📄 হারাম পোশাক
হারাম পোশাক হলো পুরুষের জন্য রেশমের পোশাক, স্বর্ণ এবং মহিলাদের জন্য নির্ধারিত পোশাক পুরুষরা পরা, আর মহিলাদের পুরুষদের জন্য নির্ধাররিত পোশাক পরা এবং খ্যাতি, বড়াই ও অপব্যয়মূলক পোশাক পরা।
📄 রেশম পরিধান করা ও তার উপর বসা
হাদিসে স্পষ্টভাবে পুরুষদের জন্য রেশমের কাপড় পরা ও তার উপর বসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের কয়েকটি হাদিস নিম্নে উল্লেখ করছি:
১. উমর (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'তোমরা রেশম পরিধান করোনা। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় রেশম পরিধান করবে, সে আখিরাতে তা পরিধান করতে পারবেনা।'
২. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত: উমর (রা) এক সেট পুরু রেশমের পোশাক বিক্রয় হতে দেখলেন, অত:পর তা নিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট এসে বললেন: হে রসূল, এটা কিনুন, এ দ্বারা ঈদের জন্য ও প্রতিনিধিদলগুলোর জন্য সুসজ্জিত হোন। রসূল (সা) বললেন: এ পোশাক শুধু তার জন্য, যার পরকালে এটা প্রাপ্য নেই। এরপর উমর (রা) এর বেশ কিছু দিন কেটে গেল। সহসা একদিন রসূল (সা) তার নিকট রেশমের আরেকটি জুব্বা পাঠালেন'। তখন উমর (রা) রসূল (সা) এর নিকট এসে বললেন: হে রসূল! আপনি বলেছেন: এটা সে ব্যক্তির পোশাক, যার পরকালে এটা প্রাপ্য নেই। তারপর আবার এটা পাঠিয়েছেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: ওটা আমি তোমার কাছে তোমার পরিধানের জন্য পাঠাইনি, পাঠিয়েছি যাতে তুমি ওটা বিক্রয় করে নিজের প্রয়োজন মিটাতে পার।' (বুখারি, মুসলিম, নাসায়ি আবুদাউদ, ইবনে মাজা)।
৩. হুযাইফা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করতে এবং রেশমের কাপড় পরিধান করতে ও তার উপর বসতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: ওটা দুনিয়ায় তাদের জন্য (অর্থাৎ আল্লাহ্র অবাধ্যদের জন্য) আর আখিরাতে আমাদের জন্য (বুখারি)। এ সব হাদিসের আলোকে অধিকাংশ আলেমের মত হলো, রেশম পরা ও বিছানো হারাম। মাহ্দী 'বাহরে' উল্লেখ করেছেন যে, এটা সর্বসম্মত মত।
📄 শতমসীর অভিমত
তবে কাযী ইয়ায বলেন: ইবনে উলিয়াসহ কিছু সংখ্যক আলেমের মতে এটা জায়েয। তারা নিম্নোক্ত হাদিসসমূহ দ্বারা তাদের মতের স্বপক্ষে প্রমাণ দর্শান:
১. উব্বা (রা) বলেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) কে পেছন থেকে খোলা রেশমের কুবা (জামা) হাদিয়া পাঠানো হয়েছিল এবং তিনি তা পরেছিলেন, তা পরে নামাযও পড়েছিলেন, তারপর তা এমন প্রবল জোরে খুলে ফেললেন, যেন ওটা তিনি অপছন্দ করেছেন। তারপর বললেন: মুত্তাকীদের জন্য এটা শোভন নয়। (বুখারি ও মুসলিম)।
২. মিস্তয়ার ইবনে মাখরামা সূত্রে বর্ণিত: রসূল (সা) এর নিকট হাদিয়া হিসাবে কিছু কুবা এলো। তখন মিস্তয়ার ও তার পিতা তা থেকে কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে রসূল (সা) এর নিকট গেলেন। রসূল (সা) তখন একটা রেশমি কুবা পরে বের হয়ে বললেন: হে মাখরামা, এটা আমি তোমার জন্য লুকিয়ে রেখেছি। তারপর তিনি কুবাটির কারুকার্য দেখাতে লাগলেন। তারপর বললেন: মাখরামা কি সন্তুষ্ট হয়েছে?
৩. আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সা) অত্যন্ত উঁচুমানের একটা রেশমি পোশাক পরলেন, যা রোম সম্রাট তাকে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছিলেন। পরে সেটি তিনি জাফরকে পাঠালেন। জাফর সেটি পরে রসূলুল্লাহ্ (সা) কাছে এলে তিনি বললেন: তোমাকে আমি ওটা এজন্য দেইনি যে, তুমি ওটা পরবে। জাফর বললেন: তাহলে আমি কী করবো? তিনি বললেন: ওটা তোমার ভাই নাজাশীর নিকট পাঠিয়ে দাও। (আবু দাউদ)।
৪. বিশজনের বেশি সাহাবি রেশম পরিধান করেছেন। তাদের মধ্যে আনাস (রা) ও বারা ইবনে আযিব অন্যতম। (আবু দাউদ)।
ইমাম আবু হানিফা, মালেকি ফকিহ্ ইবনে মাজেশূন ও কিছু সংখ্যক শাফেয়ি ফকিহ্ রেশমীবস্ত্র বিছানো ও তার উপর বসা জায়েয মনে করেন। তারা বলেন: রেশমীবস্ত্র শুধু পরিধান করাই নিষিদ্ধ। কিন্তু এ মত সহীহ হাদিসের পরিপন্থী।
যে সব সংখ্যাগুরু আলেম রেশম পুরুষের জন্য হারাম মনে করেন তারা এটাকে যারা বৈধ মনে করেন তাদের জবাবে নিষেধাজ্ঞা সংবলিত হাদিসগুলো তুলে ধরে বলেন: উকবা বর্ণিত হাদিসেও তো রসূল (সা) এর এ উক্তি রয়েছে যে, এটা মুত্তাকীদের জন্য শোভন নয়। বস্তুত মুত্তাকীদের জন্য যা শোভন নয় তা নিষিদ্ধ হওয়াই ভাল। আর মিস্তয়ার ও আনাসের হাদিসে দেখানো হয়েছে রসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাজ যা তার নিষেধাজ্ঞা সংবলিত কথাকে রদ করতে পারে না। তবে এ বিষয়ে তর্কের অবকাশ নেই যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) রেশম পরতেন, তারপর সবশেষে তা নিষিদ্ধ হয়। জাবির (রা) বলেন: রসূল (সা) তার কাছে উপহার হিসাবে পাঠানো একটা কুবা পরলেন, তারপর তা অনতিবিলম্বে খুলে ফেললেন এবং উমর ইবনুল খাত্তাবের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। তখন বলা হলো: হে রসূলুল্লাহ্, আপনি এটি খুলে ফেললেন। রসূল (সা) বললেন: জিব্রীল (আ) আমাকে নিষেধ করেছেন। পরক্ষণে উমর (রা) তার কাছে গিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তিনি বললেন: হে রসূল, আপনি একটা জিনিস অপছন্দ করলেন, আবার সেটা আমাকে দিলেন। এখন আমি কী করবো? রসূল (সা) বললেন: তোমাকে পরার জন্য দেইনি। দিয়েছি তুমি ওটা বিক্রয় করবে সে জন্য। পরে তিনি দু'হাজার দিরহামে তা বিক্রয় করলেন।
শওকানির অভিমত: ইমাম শওকানি বলেন: নিষেধাজ্ঞা ও বৈধতা সংবলিত হাদিসগুলো একত্র করলে মনে হয়, নিষেধাজ্ঞা সংবলিত হাদিসগুলো রেশমীবস্ত্র পরিধান করাকে মাকরূহ প্রমাণ করে। তিনি 'নাইলুল আওতার' গ্রন্থে বলেন: 'রসূল (সা) কর্তৃক নিজে রেশম পরিধান ও তা সাহাবিদেরকে বিতরণ নিষেধাজ্ঞা সংলিত হাদিসগুলোর আগে না পরে সংঘটিত হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ নেই। এ থেকে বুঝা যায়, উক্ত হাদিসগুলোতে নিষেধাজ্ঞা অর্থ মারূহ। এটা উভয় প্রকারের হাদিসের সমন্বয়ের ফল। এ মতটি আরো শক্তিশালী হয় এ উক্তি দ্বারা যে, বিশজন সাহাবি রেশম পরেছেন। শরিয়তে যা হারাম, তা উক্ত সাহাবিদের পক্ষে করা সুদূর পরাহত ব্যাপার। আবার এটাও সুদূর পরাহত যে, এটাকে হারাম জেনেও অন্য সাহাবিগণ উক্ত বিশজনের কাজে নীরব থেকেছেন। কেননা এর চেয়েও ক্ষুদ্র ব্যাপারে তারা একে অপরের কাজের সমালোচনা করতেন।'
📄 রেশম পরা মহিলাদের জন্য বৈধ
রেশম পরা হারাম বা মাক্সহ যাই হোক, এটা শুধু পুরুষেদের জন্য। মহিলাদের জন্য তা পরা ও বিছানো সম্পূর্ণ হালাল। অনুরূপ ওযর থাকলে পুরুষদের জন্যও হালাল। এ ব্যাপারে নিম্নের হাদিসসমূহ লক্ষণীয়:
১. আলি (রা) বলেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট একটা রেশমের পোশাক উপহার হিসাবে পাঠানো হলো। পরে তিনি সেটি আমার নিকট পাঠলেন। আমি সেটি পরলাম। এতে তাঁর চেহারায় অসন্তোষের চিহ্ন দেখতে পেলাম। তিনি বললেন: ওটা তোমার নিকট এ জন্য পাঠাইনি যে, তুমি পরবে। বরং এটি তোমার জন্য এ জন্য পাঠায়েছি যে, তুমি ওটা টুকরো টুকরো করে ওড়না বানিয়ে মহিলাদের মধ্যে বিতরণ করবে।' (বুখারি, মুসলিম)।
২. আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সা) আব্দুর রহমান ইবনে আওফ ও যুবাইরকে তাদের চর্মরোগের কারণে রেশমের পোশাক পরার অনুমতি দিয়েছিলেন। 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা' গ্রন্থে বলা হয়েছে: রসূল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বিলাসিতা করার উদ্দেশ্যে নয়, তাদের রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে এ অনুমতি দিয়েছিলেন।
৩. উমর (রা) থেকে বর্ণিত: দু'আংগুল, তিন আংগুল বা চার আংগুল স্থান ব্যতীত রেশম পরিধান রসূল (সা) নিষেধ করেছেন। (বুখারি ও মুসলিম)।