📄 বিচারকের মাথায় নতুন সিদ্ধান্তের উদয়
বিচারক যখন নিজের ইজতিহাদ তথা সর্বাত্মক চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে কোনো মামলায় একটা রায় ঘোষণা করে, অত:পর তার মাথায় নতুন রায়ের উদ্ভব হয়, যা প্রথম রায়টির বিপরীত, তখন সে উক্ত রায়টি বাতিল করবেনা। অনুরূপ যখন তার কাছে অন্য একজন বিচারকের রায় উত্থাপন করা হয়, কিন্তু তা তার পছন্দ হয়না, তখন সেটা সে বাতিল করবেনা। এর প্রমাণ হলো, জনৈকা মহিলার ব্যাপারে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর যে রায় আব্দুর রাজ্জাক বর্ণনা করেন। ঐ মহিলা স্বামী, মা, পিতা ও মাতার দিক থেকে দু সৎভাই ও মায়ের দিক থেকে দু সৎভাই রেখে মারা যায়। উমর (রা) পিতা ও মাতার দিকের সৎভাই ও মায়ের দিকের দু সৎভাইকে সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশে অংশীদার করলেন, এটা দেখে এক ব্যক্তি তাকে বললো: অমুক বছর আপনি উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধের মীমাংসা করেছিলেন তখন এভাবে তাদেরকে অংশীদার করেননি। উমর (রা) বললেন: 'সেদিন মীমাংসা করেছিলাম সেদিনকার প্রেক্ষাপটে, আর আজকে করলাম আজকের প্রেক্ষাপটে।' ইবনুল কাইয়েম বলেন: খলিফা উভয় দিনের ইজতিহাদে স্বাধীনভাবে যেটা সত্য ও সঠিক মনে করেছিলেন, সে অনুসারে মীমাংসা করেছেন।
📄 ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিচার-ফায়সালার একটি নমুনা
আবু নুআইম তার 'হিলয়া' নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন: আলি ইবনে আবু তালেব (রা) জনৈক ইহুদির নিকট তার একটা বর্ম পেলেন। ইহুদি সেটি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল। আলি (রা) দেখেই বর্মটি চিনে ফেললেন। তিনি বললেন: এটা আমার বর্ম। আমার ছাই রং এর একটা উটের উপর থেকে এটা পড়ে যায়। ইহুদি বললো: বর্মটি আমার এবং আমার হাতে রয়েছে। পরক্ষণে ইহুদি বললো: আমার ও আপনার বিরোধ মীমাংসার জন্য মুসলিম বিচারকের কাছে চলুন। উভয়ে বিচারপতি শুরাইহের নিকট গেলেন। শুরাইহ আলি (রা) কে আসতে দেখে নিজের আসন থেকে সরে বসলেন এবং আলি (রা) সেখানে বসলেন। অত:পর আলি (রা) বললেন: আমার প্রতিপক্ষ যদি মুসলমান হতো তাহলে তার বসার জন্য আমার সমান আসনের ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু আমি রসূলুল্লাহ্ (সা) কে বলতে শুনেছি: 'অমুসলিমদেরকে সমান আসনে বসাবেনা।'
এবার শুরাইহ্ বললেন: হে আমীরুল মুমিনীন, কী চান? আলি (রা) বললেন: আমার একটা ছাই রং এর উটের উপর থেকে আমার বর্ম পড়ে গেছে। অত:পর এ ইহুদি সেটি কুড়িয়ে নিয়েছে। শুরাইহ্ বললেন: হে ইহুদি, তোমার বক্তব্য কী? সে বললো: ওটা আমার বর্ম এবং আমার হাতেই রয়েছে। শুরাইহ্ বললেন: হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি সত্য বলেছেন। ওটা আপনার বর্ম। কিন্তু এ ব্যাপারে দুজন সাক্ষী প্রয়োজন।
তৎক্ষণাৎ তিনি কাম্বার ও আলি তনয় হাসানকে ডাকলেন এবং উভয়ে সাক্ষ্য দিলো যে, বর্মটি আলি (রা)-এর। শুরাইহ্ বললেন: আপনার মুক্ত গোলাম কাম্বারের সাক্ষ্য আমি অনুমোদন করলাম। কিন্তু আপনার জন্য আপনার ছেলের সাক্ষী হওয়া অনুমোদন করতে পারিনা। আলি (রা) বললেন: আপনি কি শোনেননি, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেছেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের নেতা? শুরাইহ্ বললেন: হ্যাঁ, শুনেছি। আলি (রা) বললেন: তবুও বেহেস্তের যুবকদের নেতার সাক্ষ্য অনুমোদন করছেননা? অত:পর ইহুদিকে বললেন: নাও, বর্মটা তুমিই নিয়ে যাও।
ইহুদি বললো: আমীরুল মুমিনীন আমার সাথে মুসলমানদের বিচারকের নিকট এলেন, সে বিচারক আমার পক্ষে রায় দিল এবং আমীরুল মুমিনীন তাতে রাজি হলেন। হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর কসম, আপনি সত্যবাদী, এটা আপনারই বর্ম। আপনার একটা উটের উপর থেকে পড়ে গিয়েছিল। আমি ওটা কুড়িয়ে পেয়েছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) তাঁর রসূল। এরপর আলি (রা) বর্মটি ইহুদিকে উপহার দিলেন। উপরন্তু তাকে নয়শো মুদ্রা উপহার দিলেন। পরে সে সিফফিন যুদ্ধে আলি (রা) এর পক্ষে যুদ্ধ করে শহীদ হয়।