📄 মীমাংসার মূল উপাদান
আপোস মীমাংসার মূল উপাদান দুটো: মীমাংসা বুঝা যায় এমন শব্দ দ্বারা ইজাব ও কবুল করা। যেমন বিবাদী বলবে: ‘আমার কাছে তোমার যে একশো মুদ্রা পাওনা রয়েছে, সে বিষয়ে তোমার সাথে পঞ্চাশ মুদ্রায় আপোস মীমাংসা করলাম।’ অপরজন বলবে: ‘আমি মেনে নিলাম।’
এভাবে যখন আপোস মীমাংসা সম্পন্ন হয়ে যায়, তখন তা বাদী বিবাদী উভয়ের জন্য অপরিহার্য হয়ে যায়। তখন আর কোনো এক পক্ষ এককভাবে অপর পক্ষের সম্মতি ব্যতিরেকে তা বাতিল করতে পারে না। চুক্তি অনুযায়ী মীমাংসার বিনিময়ে বাদীর যা প্রাপ্য, সে তার মালিক হয়ে যাবে এবং বিবাদী তা তার কাছ থেকে ফেরত চাইতে পারবে না। আর এর মাধ্যমে বিবাদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যাবে, অতঃপর বাদীর নতুন কোনো দাবি দাওয়া শোনা হবে না।
📄 মীমাংসার শর্তাবলী
মীমাংসার শর্ত তিন প্রকার:
মীমাংসাকারীর সাথে সংশ্লিষ্ট শর্ত, যে জিনিসের মাধ্যমে মীমাংসা কাম্য তার শর্ত, যে জিনিস বা অধিকার নিয়ে মীমাংসা কাম্য, তার শর্ত।
📄 মীমাংসা গ্রহণকারী
এমন ব্যক্তি হওয়া শর্ত, যার কাউকে স্বেচ্ছায় কিছু দান করার যোগ্যতা রয়েছে। সে যদি এমন ব্যক্তি হয়, যার স্বেচ্ছায় দান করার যোগ্যতা (অর্থাৎ আইনানুগ যোগ্যতা) নেই, যথা : পাগল, অপ্রাপ্তবয়স্ক, এতিমের অভিভাবক ও ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক, তবে এ ধরণের লোকের মীমাংসা গ্রহণ বৈধ নয়। কেননা এটা একটা স্বেচ্ছাকৃত দান, যার যোগ্যতা এসব ব্যক্তির নেই। তবে ভালোমন্দ ও ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সচেতন অপ্রাপ্তবয়স্কের, এতিমের অভিভাবকের ও ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়কের মীমাংসা গ্রহণকারী হওয়া সেই ক্ষেত্রে বৈধ যেখানে মীমাংসা উক্ত অপ্রাপ্তবয়স্কের, এতিমের বা ওয়াক্ত সম্পত্তির জন্য কল্যাণজনক ও লাভজনক হয়। কারো কাছে কিছু ধারের অর্থ পাওনা রয়েছে, কিন্তু তার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই, এরূপ ক্ষেত্রে ঋণের একাংশ নিয়ে অপর অংশ থেকে খাতককে অব্যাহতি দেয়ার জন্য মীমাংসায় উপনীত হওয়া জায়েয, যদিও মীমাংসা গ্রহণকারী অপ্রাপ্তবয়ষ্ক হয়।
📄 মীমাংসা বিনিময়ের শর্ত
১. বিনিময়টা যেন এমন কোনো মাল হয়, যার মূল্যায়ন করা যায় ও হস্তান্তরযোগ্য হয় অথবা কোনো সেবা বা কল্যাণমূলক কিছু হয়।
২. যখন বিনিময়টা হস্তান্তর ও গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়, তখন তা যেন সুপরিচিত ও সুনির্দিষ্ট হয় এবং তাতে এমন কোনো অস্বচ্ছতা না থাকে, যা কোনো বিতর্কের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
হানাফি ফকিহগণ বলেন যে ক্ষেত্রে বিনিময়কে হস্তান্তর ও গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই, সেক্ষেত্রে তা সুপরিচিত ও সুনির্দিষ্ট হওয়া শর্ত নয়। যেমন দুই ব্যক্তি তাদের প্রতিপক্ষের নিকট কোনো জিনিস দাবি করলো, অত:পর দুজনেই একে অপরের প্রাপ্যের বিনিময়ে নিজের অংশ ছেড়ে দিয়ে মীমাংসা করলো। ইমাম শাওকানির মতে পরিচিত জিনিসের বাবতে অপরিচিত জিনিস দিয়ে মীমাংসা করা জায়েয। এ ব্যাপারে তিনি উম্মে সালমা (রা) থেকে বর্ণিত এই হাদিস দ্বারা প্রমাণ দর্শান:
'দুই ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট তাদের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত একটি পুরনো বিবাদ মীমাংসার জন্য উপস্থিত হয়। এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিলো না। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা আল্লাহর রসূলের নিকট বিবাদ মীমাংসার জন্য এসেছ। অথচ আমি তো একজন মানুষ। সম্ভবত তোমাদের একজন তার দাবিতে অপর জনের চেয়ে বেশি অগ্রগামী। কিন্তু আমি তো শুধু যা শুনবো তার ভিত্তিতেই তোমাদের মধ্যে মীমাংসা করবো। এমতাবস্থায় আমি যদি কাউকে তার ভাই এর প্রাপ্য দিয়ে ফেলি, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা এ ধরনের মীমাংসায় আমি তাকে এক টুকরো আগুনই দেবো, যা সে কিয়ামতের দিন একটা লোহার শালাকায় করে নিজের ঘাড়ের উপর জ্বালাবে।' এ কথা শুনে দুই ব্যক্তিই কাঁদতে লাগলো এবং উভয়ে বলতে লাগলো 'আমার হক আমার ভাইকে দিলাম।' রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা যখন এ কথা বলেছ, তখন যাও, তোমাদের প্রাপ্য ভাগ কর। তারপর কার কোন্ ভাগ, তা নির্ধারণের জন্য লটারি কর। তারপর তোমরা উভয়ে নিজের ভাগ অপর ভাই এর জন্য উৎসর্গ কর।' আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, আবু দাউদের অপর বর্ণনায় আছে: 'যে বিষয়ে আমার নিকট কোনো ওহি আসেনি, সে বিষয়ে আমি কেবল নিজের মত অনুসারেই ফায়সালা করবো।' ইমাম শাওকানি বলেন: এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, অজ্ঞাত প্রাপ্যের দাবি ছেড়ে দেয়া জায়েয। কেননা এখানে উভয়ের প্রাপ্য অজ্ঞাত। এ থেকে আরো প্রমাণিত হয়, জ্ঞাত জিনিসের বিনিময়ে অজ্ঞাত পাওনার মীমাংসা করা বৈধ। তবে এতদসত্ত্বেও উভয়ের নিজ দাবি অপর পক্ষের জন্য ছেড়ে দেয়া জরুরি। ইমাম আল লাহর' গ্রন্থে শাফেয়ি ও নাসের সূত্রে বর্ণিত, অজ্ঞাত পাওনার মীমাংসা জ্ঞাত জিনিস দ্বারা বৈধ নয়।