📄 জীবন বীমা
শায়খ আহমদ ইব্রাহীম জীবন বীমাকে অবৈধ ঘোষণা করে ফতোয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন: জীবন বীমা কোম্পানীর সাথে বীমা চুক্তি সম্পাদনকারী যখন জীবদ্দশায় তার সব কটা কিস্তি জমা দেয়া সম্পন্ন করে তখন সে কোম্পানীর কাছ থেকে তার জমা দেয়া সবকটা কিস্তির অর্থ কোম্পানীর সাথে ঐকমত্যে স্থিরকৃত লভ্যাংশ সহকারে ফেরত নেয়ার অধিকারী হয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো, এটা শরিয়তে জায়েযকৃত মুদারাবা চুক্তির সাথে কিভাবে সংগতিপূর্ণ হয়?
মুদারাবার উদাহরণ হলো: যায়েদ বকরকে একশো পাউন্ড ব্যবসায় করার জন্য এরূপ শর্তে দিলো যে, তাদের মধ্যে উভয়ের সম্মতি আছে এমন একটা অনুপাতে লভ্যাংশ বষ্টিত হবে। ধরা যাক, মূলধনওয়ালা পাবে অর্ধেক লভ্যাংশ, আর মুদারিব (ব্যবসায়ী) পাবে অর্ধাংশ। প্রথমজন পাবে তার মূলধন বাবত আর দ্বিতীয়জন পাবে তার কাজের বাবদ। কোথাও বা মূলধনওয়ালার জন্য দুই তৃতীয়াংশ ও মুদারিবের জন্য এক তৃতীয়াংশ অথবা এর বিপরীত ধার্য হতে পারে।
মুদারাবার বৈধতার মূল শর্ত হলো, মুদারিবের ব্যবসায়িক তৎপরতার কল্যাণে মূলধনদাতার মূলধন দ্বারা ব্যবসায় যে মুনাফা আসে, মূলধনদাতা তা থেকে তার ধার্যকৃত প্রাপ্য অংশ পাবে। কিন্তু ব্যবসায় যদি কোনো মুনাফা অর্জিত না হয় তাহলে মূলধন ওয়ালা ও মুদারিব কেউ কিছু পাবে না। তবে মূলধন ওয়ালার মূলধন অক্ষত থাকবে। আর যখন ব্যবসায় লোকসান হয় তখন লোকসানটা মূলধনওয়ালার মূলধন থেকেই হয়। মুদারিবের কিছুই ক্ষতি হয় না। তবে মুদারিবের কোনো মজুরিও পাওনা হয় না। কেননা সে মজুর নয়, বরং শরিক।
মূলধনওয়ালা যদি শর্ত আরোপ করে যে, ব্যবসায়ে লাভ হোক বা লোকসান হোক, সে তার মূলধনের অতিরিক্ত একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ লভ্যাংশ নেবেই, তাহলে এই শর্ত অবৈধ। কেননা এটা লভ্যাংশে শরিক হওয়ার পথ রুদ্ধ করে। এটা মুদারাবার বিধিরও লংঘন। মূলধনওয়ালার এ ধরনের শর্ত মানতে হলে তাকে মুদারিবের পকেট থেকে কিছু অর্থ দিতে হবে, যা মানুষের অর্থ অবৈধভাবে আত্মসাতের শামিল।
মূলধন বিনিয়োগকারীর উক্ত শর্তের কারণে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায় এবং ব্যবসায় যে মুনাফা আসে তা পুরোপুরি মূলধনদাতার পকেটে চলে যায়। আর এই শর্তই জীবনবীমায় বিদ্যমান। তবে মূলধনের মালিকের নিকট মুদারিবের ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক প্রাপ্য থাকে, তার পরিমাণ যাই হোক না কেন। কেননা মুদারাবা বাতিল হয়ে যাওয়ায় সে শরিক থেকে মজুরে পরিণত হয়েছে। এটা ইমাম মুহাম্মদের অভিমত। ইমাম আবু ইউসুফের মতানুসারে মুদারিব ন্যায়সংগতভাবে মজুরী পাবে। তবে তা চুক্তিতে স্থিরকৃত সর্বসম্মত মজুরির অতিরিক্ত হতে পারবে না। (এমন একদল নিরপেক্ষ ও নি:স্বার্থ অভিজ্ঞ লোকদের দ্বারা এই মজুরি নির্ধারিত হওয়া চাই, যারা উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে অথবা শাসকের পছন্দ অনুসারে নিযুক্ত হবে)। কেননা মুদারাবা সঠিক হলেও মুদারিব উভয় পক্ষের মতানুসারে ধার্যকৃতের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ পেতনা। তাই মুদারাবা যখন বাতিল হয়ে যায় তখন মুদারিবের এমন লভ্যাংশ পাওয়া সমীচীন নয়, যা বৈধ মুদারাবার লভ্যাংশের চেয়ে বেশি হয়, এ হচ্ছে শরিয়ত অনুমোদিত মুদারাবার প্রকৃত রূপ এবং এ হচ্ছে তার বিধান। এখন যদি প্রশ্ন করা হয়। বীমার চুক্তি কি যথার্থ মুদারাবার আওতায় পড়ে? তবে এর জবাব এটাই যে, পড়ে না। সুতরাং বীমার চুক্তি একটা বাতিল মুদারাবা। শরিয়তের আলোকে এটা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, কোম্পানী নিজের জন্য যা বাধ্যতামূলক করে নেয়, বীমাকারীর জন্য সেটা রাখে ইচ্ছাধীন। যেহেতু বীমা চুক্তির প্রকৃতিই এই যে, এটা একটা সম্ভাব্য ও অনিশ্চিত বিনিময় লাভের চুক্তি, তাই উক্ত কথা প্রযোজ্য নয়।
বলা হয় যে, বীমাকারী কোম্পানীকে যা দেয় তা তাকে ধার হিসাবে দেয় এবং জীবিতাবস্থায় তা লাভ সহকারে ফেরত নিতে পারে। এ কথা যদি সঠিক ধরে নেই তবে তার অর্থ দাঁড়ায়, এটা এমন একটা ঋণ, যা মুনাফা নিয়ে আসে। অথচ এটা হারাম। কেননা এটা হচ্ছে নিষিদ্ধ সুদ। মোট কথা, বিষয়টাকে যেভাবেই ঘোরান ফেরানো হোক। ইসলামি শরিয়তের সাথে এর কোনোই মিল দেখতে পাবেন না।
উপরে যে কথা আমি বললাম, তা সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেখানে বীমাকারী তার প্রিমিয়ামের সকল কিস্তি শোধ করে জীবিত থাকে। পক্ষান্তরে সে যখন সব কটা কিস্তি পরিশোধ করার আগেই মারা যায়, এমনকি অনেক সময় মাত্র এক কিস্তি দিয়েই মারা যেতে পারে এবং একটা বড় অংকের অর্থ অবশিষ্ট থেকে যেতে পারে। কেননা বীমার অর্থের অংকটা কত বড় হবে, তা নির্ভর করে উভয় পক্ষের সম্পাদিত চুক্তিতে কত নির্ধারিত হয়েছে তার উপর। সুতরাং বীমা কোম্পানী যখন উভয় পক্ষের সম্পত্তিতে নির্ধারিত অংকের অর্থ তার উত্তরাধিকারীদের অথবা বীমাকারী যাকে নিজের মৃত্যুর পর কোম্পানীর প্রদেয় অর্থ গ্রহণের জন্য মনোনীত করে গেছে তাকে প্রদান করলো, তখন কোম্পানী কিসের বিনিময়ে এই অংকের অর্থ প্রদান করলো? এটা কি একটা পারস্পরিক ঝুঁকি গ্রহণ ও বেপরোয়া লড়াই নয়? যে শরিয়ত মানুষের সম্পদ অবৈধ ভোগে ভাগ ও আত্মসাৎ করাকে হারাম ঘোষণা করেছে, সেই শরিয়ত কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকে তার উত্তরাধিকারীদের জন্য অবৈধ মুনাফা উপার্জনের উৎসে পরিণত করবে- এটা কি কল্পনা করা যায়? মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে অনুমান ভিত্তিক মুনাফা তার উত্তরাধিকারী বা মনোনীত ব্যক্তিকে তার মৃত্যুর পরে দেয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেই এই অবৈধ মুনাফা কি বৈধ হয়ে যাবে, যা অনিশ্চয়তা ও সুদ এই উভয় কারণেই অবৈধ?
বস্তুত: মানুষের জীবন ও মৃত্যু যখন বাণিজ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখনই এ ধরনের অঢেল মুনাফাখুরীর সুযোগ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। পৃথিবীতে এমন বহু জিনিস রয়েছে, যার আর্থিক মূল্যের পরিমাপ কোনো নির্দিষ্ট সীমায় গিয়ে থেমে থাকেনা, বরং তা উভয় পক্ষের পরিমাপ নির্ধারণের উপর নির্ভরশীল থাকে। কিন্তু বীমার বাণিজ্য এই শ্রেণীর আওতায় পড়েনা। কেননা এখানে উভয় পক্ষের নির্ধারিত পরিমাণের মধ্যে বীমার অর্থ সীমাবদ্ধ থাকে না।
বস্তুত: এদিক দিয়েও এটা একটা অনিশ্চিত ঝুঁকির ব্যাপার। কারণ বীমাকারী সকল কিস্তি জীবদ্দশায় পরিশোধ করলে তার প্রাপ্য এক রকম হয় আর পরিশোধ করার আগে মারা গেলে উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য হয় অন্য রকম। এটা কি ঝুঁকি গ্রহণ ও জুয়া নয়? যেহেতু বীমাকারী ও বীমা কোম্পানী উভয়ের অজানা থাকে প্রাপ্য অংক কত হবে, তাই এটা সুনিশ্চিতভাবেই জুয়া।
📄 উমরা
সংজ্ঞা: উম্মা এক ধরনের হিবা, যা কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন ভোগ করার জন্যে দেয় এবং তার মৃত্যুর পর তা দাতার নিকট ফেরত আসে। এর জন্যে বিভিন্ন রকমের বাক্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন 'তোমাকে এ জিনিসটা জীবন সত্ত্ব দিলাম।' বা 'এই বাড়িটা আজীবন ভোগ দখলের জন্যে দিলাম'। রসূল (সা) দাতার মালিকানায় ফেরত আসার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। যাকে দান করা হয় তার মৃত্যুর পর উক্ত দানকৃত সামগ্রী তার উত্তরাধিকারীদের মালিকানাভুক্ত হবে। উত্তরাধিকারী না থাকলে তা বাইতুল মালে যাবে। কিন্তু কোনো অবস্থায়ই তা দানকারী বা হিবাকারীর নিকট ফেরত যাবেনা।
১. উরওয়া (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'উমরা যাকে দেয়া হয় তারই থাকবে।' (বুখারি, মুসলিম, আবুদাউদ ও নাসায়ি)।
৩. আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূল (সা) বলেন: 'উমরা বৈধ।' (বুখারি, মুসলিম, আবুদাউদ, নাসায়ি)।
৪. আবু সালমা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'উমরা যাকেই দেয়া হোক, তা তারই থাকবে এবং তার পরে তার উত্তরাধিকারীদের থাকবে। তা কখনো দাতার কাছে ফেরত যাবেনা। সে এমন জিনিস দিয়েছে, যার উপর উত্তরাধিকার বলবৎ হয়েছে।' (মুসলিম, আবুদাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি, ইবনে মাজা)।
৫. আবুদাউদ তারেক মক্কী সূত্রে বর্ণনা করেন, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ্ বলেন: জনৈক আনসারী মহিলাকে তার ছেলে একটা খেজুরের বাগান দান করেছিল। অত:পর মহিলা মারা গেল। তখন ছেলেটি বললো: বাগানটি তো আমি মাকে আজীবন ভোগ করার জন্যে দিয়েছিলাম। তার কয়েকজন ভাই ছিলো। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: ঐ বাগান মহিলার জীবনভর ভোগের জন্য এবং মৃত্যুর পরেও। সে বললো; আমি ওটা তাকে সক্কা করেছি। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: 'সেটি তোমার জন্যে আরো সুদূর পরাহত।' (সদকা করলে তো ফেরত পাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা।) এটাই হানাফি, শাফেয়ি ও ইমাম আহমদের মত। ইমাম মালেক বলেন: উম্মা কোনো জিনিসের শুধু উপকারিতা ভোগ-দখলের জন্যে দেয়া হয়, মূল জিনিসের মালিকানা দেয়া হয় না। কেউ কাউকে উমরা দিলে সেটা শুধু তার আজীবন ভোগ দখলের জন্য, উত্তরাধিকার হিসাবে হস্তান্তরিত হবে না। তবে দাতা যদি উল্লেখ করে যে, ওটা তার ও তার উত্তরসূরীদের জন্যে, তাহলে তা উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরিত হবে। কিন্তু ইমাম মালেকের এই মত উল্লিখিত হাদিসের পরিপন্থী।