📄 স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মীমাংসা
স্বীকারোক্তি ভিত্তিক মীমাংসা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির নিকট তার দেয়া ঋণ বা অন্য কোনো পাওনার দাবি করলো। অত:পর যার কাছে দাবি করলো, সে তা মেনে নিলো। অত:পর উভয়ে পাওনা আংশিক পরিশোধের ভিত্তিতে আপোস করলো। এটা বৈধ। কেননা মানুষকে পুরোপুরি না হোক, আংশিক পাওনা থেকে খাতককে অব্যাহতি দিতে নিষেধ করা যায়না।
ইমাম আহমদ র. বলেন: এ ক্ষেত্রে কেউ যদি সুপারিশ করে তবে তাতে গুনাহ হবে না। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সা) জাবির (রা) এর পাওনাদারদেরকে সুপারিশ করে অর্ধেক ঋণ মওকুফ করিয়েছিলেন এবং কা'ব ইবনে মালেককে সুপারিশ করে তার খাতকদের অর্ধেক ঋণ মওকুফ করিয়েছিলেন। ইমাম আহমদ ইমাম নাসায়ির এই হাদিসের দিকে ইংগিত করেছেন, যা তিনি কা'ব ইবনে মালেক (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। কা'ব মসজিদে নববীতে ইবনে আবি হাদরাদের নিকট তার পাওনা দাবি করলেন। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটি হলো। রসূলুল্লাহ্ (সা) নিজের ঘরে বসে তা শুনলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে বের হয়ে তাদের দিকে এগিয়ে ডেকে বললেন: 'হে কা'ব। কা'ব বললেন: হে রসূলুল্লাহ (সা) আমি হাজির।' রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমার ঋণের অর্ধেক মওকুফ কর। কা'ব বললেন : হে রসূলুল্লাহ্, (সা) মওকুফ করলাম। তখন রসূলুল্লাহ (সা) ইবনে আবি হাদরাদকে বললেন: ওঠ, পরিশোধ কর।
বিবাদী যদি নগদ ঋণের কথা স্বীকার করে ও নগদ প্রদান করে আপোস করে, তাহলে সেটা হবে নগদ লেনদেন এবং সে ক্ষেত্রে নগদ লেনদেনের শর্ত প্রযোজ্য হবে। আর যদি নগদ ঋণের কথা স্বীকার করে কিন্তু দ্রব্যাদি দিয়ে আপোস করে কিংবা দ্রব্যাদির ঋণের কথা স্বীকার করে এবং নগদ মুদ্রায় পরিশোধ করে, তবে সেটা হবে একটা বিনয়। এ ক্ষেত্রে বিক্রয়ের সমস্ত বিধি কার্যকর হবে। আর যদি নগদ মুদ্রা বা দ্রব্যাদির ঋণ স্বীকার করে এবং সেবা দিয়ে যথা বাড়িতে আবাসিক সুবিধা বা অন্য কোনো সেবা দিয়ে আপোস করে তবে এটা হবে ইজারা এবং এতে ইজারার বিধিমালা প্রযোজ্য হবে। আর যখন মীমাংসায় বিতর্কিত হক বাদীর প্রাপ্য বলে স্থির হয় তখন বিবাদী আপোসের জন্য তার বদলায় যে জিনিস দিয়েছিল তা ফেরত চাইতে পারবে। কেননা সে বদলা দিয়েছিলই ওটিকে রক্ষা করার জন্য। আর যখন বদলা প্রাপ্য হবে, তখন বাদী বিবাদীর কাছে দাবিকৃত জিনিসটি ফেরত চাইতে পারবে। কেননা সে বদলাকে সুরক্ষিত করার জন্যই দাবিকৃত জিনিস ছেড়ে দিয়েছিল।
📄 অস্বীকৃতিজনিত আপোস মীমাংসা
অস্বীকৃতিজনিত আপোস মীমাংসা হলো, কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির নিকট কোনো পাওনার দাবি করলে সে দাবিকৃত জিনিস অস্বীকার করবে, অত:পর উভয়ে আপোস মীমাংসা করবে।
📄 মৌনতা ভিত্তিক আপোস মীমাংসা
মৌনতা ভিত্তিক আপোস হলো, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির নিকট তার কোনো পাওনা দাবি করলে বিবাদী চুপ থাকবে, স্বীকারও করবেনা, অস্বীকারও করবেনা।
📄 অস্বীকৃতি ও মৌনতাজনিত আপোস সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
অধিকাংশ আলেমের মতে অস্বীকৃতি ও মৌনতা জনিত আপোস বৈধ। কিন্তু ইমাম শাফেয়ি বলেন: একমাত্র স্বীকারোক্তি ভিত্তিক আপোস ব্যতীত আর কোনো আপোস জায়েয নেই। কেননা আপোসের দাবি হলো, একটা প্রতিষ্ঠিত হক থাকা চাই। কিন্তু অস্বীকৃতি ও মৌনতার ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত। যেখানে বিবাদী দাবি অস্বীকার করে সেখানে হক প্রতিষ্ঠিতই হয় না। কেননা হক প্রতিষ্ঠিত হয় দাবি দ্বারা। অথচ অস্বীকৃতি দাবিকে খন্ডন করে। দাবি খন্ডনের কারণে হক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
পক্ষান্তরে মৌনতাজনিত আপোস বৈধ নয় এজন্য যে, নীরবতা অবলম্বনকারীকে কার্যত: অস্বীকারকারী বিবেচনা করা হয়, যতোক্ষণ না তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। বিবাদ দাবির জন্য যে কোনো পক্ষের অর্থ ব্যয় অবৈধ। কেননা দাবি বাতিল। তাই এখানে অর্থব্যয় ঘুষের সমার্থক। কেননা আল্লাহ্ সূরা বাকারার ১৮৮ নং আয়াতে বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتَدلُّوا بِمَا إِلَى الْحُكامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وانتم تعلمون
'তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করোনা এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দংশ জেনে-শুনে অন্যায়রূপে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের নিকট পেশ করো না।'
কিছু সংখ্যক আলেম মধ্যম পন্থা অবলম্বন করেছেন। তারা একে পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধও করেননি, পুরোপুরিভাবে বৈধও করেননি। তাদের মতে সর্বোত্তম পন্থা হলো বাদী যদি সুনিশ্চিতভাবে জানে যে, তার প্রতিপক্ষের নিকট তার পাওনা আছে, তাহলে যে জিনিসের উপর আপোস মীমাংসা হয়েছে তা দখল করা তার জন্য বৈধ, যদিও তার প্রতিপক্ষ তা অস্বীকার করে। আর সে যদি অন্যায় দাবি করে তাহলে দাবি পেশ করা এবং যে জিনিসের উপর আপোস মীমাংসা হয়েছে তা হস্তগত করা তার জন্য হারাম।
পক্ষান্তরে বিবাদীর কাছে যদি তার নিশ্চিতভাবে জানা হক থেকে থাকে, অথচ সে কোনো স্বার্থজড়িত উদ্দেশ্যে তা অস্বীকার করে থাকে, তাহলে মীমাংসিত জিনিস হস্তান্তর করা তার কর্তব্য। আর যদি সে জানে, তার কাছে কারো কোনো হক পাওনা নেই, তাহলে তার দাবিদারের সাথে তার দ্বন্দ্ব নিরসন ও তার দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্য তার অর্থ সম্পদের একাংশ তাকে প্রদান করা জায়েয। কিন্তু তার দাবিদারের পক্ষে তা গ্রহণ করা হারাম।
সুতরাং অস্বীকৃতিজনিত আপোস সর্বতোভাবে অবৈধ এ কথা যেমন বলা যাবে না, তেমনি তা সর্বতোভাবে বৈধ, একথাও বলা যাবে না, বরং উভয়টি বিশদ বিবরণসহ বলতে হবে।
আর যারা অস্বীকৃতি বা মৌনতাজনিত আপোসকে বৈধ বলে মত দিয়েছেন, তাদের যুক্তি হলো, বাদীর পক্ষে এটা তার পাওনা মেটানোর শামিল, আর বিবাদীর পক্ষে তার কসম খাওয়ার বদলা ও তার পক্ষ থেকে বিবাদ মেটানোর পদক্ষেপ। আর আপোসে গৃহীত বিনিময় যদি কোনে বস্তু বা দ্রব্য হয়, তাহলে এটা বিক্রয়ের পর্যায়ভুক্ত হবে এবং বিক্রয়ের যাবতীয় বিধান এতে প্রযোজ্য হবে। আর যদি বিনিময় কোনো সেবা হয় তাহলে সেটা হবে ইজারা এবং সে ক্ষেত্রে ইজারার যাবতীয় বিধি প্রযোজ্য হবে। আর যে বিষয়ে আপোস কাম্য তা এ রকম হবে না। কেননা তা হবে বিবাদ নিরসনের বিনিময়। ওটা কোনো মালের বিকল্প নয়। আর যখন আপোসের বিনিময় কারো প্রাপ্য বলে স্থির হবে, তখন বাদী বিবাদীকে তার দাবি পূরণের আহ্বান জানাবে। কেননা সে বিনিময় সুরক্ষিত থাকবে এই আশায়ই নিজের দাবি পরিত্যাগ করেছিল। আর যে জিনিসের ব্যাপারে আপোস কাম্য, তা যখন প্রাপ্য বলে স্থির হবে, তখন বিবাদী বাদীর কাছে তার বিনিময় ফেরত চাইবে। কেননা সে বিনিময় এজন্যই দিয়েছিল যে, তার দাবীকৃত জিনিসই অক্ষুণ্ণ থাকবে। সেটি যখন প্রাপ্য বলে স্থির হয়েছে, তখন তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। কাজেই সে বাদীর কাছে তা ফেরত চাইতে পারবে।