📄 কারাগার নিরাপত্তা ও কল্যাণের স্থান
ইমাম শওকানি বলেন: 'অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) এর যুগ, সাহাবা ও তাবেইদের যুগ এবং তার পরবর্তী সকল যুগে ও সকল দেশে কারাবাসের প্রচলন ছিল। যে সব অপরাধী গোষ্ঠী নিরন্তর জনগণের ক্ষতি সাধনে নিয়োজিত ও অভ্যস্ত থাকে, তাদের দৌরাত্ম থেকে সমাজকে নিরাপদ ও মুক্ত রাখার ব্যবস্থা কারাগার দ্বারা নিশ্চিত হয় বিধায় এটা জনস্বার্থের অনুকূল ও রক্ষক। এ শ্রেণীর অপরাধীদের চরিত্র ও কার্যকলাপ এমন যে, তারা সাধারণত হুদুদ ও কিসাস জারি হয় এমন অপরাধ করে না। যদি তা করতো তবে তাদের উপর হুদুদ ও কিসাস জারি করে সমাজ ও দেশ থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ করা যেত। এরা যে ধরনের অপরাধ করে, তা হুদুদ ও কিসাসের চেয়ে হালকা ধরনের হলেও তাদেরকে মুক্ত ছেড়ে দিলে সমাজে অনাচার ও অনাসৃষ্টি চরম আকার ধারণ করতো। আবার এ জাতীয় অপরাধের জন্য তাদেরকে হত্যা করলে অন্যায় রক্তপাত করা হতো। তাই তাদের দৌরাত্ম্য থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় অবশিষ্ট ছিলো তাদেরকে কারাগারে আটক রাখা, যাতে তাদের অপরাধ থেকে সমাজকে আপাতত মুক্ত ও নিরাপদ রাখা যায়, তারা তাওবা ও আত্মশুদ্ধির অবকাশ পায় অথবা তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ যে সিদ্ধান্ত নেন তা কার্যকর হয়। এ ধরনের দুরাচারী ও অপরাধপ্রবণ লোকদের ব্যাপারে আল্লাহ্ আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এ কাজটা করতে হলে আপাতত তাদেরকে আটক করে জনগণ এবং তাদের মধ্যে একটা অন্তরায় সৃষ্টি করা প্রয়োজন। যারা এ শ্রেণীটির স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে ওয়াকিফহাল তারা এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।'
📄 আটকাবস্থার প্রকারভেদ
ইমাম খাত্তাবি বলেন: আটকাবস্থা দু'রকমের: শাস্তিমূলক ও অনুসন্ধানমূলক। শাস্তিমূলক আটকাবস্থাটা অপরাধের বিচার শেষে শাস্তি হিসাবেই দেয়া হয়। আর অপরাধের দায়ে অভিযুক্তকে আটক করা হয়, অভিযোগের সত্যাসত্য তদন্ত ও বিচার করার জন্য। বর্ণিত আছে: রসূলুল্লাহ্ (সা) এক ব্যক্তিকে কোনো এক অভিযোগে দিনের কয়েক ঘন্টা আটক রাখার পর মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
📄 অভিযুক্তকে প্রহার করা
বিনা কারণে কাউকে আটক করা বৈধ নয়। যখন কোনো অভিযোগে কাউকে আটক করা হয়, তখন তার ব্যাপারে তদন্ত চালানো জরুরি। তদন্তে সে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে ঐ সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটক দেখাতে হবে। অন্যথায় তাকে ছেড়ে দিতে হবে। অভিযুক্তকে প্রহার করা হারাম। কেননা এতে তাকে অপমান করা হয়। রসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলমানদেরকে মারপিট করতে নিষেধ করেছেন। তাবে চুরির অভিযোগে আটক ব্যক্তিকে মারপিট করা সম্পর্কে দু'রকমের মত রয়েছে। হানাফি ও শাফেয়িদের মধ্য থেকে ইমাম গাযালীর মত এই যে, চুরির অভিযোগে ধৃতব্যক্তিকে মারপিট করা যাবে না। কেননা তার নিরপরাধ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। একজন অপরাধীকে মারপিট করা থেকে বিরত থাকা একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে মারপিট করার চেয়ে উত্তম। হাদিসে রয়েছে: 'শাসকের ভুলক্রমে ক্ষমা করা ভুলক্রমে শাস্তি দেয়ার চেয়ে উত্তম।'
ইমাম মালেক (রা) চুরির দায়ে অভিযুক্তকে কারাগারে আটক রাখার অনুমতি দিয়েছেন। ইমাম মালেকের শিষ্যদের মতে তাকে প্রহার করাও জায়েয আছে। কেননা এতে সে চোরাই মাল ফেরত দিতে এবং অন্যরা শিক্ষা লাভ করতে পারে। এ অবস্থায় সে যদি স্বীকারোক্তি দেয় তবে সে স্বীকারোক্তির মূল্য নেই। কেননা স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় ও স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে দেয়া শর্ত। সে নির্যাতনে বাধ্য হয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
📄 আটকাবস্থা কেমন হওয়া জরুরি
অভিযুক্ত বা অপরাধীকে যে স্থানে আটক রাখা হবে, সে স্থানটা প্রশস্ত হওয়া উচিত। আর আটক ব্যক্তির জন্য সরকারি কোষাগার থেকে খাদ্যবস্ত্র ও যাবতীয় মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ব্যয় নির্বাহ করতে হবে। আটক ব্যক্তিকে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত রাখা যুলুম এবং সে জন্য আল্লাহ্ শাস্তি অবধারিত। ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: একজন মহিলা একটি বিড়ালকে আটক রেখেছিল, ফলে বিড়ালটি মারা যায়। এ জন্য ঐ মহিলা দোযখে যায়। আটক অবস্থায় মহিলা বিড়ালটিকে কোনো খাদ্য ও পানীয় দেয়নি এবং মাটিতে পড়ে থাকা আজে-বাজে জিনিস খাওয়ার জন্য তাকে ছেড়েও দেয়নি।' (বুখারি ও মুসলিম)।