📄 অস্ত্র দিয়ে শিকার করার শর্তাবলী
অস্ত্র দিয়ে শিকার করার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলী প্রযোজ্য:
১. অস্ত্রটি যেন শিকারের দেহ ক্ষত করে তার ভেতরে ঢুকে যায়। 'আদি ইবনে হাতিম বললেন: হে রসূলুল্লাহ্, আমরা তীর নিক্ষেপে অভ্যস্ত। আমাদের জন্য কী হালাল? রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: 'তোমরা যা জবাই করেছ তা ভক্ষণ কর, আর যে প্রাণীর উপর তোমরা আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করেছ এবং তাকে ক্ষতি করেছ তা ভক্ষণ কর। ইমাম শাওকানি বলেন: এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হলো, একমাত্র ক্ষত করাই জরুরি, চাই তা ভোঁতা অস্ত্র দিয়েই হোক না কেন। সুতরাং আধুনিক বন্দুক দিয়ে গুলি ছুঁড়ে যে শিকার করা হয় তাও হালাল। কেননা গুলিতে অন্য অস্ত্রের চেয়ে বেশি ক্ষত হয়, কাজেই অন্য অস্ত্রের শিকার যেমন হালাল, বন্দুকের শিকারও তেমনি হালাল, কেবল গুলি করার সময় আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করলেই হলো, পরে জবাই করার সুযোগ না পেলেও ক্ষতি নেই।
পক্ষান্তরে যে হাদিসে বন্দুক দ্বারা আহত কিন্তু জবাই করা হয়নি এমন প্রাণী খেতে নিষেধ করা হয়েছে এবং তাকে 'প্রহারে মৃত প্রাণী' বিবেচনা করা হয়েছে, সে হাদিসে উল্লেখিত বন্দুক দ্বারা এমন বন্দুক বুঝানো হয়েছে, যা মাটি দ্বারা বানানো হয়, অত:পর তা শুকানো হয় এবং শুকানোর পর তা দিয়ে গুলি ছোঁড়া হয়। ঐ বন্দুক গুলি-বারুদ ছোড়া বন্দুকের মত নয়। মাটির তৈরি বন্দুকের শিকার খেতে যেমন ইসলাম নিষেধ করেছে, তেমনি নিষেধ করেছে ইট পাথর বা অনুরূপ জিনিস দ্বারা মারা প্রাণী খেতেও। এর ব্যাখ্যা দিয়ে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন; 'ওটা কোনো শিকারও বধ করেনা, কোনো শত্রুকেও হত্যা করেনা, তবে তা কোনো প্রাণীর দাঁত ভাঙে ও চোখ উপড়ায়।'
তদ্রূপ লাঠি বা অনুরূপ কোনো ভোঁতা জিনিস দ্বারা যাকে আঘাত করা হয়, যদি তা জীবিত থাকতে থাকতে জবাই করা না হয়, তবে হারাম। আদি (রা) রসূলুল্লাহ (সা) কে বললেন: আমি তীর মেরে শিকার করি। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তীর নিক্ষেপের ফলে যদি তা দেহে বিদ্ধ হয় তবে খাও। আর তীর তার পাশ দিয়ে চলে গেলে খাবেনা।'
২. শিকারকে তীর বর্শা বা গুলি ছোঁড়ার সময় শিকারী কর্তৃক আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা। ইতিপূর্বে আবু সা'লাবা বর্ণিত হাদিস, অন্যান্য হাদিস ও আয়াতের আলোকে আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা যে শরিয়তের আলোকে প্রয়োজনীয় সে ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। মতভেদ রয়েছে শুধু এটা শর্ত কিনা সে ব্যাপারে। আবু সাওর, শা'বি, দাউদ যাহরি ও মুহাদ্দেসগণের একটি গোষ্ঠীর মত হলো, আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা সর্বাবস্থায় শর্ত। ইচ্ছায় হোক, বা ভুলক্রমে হোক, আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ না করা হলে হালাল হবে না। সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুসারে এটা ইমাম আহমদেরও মত। ইমাম আবু হানিফা বলেন: ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারণে বিরত থাকলে হারাম আর ভুলক্রমে বিরত থাকলে হালাল। ইমাম মালেকের অভিমতও তদ্রূপ। ইমাম শাফেয়ি ও মালিকি ফকিহদের একদল বলেন: আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা সুন্নাত। তাই কেউ যদি এটা ইচ্ছাকৃভাবেও বর্জন করে, তবে শিকার হারাম হবে না বরং খাওয়া হালাল হবে। আল্লাহর নাম উচ্চারণের আদেশটি তাদের মতে মুস্তাহাব অর্থবোধক।
📄 শিকারি জন্তু দ্বারা শিকার করার শর্তাবলী
বাজপাখি, চিতাবাঘ, কুকুর ইত্যাদি, যার শিক্ষা গ্রহণের যোগ্যতা আছে, তা দ্বারা শিকার করার উপর নিম্নোক্ত শর্তাবলী প্রযোজ্য:
১. প্রাণীটিকে শিকার শিক্ষা দেয়া। শিক্ষা কার্যকরী হচ্ছে বুঝা যাবে যদি তাকে যা আদেশ করা হয় তা করে এবং যা নিষেধ করা হয় তা থেকে বিরত থাকে।
২. ধৃত শিকার থেকে নিজে কিছু না খেয়ে মালিকের জন্য রেখে দেয়। যদি খায় তবে বুঝতে হবে সে নিজের জন্য ধরেছে এবং তার শিকার হালাল হবেনা। আদি ইবনে হাতিম বর্ণিত হাদিসে রসূল (সা) তাকে বললেন: 'তোমার শেখানো কুকুরদেরকে যখন শিকার ধরতে পাঠাও এবং তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর, তখন তারা যা তোমার জন্য ধরে আনে তা খাও। আর কুকুর নিজে যদি খায় তবে খাবেনা। কেননা আমার আশংকা হয়, তার শিকার তার নিজের জন্য ধৃত।'
৩. শিকারী প্রাণীকে তার মালিক কর্তৃক আল্লাহর নাম উচ্চারণ পূর্বক পাঠানো চাই। আল্লাহ্র নাম উচ্চারণের বিধান ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। আর প্রাণীটি ইচ্ছাকৃভাবে পাঠানো শিকারের বৈধতার অন্যতম শর্ত। শিকারী প্রাণী যদি স্বতস্ফূর্তভাবে মালিক কর্তৃক তাকে না পাঠানো সত্ত্বেও বা কোনো প্রকার উৎসাহ না দেয়া সত্ত্বেও শিকার ধরতে চলে যায়, তবে তার শিকার খাওয়া ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আবু সাওর প্রমুখের মতে হালাল হবেনা। কেননা তাকে না পাঠানো সত্ত্বেও সে কেবল নিজের জন্য শিকার করেছে এবং এতে শিকারী প্রাণীর মালিকের কোনো ভূমিকা নেই। কাজেই এ শিকার যে তার, তা বলা যাবেনা। কেননা এর উপর আদি ইবনে হাতেমের হাদিস প্রযোজ্য নয়। শর্তের মর্মার্থ দাঁড়ায়, যাকে পাঠানো হয়নি, সে বৈধ শিকারকারী নয়। কিন্তু আতা ও আওযায়ি বলেন: শিকারী প্রাণীকে যখন শিকার শেখানো হয়েছে এবং তাকে শিকারের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে, তখন তার শিকার খাওয়া যাবে।
📄 একটি শিকার করায় দুটো শিকারী প্রাণী শরীক হওয়া
যখন দুটো শিকারী প্রাণীকে তাদের মালিক শিকার ধরতে পাঠায়, এবং তারা উভয়ে একই শিকার ধরে, তখন তা হালাল। কিন্তু যখন দুটোর একটাকে পাঠানো হয় এবং অপরটাকে পাঠানো হয়না, তখন তা খাওয়া যাবেনা। রসূল (সা) বলেছেন: 'তুমি তো তোমার কুকুর পাঠানোর সময় আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করেছ, অন্যটা পাঠানোর সময় করনি।'
📄 ইহুদি ও খ্রিষ্টানের শিকারী কুকুর দ্বারা শিকার করা
ইহুদি ও খ্রিষ্টানের প্রশিক্ষিত কুকুর ও বাজপাখি দ্বারা শিকার করা জায়েয যদি শিকারকারী মুসলমান হয়।