📄 বিচারের শরয়ি পদ্ধতি
রসূলুল্লাহ্ (সা) মুয়ায (রা) কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বিচারকের কোন পন্থা অনুসরণ করা উচিত, তা জানিয়ে দিয়েছেন। মুযায়কে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: কিসের দ্বারা বিচার ফায়সালা করবে? মুয়ায বললেন: আল্লাহ্র কিতাব দ্বারা। তিনি বললেন: যদি সেখানে না পাও? মুয়ায বললেন: তাহলে রসূলের সুন্নাহ্ দ্বারা। রসূল (সা) আবার বললেন: সেখানেও যদি না পাও? তখন মুয়ায বললেন: তাহলে আমার নিজের বিবেক দ্বারা।
বিচারকের কর্তব্য হলো, সত্য খুঁজে বের করার জন্য সর্বাত্মক অনুসন্ধান এবং এমন যে কোনো জিনিস থেকে দূরে থাকা উচিত, যা চিন্তাধারাকে বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলো করতে পারে। এ জন্য প্রচন্ড ক্রুদ্ধ, ক্ষুধার্ত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ভীত, ঘুমে পাওয়া, গরমে অতিষ্ঠ, শীতে কাতর এবং মন এতটা চিন্তাভাবনায় মগ্ন থাকা অবস্থায় বিচার কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত, যা সত্য উদঘাটন ও সূক্ষ্ম উপলব্ধির পথে অন্তরায়।
বুখারি ও মুসলিমে আবু বাক্সা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: কোনো শাসক বা বিচারক কোনো দুই ব্যক্তির বিবাদ নিজে রাগান্বিত থাকা অবস্থায় মীমাংসা করবে না।
তবে কোনো বিচারক যদি এ সব অবস্থার কোনো একটিতে বিচার করেই বসেন, তা ন্যায়সংগত হলে অধিকাংশ আলেমের মতে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য হবে।
📄 মুতাহিদিল হওয়ার পথে
বিচারক সত্য অনুসন্ধান ও সঠিক সিদ্ধান্তের অন্বেষণে যতো চিন্তা-গবেষণা তথা ইজতিহাদ করবে, ততোই সওয়াব পাবে, চাই সে শেষ পর্যন্ত সত্যের সন্ধান না পাক। আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত, রসূল (সা) বলেন: শাসক বা বিচারক যখন ইজতিহাদ করে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয় তখন দুটো পুরস্কার, যখন ইজতিহাদ করে ও ভুল সিদ্ধান্ত নেয় তখন একটা পুরস্কার পাবে। (বুখারি ও মুসলিম)।
ইমাম খাত্তাবি বলেন: মুজতাহিদ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলেই সওয়াব পায়। কেননা তার ইজতিহাদ ইবাদত। ভুল সিদ্ধান্তে সওয়াব পায়না, শুধু গুনাহ থেকে মুক্তি পায়।
এ কথা সে ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যিনি ইজতিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত যোগ্যতা ও উপকরণের অধিকারী মূলনীতি সম্পর্কে অবহিত এবং কিয়াসে অভিজ্ঞ। কিন্তু যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখেন না, তথাপি ইজতিহাদ করেন, তিনি কৃত্রিম মুজতাহিদ। তিনি ইজতিহাদের মাধ্যমে ভুল রায় দিলে তাকে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না, বরং তার সবচেয়ে বড় গুনাহ হবার আশংকা রয়েছে। উম্মে সালমা (রা) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'আমি তো মানুষ মাত্র। তোমরা আমার কাছে দাবি ও পাল্টা দাবি নিয়ে আস। হয়তো তোমাদের একজন অপরজনের চেয়ে নিজের যুক্তি প্রদর্শনে বেশি বাকপটু। আমি তোমাদের কথার ভিত্তিতে বিচার মীমাংসা করে থাকি। কাজেই আমি যদি কাউকে তার ভাইয়ের অধিকার দিয়ে থাকি তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা আমি তো তার জন্য জাহান্নামের একটা টুকরো তৈরি করি। (অর্থাৎ অধিকতর বাকপটু লোকের কথায় প্রভাবিত হয়ে ভুল মীমাংসার মাধ্যমে একজনের হক অন্য জনকে দিয়ে থাকতে পারি।) -বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা।
আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'দুজন মহিলার সাথে তাদের দুটো ছেলে ছিলো। হঠাৎ বাঘ এসে তাদের একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। তখন এক মহিলা দ্বিতীয় মহিলাকে বললো: বাঘ তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। দ্বিতীয় মহিলা প্রথম মহিলাকে বললো: তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। অত:পর উভয়ে নিজেদের বিবাদ মীমাংসার জন্য দাউদ (আ) এর কাছে গেল। দাউদ (আ) অপেক্ষাকৃত বয়োজ্যোষ্ঠা মহিলার পক্ষে রায় দিলেন। এরপর তারা উভয়ে দাউদ (আ) এর পুত্র সুলায়মান (আ) এর কাছে গিয়ে তাকে দাউদ (আ) এর মীমাংসার কথা জানালো। সুলায়মান (আ) বললেন: আমাকে একটা ছুরি এনে দাও, ছেলেটাকে দ্বিখন্ডিত করে উভয়ের মধ্যে বণ্টন করে দেই। তৎক্ষণাৎ কনিষ্ঠা মহিলা বললো: এ কাজ করবেন না। ছেলেটি ঐ মহিলার। ওকে দিয়ে দিন।' সুলায়মান (আ) ছেলেটি কনিষ্ঠা মহিলাকেই দিলেন।
এ হচ্ছে সুলায়মান (আ) এর বিচক্ষণতা ও সুবিচার। তিনি এই কৌশলটি অবলম্বন করলেন প্রকৃত মা চিনবার উদ্দেশ্যে। তিনি যখনই বললেন, ছুরি নিয়ে এসো, ছেলেকে দ্বিখণ্ডিত করে দেই, তখনই প্রকৃত মায়ের দরদ উথলে উঠলো। সে কিছুতেই তাকে হত্যা করতে দিলনা বরং হত্যার পরিবর্তে তার কাছ থেকে দূরে থাকুক এবং বেঁচে থাকুক এটাকেই সে অগ্রাধিকার দিলো। এই প্রতিক্রিয়া থেকে সুলায়মান প্রমাণ পেলেন যে, এটা তারই ছেলে.
আল্লাহ্ তায়ালা সূরা আম্বিয়ার ৭৮ ও ৭৯ নং আয়াতে হযরত দাউদ ও সুলায়মান (আ) এর অন্য একটা বিচারের কাহিনী বর্ণনা করেছেন- (وَدَاوُدَ وَسُلَيْمٰنَ إِذْ يَحْكُمٰنِ فِى الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيْهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ هٰشِدِيْنَ فَفَهَمْنٰهَا سُلَيْمٰنَ وَكُلًّا اٰتَيْنَا حُكْمًا وَّعِلْمًا )
'স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তারা শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিচার করছিল। একটি সম্প্রদায়ের মেষপাল ঐ শস্যক্ষেতে রাত্রিকালে প্রবেশ করেছিল। আমি তাদের বিচার প্রত্যক্ষ করছিলাম। আমি সুলায়মানকে মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম।
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেন: মেষ পাল ক্ষেতে প্রবেশ করে শস্য নষ্ট করে ফেলেছিল। ফলে ক্ষেতের মালিক ঐ মেষের মালিকদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত বিবাদটি মীমাংসার্থে দাউদ (আ) এর নিকট নীত হলো। দাউদ (আ) ক্ষেতের মালিককে মেষগুলো দিয়ে দেয়ার পক্ষে রায় দিলেন।
এরপর বাদী বিবাদী দাউদ (আ) এর দরবার থেকে বেরিয়ে যেতেই তাদের সাথে সুলায়মানের সাক্ষাৎ হলো। সুলায়মান (আ) জিজ্ঞাসা করলেন: তোমাদের বিবাদের মীমাংসা কিভাবে করা হলো? তারা তাকে মীমাংসার কথা জানালো। তখন সুলায়মান (আ) বললেন: তোমাদের মামলাটা আমার কাছে এলে আমি উভয় পক্ষের জন্য অপেক্ষাকৃত নমনীয় হয় এমন মীমাংসা করতাম। এ কথা জানতে পেরে দাউদ (আ) তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কিভাবে বিচার করতে? সুলায়মান (আ) বললেন: ক্ষেতের মালিককে আপাতত মেষগুলো দিয়ে দিন সে এগুলোর দুধ, পশম, বাচ্চা ও অন্যান্য সেবা দ্বারা উপকৃত হতে থাকুক। এ সময় মেষের মালিক ক্ষেতের মালিকের জন্য তার ক্ষেত নিজের ক্ষেতের মতো চাষ করতে থাকুক। যখন ফসল সে দিনের মতো বড় হবে যেদিন মেষ ফসল খেয়েছিল, তখন ক্ষেতের মালিক ক্ষেতের দখল বুঝে নেবে ও মেষের মালিক তার মেষ নিয়ে যাবে।' এ কথা শুনে দাউদ (আ) বললেন: তোমার মীমাংসাই সঠিক। তিনি এই মীমাংসাকেই নিজের রায় হিসাবে ঘোষণা করলেন।
📄 বিচারকের করণীয়
পাঁচটি বিষয়ে বাদী ও বিবাদীর প্রতি সমান আচরণ করা বিচারকের কর্তব্য:
১. বিচারকের কাছে যেতে দেয়া।
২. বিচারকের সামনে আসন গ্রহণ করা।
৩. উভয়ের প্রতি বিচারকের মনোযোগ দেয়া।
৪. উভয়ের বক্তব্য শোনা।
৫. উভয়ের প্রতি ন্যায়বিচার করা।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, উভয়ের প্রতি সমান আচরণ করা বাহ্যিক কাজের বেলায়ই জরুরি। মনের টানের বেলায় নয়। দু'জনের একজনের প্রতি যদি তার মন ঝুকে পড়ে এবং যুক্তির মাধ্যমে সে প্রতিপক্ষের উপর জয়ী হোক এটা পছন্দ করে তাহলে তার কোনো গুনাহ হবে না। কেননা এটি থেকে নিবৃত্ত থাকা সম্ভব নয়। তবে দু'জনের কোনো একজনকে তার যুক্তিতর্ক শিখিয়ে দেয়া ও কোনো সাক্ষীকে সাক্ষ্য শিখিয়ে দেয়া তার জন্য অনুচিত। কেননা এতে বাদী বিবাদীর একজন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিচারক বাদীকে দাবি পেশ করা ও শপথ করাও শেখাবেনা, বিবাদীকে স্বীকার বা অস্বীকার করাও শেখাবেনা, সাক্ষীদেরকে সাক্ষ্য দিতে বা সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকতেও বলবেনা এবং বাদী বিবাদীর একজনকে বাদ দিয়ে অপর জনের মেহমানদারী করবেনা। কেননা এতে অপর জন মনে কষ্ট পাবে। বিচারক নিজেও বাদী ও বিবাদী বা তাদের কোন একজনের মেহমানদারী গ্রহণ করবেনা যতক্ষণ তারা পরস্পরের প্রতিপক্ষ থাকবে।
বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সা) বাদী ও বিবাদীর কোনো একজনকে তার প্রতিপক্ষ ব্যতিরেকে মেহমানদারী করতেন না এবং কোনো একজনের উপহার গ্রহণ করতেন না। তবে কোনো ব্যক্তি যদি বিচারককে বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে উপহার দিতে অভ্যস্ত থাকে, তাহলে তার উপহার নেয়া যাবে। যার এ ধরনের অভ্যাস নেই তার উপহার ঘুষ বিবেচিত হবে। বারিদা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'যাকে আমরা কোনো চাকরিতে নিয়োগ করি এবং তাকে তার বিনিময়ে কোনো জীবিকা দেই, সে এরপর যা গ্রহণ করবে, তা খিয়ানত।' (আবুদাউদ)
রসূল (সা) আরো বলেন: 'বিচার ও শাসন কার্যে যে ঘুষ খায় এবং দেয়, উভয়ের উপর আল্লাহ্র অভিশাপ।' খাত্তাবি বলেন: উভয়ের ক্ষেত্রে অভিশাপ সমভাবে প্রযোজ্য কেবল তখনই, যখন উভয়ে একইভাবে স্বেচ্ছায় ঘুষের লেনদেন করবে। ঘুষদাতা যখন অবৈধ উদ্দেশ্যে ও কারো উপর যুলুম করার মানসে ঘুষ দেবে, তখন সেও ঘুষগ্রহীতার মত অভিশপ্ত হবে। কিন্তু সে যদি ন্যায্য পাওনা পাওয়ার উদ্দেশ্যে বা নিজের উপর থেকে যুলুম প্রতিহত করার লক্ষ্যে ঘুষ দেয়, তাহলে সে এই হুমকির আওতাভুক্ত হবে না। বর্ণিত আছে যে, ইবনে মাসউদ (রা) আবিসিনিয়ায় থাকাকালে অন্যায়ভাবে যুদ্ধবন্দী হিসাবে গ্রেফতার হন। তখন তিনি দুই দিনার দিয়ে গ্রেফতারি থেকে অব্যাহতি পান। হাসান, শা'বি, জাবির ও আতা র. বলেন: কেউ যদি যুলুমের ভয়ে নিজের জান ও মাল রক্ষার্থে আপোস করে তবে তাতে কোনো গুনাহ্ নেই। অনুরূপ, ঘুষ গ্রহীতার উপর এই অভিশাপের হুমকি তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন সে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করবে এবং ঘুষ না দেয়া পর্যন্ত সে দায়িত্ব পালন করবেনা অথবা কোনো অবৈধ কাজ, যা তার বর্জন করা উচিত, কিন্তু তাকে ঘুষ নাদেয়া পর্যন্ত সে তা বর্জন করেনা। 'ফাল্গুল আল্লাম' গ্রন্থে বলা হয়েছে: বিচারকগণ যে অর্থ গ্রহণ করেন তা চার প্রকার: ঘুষ, উপহার, পারিশ্রমিক ও বেতন।
১. ঘুষ: এটা যদি এজন্য দেয়া হয় যে, দাতার জন্য বিচারক অন্যায়ভাবে বিচার করবে, তবে তা দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্য হারাম। আর যদি এজন্য দেয়া হয় যে, দাতার ন্যায্য প্রাপ্য বিচারক আদায় করে দেবে, তবে তা বিচারকের জন্য হারাম, দাতার জন্য নয়। কেননা এটা সে তার ন্যায্য পাওনা পাওয়ার উদ্দেশ্যে দিয়েছে। কারো কারো মতে, এটা দাতার জন্যও হারাম। কেননা এর কারণে বিচারক গুনাহে লিপ্ত হয়।
২. উপহার: যদি বিচারকের বিচারক পদে অভিষিক্ত হবার আগে থেকেই এটা দেয়া হয়ে থাকে তবে পদ পাওয়ার পরও চালু রাখা হারাম হবে না। আর যদি বিচারক পদে অভিষিক্ত হবার পরেই দেয়া শুরু হয়ে থাকে, তাহলে দেখতে হবে দাতার সাথে কারো বিবাদ বিচ্ছেদ আছে কিনা। যদি না থাকে তবে উপহার জায়েয, কিন্তু মাকরূহ। আর যদি বিবাদ থেকে থাকে তবে এই উপহার বিচারক ও উপহারদাতা উভয়ের জন্য হারাম।
৩. পারিশ্রমিক: বিচারককে যদি সরকারের পক্ষ থেকে বেতন বা ভাতা দেয়া হয়, তাহলে এটা সর্বসম্মতভাবে হারাম। কারণ বিচারকের চাকুরির বাবতেই তাকে বেতন-ভাতাদি দেয়া হয়। এমতাবস্থায় পারিশ্রমিক হিসাবে কিছু নেয়ার কোনো যুক্তি নেই। আর যদি তাকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বেতনভাতা না দেয়া হয়, তা হলে বিচারক ব্যতীত অন্য পদে কাজের পরিমাণ অনুপাতে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েয। এর চেয়ে বেশি নিলে হারাম হবে। বিচারক হিসাবে কোনো পারিশ্রমিক নেয়া সর্বসম্মতভাবে হারাম। এ জন্য বলা হয়েছে যে, ধনী ব্যক্তির চেয়ে দরিদ্র ব্যক্তিকে বিচারক নিয়োগ করা উত্তম। কেননা সরকারি বেতনভুক্ত না হলে যে জিনিস গ্রহণ করা তার জন্য জায়েয ছিলনা, দারিদ্র্যের কারণে তা জায়েয হবে। কথাগুলো শরিয়া আদালত বা ইসলামি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রযোজ্য। প্রচলিত আইন এবং বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অন্যায় যুগ্ম ও বাড়াবাড়ি। ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া ইসলামি আদালত এবং শরিয়াতভিত্তিক বিচার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই বিচ্ছিন্নভাবে ব্যভিচার, চুরির দায়ে কাউকে দণ্ডিত করা যাবে না। আগে সমাজ পরিবর্তন করতে হবে। তারপর ইসলামি দণ্ডবিধি প্রয়োগ করতে হবে।
📄 বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে উমর রা.-এর পত্র
আবু মূসা আশ্য়ারি (রা) এর নিকট লিখিত পত্রতে উমর (রা) বিচার কার্যের জন্য স্থায়ী মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পত্রটি নিম্নরূপ: 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম, আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব এরপক্ষ থেকে আব্দুল্লাহ্ ইবনে কায়িসের নিকট- তোমার উপর সালাম।
ন্যায়বিচার করা একটা অকাট্য ফরয ও আবহমান কাল থেকে অনুসৃত একটা সুন্নাত। বুঝে নাও, যখন কোনো বিচারকার্য তোমার উপর সোপর্দ করা হবে, তখন যে সত্য কার্যকর হবেনা, তা নিয়ে বাগাড়ম্বর করে কোনো লাভ নেই। তোমার সামনে অবস্থানে, তোমরা ন্যায়বিচারে ও তোমার মজলিসে সবার সাথে সমান আচরণ কর, যাতে কোনো অভিজাত ব্যক্তি তার প্রতি তোমার বিশেষ ঝোঁকের জন্য লালায়িত না হয় এবং কোনো দুর্বল তোমার সুবিচার থেকে হতাশ না হয়। বাদীর কর্তব্য হলো তার দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা আর যে অস্বীকার করে তার কর্তব্য কসম খাওয়া। কেবল হারামকে হালাল ও হালালকে হারামে পরিণত করে এমন আপোস ছাড়া মুসলমানদের মধ্যে আপোস মীমাংসা জায়েয। আজ তুমি যে রায় ঘোষণা করেছ, তা তুমি পুনর্বিবেচনা করে যেটি সত্য ও সঠিক মনে কর তার দিকে ফিরে যেতে পার। কেননা সত্য চিরন্তন এবং সত্যের দিকে ফিরে যাওয়া বাতিলকে আঁকড়ে ধরে থাকার চেয়ে ভাল। যে বিষয় কুরআন ও সুন্নাহতে নেই, তা নিয়ে যদি দ্বিধা দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাক, তাহলে বিষয়টি পুন:পুন: উপলদ্ধি করতে চেষ্টা কর। নজিরসমূহ জেনে নাও অত:পর তার সাথে নতুন বিষয়ের তুলনা কর। যেটি আল্লাহর নিকটতম ও সত্যের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা অন্বেষণ কর। যে ব্যক্তি কোনো প্রাপ্য দাবি করে ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করতে চায়, তার জন্য একটা সর্বশেষ মেয়াদ বেঁধে দাও। সে মেয়াদের মধ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ আনতে পারলে তার প্রাপ্য দিয়ে দাও। নচেৎ তার দাবি রহিত কর। কেননা সন্দেহ মোচনে এটাই অধিকতর কার্যকর পন্থা। মুসলমানরা পরস্পরের জন্য সাক্ষী হওয়ার যোগ্য কেবল ব্যভিচারী হিসাবে, বেত্রদন্ড ভোগ করেছে, মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে কিংবা বংশগত বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযুক্ত হয়েছে এমন ব্যক্তি ব্যতীত। আল্লাহ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও শপথ দ্বারা তোমাদের গোপনীয়তা সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। বিবাদ-বিচ্ছেদের সময় প্রতিপক্ষের দ্বারা কষ্ট পেয়ে ধৈর্যহারা, দিশেহারা হবে না। কেননা সত্য সত্যের স্থানেই থাকে এবং দুঃখ কষ্ট দ্বারা আল্লাহ্ সওয়াব ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। যার নিয়ত সৎ এবং যে আত্মসংযমে অভ্যস্ত, আল্লাহ্ ও মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। যে ব্যক্তি কৃত্রিমভাবে মানুষের সাথে এমন আচরণ করবে যা তার নিয়তের পরিপন্থী এবং যা সম্পর্কে আল্লাহ্ জানেন যে, ওটা তার স্বত:স্ফূর্ত আচরণ নয়, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করবেন। সুতরাং আল্লাহ্ ত্বরিত জীবিকা ও তাঁর রহমতের ভান্ডার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? এটা কি আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ তোমাকে দিতে পারে?