📄 মীমাংসা গ্রহণকারী
এমন ব্যক্তি হওয়া শর্ত, যার কাউকে স্বেচ্ছায় কিছু দান করার যোগ্যতা রয়েছে। সে যদি এমন ব্যক্তি হয়, যার স্বেচ্ছায় দান করার যোগ্যতা (অর্থাৎ আইনানুগ যোগ্যতা) নেই, যথা : পাগল, অপ্রাপ্তবয়স্ক, এতিমের অভিভাবক ও ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক, তবে এ ধরণের লোকের মীমাংসা গ্রহণ বৈধ নয়। কেননা এটা একটা স্বেচ্ছাকৃত দান, যার যোগ্যতা এসব ব্যক্তির নেই। তবে ভালোমন্দ ও ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সচেতন অপ্রাপ্তবয়স্কের, এতিমের অভিভাবকের ও ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়কের মীমাংসা গ্রহণকারী হওয়া সেই ক্ষেত্রে বৈধ যেখানে মীমাংসা উক্ত অপ্রাপ্তবয়স্কের, এতিমের বা ওয়াক্ত সম্পত্তির জন্য কল্যাণজনক ও লাভজনক হয়। কারো কাছে কিছু ধারের অর্থ পাওনা রয়েছে, কিন্তু তার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই, এরূপ ক্ষেত্রে ঋণের একাংশ নিয়ে অপর অংশ থেকে খাতককে অব্যাহতি দেয়ার জন্য মীমাংসায় উপনীত হওয়া জায়েয, যদিও মীমাংসা গ্রহণকারী অপ্রাপ্তবয়ষ্ক হয়।
📄 মীমাংসা বিনিময়ের শর্ত
১. বিনিময়টা যেন এমন কোনো মাল হয়, যার মূল্যায়ন করা যায় ও হস্তান্তরযোগ্য হয় অথবা কোনো সেবা বা কল্যাণমূলক কিছু হয়।
২. যখন বিনিময়টা হস্তান্তর ও গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়, তখন তা যেন সুপরিচিত ও সুনির্দিষ্ট হয় এবং তাতে এমন কোনো অস্বচ্ছতা না থাকে, যা কোনো বিতর্কের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
হানাফি ফকিহগণ বলেন যে ক্ষেত্রে বিনিময়কে হস্তান্তর ও গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই, সেক্ষেত্রে তা সুপরিচিত ও সুনির্দিষ্ট হওয়া শর্ত নয়। যেমন দুই ব্যক্তি তাদের প্রতিপক্ষের নিকট কোনো জিনিস দাবি করলো, অত:পর দুজনেই একে অপরের প্রাপ্যের বিনিময়ে নিজের অংশ ছেড়ে দিয়ে মীমাংসা করলো। ইমাম শাওকানির মতে পরিচিত জিনিসের বাবতে অপরিচিত জিনিস দিয়ে মীমাংসা করা জায়েয। এ ব্যাপারে তিনি উম্মে সালমা (রা) থেকে বর্ণিত এই হাদিস দ্বারা প্রমাণ দর্শান:
'দুই ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট তাদের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত একটি পুরনো বিবাদ মীমাংসার জন্য উপস্থিত হয়। এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিলো না। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা আল্লাহর রসূলের নিকট বিবাদ মীমাংসার জন্য এসেছ। অথচ আমি তো একজন মানুষ। সম্ভবত তোমাদের একজন তার দাবিতে অপর জনের চেয়ে বেশি অগ্রগামী। কিন্তু আমি তো শুধু যা শুনবো তার ভিত্তিতেই তোমাদের মধ্যে মীমাংসা করবো। এমতাবস্থায় আমি যদি কাউকে তার ভাই এর প্রাপ্য দিয়ে ফেলি, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা এ ধরনের মীমাংসায় আমি তাকে এক টুকরো আগুনই দেবো, যা সে কিয়ামতের দিন একটা লোহার শালাকায় করে নিজের ঘাড়ের উপর জ্বালাবে।' এ কথা শুনে দুই ব্যক্তিই কাঁদতে লাগলো এবং উভয়ে বলতে লাগলো 'আমার হক আমার ভাইকে দিলাম।' রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা যখন এ কথা বলেছ, তখন যাও, তোমাদের প্রাপ্য ভাগ কর। তারপর কার কোন্ ভাগ, তা নির্ধারণের জন্য লটারি কর। তারপর তোমরা উভয়ে নিজের ভাগ অপর ভাই এর জন্য উৎসর্গ কর।' আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, আবু দাউদের অপর বর্ণনায় আছে: 'যে বিষয়ে আমার নিকট কোনো ওহি আসেনি, সে বিষয়ে আমি কেবল নিজের মত অনুসারেই ফায়সালা করবো।' ইমাম শাওকানি বলেন: এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, অজ্ঞাত প্রাপ্যের দাবি ছেড়ে দেয়া জায়েয। কেননা এখানে উভয়ের প্রাপ্য অজ্ঞাত। এ থেকে আরো প্রমাণিত হয়, জ্ঞাত জিনিসের বিনিময়ে অজ্ঞাত পাওনার মীমাংসা করা বৈধ। তবে এতদসত্ত্বেও উভয়ের নিজ দাবি অপর পক্ষের জন্য ছেড়ে দেয়া জরুরি। ইমাম আল লাহর' গ্রন্থে শাফেয়ি ও নাসের সূত্রে বর্ণিত, অজ্ঞাত পাওনার মীমাংসা জ্ঞাত জিনিস দ্বারা বৈধ নয়।
📄 যে বিতর্কিত হকের মীমাংসা কাম্য, তার শর্ত
যে বিতর্কিত হকের মীমাংসা কাম্য, তার উপর নিম্নের শর্তাবলী প্রযোজ্য:
১. হয় তা মূল্যায়নযোগ্য সম্পদ হওয়া চাই, নতুবা সেবা জাতীয় বিষয় হওয়া চাই।
জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা ঋণগ্রস্ত অবস্থায় ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। অত:পর পাওনাদাররা তাদের পাওনা আদায়ের জন্য চাপ দিতে লাগলো, জাবির (রা) বলেন: এমতাবস্থায় আমি রসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট উপস্থিত হলাম। রসুলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে অনুরোধ করলেন যেন আমার বাগানের ফল নিয়ে আমার পিতাকে দায়মুক্ত করে। কিন্তু তারা অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলো। তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে আমার বাগানের ফল দিলেন না, আমাকে বললেন: পরদিন সকালে আমি তোমার কাছে আসবো। তিনি পরদিন সকালে আমার কাছে এলেন। আমার বাগানে পায়চারি করলেন এবং বাগানের ফলে বরকতের জন্য দোয়া করলেন। তারপর আমি ফল পাড়লাম এবং তাদের ঋণ পরিশোধ করলাম। পরিশোধ করার পরও আমার ফল অবশিষ্ট রইল।'
অন্য বর্ণনার ভাষা এ রকম: 'জাবিরের পিতা জাবিরের ঘাড়ে জনৈক ইহুদির ত্রিশ ওয়াসাক ঋণ রেখে মারা গেলেন। জাবির ইহুদির নিকট কিছু সময় চাইলেন। ইহুদি সময় দিতে রাজি হলো না। অত:পর জাবির তার পক্ষে সুপারিশ করার জন্য রসূলুল্লাহ্ (সা) কে অনুরোধ করলেন। রসূলুল্লাহ্ (সা) ইহুদির নিকট গিয়ে তাকে তাঁর পাওনার বিনিময়ে জাবিরের বাগানের খেজুর নিতে বললেন। কিন্তু সে তাঁর কথা অগ্রাহ্য করলো। এরপর রসূলুল্লাহ (সা) জাবিরের বাগানে প্রবেশ করেন এবং তার ভেতরে কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করলেন। তারপর জাবির (রা) কে বললেন: ইহুদির জন্য ফল পাড় এবং তার যা পাওনা তাকে দিয়ে দাও। অত:পর রসূলুল্লাহ্ (সা) ফিরে যাওয়ার পর জাবির ইহুদিকে ত্রিশ ওয়াসাক পরিশোধ করে দিলেন এবং তার কাছে আরো সতেরো ওয়াসাক উদ্বৃত্ত রইল।' (বুখারি) ইমাম শওকানি বলেন: এ থেকে প্রমাণিত হয়, অজ্ঞাত জিনিসের বিনিময়ে জ্ঞাত জিনিসের ব্যাপারে আপোস মীমাংসা বৈধ।
২. বান্দার এমন হক হওয়া চাই, যার বিকল্প দেয়া জায়েয আছে। চাই তা কোনো মাল না-ই হোক, যেমন কিসাস, কিন্তু আল্লাহ্ হকের ব্যাপারে কোনো আপোস চলবেনা। চোর, ব্যভিচারী বা মদখোর যদি যে ব্যক্তি তাকে আদালতে সোপর্দ করার জন্য গ্রেফতার করেছে, তার সাথে কোনো মালের বিনিময়ে আপোস করে, যাতে সে তাকে ছেড়ে দেয়। তবে এই আপোস অবৈধ। কেননা এ ব্যাপারে কোনো বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয নেই। এরূপ ক্ষেত্রে বিনিময় গ্রহণকে ঘুষ খাওয়া হিসাবে বিবেচনা করা হবে। তদ্রূপ অপবাদের শাস্তির ক্ষেত্রেও আপোস বৈধ নয়। কেননা ঐ শাস্তি প্রবর্তিত হয়েছে মানুষকে মানুষের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা থেকে সতর্ক করার জন্য। এটা যদিও বান্দার হকের সাথে সংশ্লিষ্ট, কিন্তু এতে আল্লাহ্ হকই প্রবলতর। আর সাক্ষী যদি আল্লাহর হক বা বান্দার হকের ব্যাপারে সাক্ষ্য গোপন করার উদ্দেশ্যে কোনো মালের বিনিময়ে আপোস করে, তবে তা অবৈধ। কেননা সাক্ষ্য গোপন করা হারাম। আল্লাহ্ বলেন: وَلا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ ، وَمَنْ يَكْتُمُهَا فَالَّهُ أَلَمْ قَلْبُهُ 'তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে গোপন করবে তার অন্তর পাপী।' (২ সূরা বাকারা: আয়াত ২৮৩)।
আল্লাহ আরো বলেন: وَأَقِيمُوا الشَّمَادَةَ لِلَّهِ 'তোমরা আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দিও।' (৬৫ সূরা তালাক: আয়াত ২)।
শুফয়া বর্জন করার ব্যাপারেও আপোষ মীমাংসা বৈধ নয়। জমির ক্রেতা যদি শুফয়ার দাবিদারের সাথে শুফয়া বর্জনের জন্য আপোস করে তবে সেই আপোস বাতিল। কেননা শুফয়া শরিকের ক্ষতি দূর করার উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত। এ দ্বারা আর্থিক সুবিধা ভোগ করা হবে এজন্য নয়। অনুরূপ দাম্পত্য সম্পর্ক দাবির ব্যাপারেও আপোস মীমাংসা বৈধ নয়।
📄 আপোস মীমাংসার প্রকারভেদ
আপোস মীমাংসা কখনো স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কখনো অস্বীকৃতির ভিত্তিতে আবার কখনো মৌনতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে।