📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সাক্ষ্য গ্রহণের শর্তাবলী

📄 সাক্ষ্য গ্রহণের শর্তাবলী


সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য যে শর্তাবলী জরুরি তা হলো:
১. সাক্ষীর মুসলমান হওয়া: কাজেই কোনো মুসলমানের উপর কাফেরের সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা, একমাত্র সফরকালে ওসিয়ত ব্যতীত। এ ক্ষেত্রে মুসলমানের উপর অমুসলিমের সাক্ষ্য ইমাম আবু হানিফা, বিচারপতি শুরাইহ, ইব্রাহীম নায়ী ও আওযায়ির মতে জায়েয। কেননা আল্লাহ্ সূরা মায়িদার ১০৬ ও ১০৭ নং আয়াতে বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا شَهَادَةً بَيْنَكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ حِيْنَ الْوَسِيَّةِ اثْنِي ذَوَا عَدْلٍ مِّنْكُمْ أَوْ أَخَرْنِ مِنْ غَيْرِكُمْ إِنْ أَنْتُمْ ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَأَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةُ الْمَوْسِ ، تَحْبِسُونَهُمَا مِنْ بَعْدِ الصَّلوة
فَيُقْسِي بِاللَّهِ إِنِ ارْتَبْتُمْ لَا تَشْتَرِى بِهِ ثَمَنًا وَ لَوْ كَانَ ذَاقُرْبَى لَا وَلَا تَكْتُمُ شَهَادَةَ اللَّهِ إِنَّا إِذًا لَمِنَ الألْمِينَ فَإِنْ عُثِرَ عَلَى أَنَّهُمَا اسْتَحَقَّا إِنَّمَا فَأَخَونِ يَقُوْمِنِ مَقَامَهُمَا مِنَ الَّذِينَ اسْتَحَقُّ عَلَيْهِمُ الْأَوْلَيْنِ فَيُقْسِي بِاللَّهِ لَشَهَادَتْنَا أَحَقُّ مِنْ شَهَادَتِهِمَا وَمَا اعْتَدَيْنَا إِنَّا إِذًا لَمِنَ الظَّلِمِينَ
'হে মুমিনগণ, যখন তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন তোমাদের মধ্য থেকে দু'জন ন্যায়পরায়ণ লোককে অসিয়ত করার সাক্ষী রাখবে। যদি তোমরা সফরে থাক এবং তোমাদের মৃত্যুর মুসিবত উপস্থিত হয় তবে তোমাদের ছাড়া অন্য লোকদের মধ্য থেকে দু'জন সাক্ষী রাখবে। তোমাদের সন্দেহ হলে তাদের উভয়কে নামাযের পর অপেক্ষমান রাখবে এবং তারা আল্লাহ্র নামে কসম করে বলবে: আমরা এর বিনিময়ে কোনো মূল্য গ্রহণ করতে চাইনা যদিও সে আত্মীয় হয়, আর আমরা আল্লাহর সাক্ষ্য গোপন করবনা। করলে আমরা গুনাহগারদের মধ্যে শামিল হব। তবে যদি জানা যায় যে, তারা দু'জন কোনো পাপে জড়িত হয়েছে তাহলে যাদের স্বার্থহানি ঘটেছে তাদের মধ্য থেকে নিকটতম দু'জন তাদের স্থলাভিষিক্ত হবে এবং আল্লাহ্ নামে কসম করে বলবে: 'অবশ্যই আমাদের সাক্ষ্য তাদের সাক্ষ্য থেকে অধিক সত্য এবং আমরা সীমা লংঘন করিনি। করলে তো আমরা অবশ্যই যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হব।'
অনুরূপ হানাফিগণ কাফেরদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সাক্ষ্য অনুমোদন করেন। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সা) দু'জন ইহুদি কর্তৃক ব্যভিচারের সাক্ষ্য দেয়ায় দু'জন ইহুদিকে রজম করেছিলেন।
ইমাম শাবি বলেন: দাকুকায় জনৈক মুসলমানের মৃত্যু উপস্থিত হয়। তখন তার অসিয়তের উপর সাক্ষী হয় এমন কোনো মুসলমান পাওয়া গেলনা। অগত্যা সে দু'জন কিতাবীকে সাক্ষী রাখলো। পরে ঐ সাক্ষীদ্বয় কুফায় পৌঁছে আবু মূসা আশ্য়ারির নিকট গেল, তাকে তার অসিয়তের খবর জানালো ও তার পরিত্যক্ত জিনিসপত্র তার নিকট জমা দিলো। আশয়ারি বললেন: এটা এমন একটা ঘটনা, যা রসূলুল্লাহ্ (সা) এর আমলে সংঘটিত ঘটনার পর আর ঘটেনি। অত:পর আসরের নামাযের পর তাদের শপথ নিলেন যে, তারা কোনো খেয়ানত করেনি, কোনো মিথ্যাও বলেনি, কোনো পরিবর্তনও করেনি এবং কোনো কিছু গোপনও করেনি। এটা সে মৃত ব্যক্তিরই অসিয়ত ও পরিত্যক্ত সম্পদ। অত:পর তিনি তাদের দু'জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করলেন।
খাত্তাবি বলেন: এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুসলমানের বিশেষভাবে সফরকালীন অসিয়তের উপর জিম্মীদের সাক্ষ্য গৃহীত হবে। ইমাম আহমদ বলেন: শুধুমাত্র এরূপ ক্ষেত্রে অনিবার্য প্রয়োজন বশত জিম্মীদের সাক্ষ্য গৃহীত হবে, অন্য কোথাও নয়। ইমাম শাফেয়ি ও মালিক বলেন: সফরকালীন অসিয়ত হোক বা অন্য কিছু হোক, মুসলমানের উপর কাফেরের সাক্ষ্য কোনো অবস্থায়ই গৃহীত হবেনা। তাদের মতে এ আয়াত দুটি (অর্থাৎ আয়াতের বিধান) রহিত।
জিম্মীর জন্য জিম্মীর সাক্ষ্য: জিম্মীর জন্য জিম্মীর (অমুসলমানের জন্য অমুসলমানের) সাক্ষ্য নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম মালিক বলেন: অমুসলিমের সাক্ষ্য মুসলমান বা কাফির কারো ব্যাপারেই গৃহীত হবে না। ইমাম আহমদ বলেন: কিতাবীদের পরস্পরের ব্যাপারে পরস্পরের সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। হানা'িগণ বলেন: তাদের পরস্পরের ব্যাপারে পরস্পরের সাক্ষ্য বৈধ এবং সকল কাফেরই একই জাতিভুক্ত।
ইমাম শা'বি, ইবনে আবি লায়লা ও ইসহাক বলেন: ইহুদির ব্যাপারে ইহুদির সাক্ষ্য বৈধ। কিন্তু খ্রিষ্টান ও অগ্নি উপাসকের ব্যাপারে বৈধ নয়। কেননা এগুলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম। এক ধর্মের অনুসারীর ব্যাপারে অন্য ধর্মের অনুসারীর সাক্ষ্য বৈধ নয়।
২. সততা: এটা ইসলামের অতিরিক্ত এক বৈশিষ্ট্য, যা সাক্ষীদের মধ্যে থাকা জরুরি যাতে সৎ সাক্ষীরা অসৎ সাক্ষীদের উপর প্রাধান্য লাভ করে এবং মিথ্যা বলতে অভ্যস্ত লোকেরা সাক্ষী হতে না পারে। কারণ আল্লাহ্ বলেন: وَأَشْهِدُوا ذَوَى عَدْلٍ مِنْكُمْ وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ.
‘তোমাদের মধ্য হতে দু’জন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে। তোমরা আল্লাহ্ জন্য সঠিক সাক্ষ্য হবে।’ (সূরা তালাক আয়াত ২)
سَاكِدين مِّمَّن تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ ‘সাক্ষীদের মধ্যে যাদের উপর তোমরা রাজি’ ...... (সূরা বাকারা, ২৮২)।
يَأْيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإِ فَتَبَيَّنُوا ‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের নিকট কোনো বার্তা আনয়ন করে তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে .....’ (সূরা হুজুরাত, ৬)
আবু দাউদের বর্ণনা, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন: ‘কোনো খিয়ানতকারী ও খিয়ানতকারিণী এবং কোনো ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর সাক্ষ্য বৈধ নয়।’ তাই মিথ্যাচারী, চরিত্রহীন ও খারাপ স্বভাবের লোক হিসাবে খ্যাত লোক ও পাপাচারীর সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। বস্তুত সততার এ অর্থই ব্যাপকভাবে গৃহীত। ইমাম আবু হানিফা বলেন: সততার জন্য সাক্ষীর বাহ্যত মুসলমান হওয়া এবং তার ভদ্রতা ও সুখ্যাতির পরিপন্থি কোনো বিষয় প্রকাশ না পাওয়াই যথেষ্ট। তবে এটা আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, হুদুদ তথা ফৌজদারি মামলায় যথেষ্ট নয়। বিয়ের জন্য তিনি ফাসেকের সাক্ষ্য অনুমোদন করে বলেন: দু’জন ফাসিকের সাক্ষ্য দ্বারা বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাবে। মালেকি মযহাব অনুসারে অনন্যোপায় অবস্থায় অসৎ লোকের সাক্ষ্য দ্বারাও বিচার করা যাবে এবং ছোটখাট বিষয়ে সৎ কি অসৎ জানা যায় না, এমন লোকের সাক্ষ্য গৃহীত হবে।
ফকিহগণ বলেন: সাক্ষীর জন্য ইসলামের বাস্তব অনুসারী ও ভদ্র হওয়া জরুরি। ইসলামের বাস্তব অনুসারী হওয়ার জন্য ফরয ও নফল আদায়, হারাম ও মাকরুহ বর্জন এবং কবীরা (বড়) গুনাহ না করা ও সগীরা (ছোট) গুনাহ বারবার না করা যথেষ্ট। আর ভদ্রতা বলতে বুঝায়, কথা ও কাজে যা শোভনীয় তা করবে এবং যা অশোভন তা বর্জন করবে। পাপাচারী লোক তাওবা করলে তার সাক্ষ্য গৃহীত হবে। এ ব্যাপারে সকল ফকিহ একমত। তবে ইমাম আবু হানিফা বলেন: তার পাপাচারী হিসাবে পরিচিত হওয়ার কারণ যদি কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয় তা হলে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবেনা। কেননা আল্লাহ্ ব ২৫২
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَسِقُونَ ‘যারা সতী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করেনা, তাদেরকে আশিটি কশাঘাত করবে এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবেনা। তারাই তো সত্যত্যাগী।’ (সূরা নূর, ৪)।
৩, ৪. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া: সততা ও ন্যায়পরায়ণতা যেমন সাক্ষ্য গৃহীত হওয়ার শর্ত, তেমনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ও সুস্থমস্তিষ্ক হওয়াও সততার শর্ত। কাজেই একজন শিশুর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবেনা যদিও সে তারই মতো একজন শিশুর ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয়। অনুরূপ পাগল ও মানসিক প্রতিবন্ধীর সাক্ষ্যও গৃহীত হবেনা। কেননা তাদের সাক্ষ্য এমন বিশ্বাস জন্মাতে সাহায্য করেনা যার ভিত্তিতে বিচার করা যায়। ইমাম মালিক জখমের মামলায় শিশুদের সাক্ষ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন, যতোক্ষণ তারা বিচ্ছিন্ন না হয় ও পরস্পর বিরোধী বক্তব্য না দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরও অনুরূপ শর্তে শিশুদের সাক্ষ্যের অনুমতি দিয়েছেন। একইভাবে সাহাবায়ে কিরাম ও মদিনার ফকিহগণ শিশুদের একে অপরকে আহত করার ঘটনায় তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন এবং এটাই অগ্রগণ্য মত। কেননা তাদের খেলাধুলায় বয়স্ক লোকেরা সচারাচর উপস্থিত থাকেনা। এমতাবস্থায় তাদের সাক্ষ্য যদি গ্রহণ না করা হতো এবং মহিলাদের এককভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ না করা হতো, তাহলে অনেকের অধিকার ও ন্যায্য প্রাপ্য নষ্ট হয়ে যেতো ও অবহেলিত হতো। অথচ সাধারণ মানুষ তাদের সত্যবাদিতায় প্রবল ধারণা অথবা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে থাকে। বিশেষত তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আগে যখন দলবদ্ধভাবে আসে এবং কোনো ঘটনা সম্পর্কে সবাই একই বক্তব্য দেয়, সে সময় তাদের সাক্ষ্য থেকে যে ধারণা জন্মে, তা দু’জন পুরুষের সাক্ষ্য থেকে সৃষ্ট ধারণার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ইসলামি শরিয়ত হচ্ছে একটা পূর্ণাংগ, মর্যাদাপূর্ণ এবং মানুষের ইহ-পরকালের স্বার্থ ও কল্যাণের নিশ্চয়তা বিধানকারী বিধান। তাই তার ব্যাপারে এ কথা কল্পনা করা যায়না যে, তা এমন অকাট্য অধিকারকে সুস্পষ্ট ও অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অবজ্ঞা ও বিনষ্ট করবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 জিহ্বার জন্য জিহ্বার সাক্ষ্য

📄 জিহ্বার জন্য জিহ্বার সাক্ষ্য


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 চরিত্র অজানা এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য

📄 চরিত্র অজানা এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য


৫. বাকশক্তি: সাক্ষীকে অবশ্যই বাকশক্তি সম্পন্ন হতে হবে। সে যদি বোবা হয়, তবে তার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা- যদিও সে ইশারায় মনোভাব ব্যক্ত করে এবং তা বোধগম্য হয়। তবে সে যদি স্বহস্তে লিখে সাক্ষ্য দেয়, তাহলে ইমাম আহমদ ও ইমাম আবু হানিফার মতে এবং ইমাম শাফেয়ির নির্ভরযোগ্যভাবে প্রাপ্ত মতানুসারে তা গৃহীত হবে।
৬. স্মৃতিশক্তি: যার স্মৃতিশক্তি দুর্বল বলে জানা যায় এবং প্রচুর ভুল হয় তার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। অমনোযোগী ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই বিধি পালনীয়।
৭. অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজন না হওয়া: শত্রুতা বা ভালোবাসার কারণে অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তির সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা। কিন্তু উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বিচারপতি শুরাইহ্, উমার ইবনে আব্দুল আযীয, আবু সাওর, ইবনুল মুন্যির প্রমুখ এবং ইমাম শাফেয়ির প্রাপ্ত দুই মতের একটি মত অনুসারে পিতার জন্য সন্তানের ও সন্তানের জন্য পিতার সাক্ষ্য ততোক্ষণ গৃহীত হবে, যতোক্ষণ তারা উভয়ে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও গ্রহণীয় সাক্ষ্যদাতা হবে। অপর দিকে শত্রুর বিরুদ্ধে শত্রুর সাক্ষ্য গৃহীত হবে না, যখন তাদের শত্রুতা হবে পার্থিব শত্রুতা। কেননা এ ক্ষেত্রে সাক্ষী অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজন। তবে শত্রুতা যদি হয় ধর্মীয়, তাহলে সন্দেহের উদ্রেক করেনা। কেননা ইসলাম মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে নিষেধ করে। কাজেই এ ক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ নেই। অনুরূপ পিতা সন্তানের পক্ষে ও সন্তান পিতার পক্ষে সাক্ষ্য দিলে তা বৈধ হবেনা। কিন্তু তাদের বিপক্ষে দেয়া সাক্ষ্য গৃহীত হবে। মায়ের জন্য ছেলের ও ছেলের জন্য মায়ের সাক্ষ্যের ক্ষেত্রেও একই বিধি প্রযোজ্য। আর যে গৃহভৃত্যের খোরপোশ গৃহকর্তা বহন করে তার সাক্ষ্যও অদ্রূপ। এ সব সাক্ষী সন্দেহভাজন বিধায় গৃহীত হবেনা। আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'কোনো খিয়ানতকারী ও খিয়ানতকারিণী এবং কোনো বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তি তার মুসলমান ভাই এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে তা গৃহীত হবেনা। অনুরূপ, পিতার পক্ষে সন্তানের ও সন্তানের পক্ষে পিতার সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা।'
কথা ও কাজ দ্বারা শত্রুতা ধরা পড়ে। শত্রুর অন্যতম আলামত হলো, শত্রুর বিপদাপদে খুশি হওয়া, শত্রুর সুখে দুঃখ ভারাক্রান্ত হওয়া এবং শত্রুর জন্য যাবতীয় অকল্যাণ কামনা করা। ফকিহগণ মিথ্যা অপবাদ আরোপ, বলপূর্বক সম্পদ ছিনতাই ও জবরদখল, হত্যা ও ডাকাতিকে শত্রুর অন্যতম কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন। সুতরাং জবরদখলকৃত সম্পত্তির মালিক জবরদখলকারীর বিরুদ্ধে, অপবাদের শিকার ব্যক্তির অপবাদদাতার বিরুদ্ধে, চুরি হওয়া সম্পদের মালিক চোরের বিরুদ্ধে এবং নিহতের উত্তরাধিকারী হত্যাকারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে সে সাক্ষ্য গৃহীত হবে না।
আহমদ ও আবুদাউদ আমর ইবনে শুয়াইব থেকে বর্ণনা করেন, রসূল (সা) বলেন: 'কোনো খেয়ানতকারী, খেয়ানতকারিণী ও বিদ্বেষ পরায়ণের সাক্ষ্য কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে এবং কোনো গৃহভৃত্যের সাক্ষ্য গৃহকর্তার পক্ষে গৃহীত হবেনা। রসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন: কোনো বাদী বা বিবাদীর সাক্ষ্য তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গৃহীত হবেনা।
স্বামী ও স্ত্রীর সাক্ষ্য পরস্পরের জন্য গৃহীত হবেনা। কেননা এখানে পক্ষপাতিত্বের সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই স্বজনপ্রীতি হয়ে থাকে। ইমাম মালিক, আহমদ ও আবু হানিফা এই মত অনুসরণ করেন। তবে ইমাম শাফেয়ি, আবু সাওর ও হাসান স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষ্য পরস্পরের জন্য গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। অন্যান্য আত্মীয়ের একে অপরের জন্য সাক্ষ্য, যথা ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের সাক্ষ্য বৈধ। অনুরূপ বন্ধুর জন্য বন্ধুর সাক্ষ্যও বৈধ। যে হাদিসে আত্মীয়ের জন্য আত্মীয়ের সাক্ষ্য অবৈধ বলা হয়েছে, ইমাম তিরমিযির মতে সে হাদিস সহিহ নয়। ইমাম মালেক বলেন: বিচ্ছিন্ন ভাইয়ের সাক্ষ্য ভাইয়ের জন্য এবং বন্ধুর সাক্ষ্য বন্ধুর জন্য গৃহীত হবেনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 নগরবাসীর ব্যাপারে যাযাবরের সাক্ষ্য

📄 নগরবাসীর ব্যাপারে যাযাবরের সাক্ষ্য


ইমাম আহমদ, তার শিষ্যদের একটি গোষ্ঠী, আবু উবায়েদ ও এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম মালেকের মত এই যে, নগরবাসীর ব্যাপারে যাযাবরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: কোনো নগরবাসী সম্পর্কে যাযাবরের সাক্ষ্য গৃহীত হবেনা।' (আবুদাউদ, ইবনে মাজা)।
যাযাবরের সাক্ষ্য অগ্রাহ্য হওয়ার কারণ হলো, সে অত্যন্ত কষ্টে জীবন ধারণ করে, মূর্খ এবং জনপদে যা কিছু ঘটে, তা সে কমই প্রত্যক্ষ করে। তাই তার সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্য নয়।
কিন্তু বিশুদ্ধ মত হলো, সে যদি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হয় এবং মুসলমান হয়, তবে তার সাক্ষ্য গৃহীত হবে। কুরআনে ন্যায়পরায়ণ লোকের সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপারে নগরবাসী বা যাযাবরে পার্থক্য করা হয়নি। তার যাযাবর হওয়া অন্য শহরের অধিবাসী হওয়ার মতই। এটাই ইমাম শাফেয়ি ও অধিকাংশ ফকিরে মত।
আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদিস মূর্খ লোকের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সকল যাযাবর তার আওতাভুক্ত নয়। কেননা রসূল (সা) চাঁদ দেখার ব্যাপারে যাযাবরের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00