📄 কথা বলার জন্য বল প্রয়োগ
কোনো কথা বলার জন্য বলপ্রয়োগ করা হলে সে জন্য যার উপর বলপ্রয়োগ করা হয়, তার উপর কোনো দায় বর্তেনা। কেননা সে সেজন্য দায়ী নয়। বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়ে সে যদি এমন কোনো কথা বলে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় বললে মানুষ কাফির হয়ে যায়, তবে সে জন্য তাকে দায়ী করা হবে না। আর বাধ্য হয়ে সে যদি কাউকে অপবাদ দেয় তবে তার উপর অপবাদের শাস্তি কার্যকর হবে না। আর যখন সে বাধ্য হয়ে কোনো স্বীকারোক্তি দেয় তবে তাতেও তার উপর কোনো দায় আরোপিত হবেনা। আর বাধ্য হয়ে যদি কোনো বিয়ে, দান বা বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদন করে তবে সে চুক্তি শুদ্ধ হবে না ও কার্যকর হবে না। আর যখন বাধ্য হয়ে কোনো শপথ বা মান্নত করে, তখনও তার উপর কিছুই ধার্য হবে না। বাধ্য হয়ে তালাক দিলে বা তালাক প্রত্যাহার করলে তাও কার্যকর হবে না। এর মূলনীতি রয়েছে সুরা নাহলের ১০৬ নং আয়াতে:
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبَهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ وَلَكِنْ مِّنْ هَرَحَ بِالْكُفْرِ مَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ
'কোনো ব্যক্তি ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফ্রির জন্য হৃদয়কে উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আল্লাহ্র গযব আপতিত হবে এবং তার জন্য মহা শাস্তি রয়েছে। তবে সে ব্যক্তির জন্য নয়, যাকে কুফ্রির জন্য বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচল।'
হৃদয়কে উন্মুক্ত রাখা অর্থ মনের আনন্দ ও চিরস্থায়ী পরকালের উপর নশ্বর ইহকালকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বেচ্ছায় আল্লাহকে অস্বীকার করলে তার উপর আল্লাহর গযব ও মহাশাস্তি অবধারিত।
📄 আকৃতি নাযিল হওয়ার কারণ
এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ আল্লামা ইবনে কাছির তাঁর তাফসিরে আম্মার ইবনে ইয়াসারের ছেলে মুহাম্মদ সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: মুশরিকরা আম্মার ইবনে ইয়াসারকে ধরে নিয়ে গেল এবং তার উপর নির্যাতন চালালো। এর ফলে তারা তাকে দিয়ে যা যা বলাতে চেয়েছিল, তার প্রায় সবই বলতে তিনি রাযী হয়ে গেলেন। পরে তিনি এ ঘটনা রসূল (সা) কে জানালে তিনি তাকে বললেন: 'তোমার মনের অবস্থা কেমন অনুভব করছ?' আম্মার বললেন: ঈমানে স্থির ও অবিচল। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: 'তারা যদি তোমার সাথে পুনরায় এমন করে, তবে তুমি পুনরায় এ রকম বলো।' ইমাম বায়হাকি এ হাদিস আরো বিশদভাবে বর্ণনা করে বলেন: আম্মার রসূলুল্লাহ (সা) কে গালি দেন এবং তাদের দেবদেবীর প্রশংসা করেন। পরে তিনি রসূল (সা) কে এ ঘটনা জানিয়ে বলেন: হে রসূলুল্লাহ! আপনাকে গালি না দেয়া ও তাদের দেবদেবীর প্রশংসা না করা পর্যন্ত আমাকে ছাড়া হয়নি। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমার মনের অবস্থা তখন কেমন অনুভব করছ? আম্মার বললেন, ঈমানে স্থির ও অবিচল। রসূল (সা) বললেন: 'তারা যদি আবার এরূপ করে তবে তুমি আবার এরূপ বলবে।' এ ঘটনা উপলক্ষেই আল্লাহ্ এ আয়াতটি নাযিল করলেন।
📄 কুরআয়ী চুক্তি ছাড়া অন্যান্য ব্যাপারেও নির্দেশনা দেয়
আয়াতটি যদিও কুফ্রি কথা উচ্চারণের সাথে সংশ্লিষ্ট, কিন্তু এ দ্বারা অন্যান্য বিষয়েও দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। ইমাম কুরতুবি বলেন: আল্লাহ্ যখন বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়ে তাঁর সাথে কৃষ্ণী করারও অনুমতি দিয়েছেন এবং এ জন্য মৌখিক কুফরী উচ্চারণকারীকে দোষারোপ করেননি, অথচ ওটা হচ্ছে শরিয়তের ভিত্তি, তখন আলেমগণ শরিয়তের সকল শাখা-উপশাখাকেও এর আওতাভুক্ত করেছেন। কাজেই বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়ে কেউ শরিয়তের যে কোনো বিধিই লংঘন করুক, তার জন্য সে দায়ী হবে না এবং তাকে এর কোনো আইনী পরিণতি ভোগ করতে হবে না। এ ব্যাপারেই রসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে এ বিখ্যাত হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে: 'আমার উম্মতের সকল ভুলত্রুটি ও বাধ্য হয়ে যা কিছু করে, তা থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।' এ হাদিসটি সনদের দিক দিয়ে সহিহ না হলেও এর বক্তব্য যে সঠিক, সে ব্যাপারে আলেমগণ একমত। তবে ইমাম আবু বকর ইবনুল আরাবী ও আবু মহাম্মদ আব্দুল হক বলেছেন, হাদিসটি সহিহ। আবু বকর আল উসাইলি তার 'ফাওয়ায়েদ' ও ইবনুল মুন্যির 'আল ইকনা' নামক গ্রন্থে এটি উদ্ধৃত করেছেন।
📄 কুরআয়ী বাক্য উচ্চারণে বলপ্রয়োগকালে মুসল্লীর উপর অবিচল থাকা উত্তম
বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে কুফরী বাক্য উচ্চারণের যদিও অনুমতি রয়েছে, কিন্তু মূলনীতির উপর অবিচল থাকা ও অত্যাচার-নির্যাতনে ধৈর্য ধারণ করা উত্তম, যদিও তা হত্যা পর্যন্ত গড়ায়। এতে ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত থাকবে। ইয়াসার ও সুমাইয়া এটাই করেছিলেন। এটা নিজেকে ধ্বংসের আবর্তে নিক্ষেপ করা নয়, বরং জিহাদ করে শহীদ হওয়ার শামিল।
ইবনে আবি শায়বা হাসান সূত্রে ও আব্দুর রাযেক তার তাফসির গ্রন্থে মুয়াম্মার সূত্রে বর্ণনা করেন: 'মুসাইলামা দু ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলো: মুহাম্মদ সম্পর্কে তোমার মত কী? সে বললো: উনি তো আল্লাহ্র রসূল। মুসাইলামা বললো: আর আমার সম্পর্কে? সে বললো: আপনিও। তখন সে তাকে মুক্তি দিলো।
এবার দ্বিতীয় জনকে জিজ্ঞাসা করলো: তুমি মুহাম্মদকে কী মনে কর? সে বললো: আল্লাহর রসূল। মুসাইলামা বললো আর আমি? সে বললো: আমি কানে শুনিনা। মুসাইলামা তাকে তিনবার একই কথা জিজ্ঞাসা করলো। সে প্রত্যেকবার বললো: আমি কানে শুনিনা। তখন মুসাইলামা তাকে হত্যা করলো।
এ খবর শুনে রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, 'প্রথম জন আল্লাহ্র দেয়া অনুমতির সুযোগ গ্রহণ করেছে। দ্বিতীয় জন সত্যকে বজ্র কণ্ঠে ঘোষণা করেছে। তার জন্য সুসংবাদ।'