📄 সংজ্ঞা
শরিয়তের পরিভাষায় গাছে পানি সেচ দিয়ে বড় করা ও ফল উৎপন্ন করা তার বিনিময়ে গাছের ফলের নির্দিষ্ট অংশ মালিক ও সেচদাতার মধ্যে ভাগ করে নেয়াকে মুসাকাত বলা হয়। এটা আসলে গাছ থেকে ফল ফলানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত যৌথ কৃষি কাজ। এতে গাছ থাকে এক পক্ষের, আর গাছের উপর কাজ করে আরেক পক্ষ এবং গাছ থেকে যে ফল পাওয়া যায় তা উভয় পক্ষের সম্মত হারে যথা অর্ধেক বা এক তৃতীয়াংশের হারে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়া হয়। যে ব্যক্তি গাছে সেচ দেয় তাকে মুসাকি বলা হয়। যে গাছ জমিতে কম পক্ষে এক বছর টিকে থাকে এবং যার কাটার কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ বা সময় নেই, সেই গাছই এর আওতাধীন, চাই তা ফলজ হোক বা বনজ হোক। গাছ যদি বনজ হয়, তবে মুসাকি বা সেচকারী তার কাজের বিনিময়ে গাছ থেকে প্রাপ্ত জ্বালানী কাঠ, তক্তা ইত্যাদির ভাগ পাবে।
📄 বিধান
মুসাকাত কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে বৈধ প্রমাণিত। ইমাম আবু হানিফা ব্যতীত অন্য সকল ফকিহের মতেও এটা বৈধ। যারা এটা বৈধ মনে করেন তাদের প্রমাণ নিম্নরূপ:
১. ইবনে উমর (রা) থেকে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) খয়বরবাসীর সাথে সেখানকার উৎপন্ন ফসলের অর্ধেকের বিনিময়ে কৃষি কাজের চুক্তি করেন।
২. ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন, আনসারগণ রসূলুল্লাহ্ (সা) কে বললেন: আমাদের (মুহাজির) ভাইদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে খেজুরের বাগান ভাগ করে দিন। রসূলুল্লাহ (সা) বললেন: না। তখন তারা বললেন: তবে শ্রমের দায়িত্ব আপনারা নিন। আর আমরা ফলের ভাগ আপনাদেরকে দেই? তখন রসূল (সা) বললেন: শুনলাম ও মেনে নিলাম।
আনসারগণ মুহাজিরদেরকে খেজুরের বাগানের শরীক করতে চেয়েছিলেন এবং রসূল (সা) কে সে জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখান করেন। তখন তারা তাকে খেজুর বাগানের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ এবং এর বিনিময়ে তাদেরকে অর্ধেক ফল দেয়ার প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেন।
'নাইলুল আওতার' গ্রন্থে আছে, হাযেমি বলেন: আলি ইবনে আবু তালিব (রা) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) আম্মার ইবনে ইয়াসার (রা) সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, মুহাম্মদ ইবনে সিরীন, উমর ইবনে আব্দুল আযিয, ইবনে আবি লায়লা, ইবনে শিহাব যুহরি, বিচারপতি আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান বলেন: যৌথ কৃষি কাজ ফসলের বা ফলের অংশ বিশেষের বিনিময়ে জায়েয, যেমন খয়বরে হয়েছিল।
📄 মুসাকাতের মূল উপাদান
মুসাকাতের মূল উপাদান দুটি: ১ ইজাব (প্রস্তাব দেয়া) ২ কবুল (প্রস্তাব গ্রহণ) মৌখিকভাবে, লিখিতভাবে বা ইশারায় এমন যে কেউ ইজাব ও কবুল করলে মুসাকাতের চুক্তি সম্পাদিত হবে, যার চুক্তি সম্পাদনের শরিয়ত সম্মত যোগ্যতা রয়েছে।
📄 শর্তাবলী
মুসাকাতের শর্তাবলী নিম্নরূপ:
১. যে গাছ সম্পর্কে মুসাকাতের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বা হবে, তা যেন দেখে বা বিবরণের মাধ্যমে জানা যায়। কেননা কোনো অজানা জিনিসের উপর চুক্তি জায়েয নেই।
২. এর মেয়াদ জানা থাকা চাই, যাতে কোনো অস্বচ্ছতা, অস্পষ্টতা ও ধোঁকার সম্ভাবনা না থাকে। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ বলেন: মেয়াদ স্পষ্ট করে জানানো মুসাকাতের জন্য শর্ত নয়। কেননা ফল বা ফসল কখন পাকে তা প্রায় সবাই জানে এবং সামান্যই হেরফের হয়। যাহেরি মযহাবের মতে এটা আদৌ শর্ত নয়। তাদের প্রমাণ হচ্ছে ইমাম মালেক বর্ণিত হাদিস, রসূলুল্লাহ্ (সা) ইহুদিদেরকে বলেছিলেন: 'আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যে বিধি নির্ধারণ করেছেন, আমিও তাই নির্ধারণ করছি।' হানাফিদের মত হলো: ফল পাকার আগে মুসাকাতের মেয়াদ শেষ হলে গাছগুলোকে মুসাকির তদারকিতে রাখা হবে এবং সে ফল পাকা পর্যন্ত বিনা মজুরিতে তার কাজ করে যাবে।
৩. মুসাকাতের চুক্তি ফলের পরিপক্কতার স্তরে পৌঁছার আগে সম্পাদন করতে হবে। কেননা ঐ স্তরে থাকতে তার কাজ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পরিপক্কতা লাভের পর কোনো কোনো ফকিহের মতে মুসাকাত জায়েয নেই। কেননা তখন তার আর প্রয়োজন থাকে না, আর এরপর এ কাজ করা হলে তা হবে ইজারা, মুসাকাত নয়। কোনো কোনো ফকিহের মতে, পরিপক্কতা লাভের পরও মুসাকাত জায়েয। কেননা আল্লাহ্ ফল সৃষ্টি করার আগে যখন মুসাকাত জায়েয করেছেন, তখন ফল সৃষ্টির পরে তো আরো ভালোভাবে জায়েয হবে।
৪. অর্ধেক হোক বা এক তৃতীয়াংশ হোক, ফলের একটা অংশ মুসাকির জন্য আগে ভাগেই নির্ধারণ করে দিতে হবে। মুসাকি বা মালিকের জন্য গাছ নির্ধারণ বা পরিমাণ নির্ধারণ অবৈধ। 'বিদায়াতুল মুজতাহিদ' নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে: 'যারা মুসাকাতের বৈধতার পক্ষপাতী, তারা একমত যে, সেচের সমস্ত খরচ মালিকের, আর শ্রম দেয়া ছাড়া মুসাকির আর কোনো দায়িত্ব নেই এ নীতির ভিত্তিতে মুসাকাত জায়েয নেই। কেননা এমন একটা জিনিসের বিনিময়ে এ ধরনের চুক্তি করা হয়, যা এখনো সৃষ্টিই হয়নি।'
উল্লেখিত শর্তাবলীর একটিও বাদ পড়লে মুসাকাত বাতিল হবে। তথাপি এ ধরনের চুক্তির ভিত্তিতে মুসাকি যদি কাজ করে এবং তার কাজের কারণে গাছে ফল ধরে, তবে সে প্রচলিত নিয়মে মজুরি পাবে এবং গাছের ফল মালিকের থাকবে।