📄 তাহকিকে, পর্যায় ও সময় নির্ভর জামানত
কেফালা বা জামানত তাৎক্ষণিক, শর্তযুক্ত ও সময়নির্ভর এই তিন ধরনের হতে পারে। তাৎক্ষণিক কেফালার উদাহরণ হলো, কফিল বা জামিন বলবে: 'আমি এই মুহূর্ত থেকেই অমুকের জামিন হচ্ছি ও তার তত্ত্বাবধানের ভার নিচ্ছি।' এ ছাড়া কেউ যদি বলে: 'আমি দায়িত্ব বহন করলাম, কফিল হলাম, জামিন হলাম, তত্ত্বাবধায়ক হলাম, অভিবাবক হলাম, কিংবা সে আমার দায়িত্বে রইল, সে আমার উপর ন্যস্ত রইল, তবে এ সবই কেফালা বা জামানত হবে।
এভাবে যখন কেফালা সম্পন্ন হবে, তখন তা সংশ্লিষ্ট ঋণ তাৎক্ষণিক, বা মেয়াদী বা কিস্তিভিত্তিক যে ভাবেই পরিশোধ করার চুক্তি থাকুক, কফিল বা জামিন তা সেই ভাবে পরিশোধ করতে বাধ্য হবে। তবে ঋণ যদি তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করার কথা থেকে থাকে, কিন্তু কফিল সেটিকে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বিলম্বিত করার শর্ত আরোপ করে, তবে এই শর্ত বৈধ হবে। কেননা ইবনে মাজা ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ (সা) এমন এক ব্যক্তির দশ দিনারের ঋণের দায় গ্রহণ করেছিলেন, যা তার খাতকের উপর পরিশোধ করার অঙ্গীকার ছিলো এবং তিনি এক মাস পর পরিশোধ করে দিয়েছিলেন। এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, ঋণ যদি তাৎক্ষণিকও হয় কিন্তু কফিল নির্দিষ্ট মেয়াদের পর দেয়ার শর্তে তার দায় গ্রহণ করে, তবে এই শর্তযুক্ত দায় গ্রহণ শুদ্ধ এবং কাফিলের নিকট ঐ মেয়াদ অতিবাহিত হবার আগে পরিশোধের দাবি করা যাবে না।
আর শর্ত যুক্ত কেফালার উদাহরণ হলো, যেমন: 'তুমি যদি অমুককে ঋণ দাও তবে আমি তার জন্যে দায়ী।' সূরা ইউসুফের ৭২ নং আয়াতে যে বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি ওটা এনে দেবে, সে এক উট বোঝাই মাল পাবে এবং আমিই তার জন্যে জামিন। এটাও শর্তযুক্ত জামানতের উদাহরণ।
আর সময় নির্ভর জামানতের উদাহরণ হলো, 'রমযান মাস যখন আসবে তখন আমি তোমার জামিন হব'।
এটা ইমাম আবু হানিফা ও কিছু সংখ্যক হাম্বলি ফকিহের মত। ইমাম শাফেয়ির মতে কেফালায় শর্ত প্রযোজ্য নয়।
📄 কফিল ও খাতক উভয়ের নিকট একই সাথে ঋণ ফেরত চাওয়া
কেফালার চুক্তি যখন সম্পন্ন হবে, তখন কফিল তথা জামিন ও খাতক উভয়ের নিকট পাওনা পরিশোধের দাবি করা বৈধ। অনুরূপ দুজনের যে কোনো একজনের নিকট চাওয়াও বৈধ। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত।
📄 কেফালার শ্রেণীভেদ
কেফালা দু' ধরনের:
ব্যক্তিগত কেফালা।
আর্থিক কেফালা।
📄 ব্যক্তিগত কেফালা
ব্যক্তিগত কেফালা হচ্ছে, কফিল কর্তৃক এই মর্মে দায়িত্ব গ্রহণ করা যে, সে যে ব্যক্তির দায়িত্ব নিয়েছে, যার জন্য দায়িত্ব নিয়েছে তাকে তার কাছে সশরীরে পৌছিয়ে দেবে। 'আমি অমুকের জামিন হলাম' 'অমুকের শরীরের জামিন হলাম' ইত্যাকার কথার মাধ্যমে ব্যক্তিগত কেফালা সম্পন্ন হয়। যার দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়েছে, তার উপর যখন অন্য কারো কিছু পাওনা থাকে, তখন এ ধরনের কেফালা জায়িয। এই পাওনার পরিমাণ জানা শর্ত নয়। কেননা সে শরীরের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, সম্পদের নয়।
তবে কেফালা যখন আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি বা হুদুদ সংক্রান্ত হয়, তখন কেফালা তথা জামানত জায়িয হবে না, চাই সে শাস্তি আল্লাহর হক সংক্রান্ত হোক, যেমন মদ খাওয়ার শাস্তি, অথবা মানুষের হক সংক্রান্ত হোক, যেমন অপবাদের শাস্তি। এটা অধিকাংশ আলেমের মত। এর প্রমাণ আমর ইবনে শুয়াইব বর্ণিত হাদিস, যাতে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: 'শরিয়ত নির্ধারিত কোনো শাস্তির ব্যাপারে কেফালা চলবে না।' (বায়হাকি)। এর যুক্তি হলো, এই শাস্তি যে কোনো সন্দেহের কারণে রহিত হয়ে যায়। কারো নিশ্চয়তা দানে কিছু যায় আসে না। কারণ অপরাধী ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে তা আদায় করা সম্ভব নয়।
ইমাম শাফেয়ির মতে যার উপর কোনো মানুষের হক সংক্রান্ত শাস্তি প্রযোজ্য, যেমন কিসাস ও অপবাদের শাস্তি, তাকে সশরীরে পৌছিয়ে দেয়ার জন্য জামিন হওয়া জায়েয। কেননা এটা একটা সুনিশ্চিত ও অকাট্য হক। তবে আল্লাহ্ হক সংক্রান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে কেফালা জায়েয নেই। ইবনে হামের মতে ব্যক্তিগত কেফালা অবৈধ। তিনি বলেন: 'সশরীরে হাজির করার দায়িত্ব গ্রহণ, চাই মালের ব্যাপারে হোক, চাই শাস্তির ব্যাপারে বা অন্য কোনো জিনিসের ব্যাপারে হোক, জায়েয নেই। কেননা আল্লাহর কিতাবে নেই এমন যে কোনো শর্ত বাতিল। যে ব্যক্তি ব্যক্তিগত কেফালা বৈধ মনে করে, তাকে জিজ্ঞাসা: যার জন্যে জামিন হয়েছে, সে যদি নিখোঁজ হয়ে যায়, তাহলে জামিনের সাথে কী আচরণ করা হবে? তাকে কি নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির কাছে যা পাওনা ছিলো, তার জন্য দায়ী করা হবে? তা যদি করা হয় তবে তো এটা হবে যুলুম ও অবৈধ অর্থ আত্মসাৎ। কেননা সে তো কখনো এর দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। তবে কি তাকে অব্যাহতি দেয়া হবে? তা করলে তা ব্যক্তিগত জমানত বাতিল করা হবে। নাকি তার দাবির জন্য তাকে দায়ী করা হবে? তা করলে তো একটা অসাধ্য ও অসম্ভব কাজের দায় তার ঘাড়ে চাপানো হবে, যার দায়িত্ব কখনো আল্লাহ তার উপর চাপাননি।
অবশ্য একদল আলেম ব্যক্তিগত কেফালা জায়েয বলে রায় দিয়েছেন। তারা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) একটা সন্দেহজনক বিষয়ে জামিন হয়েছিলেন। তবে এ তথ্যটি এমন দুর্বল হাদিসভিত্তিক, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
যা হোক, যখন তাকে সশরীরে পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব কফিল গ্রহণ করেছে তখন তাকে পৌছিয়ে দিতেই হবে। কিন্তু জীবিতাবস্থায় তাকে পৌঁছানো অসম্ভব হলে অথবা কফিল তাকে পৌঁছানো থেকে বিরত থাকলে তার কাছে যা পাওনা, তা কফিলকেই পরিশোধ করতে হবে। কেননা রসূল (সা) বলেন: 'কফিল দায়বদ্ধ।' তবে কফিল যদি শর্ত আরোপ করে থাকে যে, খাতককে সে সশরীরে পৌছাবে, কিন্তু মালের দায়িত্ব নেবেনা, তাহলে সে তার পাওনা পরিশোধ করতে বাধ্য হবে না। এটা মালিকি মযহাব ও মদিনার ফকিহদের মত। হানাফিরা বলেন: কফিল যার যামিন হয়েছে তাকে এনে না দেয়া বা তার মৃত্যুর খবর না জানা পর্যন্ত তাকে আটক রাখা হবে। অরা আরো বলেছেন: মূল দায়বদ্ধ ব্যক্তি তথা খাতক যখন মারা যাবে, তখন মৃত ব্যক্তির কাছে যা পাওনা ছিল, কফিল তার জন্য দায়ী হবে না। কেননা সে তাকে শারীরিকভাবে পৌঁছানোর দায়িত্ব নিয়েছিল, তার কাছে পাওনা পরিশোধ করার নয়। কাজেই যার দায়িত্ব সে নেয়নি, তার জন্য সে দায়ী হবে না। এটা ইমাম শাফেয়ির একাধিক মতের মধ্যে অধিকতর প্রসিদ্ধ মত। মূল দায়বদ্ধ ব্যক্তি যদি নিজেই আত্মসমর্পণ করে, তবে কাফিলের আর কোনো দায়িত্ব থাকবে না। কফিল যার পাওনা পরিশোধের দায় গ্রহণ করেছে, সে মারা গেলে কফিল দায়মুক্ত হবে না বরং মৃতের উত্তরাধিকারীরা খাতককে সশরীরে পৌছিয়ে দেয়ার দাবি করার হকদার হবে।