📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিচারকের রায়ের বাহ্যিক কার্যকারিতা

📄 বিচারকের রায়ের বাহ্যিক কার্যকারিতা


বিচারকের রায় কোনো হালাল জিনিসকে হারাম করেনা এবং কোনো হারাম জিনিসকে হালাল করেনা। এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে উম্মে সালমা বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'আমি তো মানুষ মাত্র। তোমরা আমার নিকট বিবাদ নিয়ে এসে থাক। হয়তো তোমাদের কেউ অপরের চেয়ে বেশি বাকপটু হতে পারে এবং নিজের যুক্তিপ্রমাণ তুলে ধরতে পারে। ফলে আমি যা শুনি তার ভিত্তিতে মীমাংসা করি। কাজেই আমি যদি কাউকে তার ভাইয়ের অধিকার দিয়ে থাকি তবে সে যেন তা না নেয়। কেননা আমি তো তার জন্য আগুনের টুকরো তৈরি করি।' (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা)। ইমাম শাফেয়ি বলেন, বিচারকের রায় হারামকে হালাল করতে পারেনা, এটা একটা সর্বসম্মত অভিমত। সুতরাং যখন কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দাবি উপস্থাপন করে, সে দাবির উপর সাক্ষীদেরকেও হাজির করে এবং বিচারক দাবিকারীর পক্ষে রায় দেয়, তখন সাক্ষ্য-প্রমাণ সত্য হলে বিচারকের রায়ে পাওয়া হক গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ মিথ্যা হয়ে থাকলে এবং সে মিথ্যা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারক রায় দিয়ে থাকলে সে রায় বাদীর জন্য দাবিকৃত হক গ্রহণ করাকে বৈধ করেনা, বরং সেটি তার মালিকের মালিকানার অধীনেই থাকবে। একমাত্র ইমাম আবু হানিফা ব্যতীত আর কোনো ফকিহ্ এই মতের বিরোধিতা করেনি। ইমাম আবু হানিফা বলেন: বিচারকের রায় চুক্তিসমূহের বহাল থাকা ও বাতিল হওয়ার ব্যাপারে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সর্বতোভাবেই কার্যকর।
সুতরাং কোনো মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা যখন বিচারকের নিকট কোনো মহিলার তালাকের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়, অত:পর তদনুসারে বিচারক তালাকের পক্ষে রায় দেয়, তখন স্বামীর সাথে তার বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে এবং সে অন্য স্বামীর সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এমনকি যে ব্যক্তি তার তালাকের পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে তার সাথেও বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। অনুরূপ, কেউ যদি কোনো মহিলা সম্পর্কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় যে, সে অমুকের স্ত্রী, অথচ সে তার স্ত্রী নয়, অত:পর বিচারক এ সাক্ষ্য অনুযায়ী রায় দেয়, তাহলে এ রায় অনুযায়ী মহিলাটি তার জন্য বৈধ হবে। ইমাম আবু হানিফা অবশ্য চুক্তি বহাল থাকা বা বাতিল হওয়া সংক্রান্ত মামলায় এবং খুন ও সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলায় পার্থক্য করেছেন। কিন্তু সে পার্থক্য সঠিক নয়। কেননা এ দুধরনের মামলায় কোনো পার্থক্য নেই। এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফার শিষ্যগণ তাঁর মতের বিরোধিতা করেছেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যে অনুপস্থিত ব্যক্তির কোনো প্রতিনিধি নেই তার সম্পর্কে বিচারকের রায়

📄 যে অনুপস্থিত ব্যক্তির কোনো প্রতিনিধি নেই তার সম্পর্কে বিচারকের রায়


যে ব্যক্তি অনুপস্থিত এবং তার কোনো প্রতিনিধিত্ব (উকিল) নেই, বাদী তার বিরুদ্ধে দাবি তুলতে তথা মামলা করতে পারেন। আর দাবি প্রমাণিত হলে বিচারক উক্ত অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায় দিতেও পারেন।
এর প্রথম প্রমাণ: সূরা সাদের ২৬ নং আয়াত: 'হে দাউদ, মানুষের মধ্যে সত্য অনুযায়ী ফায়সালা 'কর'। যেহেতু সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত জিনিস সত্য, তাই সে অনুযায়ী রায় দেয়া ওয়াজিব।
দ্বিতীয় প্রমাণ: আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ রসূলুল্লাহ্ (সা) কে জানালো যে, আবু সুফিয়ান কৃপণ মানুষ, তাই সে কি তার অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ থেকে কিছু নিতে পারে? রসূল (সা) তাকে বললেন: যতোটুকু নিলে তোমার ও তোমার সন্তানের জন্য যথেষ্ট হয়, ততোটুকু নিতে পার।' এটা একজন অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায়।
তৃতীয় প্রমাণ: ইমাম মালেক 'মুয়াত্তায় উল্লেখ করেন যে, উমর (রা) বলেছেন: 'যে ব্যক্তির কারো কাছে কিছু পাওনা আছে সে যেন আগামীকাল আমার কাছে আসে। আমি খাতকের সম্পত্তি বিক্রয় করবো এবং তা তার পাওনাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেব।' যে ব্যক্তির সম্পত্তি বিক্রয়ের ফায়সালা করা হয়েছিল সে অনুপস্থিত ছিলো।
চতুর্থ প্রমাণ: যেহেতু অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায় দানে বিচারক বিরত থাকলে হকদারের হক নষ্ট হবে, সেহেতু এ রূপ রায় দান অবৈধ নয়। আর অনুপস্থিত থাকার ওজুহাত কারো ঋণ পরিশোধ থেকে বিরত থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। এটাই ইমাম মালিক, শাফেয়ি ও আহমদের মত। তাঁরা বলেন: 'অনুপস্থিত ব্যক্তির কোনো হক নষ্ট করা হয়না। সে উপস্থিত হলে তার যুক্তি শোনা হয় এবং তদনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়, এমনকি তার ফলে রায়ও বাতিল হতে পারে। কেননা তার বক্তব্য শোনা শর্ত। বিচারপতি শুরাইহ, উমার ইবনে আব্দুল আযীয, ইবনে আবি লায়লা ও ইমাম আবু হানিফা বলেন: অনুপস্থিত ব্যক্তির কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি ব্যতীত বিচারক তার বিরুদ্ধে কোনো রায় দিতে পারেননা। কেননা তার কাছে এমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকতে পারে, যা বাদীর দাবি বাতিল করে দেয়। তাছাড়া ইতিপূর্বে এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ্ (সা) আলি (রা) কে বলেন: 'হে আলি, যখন বাদী ও বিবাদী তোমার সামনে বসবে, তখন উভয়ের বক্তব্য না শোনা পর্যন্ত কোনো রায় দেবেনা। উভয়ের বক্তব্য শুনলে তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে বিচারটা কেমন হওয়া উচিত।'
খাত্তাবি বলেন: কিছু সংখ্যক ফকিহ কতিপয় ব্যাপারে অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায় দানের পক্ষপাতী। তন্মধ্যে মৃত ব্যক্তি ও শিশু সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখযোগ্য। তারা আরো বলেন: যে ব্যক্তি তার সম্পদ কারো কাছে গচ্ছিত রেখে বিদেশে চলে যায়, তার স্ত্রী যখন খোরপোশ দাবি করবে এবং যার নিকট গচ্ছিত রেখেছে, তাকে হাজির করে, তখন বিচারক স্ত্রীর খোরপোশ দিতে বাধ্য করতে পারবে। তিনি আরো বলেন: শুফয়ার দাবিদার যখন অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচারকের নিকট শুফয়ার দাবি জানাবে এবং প্রমাণ দেবে যে, সে তার সম্পত্তি বিক্রয় করেছে ও মূল্য হস্তগত করেছে, তখন বিচারক তার শুফয়ার পক্ষে রায় দেবেন। এ সব রায়ই অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বিচারকের রায়

📄 অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বিচারকের রায়


অমুসলিমরা মুসলমান বিচারকদের নিকট বিবাদ পেশ করলে তা জায়েয। তাদের ব্যাপারে বিচারক ইসলামের বিধান অনুসারে মীমাংসা করবেন।
فَإِنْ جَاءُوكَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ ج وَإِنْ تَعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَىٰ يَضُرُّوكَ شَيْئًا وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
'তারা যদি তোমার নিকট আসে তবে তাদের বিচার করো অথবা তাদেরকে উপেক্ষা করো। তুমি যদি তাদেরকে উপেক্ষা কর, তবে তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবেনা। আর যদি বিচার কর তবে ন্যায় বিচার করো। আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণদের ভালবাসেন।' (সূরা মায়িদা, ৪২)।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 খাতক টালবাহানা করলে পাওনাদার দাবি না জানিয়েই পাওনা আদায় করতে পারবে কি?

📄 খাতক টালবাহানা করলে পাওনাদার দাবি না জানিয়েই পাওনা আদায় করতে পারবে কি?


শাফেয়ি ফকিহগণ বলেন: যে ব্যক্তির কারো কাছে কিছু পাওনা আছে, কিন্তু প্রমাণ বা সাক্ষী নেই এবং খাতক তা অস্বীকার করে, তাহলে সে তার সম্পত্তি থেকে হুবহু ঐ জিনিস নিতে পারলে নেবে। হুবহু ঐ জিনিস নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো জিনিস থেকে পাওনা নিতে পারবেনা। অন্য জিনিস থেকে নেয়া ছাড়া উপায়ান্তর না থাকলে অন্য জিনিস থেকেই নিতে পারবে।
আর যদি বিচারকের সাহায্যে পাওনা আদায় করা সম্ভব হয়, যেমন খাতক তার পাওনা স্বীকার করে, কিন্তু টালবাহানা করে অথবা সে অস্বীকার করে, কিন্তু পাওনাদারের কাছে সাক্ষী-প্রমাণ আছে। অথবা খাতককে বিচারকের নিকট হাজির করলে এবং তাকে শপথ করতে বললে সে স্বীকার করবে বলে পাওনাদার আশা করে, তাহলেও কি সে নিজের ইচ্ছামত সরাসরি আদায় করে নিতে পারবে, না বিচারকের কাছে নেয়া বাধ্যতামূলক? এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। অগ্রগণ্য মত হলো, আদায় করা জায়েয। এর প্রমাণ আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দের ঘটনা। তাছাড়া আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি কষ্টকর, ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ হওয়ায় আদালতের আশ্রয় নেয়া বাধ্যতামূলক নয়।
শাফেয়ি ফকিহগণ আরো বলেন: সরাসরিভাবে আদায় করা যখন জায়েয, তখন যদি আদায় করার জন্য তার দরজা ভাঙ্গা অথবা প্রাচীর ছিদ্র করা ছাড়া উপায় না থাকে, তবে ওটাও জায়েয। এ ক্ষেত্রে তার যে ক্ষতি হবে তা পূরণ করা পাওনাদারের জন্য জরুরি নয়। এটা ঠিক তেমনি যেমন কোনো আক্রমণকারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য যদি তার সম্পদ নষ্ট করা ছাড়া গত্যন্তর না থাকে তবে তাও করা যাবে এবং কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া লাগবে না।
শাফেয়ি ফকিহগণের এ মত রসূলুল্লাহ (সা) এর এ হাদিসের পরিপন্থী নয় যে, 'যে ব্যক্তি তোমার আমানত রক্ষা করে, তুমি তার আমানত রক্ষা কর। আর যে ব্যক্তি তোমার আমানতের খিয়ানত করে, তুমি তার আমানতের খেয়ানত করোনা'। কেননা খিায়নতকারী হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে যুলুম ও আগ্রাসনের মাধ্যমে যা নেয়ার অধিকার নেই তা কেড়ে নেয়। যে ব্যক্তি নিজের ন্যায্য প্রাপ্য তার প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আদায় করার অধিকার রাখে এবং নিজের উপর কৃত যুলুমের প্রতিকার করার অনুমতিপ্রাপ্ত, সে খেয়ানতকারী নয়। হাদিসটির প্রকৃত অর্থ দাঁড়ায়: 'যে ব্যক্তি তোমার সাথে খেয়ানত করেছে, তার কৃত খিয়ানতের মতো তুমিও তার সাথে খেয়ানত করোনা'। এখানে যার কথা আলোচিত হচ্ছে, সে তো খেয়ানত করেনি। সে কেবল নিজের ন্যায্য প্রাপ্য আদায় করেছে। আর হাদিসে উল্লেখিত খেয়ানতকারী অন্যের অধিকার অপহরণ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00