📄 তিনজন সাক্ষীর প্রয়োজনীয়তা
হাম্বলি ফকিহগণ বলেন: যে ব্যক্তি স্বচ্ছল বলে খ্যাতি আছে, সে যদি যাকাত গ্রহণের জন্য নিজেকে অস্বচ্ছল বলে দাবি করে, তাহলে তার দাবি তিনজন সাক্ষী ব্যতীত গৃহীত হবে না। তাদের এ মতের পক্ষে তারা কুবাইসা ইবনে মুখারিকের এ হাদিস তুলে ধরেন: কুবাইসা ইবনে মুখারিক হিলালী (রা) বলেন: আমি একটা রক্তপণের দায় বহন করছিলাম। তাই রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট উপস্থিত হয়ে এ জন্য সাহায্য চাইলাম। তিনি বললেন: কিছুক্ষণ অবস্থান কর। আমাদের নিকট যাকাত আসুক, তা থেকে তোমাকে কিছু দিতে বলবো।' তারপর বললেন: হে কুবাইসা, তিন ব্যক্তির মধ্য হতে যে কোনো একজনের পক্ষেই সাহায্য চাওয়া হালাল: একজন হলো সে ব্যক্তি, কোনো রক্তপণ বা জরিমানার দায় যার ঘাড়ে চেপেছে। তার জন্য সাহায্য চাওয়া হালাল, যাতে ঐ দায় থেকে মুক্ত হতে পারে, অত:পর আত্মসংযম করে। আর একজন হচ্ছে সে ব্যক্তি, যার উপর কোনো মুসিবত আপতিত হওয়ায় তার সহায়-সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। সে যাতে জীবন ধারণের অথবা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে, সে কারণে সাহায্য চাওয়া তার জন্য বৈধ। অপরজন হলো সে ব্যক্তি, যে এমন খাদ্যাভাবে জর্জরিত যে, তার গোত্রের তিনজন বুদ্ধিমান লোক সাক্ষ্য দেয় যে, অমুক খাদ্যাভাবে জর্জরিত। এ ব্যক্তিও যাতে জীবন ধারণ অথবা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে সে জন্য সাহায্য চাওয়া তার পক্ষে বৈধ। হে কুবাইসা, এ ছাড়া আর যত রকম সাহায্য প্রার্থনা করা হয় ও ভোগ করা হয় তা অবৈধ।' (মুসলিম, আবুদাউদ, নাসায়ি)।
📄 শুধু দুজন পুরুষের সাক্ষ্য
সকল অধিকার ও হুদুদ সংক্রান্ত মামলায় শুধু দু'জন পুরুষের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। কোনো মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়না। কেবল ব্যভিচারে চারজন সাক্ষী প্রয়োজন। হুদুদে মহিলাদের সাক্ষ্য যাহেরি মযহাব ব্যতীত অন্য সকল মযহাবের ফকিহদের মতে অবৈধ। আল্লাহ্ তালাক সম্পর্কে বলেন: 'তোমাদের মধ্য হতে দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখ।' (সূরা তালাক ২)।
বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাগ (সা) আশয়াস্ক বলেন: 'হয় তোমার দু'জন সাক্ষী নতুবা তার শপথ.....'
📄 দুজন পুরুষের অথবা পুরুষ ও দুজন মহিলার সাক্ষ্য
মহান আল্লাহ্ সূরা বাকারার ২৮২ নং আয়াতে বলেন:
وَاسْتَشْهِدُوا عَمِيدَيْنِ مِنْ رِجَالِكُمْ ج فَإِنْ لَمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتِي مِنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشَّمَدَاءِ أَنْ تَضِلُّ إِحْدَهُمَا فَتُذَكَرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى
'সাক্ষীদের মধ্যে যাদের উপর তোমরা রাজি, তাদের মধ্য হতে দু'জন পুরুষ সাক্ষী রাখবে। যদি দু'জন পুরুষ না থাকে, তবে একজন পুরুষ ও দু'জন স্ত্রীলোক। স্ত্রীলোকদের মধ্যে একজন ভুল করলে তাকে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেবে।'
এ ব্যবস্থা সকল আর্থিক লেনদেনের বেলায় প্রযোজ্য, যথা ব্যবসা, ঋণ, ইজারা, বন্ধক, স্বীকারোক্তি ও জবরদখল। হানাফি মযহাব মতে হুদুদ ও কিসাস ব্যতীত সকল আর্থিক লেনদেনে, বিয়ে, তালাক ও অন্য সর্ব ব্যাপারে পুরুষের সাথে মহিলার সাক্ষ্য চলবে। ইমাম ইবনুল কাইয়েম এই মতটিকে অগ্রাধিকার দয়ে বলেন: 'শরিয়ত যখন পুরুষদের দ্বারা লেখা ঋণের দলীলে, যা কিনা প্রধানত পুরুষদের সমাবেশে লেখা হয়ে থাকে, মহিলাদের সাক্ষ্য গ্রহণকে বৈধ করেছে, তখন যে সব সমাবেশে প্রচুর মহিলার সমাগম ঘটে থাকে যেমন অছিয়ত ও রাজয় তালাকের অনুষ্ঠনে, সে সব সমাবেশে মহিলাদের সাক্ষ্য গ্রহণ তো আরো ভালভাবেই অনুমোদনযোগ্য ও বৈধ হবে।'
ইমাম মালেক ও শাফেয়ি ফকিহগণ এবং অন্য বহু ফকিরে মতে আর্থিক ও লেনদেনে বিশেষভাবে মহিলাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। কিন্তু হুদুদ, কিসাস, বিয়ে, তালাক ইত্যাকার ঘটনাবলীতে, যা শরীর সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট, মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। পক্ষান্তরে শরীর সংক্রান্ত যে সব বিষয় নিছক আর্থিক বিষয় হিসাবে গণ্য, যথা প্রতিনিধিত্ব ও অছিয়ত, সেগুলি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন: এ ক্ষেত্রে একজন পুরুষ ও দু'জন মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। আবার কেউ কেউ বলেন: কোনো মহিলার নয়, বরং শুধু দু'জন পুরুষের সাক্ষ্য গৃহীত হবে। একমাত্র আর্থিক বিষয়ে মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়া ও অন্য বিষয়ে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ সম্পর্কে ইমাম কুরতুবি বলেন: 'যেহেতু অর্থ উপার্জনের উপায় ও উৎসের সংখ্যা অনেক এবং এগুলোতে প্রায়ই অনিয়ম ও অসততার প্রাদুর্ভাব ঘটে, তাই আল্লাহ্ অর্থ সংক্রান্ত বিষয়কে মজবুত করার উপায়-উপকরণকে ব্যাপকতর করেছেন। কখনো লেনদেনকে লিখে রাখা, কখনো তার উপর সাক্ষী রাখা, কখনো বন্ধক ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা দ্বারা এর ভিত্তি মজবুত ও সংহত করেছেন এবং এর সব কটাতে পুরুষের সাথে সাথে মহিলাদেরও প্রবেশাধিকার রেখেছেন।'
📄 একজন পুরুষের সাক্ষ্য
একজন মাত্র সৎ ও ন্যায়পরায়ণ পুরুষের সাক্ষ্য আযান, নামায, রোযা প্রভৃতি ইবাদাতে গ্রহণযোগ্য। ইবনে উমর (রা) বলেন: 'আমি একা চাঁদ দেখেছি বলে রসূলুল্লাহ্ (সা) কে জানালাম। তাতেই তিনি রোযা রাখলেন এবং জনগণকে রোযা রাখার আদেশ দিলেন।'
এ ছাড়া আরো কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে হানাফি ফকিহগণ একজন পুরুষের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য বলে রায় দিয়েছেন, যেমন শিশুদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একজন শিক্ষকের সাক্ষ্য, জন্ম সংক্রান্ত বিরোধে যে কোনো একজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষের সাক্ষ্য, নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসে একজন বিশেষজ্ঞের সাক্ষ্য, সাক্ষীদের বাছাই ও জেরার কাজে একজন ন্যায়পরায়ণের সাক্ষ্য, প্রতিনিধি অপসারণ ও বিক্রীত জিনিসে ত্রুটি থাকার বিষয়ে একজন ন্যায়পরায়ণের সাক্ষ্য গৃহীত হবে। একজন ন্যায়পরায়ণ অনুবাদকের অনুবাদ সম্পর্কে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ তার অনুবাদ গ্রহণের পক্ষে। কিন্তু অন্যান্য ইমামগণ ও মুহাম্মদ ইবনুল হাসান বলেন: 'অনুবাদ সাক্ষ্যের মতই। এতে একজন অনুবাদক গ্রহণযোগ্য নয়।' কিছু কিছু ফকিহ একজন সত্যবাদী পুরুষের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন, তন্মধ্যে ইবনুল কাইয়েম অন্যতম। তিনি বলেন: 'প্রকৃত ব্যাপার হলো, সত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে এমন যে কোনো জিনিসই সাক্ষ্য ও প্রমাণ হিসাবে গণ্য। যে কোনো উপায়েই হোক, সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর আল্লাহ্ তাকে অচল করে রাখেননি। বরং যে আল্লাহ্ ও রসূলের ফায়সালা ব্যতীত আর কারো ফায়সালার কোনোই মূল্য নেই, সে আল্লাহ্ ও রসূলের ফায়সালা হলো, সত্য যখনই যে কোনো উপায়ে উদঘাটিত হবে, তখন তা কার্যকরী করতে হবে এবং তাকে অকার্যকর ও বাতিল করে রাখা হারাম।'
ইমাম ইবনুল কাইয়েম আরো বলেন: 'একজন পুরুষ সাক্ষীর সত্যবাদিতা সম্পর্কে বিচারক নিশ্চিত হলে হুদুদ ব্যতীত আর সব ব্যাপারে তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচার করতে পারেন। আল্লাহ্ বিচারকদের জন্য এটা মোটেই বাধ্যতামূলক করেননি যে, দু'জন সাক্ষী ব্যতীত বিচার করতেই পারবেনা। তিনি শুধু হকদারকে আদেশ দিয়েছেন যেন সে দুজন পুরুষ সাক্ষী অথবা একজন পুরুষ ও দু'জন মহিলা সাক্ষী যোগাড় করে নিজের হক প্রাপ্তি নিশ্চিত করে। এ দ্বারা প্রমাণিত হয়না যে, বিচারক এর চেয়ে কমে বিচার করতেই পারবে না। বরং রসূলুল্লাহ্ (সা) স্বয়ং কখনো একজন সাক্ষীর শপথের ভিত্তিতে এবং কখনো শুধু একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচার-ফায়সালা করেছেন।'
সুতরাং বিচারকের বিচারকার্য পরিচালনার পথ আল্লাহ্ হকদারকে তার হক প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য যে সব পথ অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন তার চেয়ে প্রশস্ত। যেমন রসূলুল্লাহ্ (সা) চাঁদ দেখার ব্যাপারে একজন মাত্র বেদুইনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন, লুণ্ঠিত মালামাল সংক্রান্ত মামলায় তিনি একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন এবং যে সব বিষয়ে নারীরা ছাড়া কোনো পুরুষ সঠিক তথ্য জানেনা, সে সব বিষয়ে একজন বিশ্বস্ত নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। তিনি খুযায়মার একক সাক্ষ্যকে দু'জন পুরুষের সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করেন এবং বলেছেন: 'খুযায়মা যার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে, সে তার জন্য যথেষ্ট।'
আর এটা শুধু খুযায়মার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সাহাবিদের মধ্যে যারা তার সমকক্ষ বা তার চেয়ে উচ্চমানের, তাদের অবস্থাও তদ্রূপ। আবু বকর, উমর, উসমান, আলি (রা) উবাই ইবনে কা'ব (রা) যদি সাক্ষ্য দিতেন, তাহলে তা খুযায়মার একার সাক্ষ্যের চেয়েও অগ্রগণ্য হতো। ইমাম আবু দাউদ তাঁর হাদিস গ্রন্থে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম করেছেন: 'একজন মাত্র সাক্ষীর সত্যবাদিতা সম্পর্কে বিচারক নিশ্চিত হলে তার ভিত্তিতে তিনি বিচার করতে পারেন।'