📄 শপথ করার পর সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ করা হবে কি?
বিবাদী শপথ করলে বাদীর দাবি অগ্রাহ্য হবে। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। এরপর পুনরায় যদি বাদী সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে হাজির হয়, তাহলে কী করা হবে, সে সম্পর্কে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন: গ্রহণ করা হবে না। কেউ বলেন, গ্রহণ করা হবে। আবার কেউ কেউ বলেন: শর্ত সাপেক্ষে গৃহীত হবে। যারা বলেন: গ্রহণ করা হবেনা তারা হচ্ছেন যাহেরি মযহাবের অনুসারী, ইবনে আবি লায়লা ও আবু উবায়েদ এবং ইমাম শওকানি। শওকানি বলেন: 'যেহেতু রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, হয় তুমি দু'জন সাক্ষী আন, নচেৎ সে শপথ করুক' সেহেতু শপথের পর আর সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করা যাবেনা। বিবাদীর কাছে যখন শপথ চাওয়া হয় তখন তা অকাট্য ও সুস্পষ্ট হুকুমের ভিত্তিতেই চাওয়া হয়। শপথ করার পর এর বিপরীত যে প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে, তা গ্রহণ করা যাবেনা। কারণ তখন শপথ ও প্রমাণ দুটোই কেবলমাত্র ধারণার সৃষ্টি করে। অকাট্য বিশ্বাস কোনোটাতেই অর্জিত হয়না। আর একটি ধারণা দ্বারা আর একটি ধারণাকে খণ্ডন করা সম্ভব নয়।
যারা বলেন, শপথের পরে সাক্ষ্য-প্রমাণ আনলে তা গৃহীত হবে, তারা হচ্ছেন হানাফি শাফেয়ি, হাম্বলি, তাউস, ইব্রাহিম নায়ি, ও বিচারপতি শুরাইহ। তারা বলেন: একজন সত্যবাদীর সাক্ষ্য একজন পাপাচারীর শপথের চেয়ে অগ্রগণ্য, এটা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এরও মত। তাদের যুক্তি হলো, শপথএকটা দুর্বল প্রমাণ, যা কোনো বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারেনা। কাজেই শপথের পরে সাক্ষ্য-প্রমাণ গৃহীত হবে। কেননা সাক্ষ্য-প্রমাণই আসল। শপথ হচ্ছে সাক্ষ্য-প্রমাণের স্থলাভিষিক্ত। আসল যখন উপস্থিত হয় তখন স্থলাভিষিক্তের কার্যকারিতা থাকেনা।
ইমাম মালেক ও শাফেয়ি মযহাব থেকে ইমাম গাযালি বলেন: শপথের পরে সাক্ষ্য প্রমাণ শর্ত সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য। শর্ত হলো, শপথ পেশ করার পূর্বে সাক্ষ্য-প্রমাণের উপস্থিতি সম্পর্কে সে যদি অজ্ঞ থাকে, তাহলে শপথের পরে সে তার দাবির যথার্থতা সম্পর্কে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারবে। কিন্তু যেখানে এ শর্ত অনুপস্থিত, এবং তার সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকার কথা জানা সত্ত্বেও বিবাদীর শপথ গ্রহণে সম্মত হয়েছে, অত:পর শপথ করার পর সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে তার সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করা হবে না। কেননা শপথ নেয়ার মাধ্যমে তার সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশের সুযোগ রহিত হয়েছে।
📄 শপথ করতে অস্বীকৃতি
বাদী সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন না করায় বিবাদিকে যখন শপথ করতে বলা হয়, তখন সে শপথ করতে সম্মত না হলে তার এ অসম্মতিকে বিবাদীর দাবির স্বীকৃতি বলে গণ্য করা হবে। কেননা সে অস্বীকৃতি জানানোর ব্যাপারে আন্তরিক হলে শপথ করতে অসম্মত হতো না। শপথ করার এ অসম্মতি সরাসরিও প্রকাশ করা হতে পারে, কিংবা মৌনতা দ্বারাও প্রমাণিত হতে পারে।
এরূপ অবস্থায় বাদীর উপর নিজের দাবির সত্যতার পক্ষে শপথ করার দায়িত্ব আরোপিত হবেনা। কেননা শপথ সব সময় অস্বীকৃতির পক্ষেই হয়ে থাকে। কারণ রসূল (সা) বলেন: যে দাবি করে তার দায়িত্ব প্রমাণ পেশ করা, আর যে অস্বীকার করে তার দায়িত্ব শপথ করা। এটা হানাফি মযহাবের মত এবং ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও ইমাম আহমদের দ্বিতীয় মত হলো শুধুমাত্র শপথে অসম্মতি বিবাদীর বিরুদ্ধে রায় দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়। কেননা এটা একটা দুর্বল প্রমাণ। এটিকে সবল করার জন্য বাদীর দাবির সত্যতা সম্পর্কে শপথ করা জরুরি, চাই বিবাদী সেটি চাক বা না চাক। বাদী শপথ করলে তার দাবির স্বপক্ষে রায় দেয়া হবে, নচেৎ তা প্রত্যাখান করা হবে। এর প্রমাণ হিসাবে বলা হয়, রসূল (সা) একজন দাবিদারকে শপথ করতে বলেছিলেন। কিন্তু এই হাদিসটির সনদ বিভিন্ন কারণে দুর্বল। ইমাম মালেকের মতে এই বিধি কেবল অর্থসংক্রান্ত দাবির মধ্যে সীমিত। কিন্তু ইমাম শাফেয়ি বলেন: এটা সকল ধরনের দাবির বেলায় প্রযোজ্য।
যাহেরি মযহাব ও ইবনে আবি লায়লা বিবাদীর শপথে অসম্মতিকে ধর্তব্য মনে করেননা এবং তা দ্বারা কোনো ব্যাপারেই কোনো নিষ্পত্তি করা যায়না বলে মত প্রকাশ করেন। তারা বলেন, বাদীকে শপথ করতে বলা হবেনা। তবে বিবাদী হয় বাদীর দাবি মেনে নেবে, নতুবা অস্বীকার করবে এবং নিজেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করে শপথ করবে।
ইমাম শওকানির মতে, শেষোক্ত মতই অগ্রগণ্য। তিনি বলেন: শপথে অসম্মতির ভিত্তিতে বিচার নিষ্পত্তি করা বৈধ নয়। কেননা এতে বড়জোর এতটুকু বিষয় প্রমাণিত হয় যে, শরিয়তের বিধান অনুযায়ী যার শপথ করার দায়িত্ব ছিলো, সে সেটা করেনি এবং সে দায়িত্ব পালন করেনি। এটা না করার অর্থ এ নয় যে, সে বাদীর দাবি মেনে নিয়েছে। এর অর্থ শুধু এ যে, শরিয়তে তার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছিল, তা সে পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং বিচারকের করণীয় হলো, শপথ করতে অসম্মত হওয়ার পর বিবাদীকে দুটো কাজের একটা করতে বাধ্য করবে: হয় তার যে শপথ করার কথা, তা সে করবে, নচেৎ বাদী যা দাবি করেছে তা মেনে নেবে। এ দুটো কাজের যেটিই সে করবে, তার ভিত্তিতে বিচার নিষ্পত্তি করা যাবে।'
📄 শপথ তলবকারীর নিজের উপর শপথ হবে
বাদী বিবাদীর একজন যখন শপথ করবে, তখন বিচারকের নিয়ত ও শপথ তলবকারীর নিয়তের উপর শপথ হবে, যার দাবি পূরণ ঐ শপথের উপর নির্ভরশীল, শপথকারীর নিয়তের উপর নয়। কেননা ইতিপূর্বে রসূলের এ হাদিস বর্ণিত হয়েছে: 'শপথ তলবকারীর নিয়তের উপর শপথ।' সুতরাং শপথকারী যখন শপথে তার ইচ্ছা গোপন করে, অর্থাৎ তার ব্যবহৃত শব্দ দ্বারা বাহ্যত যা বুঝা যায়, তা থেকে ভিন্ন কোনো অর্থ গোপন করে, তখন সেটা বৈধ হবেনা। কারো কারো মতে, কোনো ব্যক্তি অত্যাচারিত হওয়ার কারণে এটা করতে বাধ্য হলে তার জন্য বৈধ।
📄 সাক্ষীর সাক্ষ্যের সাথে শপথ যুক্ত করে রায় দান
বাদীর সাথে যখন একমাত্র সাক্ষী ব্যতীত আর কোনো প্রমাণ থাকেনা, তখন ঐ সাক্ষীর সাক্ষ্য ও সে সাথে বাদীর শপথ যুক্ত করে বিচারের রায় দেয়া হবে। কেননা দারু কুতনি আমর ইবনে শুয়াইব সূত্রে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) দু'জন সাক্ষী দ্বারা বিচার করতেন। দু'জন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারলে বাদী তার পাওনা বুঝে নিত। আর যদি সে একজন সাক্ষী নিয়ে আসতো তখন সাক্ষীর সাক্ষ্যের সাথে সাথে বাদী শপথও করতো। হুদুদ ও কিসাস ব্যতীত যাবতীয় মামলায় একক সাক্ষীর সাক্ষ্যের সাথে বাদীর শপথ যুক্ত করে রায় দেয়া যাবে। তবে কোনো কোনো আলেম সাক্ষ্য ও শপথের ভিত্তিতে নিষ্পত্তিকে কেবল আর্থিক ও তৎ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। একজন সাক্ষী ও শপথ দ্বারা বিচার নিষ্পত্তি বিষয়ক হাদিসগুলো বিশজনের বেশি বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন।
শাফেয়ি বলেন: একজন সাক্ষী ও শপথ দ্বারা বিচার নিষ্পন্ন করা কুরআনের প্রকাশ্য উক্তির বিরোধী নয়। কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় যে সংখ্যক সাক্ষী প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে, এ ব্যবস্থা তা ব্যাহত করেনা।
এ পদ্ধতির পক্ষে রায় দিয়েছেন আবু বকর, আলি, উমর ইবনে আব্দুল আযীয ও অধিকাংশ প্রাচীন ও পরবর্তী কালীন ফকিহ্, যাদের মধ্যে ইমাম মালেক ও তাঁর শিষ্যগণ, ইমাম শাফেয়ি ও তাঁর অনুসারীগণ, ইমাম আহমদ, ইসহাক, আবু উবায়দ, আবু সাওর, ও দাউদ অন্যতম। আর হানাফি ফকিহগণ, আওযায়ি, যায়দ ইবনে আলি, যুহরি, নাসায়ি, ও ইবনে শারুমা এর বিরোধিতা করে বলেছেন: একজন সাক্ষী ও শপথ দ্বারা কখনো বিচার সম্পন্ন করা যাবেনা। কিন্তু এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলি তাদের বিপক্ষে।