📄 জিহ্বার জন্য জিহ্বার সাক্ষ্য
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 চরিত্র অজানা এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য
৫. বাকশক্তি: সাক্ষীকে অবশ্যই বাকশক্তি সম্পন্ন হতে হবে। সে যদি বোবা হয়, তবে তার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা- যদিও সে ইশারায় মনোভাব ব্যক্ত করে এবং তা বোধগম্য হয়। তবে সে যদি স্বহস্তে লিখে সাক্ষ্য দেয়, তাহলে ইমাম আহমদ ও ইমাম আবু হানিফার মতে এবং ইমাম শাফেয়ির নির্ভরযোগ্যভাবে প্রাপ্ত মতানুসারে তা গৃহীত হবে।
৬. স্মৃতিশক্তি: যার স্মৃতিশক্তি দুর্বল বলে জানা যায় এবং প্রচুর ভুল হয় তার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। অমনোযোগী ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই বিধি পালনীয়।
৭. অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজন না হওয়া: শত্রুতা বা ভালোবাসার কারণে অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তির সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। কিন্তু উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বিচারপতি শুরাইহ্, উমার ইবনে আব্দুল আযীয, আবু সাওর, ইবনুল মুন্যির প্রমুখ এবং ইমাম শাফেয়ির প্রাপ্ত দুই মতের একটি মত অনুসারে পিতার জন্য সন্তানের ও সন্তানের জন্য পিতার সাক্ষ্য ততোক্ষণ গৃহীত হবে, যতোক্ষণ তারা উভয়ে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও গ্রহণীয় সাক্ষ্যদাতা হবে। অপর দিকে শত্রুর বিরুদ্ধে শত্রুর সাক্ষ্য গৃহীত হবে না, যখন তাদের শত্রুতা হবে পার্থিব শত্রুতা। কেননা এ ক্ষেত্রে সাক্ষী অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজন। তবে শত্রুতা যদি হয় ধর্মীয়, তাহলে সন্দেহের উদ্রেক করেনা। কেননা ইসলাম মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে নিষেধ করে। কাজেই এ ক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ নেই। অনুরূপ পিতা সন্তানের পক্ষে ও সন্তান পিতার পক্ষে সাক্ষ্য দিলে তা বৈধ হবেনা। কিন্তু তাদের বিপক্ষে দেয়া সাক্ষ্য গৃহীত হবে। মায়ের জন্য ছেলের ও ছেলের জন্য মায়ের সাক্ষ্যের ক্ষেত্রেও একই বিধি প্রযোজ্য। আর যে গৃহভৃত্যের খোরপোশ গৃহকর্তা বহন করে তার সাক্ষ্যও অদ্রূপ। এ সব সাক্ষী সন্দেহভাজন বিধায় গৃহীত হবেনা। আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'কোনো খিয়ানতকারী ও খিয়ানতকারিণী এবং কোনো বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তি তার মুসলমান ভাই এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে তা গৃহীত হবেনা। অনুরূপ, পিতার পক্ষে সন্তানের ও সন্তানের পক্ষে পিতার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা।'
কথা ও কাজ দ্বারা শত্রুতা ধরা পড়ে। শত্রুর অন্যতম আলামত হলো, শত্রুর বিপদাপদে খুশি হওয়া, শত্রুর সুখে দুঃখ ভারাক্রান্ত হওয়া এবং শত্রুর জন্য যাবতীয় অকল্যাণ কামনা করা। ফকিহগণ মিথ্যা অপবাদ আরোপ, বলপূর্বক সম্পদ ছিনতাই ও জবরদখল, হত্যা ও ডাকাতিকে শত্রুর অন্যতম কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন। সুতরাং জবরদখলকৃত সম্পত্তির মালিক জবরদখলকারীর বিরুদ্ধে, অপবাদের শিকার ব্যক্তির অপবাদদাতার বিরুদ্ধে, চুরি হওয়া সম্পদের মালিক চোরের বিরুদ্ধে এবং নিহতের উত্তরাধিকারী হত্যাকারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে সে সাক্ষ্য গৃহীত হবে না।
আহমদ ও আবুদাউদ আমর ইবনে শুয়াইব থেকে বর্ণনা করেন, রসূল (সা) বলেন: 'কোনো খেয়ানতকারী, খেয়ানতকারিণী ও বিদ্বেষ পরায়ণের সাক্ষ্য কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে এবং কোনো গৃহভৃত্যের সাক্ষ্য গৃহকর্তার পক্ষে গৃহীত হবেনা। রসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন: কোনো বাদী বা বিবাদীর সাক্ষ্য তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গৃহীত হবেনা।
স্বামী ও স্ত্রীর সাক্ষ্য পরস্পরের জন্য গৃহীত হবেনা। কেননা এখানে পক্ষপাতিত্বের সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই স্বজনপ্রীতি হয়ে থাকে। ইমাম মালিক, আহমদ ও আবু হানিফা এই মত অনুসরণ করেন। তবে ইমাম শাফেয়ি, আবু সাওর ও হাসান স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষ্য পরস্পরের জন্য গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। অন্যান্য আত্মীয়ের একে অপরের জন্য সাক্ষ্য, যথা ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের সাক্ষ্য বৈধ। অনুরূপ বন্ধুর জন্য বন্ধুর সাক্ষ্যও বৈধ। যে হাদিসে আত্মীয়ের জন্য আত্মীয়ের সাক্ষ্য অবৈধ বলা হয়েছে, ইমাম তিরমিযির মতে সে হাদিস সহিহ নয়। ইমাম মালেক বলেন: বিচ্ছিন্ন ভাইয়ের সাক্ষ্য ভাইয়ের জন্য এবং বন্ধুর সাক্ষ্য বন্ধুর জন্য গৃহীত হবেনা।
📄 নগরবাসীর ব্যাপারে যাযাবরের সাক্ষ্য
ইমাম আহমদ, তার শিষ্যদের একটি গোষ্ঠী, আবু উবায়েদ ও এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম মালেকের মত এই যে, নগরবাসীর ব্যাপারে যাযাবরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: কোনো নগরবাসী সম্পর্কে যাযাবরের সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা।' (আবুদাউদ, ইবনে মাজা)।
যাযাবরের সাক্ষ্য অগ্রাহ্য হওয়ার কারণ হলো, সে অত্যন্ত কষ্টে জীবন ধারণ করে, মূর্খ এবং জনপদে যা কিছু ঘটে, তা সে কমই প্রত্যক্ষ করে। তাই তার সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্য নয়।
কিন্তু বিশুদ্ধ মত হলো, সে যদি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হয় এবং মুসলমান হয়, তবে তার সাক্ষ্য গৃহীত হবে। কুরআনে ন্যায়পরায়ণ লোকের সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপারে নগরবাসী বা যাযাবরে পার্থক্য করা হয়নি। তার যাযাবর হওয়া অন্য শহরের অধিবাসী হওয়ার মতই। এটাই ইমাম শাফেয়ি ও অধিকাংশ ফকিরে মত।
আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদিস মূর্খ লোকের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সকল যাযাবর তার আওতাভুক্ত নয়। কেননা রসূল (সা) চাঁদ দেখার ব্যাপারে যাযাবরের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন।
📄 অন্ধের সাক্ষ্য
অন্ধ যদি আওয়াজ শুনে মানুষ চিনতে পারে তাহলে ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদের মতে বিয়ে, তালাক, বিক্রয়, ইজারা, বংশ নির্ণয়, ওয়াকফ, মালিকানা ও স্বীকারোক্তি ইত্যাদিতে অন্ধের সাক্ষ্য বৈধ, চাই ঘটনা অন্ধ অবস্থায় তার গোচরে আসুক বা অন্ধ হওয়ার আগে।
ইবনুল কাসিম বলেন: আমি ইমাম মালিককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোনো ব্যক্তি যদি তার প্রতিবেশীর কথা প্রাচীরের আড়াল থেকে শুনতে পায় এবং তাকে দেখতে না পায়, শুনতে পায় সে তার স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছে এবং তার আওয়াজ চিনতে পারে, তার ব্যাপারে তার সাক্ষ্য বৈধ হবে কি? ইমাম মালিক বললেন: বৈধ হবে।
শাফেয়ি মযহাবের মতে পাঁচটি ক্ষেত্র ব্যতীত অন্ধের সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা: বংশ পরিচয়, মৃত্যু, মালিকানা, অনুবাদ ও অন্ধ হওয়ার পূর্বে যা তার গোচরে এসেছে।
ইমাম আবু হানিফা বলেন: অন্ধের সাক্ষ্য আদৌ গৃহীত হবেনা।