📄 সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থে 'বলপ্রয়োগ' হচ্ছে মানুষকে এমন কোনো কাজ করতে বাধ্য করা, যা সে স্বতস্ফূর্তভাবে বা আইনত করতে ইচ্ছুক নয়। আর শরিয়তের বা ফিকহের পরিভাষায় কাউকে হত্যা, প্রহার, জেল, সম্পদ বিনাশ, মারাত্মক কষ্ট দেয়া বা কঠিন শারীরিক নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে, যা সে স্বেচ্ছায় করতে প্রস্তুত নয় তা করতে বাধ্য করা।
এ ক্ষেত্রে যার উপর বলপ্রয়োগ করা হয়, তার মনে বলপ্রয়োগকারী যে জিনিসের ভয় দেখিয়েছে তা কার্যকর করা অবশ্যম্ভাবী বলে প্রবল ধারণা সৃষ্টি হওয়া শর্ত। বলপ্রয়োগ শাসক কিংবা ডাকাত বা অন্য যে কেউ করুক, কোনোই পার্থক্য নেই। উমর (রা) বলেন: তুমি যখন কাউকে ভয় দেখাও, বা বেঁধে রাখ, বা প্রহার কর, তখন সে নিরাপদ নয়। ইবনে মাসউদ (রা) বলেন: কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি আমাকে বেত মারার ভয় দেখিয়ে কোনো কথা বলতে বাধ্য করে, তাহলে আমি তা বলবো। ইবনে হাযম বলেন: কোনো সাহাবি ইবনে মাসউদ (রা) এর বক্তব্যের বিরোধী কিছু বলেননি।
📄 বলপ্রয়োগের প্রকারভেদ
বলপ্রয়োগ দু প্রকার:
১. কোনো কথা বলার জন্য বলপ্রয়োগ
২. কোনো কাজ করার জন্য বলপ্রয়োগ।
📄 কথা বলার জন্য বল প্রয়োগ
কোনো কথা বলার জন্য বলপ্রয়োগ করা হলে সে জন্য যার উপর বলপ্রয়োগ করা হয়, তার উপর কোনো দায় বর্তেনা। কেননা সে সেজন্য দায়ী নয়। বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়ে সে যদি এমন কোনো কথা বলে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় বললে মানুষ কাফির হয়ে যায়, তবে সে জন্য তাকে দায়ী করা হবে না। আর বাধ্য হয়ে সে যদি কাউকে অপবাদ দেয় তবে তার উপর অপবাদের শাস্তি কার্যকর হবে না। আর যখন সে বাধ্য হয়ে কোনো স্বীকারোক্তি দেয় তবে তাতেও তার উপর কোনো দায় আরোপিত হবেনা। আর বাধ্য হয়ে যদি কোনো বিয়ে, দান বা বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদন করে তবে সে চুক্তি শুদ্ধ হবে না ও কার্যকর হবে না। আর যখন বাধ্য হয়ে কোনো শপথ বা মান্নত করে, তখনও তার উপর কিছুই ধার্য হবে না। বাধ্য হয়ে তালাক দিলে বা তালাক প্রত্যাহার করলে তাও কার্যকর হবে না। এর মূলনীতি রয়েছে সুরা নাহলের ১০৬ নং আয়াতে:
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبَهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ وَلَكِنْ مِّنْ هَرَحَ بِالْكُفْرِ مَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ ، وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ
'কোনো ব্যক্তি ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফ্রির জন্য হৃদয়কে উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আল্লাহ্র গযব আপতিত হবে এবং তার জন্য মহা শাস্তি রয়েছে। তবে সে ব্যক্তির জন্য নয়, যাকে কুফ্রির জন্য বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচল।'
হৃদয়কে উন্মুক্ত রাখা অর্থ মনের আনন্দ ও চিরস্থায়ী পরকালের উপর নশ্বর ইহকালকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বেচ্ছায় আল্লাহকে অস্বীকার করলে তার উপর আল্লাহর গযব ও মহাশাস্তি অবধারিত।
📄 আকৃতি নাযিল হওয়ার কারণ
এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ আল্লামা ইবনে কাছির তাঁর তাফসিরে আম্মার ইবনে ইয়াসারের ছেলে মুহাম্মদ সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: মুশরিকরা আম্মার ইবনে ইয়াসারকে ধরে নিয়ে গেল এবং তার উপর নির্যাতন চালালো। এর ফলে তারা তাকে দিয়ে যা যা বলাতে চেয়েছিল, তার প্রায় সবই বলতে তিনি রাযী হয়ে গেলেন। পরে তিনি এ ঘটনা রসূল (সা) কে জানালে তিনি তাকে বললেন: 'তোমার মনের অবস্থা কেমন অনুভব করছ?' আম্মার বললেন: ঈমানে স্থির ও অবিচল। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: 'তারা যদি তোমার সাথে পুনরায় এমন করে, তবে তুমি পুনরায় এ রকম বলো।' ইমাম বায়হাকি এ হাদিস আরো বিশদভাবে বর্ণনা করে বলেন: আম্মার রসূলুল্লাহ (সা) কে গালি দেন এবং তাদের দেবদেবীর প্রশংসা করেন। পরে তিনি রসূল (সা) কে এ ঘটনা জানিয়ে বলেন: হে রসূলুল্লাহ! আপনাকে গালি না দেয়া ও তাদের দেবদেবীর প্রশংসা না করা পর্যন্ত আমাকে ছাড়া হয়নি। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমার মনের অবস্থা তখন কেমন অনুভব করছ? আম্মার বললেন, ঈমানে স্থির ও অবিচল। রসূল (সা) বললেন: 'তারা যদি আবার এরূপ করে তবে তুমি আবার এরূপ বলবে।' এ ঘটনা উপলক্ষেই আল্লাহ্ এ আয়াতটি নাযিল করলেন।