📄 লাভজনক উদ্দেশ্য ব্যতীত প্রাণী হত্যা
রসূলুল্লাহ্ (সা) খাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যতীত কোনো প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। নাসায়ি ও ইবনে হাব্বান বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি অযথা কোনো চড়ুইকে হত্যা করবে, উক্ত চড়ুই কিয়ামতের দিন এই বলে অভিযোগ করবে: 'হে আল্লাহ্, অমুক আমাকে বিনা কারণে হত্যা করেছে, এবং কোনো উপকার লাভের উদ্দেশ্যে হত্যা করেনি।' মুসলিম ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যস্থল বানাবেনা।'
একদিন রসূলুল্লাহ্ (সা) কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দেখলেন, কিছু লোক একটা পাখিকে লক্ষ্যস্থল বানিয়ে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছে। তখন তিনি বললেন: 'যারা এমন কাজ করছে, আল্লাহ্ তাদের উপর অভিসম্পাত করুন।'
📄 শিকারির শর্তাবলী
জবাইকারীর মধ্যে যে শর্তবালী থাকা প্রয়োজন, শিকার করা জন্তু খাওয়া হালাল হওয়ার জন্য শিকারীর মধ্যেও সেই সব শর্ত থাকা জরুরি। শিকারীর মুসলমান বা কিতাবী হওয়া শর্ত। ইহুদি বা খ্রিষ্টানের শিকার তার জবাই করা জন্তুর মতোই হালাল। অনুরূপ শরয়ী জবাইর অধ্যায়ে অন্য যে সব শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, এ ক্ষেত্রেও সেই সব শর্ত প্রযোজ্য।
📄 ক্ষত সৃষ্টিকারী অস্ত্র দ্বারা ও জন্তু দ্বারা শিকার করা
শিকার করা কখনো ক্ষত সৃষ্টিকারী অস্ত্র যথা বর্শা, তীর, তরবারি ইত্যাদি দ্বারা সম্পন্ন হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ সূরা মায়িদার ৯৪ নং আয়াতে বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَيَبْلُونَكُمُ اللهُ بِشَيْءٍ مِنَ الصَّيْدِ تَنَالُهُ أَيْدِيكُمْ وَرِمَاحُكُمْ 'হে মুমিনগণ! আল্লাহ্ অবশ্যই এমন কিছু শিকারের মাধ্যমে তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন, যা তোমাদের হাত ও বর্শা সহজেই নাগালে পায়।'
আবার কখনো শিকারী জন্তুর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। যেমন আল্লাহ সূরা মায়িদার ৪নং আয়াতে বলেন: يَسْتَلُونَكَ مَاذَا أُحِلَّ لَهُمْ ۖ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ ۙ وَمَا عَلَّمْتُم مِّنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللَّهُ ۖ فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
'লোকে তোমাকে প্রশ্ন করে তাদের জন্য কী কী হালাল করা হয়েছে? বল, সমস্ত ভাল জিনিস তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে এবং শিকারী পশুপক্ষী যাদেরকে তোমরা শিকার শিক্ষা দিয়েছ যেভাবে আল্লাহ্ তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, তারা যা তোমাদের জন্য ধরে আনে তা ভক্ষণ কর, তাতে আল্লাহ্ নাম নেবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে। আল্লাহ্ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।'
আবু সালাবা খাশানি বলেন: আমি বললাম, হে রসূলুল্লাহ্, আমরা এমন একটা শিকারের এলাকায় বাস করি যেখানে ধনুক এবং শিক্ষিত ও অশিক্ষিত কুকুর দিয়ে শিকার করি। এ ক্ষেত্রে আমার কী করণীয়? রসূলুল্লাহ (সা) বললেন: যে প্রাণী ধনুক দিয়ে শিকার করেছ এবং যার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছ তা ভক্ষণ কর, আর যে প্রাণী অশিক্ষিত কুকুরকে দিয়ে শিকার করেছ, অত:পর তা জবাই করতে পেরেছ, তা ভক্ষণ কর।' (বুখারি ও মুসলিম)।
📄 অস্ত্র দিয়ে শিকার করার শর্তাবলী
অস্ত্র দিয়ে শিকার করার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলী প্রযোজ্য:
১. অস্ত্রটি যেন শিকারের দেহ ক্ষত করে তার ভেতরে ঢুকে যায়। 'আদি ইবনে হাতিম বললেন: হে রসূলুল্লাহ্, আমরা তীর নিক্ষেপে অভ্যস্ত। আমাদের জন্য কী হালাল? রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: 'তোমরা যা জবাই করেছ তা ভক্ষণ কর, আর যে প্রাণীর উপর তোমরা আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করেছ এবং তাকে ক্ষতি করেছ তা ভক্ষণ কর। ইমাম শাওকানি বলেন: এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হলো, একমাত্র ক্ষত করাই জরুরি, চাই তা ভোঁতা অস্ত্র দিয়েই হোক না কেন। সুতরাং আধুনিক বন্দুক দিয়ে গুলি ছুঁড়ে যে শিকার করা হয় তাও হালাল। কেননা গুলিতে অন্য অস্ত্রের চেয়ে বেশি ক্ষত হয়, কাজেই অন্য অস্ত্রের শিকার যেমন হালাল, বন্দুকের শিকারও তেমনি হালাল, কেবল গুলি করার সময় আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ করলেই হলো, পরে জবাই করার সুযোগ না পেলেও ক্ষতি নেই।
পক্ষান্তরে যে হাদিসে বন্দুক দ্বারা আহত কিন্তু জবাই করা হয়নি এমন প্রাণী খেতে নিষেধ করা হয়েছে এবং তাকে 'প্রহারে মৃত প্রাণী' বিবেচনা করা হয়েছে, সে হাদিসে উল্লেখিত বন্দুক দ্বারা এমন বন্দুক বুঝানো হয়েছে, যা মাটি দ্বারা বানানো হয়, অত:পর তা শুকানো হয় এবং শুকানোর পর তা দিয়ে গুলি ছোঁড়া হয়। ঐ বন্দুক গুলি-বারুদ ছোড়া বন্দুকের মত নয়। মাটির তৈরি বন্দুকের শিকার খেতে যেমন ইসলাম নিষেধ করেছে, তেমনি নিষেধ করেছে ইট পাথর বা অনুরূপ জিনিস দ্বারা মারা প্রাণী খেতেও। এর ব্যাখ্যা দিয়ে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন; 'ওটা কোনো শিকারও বধ করেনা, কোনো শত্রুকেও হত্যা করেনা, তবে তা কোনো প্রাণীর দাঁত ভাঙে ও চোখ উপড়ায়।'
তদ্রূপ লাঠি বা অনুরূপ কোনো ভোঁতা জিনিস দ্বারা যাকে আঘাত করা হয়, যদি তা জীবিত থাকতে থাকতে জবাই করা না হয়, তবে হারাম। আদি (রা) রসূলুল্লাহ (সা) কে বললেন: আমি তীর মেরে শিকার করি। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তীর নিক্ষেপের ফলে যদি তা দেহে বিদ্ধ হয় তবে খাও। আর তীর তার পাশ দিয়ে চলে গেলে খাবেনা।'
২. শিকারকে তীর বর্শা বা গুলি ছোঁড়ার সময় শিকারী কর্তৃক আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা। ইতিপূর্বে আবু সা'লাবা বর্ণিত হাদিস, অন্যান্য হাদিস ও আয়াতের আলোকে আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা যে শরিয়তের আলোকে প্রয়োজনীয় সে ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। মতভেদ রয়েছে শুধু এটা শর্ত কিনা সে ব্যাপারে। আবু সাওর, শা'বি, দাউদ যাহরি ও মুহাদ্দেসগণের একটি গোষ্ঠীর মত হলো, আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা সর্বাবস্থায় শর্ত। ইচ্ছায় হোক, বা ভুলক্রমে হোক, আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ না করা হলে হালাল হবে না। সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুসারে এটা ইমাম আহমদেরও মত। ইমাম আবু হানিফা বলেন: ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারণে বিরত থাকলে হারাম আর ভুলক্রমে বিরত থাকলে হালাল। ইমাম মালেকের অভিমতও তদ্রূপ। ইমাম শাফেয়ি ও মালিকি ফকিহদের একদল বলেন: আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা সুন্নাত। তাই কেউ যদি এটা ইচ্ছাকৃভাবেও বর্জন করে, তবে শিকার হারাম হবে না বরং খাওয়া হালাল হবে। আল্লাহর নাম উচ্চারণের আদেশটি তাদের মতে মুস্তাহাব অর্থবোধক।