📄 বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে উমর রা.-এর পত্র
আবু মূসা আশ্য়ারি (রা) এর নিকট লিখিত পত্রতে উমর (রা) বিচার কার্যের জন্য স্থায়ী মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পত্রটি নিম্নরূপ: 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম, আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব এরপক্ষ থেকে আব্দুল্লাহ্ ইবনে কায়িসের নিকট- তোমার উপর সালাম।
ন্যায়বিচার করা একটা অকাট্য ফরয ও আবহমান কাল থেকে অনুসৃত একটা সুন্নাত। বুঝে নাও, যখন কোনো বিচারকার্য তোমার উপর সোপর্দ করা হবে, তখন যে সত্য কার্যকর হবেনা, তা নিয়ে বাগাড়ম্বর করে কোনো লাভ নেই। তোমার সামনে অবস্থানে, তোমরা ন্যায়বিচারে ও তোমার মজলিসে সবার সাথে সমান আচরণ কর, যাতে কোনো অভিজাত ব্যক্তি তার প্রতি তোমার বিশেষ ঝোঁকের জন্য লালায়িত না হয় এবং কোনো দুর্বল তোমার সুবিচার থেকে হতাশ না হয়। বাদীর কর্তব্য হলো তার দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা আর যে অস্বীকার করে তার কর্তব্য কসম খাওয়া। কেবল হারামকে হালাল ও হালালকে হারামে পরিণত করে এমন আপোস ছাড়া মুসলমানদের মধ্যে আপোস মীমাংসা জায়েয। আজ তুমি যে রায় ঘোষণা করেছ, তা তুমি পুনর্বিবেচনা করে যেটি সত্য ও সঠিক মনে কর তার দিকে ফিরে যেতে পার। কেননা সত্য চিরন্তন এবং সত্যের দিকে ফিরে যাওয়া বাতিলকে আঁকড়ে ধরে থাকার চেয়ে ভাল। যে বিষয় কুরআন ও সুন্নাহতে নেই, তা নিয়ে যদি দ্বিধা দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাক, তাহলে বিষয়টি পুন:পুন: উপলদ্ধি করতে চেষ্টা কর। নজিরসমূহ জেনে নাও অত:পর তার সাথে নতুন বিষয়ের তুলনা কর। যেটি আল্লাহর নিকটতম ও সত্যের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা অন্বেষণ কর। যে ব্যক্তি কোনো প্রাপ্য দাবি করে ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করতে চায়, তার জন্য একটা সর্বশেষ মেয়াদ বেঁধে দাও। সে মেয়াদের মধ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ আনতে পারলে তার প্রাপ্য দিয়ে দাও। নচেৎ তার দাবি রহিত কর। কেননা সন্দেহ মোচনে এটাই অধিকতর কার্যকর পন্থা। মুসলমানরা পরস্পরের জন্য সাক্ষী হওয়ার যোগ্য কেবল ব্যভিচারী হিসাবে, বেত্রদন্ড ভোগ করেছে, মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে কিংবা বংশগত বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযুক্ত হয়েছে এমন ব্যক্তি ব্যতীত। আল্লাহ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও শপথ দ্বারা তোমাদের গোপনীয়তা সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। বিবাদ-বিচ্ছেদের সময় প্রতিপক্ষের দ্বারা কষ্ট পেয়ে ধৈর্যহারা, দিশেহারা হবে না। কেননা সত্য সত্যের স্থানেই থাকে এবং দুঃখ কষ্ট দ্বারা আল্লাহ্ সওয়াব ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। যার নিয়ত সৎ এবং যে আত্মসংযমে অভ্যস্ত, আল্লাহ্ ও মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। যে ব্যক্তি কৃত্রিমভাবে মানুষের সাথে এমন আচরণ করবে যা তার নিয়তের পরিপন্থী এবং যা সম্পর্কে আল্লাহ্ জানেন যে, ওটা তার স্বত:স্ফূর্ত আচরণ নয়, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করবেন। সুতরাং আল্লাহ্ ত্বরিত জীবিকা ও তাঁর রহমতের ভান্ডার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? এটা কি আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ তোমাকে দিতে পারে?
📄 বিচারকের সুপারিশ
বিচারক ভাল মনে করলে সুপারিশ করতে পারেন। যেমন বাদী বিবাদীকে আপোস করতে বা তাদের পাওনার একাংশ ছেড়ে দিতে বলতে পারেন। ইতিপূর্বে উল্লেখিত এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) কাব ইবনে মালিককে তার ঋণের অর্ধেক ছেড়ে দেয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন এবং কাব তা মেনে নিয়ে আপোস করেছিলেন।
📄 বিচারকের রায়ের বাহ্যিক কার্যকারিতা
বিচারকের রায় কোনো হালাল জিনিসকে হারাম করেনা এবং কোনো হারাম জিনিসকে হালাল করেনা। এ ব্যাপারে ইতিপূর্বে উম্মে সালমা বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'আমি তো মানুষ মাত্র। তোমরা আমার নিকট বিবাদ নিয়ে এসে থাক। হয়তো তোমাদের কেউ অপরের চেয়ে বেশি বাকপটু হতে পারে এবং নিজের যুক্তিপ্রমাণ তুলে ধরতে পারে। ফলে আমি যা শুনি তার ভিত্তিতে মীমাংসা করি। কাজেই আমি যদি কাউকে তার ভাইয়ের অধিকার দিয়ে থাকি তবে সে যেন তা না নেয়। কেননা আমি তো তার জন্য আগুনের টুকরো তৈরি করি।' (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা)। ইমাম শাফেয়ি বলেন, বিচারকের রায় হারামকে হালাল করতে পারেনা, এটা একটা সর্বসম্মত অভিমত। সুতরাং যখন কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দাবি উপস্থাপন করে, সে দাবির উপর সাক্ষীদেরকেও হাজির করে এবং বিচারক দাবিকারীর পক্ষে রায় দেয়, তখন সাক্ষ্য-প্রমাণ সত্য হলে বিচারকের রায়ে পাওয়া হক গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ মিথ্যা হয়ে থাকলে এবং সে মিথ্যা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারক রায় দিয়ে থাকলে সে রায় বাদীর জন্য দাবিকৃত হক গ্রহণ করাকে বৈধ করেনা, বরং সেটি তার মালিকের মালিকানার অধীনেই থাকবে। একমাত্র ইমাম আবু হানিফা ব্যতীত আর কোনো ফকিহ্ এই মতের বিরোধিতা করেনি। ইমাম আবু হানিফা বলেন: বিচারকের রায় চুক্তিসমূহের বহাল থাকা ও বাতিল হওয়ার ব্যাপারে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সর্বতোভাবেই কার্যকর।
সুতরাং কোনো মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা যখন বিচারকের নিকট কোনো মহিলার তালাকের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়, অত:পর তদনুসারে বিচারক তালাকের পক্ষে রায় দেয়, তখন স্বামীর সাথে তার বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে এবং সে অন্য স্বামীর সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এমনকি যে ব্যক্তি তার তালাকের পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে তার সাথেও বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। অনুরূপ, কেউ যদি কোনো মহিলা সম্পর্কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় যে, সে অমুকের স্ত্রী, অথচ সে তার স্ত্রী নয়, অত:পর বিচারক এ সাক্ষ্য অনুযায়ী রায় দেয়, তাহলে এ রায় অনুযায়ী মহিলাটি তার জন্য বৈধ হবে। ইমাম আবু হানিফা অবশ্য চুক্তি বহাল থাকা বা বাতিল হওয়া সংক্রান্ত মামলায় এবং খুন ও সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলায় পার্থক্য করেছেন। কিন্তু সে পার্থক্য সঠিক নয়। কেননা এ দুধরনের মামলায় কোনো পার্থক্য নেই। এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফার শিষ্যগণ তাঁর মতের বিরোধিতা করেছেন।
📄 যে অনুপস্থিত ব্যক্তির কোনো প্রতিনিধি নেই তার সম্পর্কে বিচারকের রায়
যে ব্যক্তি অনুপস্থিত এবং তার কোনো প্রতিনিধিত্ব (উকিল) নেই, বাদী তার বিরুদ্ধে দাবি তুলতে তথা মামলা করতে পারেন। আর দাবি প্রমাণিত হলে বিচারক উক্ত অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায় দিতেও পারেন।
এর প্রথম প্রমাণ: সূরা সাদের ২৬ নং আয়াত: 'হে দাউদ, মানুষের মধ্যে সত্য অনুযায়ী ফায়সালা 'কর'। যেহেতু সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত জিনিস সত্য, তাই সে অনুযায়ী রায় দেয়া ওয়াজিব।
দ্বিতীয় প্রমাণ: আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ রসূলুল্লাহ্ (সা) কে জানালো যে, আবু সুফিয়ান কৃপণ মানুষ, তাই সে কি তার অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ থেকে কিছু নিতে পারে? রসূল (সা) তাকে বললেন: যতোটুকু নিলে তোমার ও তোমার সন্তানের জন্য যথেষ্ট হয়, ততোটুকু নিতে পার।' এটা একজন অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায়।
তৃতীয় প্রমাণ: ইমাম মালেক 'মুয়াত্তায় উল্লেখ করেন যে, উমর (রা) বলেছেন: 'যে ব্যক্তির কারো কাছে কিছু পাওনা আছে সে যেন আগামীকাল আমার কাছে আসে। আমি খাতকের সম্পত্তি বিক্রয় করবো এবং তা তার পাওনাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেব।' যে ব্যক্তির সম্পত্তি বিক্রয়ের ফায়সালা করা হয়েছিল সে অনুপস্থিত ছিলো।
চতুর্থ প্রমাণ: যেহেতু অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায় দানে বিচারক বিরত থাকলে হকদারের হক নষ্ট হবে, সেহেতু এ রূপ রায় দান অবৈধ নয়। আর অনুপস্থিত থাকার ওজুহাত কারো ঋণ পরিশোধ থেকে বিরত থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। এটাই ইমাম মালিক, শাফেয়ি ও আহমদের মত। তাঁরা বলেন: 'অনুপস্থিত ব্যক্তির কোনো হক নষ্ট করা হয়না। সে উপস্থিত হলে তার যুক্তি শোনা হয় এবং তদনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়, এমনকি তার ফলে রায়ও বাতিল হতে পারে। কেননা তার বক্তব্য শোনা শর্ত। বিচারপতি শুরাইহ, উমার ইবনে আব্দুল আযীয, ইবনে আবি লায়লা ও ইমাম আবু হানিফা বলেন: অনুপস্থিত ব্যক্তির কোনো প্রতিনিধির উপস্থিতি ব্যতীত বিচারক তার বিরুদ্ধে কোনো রায় দিতে পারেননা। কেননা তার কাছে এমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকতে পারে, যা বাদীর দাবি বাতিল করে দেয়। তাছাড়া ইতিপূর্বে এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ্ (সা) আলি (রা) কে বলেন: 'হে আলি, যখন বাদী ও বিবাদী তোমার সামনে বসবে, তখন উভয়ের বক্তব্য না শোনা পর্যন্ত কোনো রায় দেবেনা। উভয়ের বক্তব্য শুনলে তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে বিচারটা কেমন হওয়া উচিত।'
খাত্তাবি বলেন: কিছু সংখ্যক ফকিহ কতিপয় ব্যাপারে অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায় দানের পক্ষপাতী। তন্মধ্যে মৃত ব্যক্তি ও শিশু সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখযোগ্য। তারা আরো বলেন: যে ব্যক্তি তার সম্পদ কারো কাছে গচ্ছিত রেখে বিদেশে চলে যায়, তার স্ত্রী যখন খোরপোশ দাবি করবে এবং যার নিকট গচ্ছিত রেখেছে, তাকে হাজির করে, তখন বিচারক স্ত্রীর খোরপোশ দিতে বাধ্য করতে পারবে। তিনি আরো বলেন: শুফয়ার দাবিদার যখন অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচারকের নিকট শুফয়ার দাবি জানাবে এবং প্রমাণ দেবে যে, সে তার সম্পত্তি বিক্রয় করেছে ও মূল্য হস্তগত করেছে, তখন বিচারক তার শুফয়ার পক্ষে রায় দেবেন। এ সব রায়ই অনুপস্থিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায়।