঞ্চার করতে বলা হবে। অথচ সে প্রাণ সঞ্চার করতে পারবেনা। (বুখারি)।
২. রসূলু (সা) বলেন: যারা ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তারা হবে কঠিনতম শান্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।
৩. ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন: এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাস (রা) এর নিকট এসে বললো: আমি এ সব ছবি তৈরি করি এবং এগুলোর প্রতি আমি আসক্ত। ইবনে আব্বাস তাকে বললেন: 'আমার কাছে এসো।' সে কাছে এলো। তারপর তার কথার পুনরাবৃত্তি করলো এবং আরো কাছে এলো। তখন তিনি তার মাথায় হাত রেখে বললেন: 'আমি যা শুনেছি, তা তোমাকে জানাচ্ছি। আমি রসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি: 'প্রত্যেক চিত্রকর জাহান্নামে যাবে। সে যে সব চিত্র তৈরি করেছে, তার প্রত্যেক চিত্রের পরিবর্তে তার জন্য একটা করে প্রাণী সৃষ্টি করা হবে এবং প্রত্যেকটা প্রাণী তাকে আযাব দেবে।' তারপর তিনি (ইবনে আব্বাস) বললেন: 'ছবি যদি তৈরি করতেই চাও তবে গাছ ও যে সব জিনিসের প্রাণ নেই, সে সব জিনিসের চিত্র তৈরি কর।'
৪. আলি (রা) বলেন: রসূলুল্লাহ (সা) একটি জানাযার নামাযে ছিলেন। তারপর বললেন: তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে মদিনায় যাবে এবং সেখানে যত মূর্তি রয়েছে সব ভেঙ্গে ফেলবে, যতো কবর আছে, সমান করে দেবে এবং যতো ছবি আছে, তা নষ্ট করে ফেলবে। এক ব্যক্তি বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমি প্রস্তুত। অত:পর বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমি প্রতিটি ছবি নষ্ট করে এসেছি। অত:পর রসূলুল্লাহ (সা) বললেন: যে ব্যক্তি এ ক'টি জিনিসের একটিও পুনরায় তৈরি করবে সে মুহাম্মদ (সা) এর উপর যা কিছু নাযিল হয়েছে তার উপর কুফ্রি করবে। (আহমদ)।
📄 শিশুদের খেলনার পুতুল বৈধ
শিশুদের খেলাধুলা, বিয়ের উৎসব ইত্যাদির ছবি বা পুতুল এর ব্যতিক্রম। এ সব পুতুল বা ছবি তৈরি করা ও বিক্রয় করা জায়েয। এর প্রমাণ নিম্নোক্ত হাদিসসমূহ:
১. আয়েশা (রা) বলেন: আমি কিছু সংখ্যক কিশোরীর সাথে খেলা করতাম। তারা থাকা অবস্থায় কখনো কখনো রসূলুল্লাহ (সা) বাড়িতে ঢুকে পড়তেন। তিনি ঘরে ঢুকলেই তারা বেরিয়ে যেত। আর তিনি বেরিয়ে গেলেই তারা প্রবেশ করতো। (বুখারি, আবু দাউদ)।
২. আয়েশা (রা) আরো বলেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) খয়বর বা তবুক থেকে ফিরে আয়েশার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন আয়েশার র্যাকে একট পর্দা ছিলো। সহসা বাতাস এসে আয়েশার খেলার সাথী কিশোরীদের পুতুল উন্মোচন করলো। রসূলুল্লাহ (সা) বললেন: হে আয়েশা, এগুলো কী? আয়েশা বললেন: আমার (খেলার) মেয়েরা। তাদের মাঝে একটা ঘোড়া দেখলেন, যার চামড়ার তৈরি পাখা রয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: ওদের মাঝে এটা কী দেখছি? আয়েশা (রা) বললেন: একটা ঘোড়া। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: ওর উপর ওটা কী? আয়েশা (রা) বললেন: দুটো পাখা। রসূল (সা) বললেন: ঘোড়ার আবার পাখা? আয়েশা (রা) বললেন: কেন, শোনেননি, সুলায়মান (আ) এর ঘোড়ার পাখা ছিলো? আয়েশা (রা) বললেন: এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ্ (সা) এমনভাবে হেসে দিলেন যে, তার মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ পেলো।' (আবুদাউদ, নাসায়ি)।
📄 বাড়িতে ছবি বা মূর্তি রাখা নিষেধ
মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করা যেমন হারাম, তেমনি তা বাড়ি-ঘরে রাখাও নিষেধ। মূর্তি বা ছবিকে এমনভাবে ভেঙ্গে রাখা উচিত, যাতে তার মূল আকৃতি বহাল না থাকে।
১. ইমাম বুখারি বর্ণনা করেছেন: রসল (সা) তার ঘরে কোনো ক্রুশের ছবি রাখতেন না।
২. বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেন, রসূল (সা) বলেন: যে বাড়িতে ছবি বা মূর্তি আছে, সে বাড়িতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।
📄 যে সকল ছবির ছায়া নেই
এতোক্ষণ যা কিছু আলোচিত হলো, তা সে সব ছবি-মূর্তি সংক্রান্ত, যার দেহ ও ছায়া আছে। কিন্তু যে সকল ছবির কোনো ছায়া নেই, যেমন দেয়ালে ও কাগজে অংকিত নকশা এবং কাপড়ে, পর্দায় ও ফটোতে যে ছবি থাকে তার সবই জায়েয। প্রথম দিকে এগুলিও নিষিদ্ধ ছিল, পরে তার অনুমতি দেয়া হয়। এগুলো যে প্রথম নিষিদ্ধ ছিলো, তা আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিস থেকে জানা যায়:
'রসূলুল্লাহ্ (সা) (একদিন) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন আমার একটা তাক একটা পাতলা পর্দা দিয়ে ঢেকে রেখেছিলাম, যাতে কিছু ছবি ছিলো। তিনি এগুলো দেখে তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এবং তার মুখের রং পাল্টে গেল। তিনি বললেন: হে আয়েশা, যারা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনের চেষ্টা করে, কিয়ামতের দিন তাদের উপর সবচেয়ে বেশি আযাব হবে।' আয়েশা (রা) বলেন: এ কথা শুনে আমি পর্দাটা কেটে ফেললাম এবং তা দিয়ে কয়েকটা বালিশ বানালাম। আর নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা এটা বৈধ প্রমাণিত হয়:
১. আবু তালহা বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: যে ঘরবাড়িতে ছবি থাকে তাতে ফেরেশতারা প্রবেশ করেনা। পরে যায়েদ ইবনে খালেদের অসুখ হলে আমরা দেখতে গেলাম। দেখলাম, তার দরজার উপর ছবি আঁকা পর্দা ঝুলছে। তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) এর স্ত্রী মাইমুনার পালিত পুত্র উবায়দুল্লাহকে বললাম: যায়েদ না আমাদেরকে আগের দিন ছবি সম্পর্কে বলছিল? উবায়দুল্লাহ বললো: আপনি কি শোনেননি, যায়েদ বলেছিল: কাপড়ের নকশা এর ব্যতিক্রম? (পাঁচটি সহিহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত)।
২. আয়েশা (রা) বলেন: 'আমাদের একটা পর্দা ছিলো, তাতে একটা পাখির ছবি ছিলো। কেউ ঘরে ঢুকতে গেলেই সেটি তার সামনে পড়তো। তাই রসূলুল্লাহ (সা) বললেন: ওটা উল্টে দাও। কারণ আমি যখনই ঘরে প্রবেশ করতে গিয়ে ওটা দেখি, অমনি দুনিয়ার কথা আমার মনে পড়ে যায়।' (মুসলিম)।
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, এটা হারাম নয়। যদি হারাম হতো, তা হলে তা নষ্ট করে ফেলার আদেশ দিতেন এবং শুধু উল্টিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হতেন না। তাছাড়া তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পর্দাটা উল্টিয়ে দেয়ার কারণ হলো, ওটা দুনিয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। হানাফি ইমামদের মধ্য থেকে তাহাবী এই মত সমর্থন করে বলেন: 'শরিয়ত প্রথমে সব রকমের প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ করেছে, এমনকি তা যদি নক্শামাত্র হয় তবুও। কেননা মুসলমানরা স্বল্পকাল আগেই মূর্তিপূজা থেকে উদ্ধার পেয়েছে। তারপর এই নিষেধাজ্ঞা যখন পালিত হলো, তখন একান্ত প্রয়োজনে কাপড়ের নকশা হিসাবে স্বল্প মাত্রায় অনুমোদন করা হয়েছে। কেননা স্বল্পমাত্রার ছবি অজ্ঞ লোকের জন্যও নিরাপদ। তবে অধিক মাত্রায় ছবির উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে।'
ইবনে হাযম বলেন: অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের জন্য পুতুল ও ছবি নিয়ে খেলা জায়েয আছে, অন্য কারো জন্য নয়। এ ছাড়াও কাপড়ের নকশা ছাড়া আর সমস্ত ছবি ও প্রতিকৃতি হারাম। এরপর ইবনে হাম্ আবু তাল্হার হাদিস উল্লেখ করেছেন।