📄 মৃত্যুর মুখোমুখি বা ক্ষুধাক্সয়ায় জবাই করা
কোনো প্রাণীকে জবাই করার মুহূর্তে যদি সে জীবিত থাকে তবে তা খাওয়া হালাল হবে, যদিও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তার ঐ জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী হতো এবং কোনো প্রাণী ঐ অবস্থায় বেঁচে থাকেনা। অনুরূপ যে রুগ্ন প্রাণীর বাঁচার আশা নেই, তাকে জীবিত থাকতে থাকতে জবাই করা হলে তা খাওয়া হালাল। জবাই করাকালে তার প্রাণ ছিলো এটা বুঝা যাবে তার হাত পা ও লেজের নড়াচড়া, শ্বাসপ্রশ্বাস চলা ইত্যাদি দ্বারা। কিন্তু সে যদি প্রাণবায়ু নির্গত হওয়ার অবস্থায় পৌছে যায় এবং হাত পা না নাড়ায়, তবে সে অবস্থায় তাকে মৃত প্রাণী বিবেচনা করা হবে এবং জবাই দ্বারা তাকে হালাল করা যাবে না। কারণ সূরা মায়িদার ৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرَ اللهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمُوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ والنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ . 'তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মরা, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ব্যতীত অপরের নামে যবাই করা পশু, শ্বাসরোধ মৃত জন্তু, প্রহারের মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃংগাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু, তবে যা তোমরা জবাই করতে পেরেছ তা ব্যতীত।' অর্থাৎ এ সব জন্তু তোমাদের জন্য হারাম, কেবল এগুলোর মধ্য থেকে যা তোমরা জীবিতাবস্থায় পাও ও জবাই কর। এই জবাই এগুলোকে হালাল করে।
ইমাম আব্বাস (রা) কে জিজ্ঞাসা করা হলো: একটা বাঘ একটা ছাগলের উপর হামলা করে তার পেট ছিঁড়ে ফেলেছে, অত:পর তার নাড়িভুড়ি বেরিয়ে পড়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে যবাই করা হয়েছে, তার কী হবে? তিনি বললেন: খাও। কিন্তু তার নাড়িভুড়ির যেটুকু বেরিয়ে গেছে তা খাবে না।
📄 জবাইর কাজ সম্পূর্ণ না করে হাত সরানো
জবাইকারী জবাইর কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে যদি হাত সরায়, অত:পর তৎক্ষণাৎ আবার হাত ফিরিয়ে আনে ও জবাই সম্পূর্ণ করে, তবে এটা বৈধ। কেননা সে জন্তুটিকে আহত করেছে অত:পর জীবিত থাকতেই তাকে জবাই করেছে। এমতাবস্থায় জন্তুটি আল্লাহ্র এই উক্তির আওতায় পড়ে: 'তবে যা তোমরা জবাই করতে পেরেছ তা ব্যতীত।'
📄 জবাই করা অঙ্গসব হয়ে পড়লে জন্তুকে আহত করা
যে জন্তু জবাই করলে হালাল হয়, তাকে জবাই করা সম্ভব হলে জবাইর জায়গাতেই জবাই করতে হবে। আর তা সম্ভব না হলে জন্তুর শরীরের যে কোনো স্থানে আঘাত করলেই তাতে জবাই সম্পন্ন হয়ে যাবে। তবে শর্ত এই যে, আঘাতটা যেন এমন রক্ত প্রবাহকারী হয়, যা দ্বারা হত্যা সংঘটিত করা সম্ভব হয়।
রাফে' ইবনে খাদীজ (রা) বলেন: আমরা রসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাথে একটা সফরে ছিলাম। আমাদের সফর সংগীদের একটা উট সহসা ছুটে পালালো। অথচ আমাদের সাথে কোনো ঘোড়া ছিলনা। তখন এক ব্যক্তি একটা বর্ণা ছুড়ে মেরে তাকে থামালো। রসূল (সা) বললেন: এই সব জীবজন্তুর মধ্যে কতক আছে জংলী স্বভাবের। কাজেই তাদের মধ্যে যে জন্তু এরকম কাজ করবে, তার সাথে তোমরাও এরকম আচরণ করবে।' বুখারি ও মুসলিম।
আহমদ, আবুদাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা আবুল আশ্রা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা বললেন: হে রসূলুল্লাহ্, জবাই তো কেবল গলায় বা বুকের উপরি ভাগে হয়, তাই নয় কি? রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তার উরুতে আঘাত করলেও যথেষ্ট হবে।' ইমাম আবুদাউদ বলেন: 'এটা শুধু পতনের কারণে মৃত ও জংলী জানোয়ারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।' ইমাম তিরমিযি বলেন: এটা শুধু অস্বাভাবিক অবস্থায় প্রযোজ্য, যেমন অবাধ্য, উচ্ছৃংখল ও ছুটে যাওয়া জন্তুর ক্ষেত্রে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়না, অথবা যে জন্তু পানিতে পড়ে গেছে এবং তার ডুবে মরে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এ ধরনের জন্তুর দিকে যদি ছোরা বা বর্শা ছুড়ে মারা হয় এবং তার ফলে তার রক্ত প্রবাহিত হয়ে মারা যায়, তাহলে তা হালাল হবে।
ইমাম বুখারি আলি, ইবনে আব্বাস, ইবনে উমার ও আয়েশা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন: 'যে জন্তু তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, সে জন্তু শিকার করার জন্তুর মতো। আর যে জন্তু কোনো কুয়ায় পড়ে যায় তার উপর যখন যেভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাবে সেভাবেই তাকে জবাই করা হবে।
📄 গর্ভস্থ শিশু জবাই
কোনো জন্তুর গর্ভস্থ শিশু মায়ের পেট থেকে বের হয়ে এখনো জীবিত থাকলে, তখনই তাকে যবাই করা ওয়াজিব। শিশু পেটে থাকা অবস্থায় তার মাকে জবাই করা হলে তার মার জবাইতেই তার জবাই সম্পন্ন হবে চাই সে জীবিত অবস্থায় পেট থেকে বের হোক বা মৃত অবস্থায়। কেননা গর্ভস্থ বাচ্চা সম্পর্কে রসূল (সা) বলেছেন: 'মায়ের জবাই গর্ভের শিশুর জবাই।' (আহমদ, ইবনে মাজা, আবুদাউদ, তিরমিযি, দারকুতনি ও ইবনে হাব্বান)।
ইবনুল মুনযির বলেন: যারা বলেন মায়ের জবাইতেই বাচ্চার জবাই সম্পন্ন হবে এবং উল্লেখ করেননি যে, বাচ্চা টের পাক বা নাপাক, তাদের মধ্যে রয়েছেন আলি ইবনে আবু তালিব, সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব, আহমদ, ইসহাক, ও শাফেয়ি। শাফেয়ি বলেন: কোনো সাহাবি বা আলেম সম্পর্কে জানা যায়নি যে, গর্ভস্থ শিশুকে নতুন করে জবাই না করলে হালাল হবে না মর্মে মত প্রকাশ করেছেন। একমাত্র ইমাম আবু হানিফা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি এরূপ মত প্রকাশ করেছেন। ইবনুল কাইয়েম বলেন: হাদিসে অর্থহীন ও অকাট্য ভাষায় বলা হয়েছে যে, গর্ভস্থ শিশুর জবাই তার মায়ের জবাইতেই সম্পন্ন হবে। এটা মূলনীতির পরিপন্থী। মূলনীতি হলো, মৃত জন্তু হারাম।
এ সম্পর্কে বলা যায়: রসূলুল্লাহ্ (সা) এর ভাষায় মৃত জন্তু হারাম ঘোষিত হয়েছে এবং মাছ ও পঙ্গপালকে মৃত জন্তু থেকে ব্যতিক্রম করা হয়েছে। কিন্তু গর্ভের বাচ্চার ক্ষেত্রে এ কথা কিভাবে প্রযোজ্য হবে। গর্ভের বাচ্চা তো মৃত জন্তু নয়। কেননা সে তো তার মায়েরই দেহের অংশ। মায়ের জবাই দ্বারাই তো তার দেহের সকল অংশের যবাই হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় তার প্রত্যেকটা অংশকে পৃথক পৃথকভাবে যবাই করার প্রয়োজন নেই। গর্ভের শিশু মায়ের অধীন ও তার দেহের অংশ। এটা যথার্থ মূলনীতির দাবি, এমনকি হাদিসে যদি তার হালাল হওয়া সম্পর্কে কিছু বলা নাও হতো তবুও মূলনীতি এ যুক্তির সাথে সংগতিপূর্ণভাবে হাদিস যখন রয়েছে তখন আর সমস্যা কোথায়? বস্তুত হাদিস মূলনীতি ও যুক্তি সবই মায়ের জবাইতে গর্ভস্থ বাচ্চার হালাল হওয়ার পক্ষে।