📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 আল্লাহর সকল নবী রাসূলদের প্রধান উদ্দেশ্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা

📄 আল্লাহর সকল নবী রাসূলদের প্রধান উদ্দেশ্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা


ন্যায় বিচার যে ইসলামের সুমহান মূল্যবোধগুলোর অন্যতম, তাতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। কেননা সত্য, ন্যায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠাই জগতে স্বস্তি, শান্তি ও নিরাপত্তার বিস্তার ঘটায়, জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ়তর করে। শাসক ও শাসিতের মধ্যে আস্থা জোরদার করে। সম্পদ, সুখ ও সমৃদ্ধি বাড়ায় এবং পরিস্থিতি ও পরিবেশকে মজবুত ও কলুষমুক্ত করে। এর ফলে সমাজ অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও সংঘাত থেকে মুক্ত হয়। শাসক ও শাসিত উভয়ে কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী ও দেশ সেবায় ব্রতী হয় এবং কর্মের পরিবেশ বিঘ্নিত করে বা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এমন উপসর্গগুলো দেশ ও জাতির অগ্রগথিকে স্তব্ধ করতে পারে না।
ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত ও বাস্তবায়িত হয়, যখন প্রত্যেক সৃষ্টি তার যথালোগ্য অধিকার ফিরে পায়। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী দেশ শাসিত হয় এবং মানব সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রবৃত্তিপূজা নির্মূল করা হয়।
আর এ কাজটার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ সম্পাদন ও বাস্তবায়নই ছিলো আল্লাহর রসূলগণের পৃথিবীতে আগমনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। আর এই কাজ অব্যাহত রাখাই রসূলগণের অনুসরণের একমাত্র পথ ও পন্থা, যাতে নবুয়ত চিরদিন মানবজাতিকে তার সুখময় ছায়ার তলে আশ্রয় দিতে পারে। আল্লাহ্ বলেন:
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَسِ والزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَب وَالْمِيزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسِ بِالْقِسْطِنِ 'আমি আমার রসূলগণকে স্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সংগে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। (সূরা হাদিদ ২৪)।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইসলামের বিচার ব্যবস্থা

📄 ইসলামের বিচার ব্যবস্থা


ইসলামের পরিভাষায় বিচার হচ্ছে জনগণের পারস্পরিক বিরোধ ও বিবাদ-বিসংবাদ আল্লাহ্র প্রবর্তিত আইন ও বিধান অনুযায়ী মীমাংসা করা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অধিকারসমূহের সুরক্ষা এবং জান, মাল ও মানসম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো, সেই বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন, যা আল্লাহ্ প্রবর্তন করেছেন, তার অন্যতম শিক্ষায় পরিণত করেছেন এবং যাকে তার সর্বাধিক প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ মৌল বিধান হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইসলামে এই মহান দায়িত্ব সর্ব প্রথম যিনি পালন করেছেন, তিনি হচ্ছেন স্বয়ং রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হিজরতের পর মুসলমান ও ইহুদি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়, তাতে লেখা ছিলো: 'এই চুক্তি সম্পদানকারীদের মধ্যে এমন যে কোনো ঘটনা বা বিবাদ ঘটুক, যার ফলে সমাজে অশান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টির আশংকা রয়েছে, তা মহান আল্লাহ্ ও আল্লাহর রসূল মুহাম্মদের (সা) নিকট নিয়ে যাওয়া হবে।'
আল্লাহ্ যা কিছু ওহির মাধ্যমে নাযিল করেছেন, তদনুসারে বিচার-ফায়সালা করতে তাঁর রসূলকে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرْكَ اللهُ طَ وَلَا تَكُنْ لِلْغَالِنِينَ عَصِيمًا واسْتَغْفِرِ الله ط إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا . 'তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি যাতে তুমি আল্লাহ্ তোমাকে যা জানিয়েছেন সেই অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা কর এবং বিশ্বাস ভঙ্গকারীদের সমর্থনে তর্ক করোনা, আর আল্লাহ্ ক্ষমা প্রার্থনা কর, আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (নিসা ১০৫, ১০৬, ১০৭ থেকে ১১৩ পর্যন্ত আয়াত দেখুন) রসূলুল্লাহ্ (সা) এর জীবদ্দশায় মক্কার বিচার ব্যবস্থার দায়িত্বে আত্তাব ইবনে উসাইদ এবং ইয়ামানের বিচার ব্যবস্থার দায়িত্বে আলি (রা) ছিলেন। আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি, ইবনে মাজা প্রমুখ বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন আলি (রা) কে ইয়ামানে বিচারক হিসেবে পাঠালেন, তখন আলি (রা) বললেন: 'হে রসূলুল্লাহ্ (সা) আপনি ইয়ামানবাসীর কাছে পাঠাচ্ছেন, অথচ আমি একজন যুবক মাত্র, বিচার কি জিনিস তা জানি না। আলি (রা) বলেন: তৎক্ষণাৎ রসূলুল্লাহ্ (সা) আমার বুক থাপড়ালেন এবং বললেন: হে আল্লাহ্, একে সঠিক পথ দেখাও এবং এর জিহ্বাকে সংযত ও দৃঢ় কর।' আলি (রা) বলেন: মহান আল্লাহ্র কসম, এরপর আমি দুই ব্যক্তির বিবাদ মিটাতে কখনো সন্দেহে পতিত হইনি।'
আলি (রা) বলেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'হে আলি, যখন তোমার সামনে দু'জন বিচার প্রার্থী বসবে, তখন একজনের বক্তব্য যেমন শুনেছ, তেমনি অপর জনের বক্তব্য না শুনা পর্যন্ত তাদের মধ্যে কোনো ফায়সালা করবে না। উভয়ের বক্তব্য শুনলে সুবিচার কিভাবে করা যায় তোমার নিকট তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কিসে কিসে বিচার ফয়সালা করা হবে

📄 কিসে কিসে বিচার ফয়সালা করা হবে


যাবতীয় অধিকারের বিষয়েই বিচার-ফায়সালার প্রয়োজন হয়ে থাকে, চাই তা আল্লাহর অধিকার হোক বা মানুষের অধিকার। ইবনে খালদুন বলেন: 'বিচারপতি পদটির সর্বশেষ রূপ দাঁড়িয়েছে এরকম যে, বাদী বিবাদীদের বিবাদ মীমাংসার পাশাপাশি জনগণের কিছু সাধারণ অধিকার ফিরিয়ে দেয়াও এর আওতাভুক্ত হয়েছে, সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীসমূহের যথা পাগল, ইয়াতিম, হতদরিদ্র ও নির্বোধদের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষণ, মুসলমানদের ওসিয়ত ও ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, অভিভাবকহীনা অবিবাহিতা যুবতীদের বিয়ে দেয়া, রাস্তাঘাট ও ভবনসমূহের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, সাক্ষীগণ সাধকগণ ও জনপ্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণ, তাদেরকে সুবিচার সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিতরণ, যাতে তাদের উপর বিচারকের আস্থা সৃষ্টি হয়। এসবই বিচারকের দায়িত্বের সাথে সম্পৃক্ত।'

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ন্যায়বিচারের মর্যাদা

📄 ন্যায়বিচারের মর্যাদা


দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার প্রতিহত করা ও পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ মীমাংসা করার লক্ষ্যে ন্যায়বিচার করা ফরযে কেফায়া। জনগণের জন্য বিচারক নিয়োগ করা শাসকের দায়িত্ব। যোগ্য ব্যক্তি এ দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলে শাসক তাকে দায়িত্ব গ্রহণে বলপ্রয়োগ করতে পারবে। কোনো ব্যক্তি যখন এমন কোনো ক্ষেত্রে অবস্থান করে, যেখানে সে ছাড়া আর কেউ বিচারক হওয়ার যোগ্য নেই, তখন তার জন্য এ দায়িত্ব গ্রহণ করা ওয়াজিব। ইসলাম সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে বিচার ফায়সালা করতে উৎসাহিত করেছে এবং একে একটা মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইমাম বুখারি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'একমাত্র দুই ব্যক্তিই ঈর্ষার পাত্র: যাকে আল্লাহ্ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা দান করেছেন এবং সে তা কাজে লাগিয়ে মানুষের বিবাদ মীমাংসা করে ও মানুষকে তা শেখায়। আর যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং তাকে তা সৎপথে ব্যয় করার ক্ষমতা দান করেছেন।' ইসলাম ন্যায়বিচারকের জন্য বেহেস্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'যে ব্যক্তি মুসলমানদের বিচারকের দায়িত্ব কামনা করে তা লাভ করে, অত:পর তার অবিচারের চেয়ে সুবিচার বেশি হয়, তার জন্য বেহেশত। আর যার সুবিচারের চেয়ে অবিচার বেশি হয় তার জন্য জাহান্নাম।' (আবু দাউদ)। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবি আওফা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'বিচারক যতোক্ষণ সুবিচার করে ততোক্ষণ আল্লাহ্ তার সাথে থাকেন। যখন সে অবিচার করে তখন আল্লাহ তার সংগ ছেড়ে যান এবং শয়তান তার সাথী হয়।' (ইবনে মাজা, তিরমিযি)।
তবে কিছু সংখ্যক হাদিসে যে বিচারকের পদ গ্রহণ করতে সতর্ক করা হয়েছে, তা শুধু সে সব ব্যক্তির বেলায় প্রযোজ্য, যারা এ কাজের পূর্ণ যোগ্যতা, দক্ষতা ও এর জন্য প্রয়োজনীয় সৎসাহস, নি:স্বার্থপরতা ও আত্মসংযমের গুণাবলীতে সজ্জিত নয়। যেমন রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'যে ব্যক্তি বিচারকের পদ লাভ করেছে সে বিনা ছুরিতেই জবাই হয়েছে।' -আবু দাউদ, তিরমিযি।
ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, আবু যর (রা) বলেন: হে রসূলুল্লাহ্ আপনি কি আমাকে কাজে লাগাবেন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00