📄 বিচারকের যোগ্যতা
বিচারকের দায়িত্ব একমাত্র এমন ব্যক্তিই পালন করতে পারে, যে কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাপারে পারদর্শী, আল্লাহ্ দীন সম্পর্কে সূক্ষ্ম ও বিশদ জ্ঞানের অধিকারী, ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য করতে সক্ষম এবং অবিচার করার মনোভাব থেকে মুক্ত ও প্রবৃত্তিকে সংযত রাখতে সক্ষম। ফকিহগণ বিচারকের জন্য ইজতিহাদের ক্ষমতা অর্জনের শর্ত আরোপ করেছেন। এজন্য বিশেষভাবে তাকে আহকাম (আইন ও বিধি) সংবলিত আয়াত ও হাদিসসমূহ জানা, প্রাচীন ফকিহগণের মতামত, কিসে কিসে তারা একমত ও কিসে কিসে দ্বিমত পোষণ করেবেন তা জানা, অভিধান ও কিয়াস সম্পর্কে দক্ষতা এবং প্রাপ্তবয়স্ক, ভারসাম্যপূর্ণ, সৎ, উত্তম শ্রোতা, উত্তম দ্রষ্টা, উত্তম বক্তা এবং পুরুষ হওয়ার শর্ত আরোপ করেছেন। (ইমাম শায়েফি ও ইমাম মালেকের মতে বিচারকের মুস্তাহিদ হওয়া শর্ত। ইমাম আবু হানিফার মতে মুজতাহিদ হওয়া শর্ত নয়।)
প্রকৃতপক্ষে এ শর্তগুলো যতটা সম্ভব পূরণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এগুলো যার ভেতরে বেশি পাওয়া যাবে তাকে নিয়োগ দেয়া জরুরি। অন্ধ অনুসারী, অমুসলিম, অপ্রাপ্তবয়স্ক, পাগল, ফাসেক ও মহিলা বিচারক পদের যোগ্য নয়। আবু বকরা (রা) বর্ণনা করেন: পারস্যবাসী পারস্য সম্রাটের কন্যাকে সম্রাজ্ঞী বানিয়েছে, এ মর্মে সংবাদ পেলে আল্লাহ্ নবি বললেন: 'এমন জাতি কখনো সফলকাম হয়না, যারা কোনো নারিকে তাদের শাসকভার অর্পণ করে।' -বুখারি, নাসায়ি, তিরমিযি, আহমদ।
ইমাম আবু হানিফার মতে মহিলা আর্থিক বিষয়ের বিচারক হতে পারে। ইমাম তাবারী বলেন: মহিলা সকল ব্যাপারেই বিচারক হতে পারে। 'নাইলুল আওতার' গ্রন্থে ফাতহুল বারীর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে: হানাফীগণ ব্যতীত আর সকলে বিচারকের জন্য পুরুষ হওয়ার শর্ত আরোপ করেছেন। তবে শরিয়তের 'হুদুদে' (দন্ডবিধিতে) মহিলার বিচারক হওয়া হানাফিদের মতেও জায়েয নয়। অধিকাংশ ফকিহ্ বলেন, বিচারকের জন্য বুদ্ধির পরিপক্কতা প্রয়োজন। অথচ নারীর বুদ্ধি অপরিপক্ক। বিশেষত যেখানে পুরুষরাও কর্মরত রয়েছে। এসব শর্তের পাশাপাশি ফকিহগণ এ শর্তও আরোপ করেছেন যে, বিচারক সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া জরুরি। এটা তার বিচারের বৈধতার শর্ত। পক্ষান্তরে বাদী বিবাদীদ্বয় নিজেরা যদি স্বেচ্ছায় কাউকে তাদের বিরোধ মীমাংসার জন্য শালিশ নিয়োগে সম্মত হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে এটা শর্ত নয়। সে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক না হলেও ইমাম মালিক ও আহমদের মতে বিচার করতে পারবে। কিন্তু ইমাম আবু হানিফার মতে তার রায় যদি দেশের সরকারি বিচারকের রায়ের সাথে সংগতিপূর্ণ হয়, তাহলে তার বিচার বৈধ হবে, অন্যথায় নয়।
ইমাম আহমদ ও ইমাম মালিকের মতানুসারে, বাদী-বিবাদীর, মনোনীত বিচারক যখন রায় দেবে, তখন তার রায় মেনে নেয়া তাদের উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক হবে। তার রায়ে তাদের সম্মতি বিবেচ্য নয়। ঐ বিচারকের রায় বাতিল করা সরকারের জন্যও বৈধ নয়। এ ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ী থেকে দুটো মত বর্ণিত আছে: একটি মত হলো, তার রায় উভয়কে মানতেই হবে। অপরটি হলো, তাদের পছন্দমত না হলে মানা জরুরি নয়। ফতোয়ার ন্যায় ইচ্ছা হলে মানবে, না হয় মানবে না। বাদী বিবাদীর সম্মতিক্রমে এই শালিশ নিয়োগ কেবল আর্থিক বিরোধ মীমাংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। হুদুদ, বিয়ে, ও লিয়ানে শালিশ সর্বসম্মতভাবে অবৈধ।
📄 অযোগ্য বিচারকের বিচার
আলেমগণ বলেন: যে ব্যক্তি বিচারের যোগ্য নয়, তার বিচার করা অবৈধ। তথাপি বিচার করলে সে পাপী হবে এবং তার রায় কার্যকর হবে না, চাই তা সত্য ও ন্যায়ের সাথে সংগতিপূর্ণ হোক বা না হোক। কেননা যদি তা ন্যায়সংগত হয়ও, তবে তা নেহায়ত কাকতালীয় ব্যাপার। সে বিচার শরিয়ত সম্মত নীতিমালা থেকে উৎসারিত হয়নি। এ ধরনের বিচারক তার সকল রায়ে গুনাহগার, চাই তা ন্যায়সংগত হোক বা নাহোক। তার সকল রায় বাতিল। তার কোনো ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
📄 বিচারের শরয়ি পদ্ধতি
রসূলুল্লাহ্ (সা) মুয়ায (রা) কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বিচারকের কোন পন্থা অনুসরণ করা উচিত, তা জানিয়ে দিয়েছেন। মুযায়কে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: কিসের দ্বারা বিচার ফায়সালা করবে? মুয়ায বললেন: আল্লাহ্র কিতাব দ্বারা। তিনি বললেন: যদি সেখানে না পাও? মুয়ায বললেন: তাহলে রসূলের সুন্নাহ্ দ্বারা। রসূল (সা) আবার বললেন: সেখানেও যদি না পাও? তখন মুয়ায বললেন: তাহলে আমার নিজের বিবেক দ্বারা।
বিচারকের কর্তব্য হলো, সত্য খুঁজে বের করার জন্য সর্বাত্মক অনুসন্ধান এবং এমন যে কোনো জিনিস থেকে দূরে থাকা উচিত, যা চিন্তাধারাকে বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলো করতে পারে। এ জন্য প্রচন্ড ক্রুদ্ধ, ক্ষুধার্ত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ভীত, ঘুমে পাওয়া, গরমে অতিষ্ঠ, শীতে কাতর এবং মন এতটা চিন্তাভাবনায় মগ্ন থাকা অবস্থায় বিচার কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত, যা সত্য উদঘাটন ও সূক্ষ্ম উপলব্ধির পথে অন্তরায়।
বুখারি ও মুসলিমে আবু বাক্সা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: কোনো শাসক বা বিচারক কোনো দুই ব্যক্তির বিবাদ নিজে রাগান্বিত থাকা অবস্থায় মীমাংসা করবে না।
তবে কোনো বিচারক যদি এ সব অবস্থার কোনো একটিতে বিচার করেই বসেন, তা ন্যায়সংগত হলে অধিকাংশ আলেমের মতে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য হবে।
📄 মুতাহিদিল হওয়ার পথে
বিচারক সত্য অনুসন্ধান ও সঠিক সিদ্ধান্তের অন্বেষণে যতো চিন্তা-গবেষণা তথা ইজতিহাদ করবে, ততোই সওয়াব পাবে, চাই সে শেষ পর্যন্ত সত্যের সন্ধান না পাক। আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত, রসূল (সা) বলেন: শাসক বা বিচারক যখন ইজতিহাদ করে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয় তখন দুটো পুরস্কার, যখন ইজতিহাদ করে ও ভুল সিদ্ধান্ত নেয় তখন একটা পুরস্কার পাবে। (বুখারি ও মুসলিম)।
ইমাম খাত্তাবি বলেন: মুজতাহিদ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলেই সওয়াব পায়। কেননা তার ইজতিহাদ ইবাদত। ভুল সিদ্ধান্তে সওয়াব পায়না, শুধু গুনাহ থেকে মুক্তি পায়।
এ কথা সে ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যিনি ইজতিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত যোগ্যতা ও উপকরণের অধিকারী মূলনীতি সম্পর্কে অবহিত এবং কিয়াসে অভিজ্ঞ। কিন্তু যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখেন না, তথাপি ইজতিহাদ করেন, তিনি কৃত্রিম মুজতাহিদ। তিনি ইজতিহাদের মাধ্যমে ভুল রায় দিলে তাকে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না, বরং তার সবচেয়ে বড় গুনাহ হবার আশংকা রয়েছে। উম্মে সালমা (রা) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'আমি তো মানুষ মাত্র। তোমরা আমার কাছে দাবি ও পাল্টা দাবি নিয়ে আস। হয়তো তোমাদের একজন অপরজনের চেয়ে নিজের যুক্তি প্রদর্শনে বেশি বাকপটু। আমি তোমাদের কথার ভিত্তিতে বিচার মীমাংসা করে থাকি। কাজেই আমি যদি কাউকে তার ভাইয়ের অধিকার দিয়ে থাকি তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা আমি তো তার জন্য জাহান্নামের একটা টুকরো তৈরি করি। (অর্থাৎ অধিকতর বাকপটু লোকের কথায় প্রভাবিত হয়ে ভুল মীমাংসার মাধ্যমে একজনের হক অন্য জনকে দিয়ে থাকতে পারি।) -বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা।
আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'দুজন মহিলার সাথে তাদের দুটো ছেলে ছিলো। হঠাৎ বাঘ এসে তাদের একজনের ছেলেকে নিয়ে গেল। তখন এক মহিলা দ্বিতীয় মহিলাকে বললো: বাঘ তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। দ্বিতীয় মহিলা প্রথম মহিলাকে বললো: তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে। অত:পর উভয়ে নিজেদের বিবাদ মীমাংসার জন্য দাউদ (আ) এর কাছে গেল। দাউদ (আ) অপেক্ষাকৃত বয়োজ্যোষ্ঠা মহিলার পক্ষে রায় দিলেন। এরপর তারা উভয়ে দাউদ (আ) এর পুত্র সুলায়মান (আ) এর কাছে গিয়ে তাকে দাউদ (আ) এর মীমাংসার কথা জানালো। সুলায়মান (আ) বললেন: আমাকে একটা ছুরি এনে দাও, ছেলেটাকে দ্বিখন্ডিত করে উভয়ের মধ্যে বণ্টন করে দেই। তৎক্ষণাৎ কনিষ্ঠা মহিলা বললো: এ কাজ করবেন না। ছেলেটি ঐ মহিলার। ওকে দিয়ে দিন।' সুলায়মান (আ) ছেলেটি কনিষ্ঠা মহিলাকেই দিলেন।
এ হচ্ছে সুলায়মান (আ) এর বিচক্ষণতা ও সুবিচার। তিনি এই কৌশলটি অবলম্বন করলেন প্রকৃত মা চিনবার উদ্দেশ্যে। তিনি যখনই বললেন, ছুরি নিয়ে এসো, ছেলেকে দ্বিখণ্ডিত করে দেই, তখনই প্রকৃত মায়ের দরদ উথলে উঠলো। সে কিছুতেই তাকে হত্যা করতে দিলনা বরং হত্যার পরিবর্তে তার কাছ থেকে দূরে থাকুক এবং বেঁচে থাকুক এটাকেই সে অগ্রাধিকার দিলো। এই প্রতিক্রিয়া থেকে সুলায়মান প্রমাণ পেলেন যে, এটা তারই ছেলে.
আল্লাহ্ তায়ালা সূরা আম্বিয়ার ৭৮ ও ৭৯ নং আয়াতে হযরত দাউদ ও সুলায়মান (আ) এর অন্য একটা বিচারের কাহিনী বর্ণনা করেছেন- (وَدَاوُدَ وَسُلَيْمٰنَ إِذْ يَحْكُمٰنِ فِى الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيْهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ هٰشِدِيْنَ فَفَهَمْنٰهَا سُلَيْمٰنَ وَكُلًّا اٰتَيْنَا حُكْمًا وَّعِلْمًا )
'স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তারা শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিচার করছিল। একটি সম্প্রদায়ের মেষপাল ঐ শস্যক্ষেতে রাত্রিকালে প্রবেশ করেছিল। আমি তাদের বিচার প্রত্যক্ষ করছিলাম। আমি সুলায়মানকে মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম।
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেন: মেষ পাল ক্ষেতে প্রবেশ করে শস্য নষ্ট করে ফেলেছিল। ফলে ক্ষেতের মালিক ঐ মেষের মালিকদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত বিবাদটি মীমাংসার্থে দাউদ (আ) এর নিকট নীত হলো। দাউদ (আ) ক্ষেতের মালিককে মেষগুলো দিয়ে দেয়ার পক্ষে রায় দিলেন।
এরপর বাদী বিবাদী দাউদ (আ) এর দরবার থেকে বেরিয়ে যেতেই তাদের সাথে সুলায়মানের সাক্ষাৎ হলো। সুলায়মান (আ) জিজ্ঞাসা করলেন: তোমাদের বিবাদের মীমাংসা কিভাবে করা হলো? তারা তাকে মীমাংসার কথা জানালো। তখন সুলায়মান (আ) বললেন: তোমাদের মামলাটা আমার কাছে এলে আমি উভয় পক্ষের জন্য অপেক্ষাকৃত নমনীয় হয় এমন মীমাংসা করতাম। এ কথা জানতে পেরে দাউদ (আ) তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কিভাবে বিচার করতে? সুলায়মান (আ) বললেন: ক্ষেতের মালিককে আপাতত মেষগুলো দিয়ে দিন সে এগুলোর দুধ, পশম, বাচ্চা ও অন্যান্য সেবা দ্বারা উপকৃত হতে থাকুক। এ সময় মেষের মালিক ক্ষেতের মালিকের জন্য তার ক্ষেত নিজের ক্ষেতের মতো চাষ করতে থাকুক। যখন ফসল সে দিনের মতো বড় হবে যেদিন মেষ ফসল খেয়েছিল, তখন ক্ষেতের মালিক ক্ষেতের দখল বুঝে নেবে ও মেষের মালিক তার মেষ নিয়ে যাবে।' এ কথা শুনে দাউদ (আ) বললেন: তোমার মীমাংসাই সঠিক। তিনি এই মীমাংসাকেই নিজের রায় হিসাবে ঘোষণা করলেন।