📄 শিরকাতুল ইনান বা অসম অংশীদারি ভিত্তিক শিরকাত
শিরকাতুল ইনান বা অসম অংশীদারিত্ব ভিত্তিক শিরকাত হলো, দুই ব্যক্তি কর্তৃক তাদের কোনো সম্পত্তিতে এরূপ শর্তে ব্যবসায় করতে সম্মত হওয়া যে, মুনাফা উভয়ের মধ্যে বণ্টিত হবে। এতে সম্পত্তি, কর্তৃত্ব ও মুনাফায় সমতার শর্ত থাকে না। এক শরিকের সম্পত্তির পরিমাণ অন্য শরিকের চেয়ে বেশি হতে পারে এবং এক শরিক দায়িত্বশীল ও অপর শরিক দায়িত্বহীন হতে পারে। উভয়ের মুনাফায় সম অধিকারী হওয়া বা অসম অধিকারী হওয়ার ব্যাপারে একমত হওয়া বৈধ। ব্যবসায়ে লোকসান হলে তা বিনিয়োগকৃত মূলধন অনুপাতে বণ্টিত হবে।
📄 শিরকাতুল মুফাওয়াদা বা সম অংশীদারিত্বভিত্তিক শিরকাত
এটা হচ্ছে, দুই বা ততোধিক ব্যক্তির নিম্নোক্ত শর্তাবলী সাপেক্ষে কোনো কাজে অংশীদারি হওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়া:
১. প্রত্যেক শরিকের বিনিয়োগকৃত সম্পত্তির পরিমাণ সমান হবে। কোনো শরিকের সম্পত্তি বেশি হলে শিরকাত শুদ্ধ হবেনা। (এই শিরকাতে শরিকদের মূলধন, মুনাফা ও ক্ষমতা সমান হয়ে থাকে। এক শরিকের মূলধন যদি একশো টাকা হয়, অপর শরিকের তার চেয়ে কম হয় তবে শিরকাত শুদ্ধ হবে না।)
২. ক্ষমতা প্রয়োগে সমতা। সুতরাং প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক এমন দুই ব্যক্তির মধ্যে শিরকাত বৈধ নয়।
৩. ধর্মে সমতা। তাই একজন মুসলমান ও একজন কাফিরের মধ্যে শিরকাত শুদ্ধ নয়।
৪. ক্রয় ও বিক্রয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে প্রত্যেক শরিক তাতে অপর শরিকের জামিন ও প্রতিনিধি হবে। কাজেই কোনো শরিকের ক্ষমতা অপর শরিকদের চেয়ে বেশি হবেনা।
এই সকল দিক দিয়ে যখন সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন শিরকাত বৈধ ও কার্যকর হবে এবং প্রত্যেক শরিক অপর শরিকের প্রতিনিধি ও জামিন হবে একে অপরকে তার যাবতীয় তৎপরতা ও ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারবে। এই শিরকাত হানাফি ও মালিকি মযহাবে বৈধ, কিন্তু শাফেয়ি মযহাবে বৈধ নয়। ইমাম শাফেয়ি বলেন: 'সমতা ভিত্তিক শিরকাত যদি অবৈধ না হয়, তবে পৃথিবীতে আর কিছু অবৈধ আছে বলে আমার জানা নেই। কেননা এটা এমন একটা চুক্তি, যার নজির শরিয়তে নেই। এই শিরকাতে সমতা কার্যকর হওয়া কঠিন। কারণ এতে অজ্ঞতা ও ধোঁকার অবকাশ রয়েছে। আর 'তোমরা মুফাওয়াযা কর, কেননা এতে সর্বাধিক বরকত রয়েছে এবং যখন তোমরা পরস্পর মুফাওয়াযা করবে তখন তা ভালোভাবে করবে' মর্মে যে সব হাদিস বর্ণিত আছে, তার কোনোটাই সহিহ হাদিস নয়।
📄 শিরকাতুল উজূহ বা মূলধন বিহীন যৌথ ব্যবসা
দুই বা ততোধিক ব্যক্তির কোনো মূলধন ছাড়াই শুধুমাত্র তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও তাদের প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থার ভিত্তিতে শরিক হওয়াকে শিরকাতুল উজুহ বা মুলধন বিহীন শিরকাত বলা হয়। এ ক্ষেত্রে শর্ত থাকে শুধু মুনাফায় অংশীদারী। এক কথায় বলা যায়, এটা কোনো কারিগরি বা সম্পত্তি ছাড়া শুধু প্রভাব ও কর্তৃত্ব ভিত্তিক শিরকাত। হানাফি ও হাম্বলি মযহাবে এটা জায়েয। কেননা এটা একটা কাজ। কাজেই এর ভিত্তিতে শিরকাত বৈধ এবং ক্রীত পণ্যে উভয়ের মালিকানায় পার্থক্য হওয়াও বৈধ। তবে মুনাফা উভয়ের মধ্যে মালিকানায় অংশ অনুপাতে বণ্টিত হবে। শাফেয়ি ও মালিকি মযহাবে এটা নাজায়েজ। কেননা শিরকাত হতে হবে সম্পত্তি অথবা কাজভিত্তিক। অথচ এখানে এই দুটোর একটিও নেই।
📄 শিরকাতুল আবদান বা শ্রমে অংশীদারিত্বভিত্তিক যৌথ ব্যবসা
দুই ব্যক্তি কর্তৃক যে কোনো কাজকে এই শর্তে গ্রহণ করা যে, ঐ কাজের পরিশ্রমিক তাদের মধ্যে ঐক্যমতের ভিত্তিতে বণ্টিত হবে। এ ধরনের শিরকাত সাধারণত মিস্ত্রী, কামার, দর্জি ইত্যাকার পেশাদার কারিগরদের মধ্যে হয়ে থাকে। উভয়ের পেশা এক হোক বা ভিন্ন ভিন্ন হোক, উভয় অবস্থায় এই শিরকাত বৈধ। তাছাড়া উভয়ে কাজ করুক বা একজন কাজ করুক, কিংবা উভয়ে এক সাথে কাজ করুক, বা পৃথক পৃথকভাবে করুক, উভয় অবস্থায় এই শিরkat বৈধ। আবুদাউদ, নাসায়ি ও ইবনে মাজা কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদিস এর বৈধতার প্রমাণ বহন করে। আবু উবায়দা আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: আমি (আব্দুল্লাহ) আম্মার ও সা'দ বদর যুদ্ধের দিন এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হলাম যে, আমরা যা পাবো, তাতে আমরা সবাই শরিক হব। কিন্তু সাদ দু'জনকে বন্দী করে আনলো, আর আমি ও আম্মার কিছুই পেলামনা।'
শাফেয়ির মতে এই শিরকাত অবৈধ। কেননা তাঁর মতে, শিরকাত শুধু সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত, কাজের সাথে নয়। আর 'রওযাতুন নাদিয়া' গ্রন্থে এ বিষয়ে একটা উত্তম আলোচনা রয়েছে। আলোচনাটি নিম্নরূপ:
'ফিক্হ শাস্ত্রীয় খুঁটিনাটি বিধি সংবলিত বিস্তৃত গ্রন্থাবলীতে রকমারি শিরকাতের যে নামগুলো পাওয়া যায়, যথা মুফাওয়াযা, ইনান, উজুহ ও আবদান, এগুলো শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত বা অভিধান থেকে প্রাপ্ত কোনো নাম নয়। এগুলো সাম্প্রতিক কালের নব উদ্ভাবিত পরিভাষা। মূলত: দুই ব্যক্তি তাদের সম্পদকে একত্রিত করে তা দিয়ে ব্যবসায় করবে, এতে শরিয়তে কোনো বাধা নেই, যা হচ্ছে 'মুফাওয়াযা' পরিভাষাটির মর্ম। কেননা সম্পদের মালিক তার সম্পদকে শরিয়তে হারাম ঘোষিত হয়নি এমন যে কোনো উপায়ে কাজে লাগাতে পারে। এখানে প্রশ্ন শুধু উভয়ের সম্পদের সমতা, উভয় সম্পদের নগদ অর্থের আকারে একত্রিত হওয়া, এবং চুক্তিবদ্ধ হওয়ার শর্ত নিয়ে। এ শর্ত জরুরি এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং দু'জনের মূলধন একত্রিত করা ও তা দিয়ে ব্যবসা করার ব্যাপারে উভয়ের সম্মতিই যথেষ্ট।
একইভাবে এ ব্যাপারেও শরিয়তে কোনো বাধা নেই যে, দুই ব্যক্তি যৌথভাবে কোনো জিনিস এরূপ শর্তাধীনে ক্রয় করবে যে, ঐ জিনিসের মূল্যে উভয়ের মধ্যে যার যতোটুকু অংশ আছে, সে অনুপাতে ঐ জিনিসের অংশ প্রত্যেকে পাবে। আর এটাই হলো 'ইনানে'র অর্থ। এ শ্রেণীর শিরকাত রসূলুল্লাহ্ (সা) এর আমলে চালু ছিলো এবং সাহাবিদের একটি দল এ ধরনের শিরকাতে অংশ নিতেন। তারা কোনো একটা জিনিস কয়েকজনে মিলে খরিদ করতেন এবং তাদের প্রত্যেকে তার মূল্যের একটা অংশ দিতেন, অত:পর দু'জনের একজন কিংবা উভয়ে একত্রে ক্রয় করার কাজটা সম্পন্ন করতেন। এখানে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ও উভয়ের মূলধন মিশ্রিত করার শর্ত আরোপের বাধ্য বাধকতার প্রমাণ কোথাও নেই। একইভাবে এতেও কোনো বাধা নেই যে, দু'জনের একজন অপরজনকে কোনো মাল ধারে কিনে দেয়া ও তাতে ব্যবসায় করার ক্ষমতা অর্পণ করবে এবং উভয়ে তার মুনাফায় শরিক হবে, যা পরিভাষাগতভাবে শিরকাতুল উজুহের মর্মার্থ। তবে এ ব্যাপারে যে সব শর্তের উল্লেখ করা হয়েছে, তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তদ্রূপ, দুই ব্যক্তির মধ্য থেকে একজন অপরজনকে তার পক্ষ থেকে মজুরির ভিত্তিতে ব্যবসায়ের কাজে নিয়োগ করবে, তাতেও শরিয়তে কোনো বাধা নেই এবং পরিভাষার দিক দিয়ে এটা হচ্ছে 'শিরকাতুল আবদান'। এখানেও শর্তারোপের কোনো অর্থ হয়না।
মোটকথা, এ সব ধরনের শিরকাতে যোগদানের জন্য শুধু উভয় পক্ষের সম্মতিই যথেষ্ট। কেননা এ সব ক্ষেত্রে প্রত্যেক শরিকের নিজ মালিকানাভুক্ত জিনিসকে ব্যবহার করা পারস্পরিক সম্মতির উপর নির্ভরশীল। পারস্পরিক সম্মতি ব্যতীত অন্য কিছু জরুরি নয়। যে সব ক্ষেত্রে শিরকাত 'ইজারা' বা 'ওয়াকালা'র পর্যায়ভুক্ত হয়, সে ক্ষেত্রেও তাতে শিরকাত ও ওয়াকালার বিধিই যথেষ্ট। এমতাবস্থায় ফকিহগণের এই সব শ্রেণী বিন্যাস ও শর্তারোপের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এর পেছনে কোনো প্রমাণও নেই। প্রকৃত পক্ষে এ কাজ এমন কঠিন ও দীর্ঘসূত্রী কিছু নয়। শিরকাতের মোদ্দা কথা হলো, চাই তা মুফাওয়াযা, ইনান বা 'উজুহ' যেটাই হোক, যে কোনো হালাল জিনিসের ক্রয় ও বিক্রয়ে একাধিক ব্যক্তি অবাধে অংশ গ্রহণ করতে পারবে এবং মুল্যে যার যতটুকু অংশ, সে ততটুকু লভ্যাংশ পাবে। এটা একটা সহজ-সরল ব্যাপার, যে কোনো সাধারণ মানুষও এটা বোঝে, আলেম বা ফকিহ তো দূরের কথা। মোটামুটিভাবে এর বৈধতার পক্ষে ফতোয়া দেয়া হয় আর চাই প্রত্যেক শরিক ক্রীত জিনিসের মূল্যে সম পরিমাণে অংশ নিক বা বিবিধ পরিমাণে, মূল্য নগদ অর্থের আকারে দেয়া হোক বা দ্রব্যের আকারে, ব্যবসায় খাটানো মূলধন উভয়ের সমগ্র সম্পত্তি হোক বা তার অংশ বিশেষ, এবং ক্রয়বিক্রয়ের কাজটা উভয় একত্রে করুক বা যে কোনো একজন করুক। যদিও মেনেও নেই যে, তারা শিরকাতের এই শ্রেণীগুলোকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করেছেন, কারণ পরিভাষা নির্ধারণ দোষের কিছু নয়। তথাপি প্রশ্ন ওঠে যে, এত সব শর্ত আরোপ এবং বিষয়গুলোকে এতো জটিল করার কী প্রয়োজন ছিলো? আপনি যদি একজন চাষীকে বা তরকারি বিক্রেতাকে কোনো জিনিসের ক্রয়বিক্রয় ও লভ্যাংশে শরিক হওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন, সে অতি সহজেই জবাব দেবে যে, এগুলো জায়েয ও সহজ। আর যদি জিজ্ঞাসা করেন, শিরকাতুল মুফাওয়াযা, ইনান ও উজুহ ইত্যাদি জায়েয কিনা, তবে সে এসব শব্দ বুঝতেই পারবে না। অবশ্য ফিক্হ শাস্ত্র নিয়ে যদি কিছু পড়াশুনা করে থাকে এবং তা মনে থেকে থাকে, তা হলে হয়তো কিছুটা বুঝতে পারবে। যুক্তি প্রমাণহীন বিষয়গুলোকে অনর্থক দীর্ঘ রূপ দেয়া কোনো প্রকৃত মুজতাহিদের কাজ হতে পারে না। প্রকৃত মুজতাহিদের কাজ হলো, সত্যকে অকপটে সত্য ও বাতিলকে অকপটে বাতিল বলে ঘোষণা করা এবং এ ব্যাপারে কারো বিরোধিতার পরোয়া না করা।'