📄 ব্যক্তিগত কেফালা
ব্যক্তিগত কেফালা হচ্ছে, কফিল কর্তৃক এই মর্মে দায়িত্ব গ্রহণ করা যে, সে যে ব্যক্তির দায়িত্ব নিয়েছে, যার জন্য দায়িত্ব নিয়েছে তাকে তার কাছে সশরীরে পৌছিয়ে দেবে। 'আমি অমুকের জামিন হলাম' 'অমুকের শরীরের জামিন হলাম' ইত্যাকার কথার মাধ্যমে ব্যক্তিগত কেফালা সম্পন্ন হয়। যার দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়েছে, তার উপর যখন অন্য কারো কিছু পাওনা থাকে, তখন এ ধরনের কেফালা জায়িয। এই পাওনার পরিমাণ জানা শর্ত নয়। কেননা সে শরীরের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, সম্পদের নয়।
তবে কেফালা যখন আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি বা হুদুদ সংক্রান্ত হয়, তখন কেফালা তথা জামানত জায়িয হবে না, চাই সে শাস্তি আল্লাহর হক সংক্রান্ত হোক, যেমন মদ খাওয়ার শাস্তি, অথবা মানুষের হক সংক্রান্ত হোক, যেমন অপবাদের শাস্তি। এটা অধিকাংশ আলেমের মত। এর প্রমাণ আমর ইবনে শুয়াইব বর্ণিত হাদিস, যাতে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: 'শরিয়ত নির্ধারিত কোনো শাস্তির ব্যাপারে কেফালা চলবে না।' (বায়হাকি)। এর যুক্তি হলো, এই শাস্তি যে কোনো সন্দেহের কারণে রহিত হয়ে যায়। কারো নিশ্চয়তা দানে কিছু যায় আসে না। কারণ অপরাধী ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে তা আদায় করা সম্ভব নয়।
ইমাম শাফেয়ির মতে যার উপর কোনো মানুষের হক সংক্রান্ত শাস্তি প্রযোজ্য, যেমন কিসাস ও অপবাদের শাস্তি, তাকে সশরীরে পৌছিয়ে দেয়ার জন্য জামিন হওয়া জায়েয। কেননা এটা একটা সুনিশ্চিত ও অকাট্য হক। তবে আল্লাহ্ হক সংক্রান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে কেফালা জায়েয নেই। ইবনে হামের মতে ব্যক্তিগত কেফালা অবৈধ। তিনি বলেন: 'সশরীরে হাজির করার দায়িত্ব গ্রহণ, চাই মালের ব্যাপারে হোক, চাই শাস্তির ব্যাপারে বা অন্য কোনো জিনিসের ব্যাপারে হোক, জায়েয নেই। কেননা আল্লাহর কিতাবে নেই এমন যে কোনো শর্ত বাতিল। যে ব্যক্তি ব্যক্তিগত কেফালা বৈধ মনে করে, তাকে জিজ্ঞাসা: যার জন্যে জামিন হয়েছে, সে যদি নিখোঁজ হয়ে যায়, তাহলে জামিনের সাথে কী আচরণ করা হবে? তাকে কি নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির কাছে যা পাওনা ছিলো, তার জন্য দায়ী করা হবে? তা যদি করা হয় তবে তো এটা হবে যুলুম ও অবৈধ অর্থ আত্মসাৎ। কেননা সে তো কখনো এর দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। তবে কি তাকে অব্যাহতি দেয়া হবে? তা করলে তা ব্যক্তিগত জমানত বাতিল করা হবে। নাকি তার দাবির জন্য তাকে দায়ী করা হবে? তা করলে তো একটা অসাধ্য ও অসম্ভব কাজের দায় তার ঘাড়ে চাপানো হবে, যার দায়িত্ব কখনো আল্লাহ তার উপর চাপাননি।
অবশ্য একদল আলেম ব্যক্তিগত কেফালা জায়েয বলে রায় দিয়েছেন। তারা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) একটা সন্দেহজনক বিষয়ে জামিন হয়েছিলেন। তবে এ তথ্যটি এমন দুর্বল হাদিসভিত্তিক, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
যা হোক, যখন তাকে সশরীরে পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব কফিল গ্রহণ করেছে তখন তাকে পৌছিয়ে দিতেই হবে। কিন্তু জীবিতাবস্থায় তাকে পৌঁছানো অসম্ভব হলে অথবা কফিল তাকে পৌঁছানো থেকে বিরত থাকলে তার কাছে যা পাওনা, তা কফিলকেই পরিশোধ করতে হবে। কেননা রসূল (সা) বলেন: 'কফিল দায়বদ্ধ।' তবে কফিল যদি শর্ত আরোপ করে থাকে যে, খাতককে সে সশরীরে পৌছাবে, কিন্তু মালের দায়িত্ব নেবেনা, তাহলে সে তার পাওনা পরিশোধ করতে বাধ্য হবে না। এটা মালিকি মযহাব ও মদিনার ফকিহদের মত। হানাফিরা বলেন: কফিল যার যামিন হয়েছে তাকে এনে না দেয়া বা তার মৃত্যুর খবর না জানা পর্যন্ত তাকে আটক রাখা হবে। অরা আরো বলেছেন: মূল দায়বদ্ধ ব্যক্তি তথা খাতক যখন মারা যাবে, তখন মৃত ব্যক্তির কাছে যা পাওনা ছিল, কফিল তার জন্য দায়ী হবে না। কেননা সে তাকে শারীরিকভাবে পৌঁছানোর দায়িত্ব নিয়েছিল, তার কাছে পাওনা পরিশোধ করার নয়। কাজেই যার দায়িত্ব সে নেয়নি, তার জন্য সে দায়ী হবে না। এটা ইমাম শাফেয়ির একাধিক মতের মধ্যে অধিকতর প্রসিদ্ধ মত। মূল দায়বদ্ধ ব্যক্তি যদি নিজেই আত্মসমর্পণ করে, তবে কাফিলের আর কোনো দায়িত্ব থাকবে না। কফিল যার পাওনা পরিশোধের দায় গ্রহণ করেছে, সে মারা গেলে কফিল দায়মুক্ত হবে না বরং মৃতের উত্তরাধিকারীরা খাতককে সশরীরে পৌছিয়ে দেয়ার দাবি করার হকদার হবে।
📄 আর্থিক কেফালা
আর্থিক কেফালা হচ্ছে, কফিল যাতে আর্থিক দায় গ্রহণ করে। এটা তিন প্রকার:
১. ঋণ পরিশোধ করে দেয়ার জামিন হওয়া: অর্থাৎ অন্য কোনো ব্যক্তির ঋণের বোঝা নিজের ঘাড়ে তুলে নেয়া। সাল্যা ইবনে আওয়া' বর্ণনা করেন: রসূল (সা) একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জানাযার নামায পড়তে অস্বীকৃতি জানালেন। তখন আবু কাতাদা বললেন: হে রসূল, ওর জানাযার নামায পড়ুন, ওর ঋণের দায় আমি নিলাম। তখন রসূলুল্লাহ্ (সা) তার জানাযা পড়লেন। (বুখারি ও আহমদ)।
অধিকাংশ আলেমের মতে মৃত ব্যক্তির জন্যে জামিন হওয়া বৈধ এবং যে ব্যক্তি জামিন হবে, সে ঐ মৃতের মাল থেকে কোনো দাবি করতে পারবে না। ঋণ পরিশোধের জামিন হওয়ার জন্যে দুটো শর্ত:
ক. জামিন হওয়ার সময় ঋণ বহাল থাকা: যথা, ধার গ্রহণজনিত ঋণ, মূল্য বাকি পড়া জনিত ঋণ, শ্রমের অপরিশোধিত মজুরি ও অপরিশোধিত দেনমোহর। এ সব ঋণ যদি বহাল না থাকে তবে কেফালা বৈধ হবে না। কেননা যে ঋণ পাওনা নেই, তার জামিন হওয়া অশুদ্ধ। এর উদাহরণ হলো কাউকে বলা: 'অমুকের কাছে জিনিসটা বেচে দাও, ওর মূল্যের জন্যে আমি দায়ী হলাম', অথবা 'অমুককে ঋণ দাও, আমি তা পরিশোধের দায়িত্ব নিলাম'। ইমাম শাফেয়ি, ইমাম মুহাম্মদ ও যাহেরি মযহাবের মতানুসারে এটা জায়েয নয়। কিন্তু আবু হানিফা, ইমাম মালেক ও ইমাম আবু ইউসূফের মতে জায়েয। তাদের মতে, যা এখনো পাওনা হয়নি, তার জামিন হওয়াও জায়েয।
খ. যে মালের জামিন হবে, তা পরিচিত ও নির্দিষ্ট হওয়া চাই। অজানা মালের জামিন হওয়া বৈধ হবে না। কেননা এতে ধোঁকার অবকাশ থাকে। উদাহরণ স্বরূপ কেউ যদি বলে, 'অমুকের কাছে তোমার যা পাওনা আছে আমি তার জামিন হলাম' অথচ দুজনের কেউই তার পরিমাণ জানেনা, তবে এটা জায়েয হবে না। এটা ইমাম শাফেয়ি ও ইবনে হাম্বলের মত। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদের মতে অজানা মালের জামিন হওয়াও জায়েয।
২. সুনির্দিষ্ট বস্তুর জামিন হওয়া: অর্থাৎ অন্যের হাতে রয়েছে এমন সুনির্দিষ্ট বস্তু হস্তান্তরের দায়িত্ব গ্রহণ করা। যেমন জবরদখলকৃত বস্তুকে জবরদখলকারীর নিকট ফিরিয়ে দেয়া এবং বিক্রীত পণ্য ক্রেতার নিকট হস্তান্তর করা। এখানে শর্ত হলো, যে বস্তুর জামিন হয়েছে, তা যেন যার জন্যে জামিন হয়েছে, অর্থাৎ খাতকের জন্যে ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা প্রাপ্ত হয়। জবরদখলকৃত বস্তুর ক্ষেত্রে হয়। ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা যদি না হয়, যেমন ধারে নেয়া জিনিস ও আমানত হিসাবে রক্ষিত জিনিস তাহলে কেফালা জায়েয হবেনা।
৩. ঝুঁকি এড়ানোর জামিন হওয়া: অর্থাৎ বিক্রীত মালের উপর বিক্রয়ের আগেকার কোনো কারণ বশতঃ ঝুঁকি থাকলে তার জামিন হওয়া। অন্য কথায়, বিক্রয়ের পর যখন বিক্রীত মালের অন্য কোনো হকদার আত্মপ্রকাশ করে, তখন ক্রেতার প্রাপ্য যে ঝুঁকির সম্মুখীন হয়, তা থেকে তাকে উদ্ধার করার নিশ্চয়তা দেয়া ও বিক্রেতার বিপক্ষে ক্রেতার জন্যে নিশ্চিত ও নিরাপদ করা। উদাহরণ স্বরূপ, বিক্রয়ের পর জানা গেল, পণ্যটির মালিক বিক্রেতা নয়, অন্য একজন, অথবা ওটা বন্ধকী মাল।
📄 জামিন কর্তৃক খাতকের কাছে পাওনা দাবি করা
জামিন যখন খাতকের ঋণ পরিশোধ করে দেয়, তখন সে যদি খাতকের অনুমতি বা অনুরোধক্রমে জামিন হয়ে থাকে ও পরিশোধ করে থাকে, তবে খাতকের নিকট তা দাবি করতে পারবে। কেননা সে ঐ ব্যক্তিকে তার অনুমতিক্রমে নিজের সম্পদ ব্যয় করে উপকৃত করেছে। এ বিষয়ে চার ইমামেরই মতৈক্য রয়েছে। তবে তার অনুমতি বা আদেশ ব্যতীত জামিন হলে ও ব্যয় করলে তা দাবি করতে পারবে কিনা, তাতে মতভেদ রয়েছে ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আবু হানিফা বলেন: সে স্বেচ্ছায় ব্যয় করেছে কাজেই সে এটা চাইতে পারবে না। ইমাম মালেকের মতে, চাইতে পারবে। ইমাম আহমদের দুটি মত বর্ণিত: একটি মত অনুসারে চাইতে পারবে, অপর মত অনুসারে চাইতে পারবে না। ইমাম হাযম বলেন: অনুরোধ বা অনুমতি নিয়ে জামিন হোক ও ব্যয় করুক, বা অনুমতি ও অনুরোধ ছাড়াই জামিন হোক ও ব্যয় করুক, যা ব্যয় করেছে তা চাইতে পারবে না। তবে খাতক যদি তার কাছে ধার চেয়ে থাকে, তবে চাইতে পারবে। ইবনে হাযম বলেন: ইবনে আবি লায়লা, ইবনে শারুমা, আবু নূর ও আবু সুলায়মান আমাদের মতের অনুরূপ মত প্রকাশ করেছেন।
📄 কেফালার কয়েকটি বিধি
১. কোনো ব্যক্তি যখন কারো জামিন হয়, তখন যার জামিন হয়, সে যদি নিখোঁজ হয় বা মারা যায়, তবে জামিন তার জন্য দায়ী হবে। নিজের পক্ষ থেকে অথবা যার জামিন হয়েছে তার কাছ থেকে নিয়ে পাওনা পরিশোধ করা, ঋণদাতা কর্তৃক তাকে ঋণ পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দেয়া, অথবা নিজেই জামিন হওয়া থেকে অব্যাহতি নেয়া ছাড়া সে এই দায় এড়ানোতে পারে না। সে জামিন হওয়া থেকে অব্যাহতি নিতে পারে। কেননা এটা তার অধিকার।
২. ঋণদাতার ক্ষমতা রয়েছে কেফালার চুক্তি বাতিল করার, চাই তাতে খাতক বা জামিন সম্মত হোক বা না হোক। তবে খাতক বা জামিনের এ ক্ষমতা নেই।