📄 কিসে কিসে বিচার ফয়সালা করা হবে
যাবতীয় অধিকারের বিষয়েই বিচার-ফায়সালার প্রয়োজন হয়ে থাকে, চাই তা আল্লাহর অধিকার হোক বা মানুষের অধিকার। ইবনে খালদুন বলেন: 'বিচারপতি পদটির সর্বশেষ রূপ দাঁড়িয়েছে এরকম যে, বাদী বিবাদীদের বিবাদ মীমাংসার পাশাপাশি জনগণের কিছু সাধারণ অধিকার ফিরিয়ে দেয়াও এর আওতাভুক্ত হয়েছে, সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীসমূহের যথা পাগল, ইয়াতিম, হতদরিদ্র ও নির্বোধদের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণ, মুসলমানদের ওসিয়ত ও ওয়াক্ফ সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, অভিভাবকহীনা অবিবাহিতা যুবতীদের বিয়ে দেয়া, রাস্তাঘাট ও ভবনসমূহের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, সাক্ষীগণ সাধকগণ ও জনপ্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণ, তাদেরকে সুবিচার সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিতরণ, যাতে তাদের উপর বিচারকের আস্থা সৃষ্টি হয়। এসবই বিচারকের দায়িত্বের সাথে সম্পৃক্ত।'
📄 ন্যায়বিচারের মর্যাদা
দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার প্রতিহত করা ও পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ মীমাংসা করার লক্ষ্যে ন্যায়বিচার করা ফরযে কেফায়া। জনগণের জন্য বিচারক নিয়োগ করা শাসকের দায়িত্ব। যোগ্য ব্যক্তি এ দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলে শাসক তাকে দায়িত্ব গ্রহণে বলপ্রয়োগ করতে পারবে। কোনো ব্যক্তি যখন এমন কোনো ক্ষেত্রে অবস্থান করে, যেখানে সে ছাড়া আর কেউ বিচারক হওয়ার যোগ্য নেই, তখন তার জন্য এ দায়িত্ব গ্রহণ করা ওয়াজিব। ইসলাম সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে বিচার ফায়সালা করতে উৎসাহিত করেছে এবং একে একটা মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইমাম বুখারি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'একমাত্র দুই ব্যক্তিই ঈর্ষার পাত্র: যাকে আল্লাহ্ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা দান করেছেন এবং সে তা কাজে লাগিয়ে মানুষের বিবাদ মীমাংসা করে ও মানুষকে তা শেখায়। আর যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং তাকে তা সৎপথে ব্যয় করার ক্ষমতা দান করেছেন।' ইসলাম ন্যায়বিচারকের জন্য বেহেস্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'যে ব্যক্তি মুসলমানদের বিচারকের দায়িত্ব কামনা করে তা লাভ করে, অত:পর তার অবিচারের চেয়ে সুবিচার বেশি হয়, তার জন্য বেহেশত। আর যার সুবিচারের চেয়ে অবিচার বেশি হয় তার জন্য জাহান্নাম।' (আবু দাউদ)। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবি আওফা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'বিচারক যতোক্ষণ সুবিচার করে ততোক্ষণ আল্লাহ্ তার সাথে থাকেন। যখন সে অবিচার করে তখন আল্লাহ তার সংগ ছেড়ে যান এবং শয়তান তার সাথী হয়।' (ইবনে মাজা, তিরমিযি)।
তবে কিছু সংখ্যক হাদিসে যে বিচারকের পদ গ্রহণ করতে সতর্ক করা হয়েছে, তা শুধু সে সব ব্যক্তির বেলায় প্রযোজ্য, যারা এ কাজের পূর্ণ যোগ্যতা, দক্ষতা ও এর জন্য প্রয়োজনীয় সৎসাহস, নি:স্বার্থপরতা ও আত্মসংযমের গুণাবলীতে সজ্জিত নয়। যেমন রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'যে ব্যক্তি বিচারকের পদ লাভ করেছে সে বিনা ছুরিতেই জবাই হয়েছে।' -আবু দাউদ, তিরমিযি।
ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, আবু যর (রা) বলেন: হে রসূলুল্লাহ্ আপনি কি আমাকে কাজে লাগাবেন না।
📄 বিচারকের যোগ্যতা
বিচারকের দায়িত্ব একমাত্র এমন ব্যক্তিই পালন করতে পারে, যে কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাপারে পারদর্শী, আল্লাহ্ দীন সম্পর্কে সূক্ষ্ম ও বিশদ জ্ঞানের অধিকারী, ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য করতে সক্ষম এবং অবিচার করার মনোভাব থেকে মুক্ত ও প্রবৃত্তিকে সংযত রাখতে সক্ষম। ফকিহগণ বিচারকের জন্য ইজতিহাদের ক্ষমতা অর্জনের শর্ত আরোপ করেছেন। এজন্য বিশেষভাবে তাকে আহকাম (আইন ও বিধি) সংবলিত আয়াত ও হাদিসসমূহ জানা, প্রাচীন ফকিহগণের মতামত, কিসে কিসে তারা একমত ও কিসে কিসে দ্বিমত পোষণ করেবেন তা জানা, অভিধান ও কিয়াস সম্পর্কে দক্ষতা এবং প্রাপ্তবয়স্ক, ভারসাম্যপূর্ণ, সৎ, উত্তম শ্রোতা, উত্তম দ্রষ্টা, উত্তম বক্তা এবং পুরুষ হওয়ার শর্ত আরোপ করেছেন। (ইমাম শায়েফি ও ইমাম মালেকের মতে বিচারকের মুস্তাহিদ হওয়া শর্ত। ইমাম আবু হানিফার মতে মুজতাহিদ হওয়া শর্ত নয়।)
প্রকৃতপক্ষে এ শর্তগুলো যতটা সম্ভব পূরণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এগুলো যার ভেতরে বেশি পাওয়া যাবে তাকে নিয়োগ দেয়া জরুরি। অন্ধ অনুসারী, অমুসলিম, অপ্রাপ্তবয়স্ক, পাগল, ফাসেক ও মহিলা বিচারক পদের যোগ্য নয়। আবু বকরা (রা) বর্ণনা করেন: পারস্যবাসী পারস্য সম্রাটের কন্যাকে সম্রাজ্ঞী বানিয়েছে, এ মর্মে সংবাদ পেলে আল্লাহ্ নবি বললেন: 'এমন জাতি কখনো সফলকাম হয়না, যারা কোনো নারিকে তাদের শাসকভার অর্পণ করে।' -বুখারি, নাসায়ি, তিরমিযি, আহমদ।
ইমাম আবু হানিফার মতে মহিলা আর্থিক বিষয়ের বিচারক হতে পারে। ইমাম তাবারী বলেন: মহিলা সকল ব্যাপারেই বিচারক হতে পারে। 'নাইলুল আওতার' গ্রন্থে ফাতহুল বারীর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে: হানাফীগণ ব্যতীত আর সকলে বিচারকের জন্য পুরুষ হওয়ার শর্ত আরোপ করেছেন। তবে শরিয়তের 'হুদুদে' (দন্ডবিধিতে) মহিলার বিচারক হওয়া হানাফিদের মতেও জায়েয নয়। অধিকাংশ ফকিহ্ বলেন, বিচারকের জন্য বুদ্ধির পরিপক্কতা প্রয়োজন। অথচ নারীর বুদ্ধি অপরিপক্ক। বিশেষত যেখানে পুরুষরাও কর্মরত রয়েছে। এসব শর্তের পাশাপাশি ফকিহগণ এ শর্তও আরোপ করেছেন যে, বিচারক সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া জরুরি। এটা তার বিচারের বৈধতার শর্ত। পক্ষান্তরে বাদী বিবাদীদ্বয় নিজেরা যদি স্বেচ্ছায় কাউকে তাদের বিরোধ মীমাংসার জন্য শালিশ নিয়োগে সম্মত হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে এটা শর্ত নয়। সে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক না হলেও ইমাম মালিক ও আহমদের মতে বিচার করতে পারবে। কিন্তু ইমাম আবু হানিফার মতে তার রায় যদি দেশের সরকারি বিচারকের রায়ের সাথে সংগতিপূর্ণ হয়, তাহলে তার বিচার বৈধ হবে, অন্যথায় নয়।
ইমাম আহমদ ও ইমাম মালিকের মতানুসারে, বাদী-বিবাদীর, মনোনীত বিচারক যখন রায় দেবে, তখন তার রায় মেনে নেয়া তাদের উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক হবে। তার রায়ে তাদের সম্মতি বিবেচ্য নয়। ঐ বিচারকের রায় বাতিল করা সরকারের জন্যও বৈধ নয়। এ ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ী থেকে দুটো মত বর্ণিত আছে: একটি মত হলো, তার রায় উভয়কে মানতেই হবে। অপরটি হলো, তাদের পছন্দমত না হলে মানা জরুরি নয়। ফতোয়ার ন্যায় ইচ্ছা হলে মানবে, না হয় মানবে না। বাদী বিবাদীর সম্মতিক্রমে এই শালিশ নিয়োগ কেবল আর্থিক বিরোধ মীমাংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। হুদুদ, বিয়ে, ও লিয়ানে শালিশ সর্বসম্মতভাবে অবৈধ।
📄 অযোগ্য বিচারকের বিচার
আলেমগণ বলেন: যে ব্যক্তি বিচারের যোগ্য নয়, তার বিচার করা অবৈধ। তথাপি বিচার করলে সে পাপী হবে এবং তার রায় কার্যকর হবে না, চাই তা সত্য ও ন্যায়ের সাথে সংগতিপূর্ণ হোক বা না হোক। কেননা যদি তা ন্যায়সংগত হয়ও, তবে তা নেহায়ত কাকতালীয় ব্যাপার। সে বিচার শরিয়ত সম্মত নীতিমালা থেকে উৎসারিত হয়নি। এ ধরনের বিচারক তার সকল রায়ে গুনাহগার, চাই তা ন্যায়সংগত হোক বা নাহোক। তার সকল রায় বাতিল। তার কোনো ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়।