📄 জবাই বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য যা করণীয়
শরিয়ত সম্মত জবাইর জন্য নিম্নোক্তগুলো জরুরি:
১. জবাইকারীকে সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন হতে হবে, চাই সে পুরুষ কিংবা মহিলা হোক, মুসলমান কিংবা ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান হোক। সে যদি মাতাল পাগল বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তবে সে জবাইর অযোগ্য এবং তার জবাই করা জন্তু খাওয়া হালাল হবে না। অনুরূপ, মুশরেক, মূর্তিপূজারী, নাস্তিক ও ইসলাম ত্যাগীর জবাই করা জন্তুও হালাল নয়।
📄 অগ্নি কিতাবের জবাই করা জন্তু
ইমাম কুরতুবি বলেন, ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ 'আর এমন প্রাণী খাবেনা যার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি, অবশ্যই তা পাপের কাজ।' (আল-আনআম: আযাত ১২১)।
এরপর বলেছেন: وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ حِلٌّ لَكُمْ صَ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَهُمْ 'যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের খাদ্যদ্রব্য তোমদের জন্য হালাল এবং তোমাদের খাদ্যদ্রব্য তাদের জন্য হালাল।' (সূরা মায়িদা: আয়াত ৫)। অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের জবাই করা জন্তু হালাল, যদিও জবাই করার সময় 'খ্রিষ্টানরা ঈসা মসিহের নামে' এবং ইহুদিরা 'উযায়েরের নামে' উৎসর্গ করে। আতা বলেন: 'খ্রিষ্টান যদিও মসিহের নামে জবাই করে, তবু তুমি তা খেতে পার। কারণ আল্লাহ্ স্বয়ংস তাদের জবাইকে হালাল করেছেন। অথচ তারা কী বলে তা তিনি জানেন।'
যুরি, রবিয়া, শাবি ও মাকহুল এবং দু'জন সাহাবি আবুদ দারদা ও উবাদা ইবনুস সামিতও একই মত পোষণ করেন।
আরেক দল ফকিহ্ বলেন: কোনো ইহুদি বা খ্রিষ্টান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে যবাই করেছে শুনলে তা খেয়োনা। তাউস ও হাসান এবং সাহাবিদের মধ্য থেকে আলি (রা) ও আয়েশা (রা) এই মতের সমর্থক। তাদের প্রমাণ সূরা আনআমের ১২১ নং আয়াত: 'এমন প্রাণী খাবে না যার উপর আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা হয়নি। অবশ্যই তা পাপের কাজ।' ইমাম মালেকের মতে এটা মাকরূহ, হারাম নয়।
📄 অগ্নি উপাসক ও সাবেয়ীদের জবাই করা জন্তু
অগ্নিউপাসকদের জবাই করা জন্তু সম্পর্কে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এর কারণ অগ্নি উপাসকদের ধর্মের উৎস নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিছু ফকিহ মনে করেন তারা 'ফারফা' নামক আসমানী গ্রন্থের অনুসারী। আলি (রা) এর মতও অনুরূপ। আবার কেউ কেউ বলেন: তারা মুশরিক। যারা তাদেরকে আসমানী গ্রন্থের অনুসারী মনে করেন তারা তাদের জবাই করা জন্তু হালাল মনে করেন, যেমন সূরা মায়িদার ৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে। রসূল (সা) বলেন; 'তাদের সাথে আহলে কিতাবের মতো আচরণ কর।'
অগ্নি উপাসকদের সম্পর্কে ইবনে হাযম বলেন: 'ওরা আহলে কিতাব। কাজেই সব ব্যাপারে তাদের বিধান আহলে কিতাবের বিধানের অনুরূপ।' আবু সাওর ও যাহেরি মাযহাবের অভিমতও তদ্রূপ। কিন্তু অধিকাংশ ফকিহের মতে তাদের জবাই করা জন্তু হারাম। কেননা তাদের মতে তারা মুশরিক। আর সাবেয়িদের জবাই করা জন্তু কারো মতো জায়েয, কারো মতে নাজায়েজ। (সাবেয়িদের ধর্ম অগ্নি উপাসক ও খ্রিষ্টানদের মধ্যবর্তী। তারা নক্ষত্রের প্রভাবে বিশ্বাসী।)
২. জবাই করা অস্ত্রটি এমন ধারালো হওয়া দরকার, যাতে সবেগে রক্ত প্রবাহিত হয় ও শ্বাসনালী কেটে, যেমন ছুরি, পাথর, কাঠ, তরবারি, কাঁচ, বাঁশ যার পাশ এমন ধারালো যে, ছুরির মত কাটে। হাড় দিয়েও জবাই করা যায়, কিন্তু দাঁত ও নখর দিয়ে নয়।
ক. ইমাম মালিক বর্ণনা করেন: জনৈকা মহিলা ছাগল চরাতো। তার একটি ছাগল আহত হলো। মহিলা তৎক্ষণাৎ একটা পাথর দিয়ে তাকে জবাই করলো। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (সা) কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: জবাই শুদ্ধ হয়েছে।
খ. বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্ (সা) কে জিজ্ঞাসা করা হলো: শক্ত পাথর ও লাঠির ভাঙ্গা টুকরো দিয়ে যবাই করতে পারি? রসূল (সা) বললেন: ক্ষীপ্রতার সাথে কর ও কাট। রক্ত সবেগে প্রবাহিত হলে ও আল্লাহ্র নাম উচ্চারিত হলে খাও। তবে দাঁত ও নখর দিয়ে কেটনা।' -মুসলিম।
গ. রসূলুল্লাহ্ (সা) শয়তানের মত জবাই করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ শুধু চামড়া কাটা ও ঘাড়ের রগ না কাটা, তারপর দীর্ঘ সময় ধরে মরার জন্য রেখে দেয়া। -আবু দাউদ।
৩. শ্বাসনালী ও খাদ্যনালী কাটা জরুরি। তবে এ দুটোকে বিচ্ছিন্ন করা জরুরি নয়। ঘাড়ের দু'পাশে মোটা রগ দুটো কাটাও জরুরি নয়। কেননা ঐ দুটো দিয়ে খাদ্য ও পানীয় চলাচল করে এবং ঐ দুটো জীবনের জন্য জরুরি নয়। অথচ জীবনের অবসান ঘটানোই জবাই এর উদ্দেশ্য। মাথা বিচ্ছিন্ন করলে জবাই করা জন্তু হারাম হবে না। অনুরূপ, পেছন থেকে জবাই করলেও জবাই শুদ্ধ হবে, যদি অস্ত্র জবাই এর জায়গায় আঘাত করে।
৪. আল্লাহর নাম উচ্চারণ: ইমাম মালেক বলেন: যে জন্তুই আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ ব্যতিরেকে জবাই করা হোক তা হারাম, চাই ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা ভুলক্রমে আল্লাহর নাম উচ্চারণ বাদ পড়ুক। ইবনে সিরীন ও একদল আলিমের অভিমতও তদ্রূপ। ইমাম আবু হানিফা বলেন: ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্ নাম উচ্চারণ পরিত্যক্ত হলে হারাম, আর ভুলক্রমে পরিত্যক্ত হলে হালাল। ইমাম শাফেয়ি বলেন: জবাইকারী যদি জবাই এর যোগ্য হয়, তাহলে ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ পরিত্যক্ত হোক বা ভুলক্রমে হোক, হালাল হবে। আয়েশা (রা) বলেন: একদল লোক বললো: হে রসূলুল্লাহ্, অনেকে আমাদেরকে গোশ্ত দিতে আসে। অথচ আমরা জানিনা ঐ গোস্তে আল্লাহ্র নাম উচ্চারিত হয়েছে কি হয়নি। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর ও খাও।' আয়েশা (রা) বললেন: তারা অল্প কিছুদিন আগেও কাফির ছিলো। (বুখারি)।
📄 জবাইতে যা যা মাকরূহ
১. ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে জবাই করা: কেননা শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা) থেকে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: আল্লাহ্ সব কাজ ভালোভাবে করার আদেশ দিয়েছেন। কাজেই তোমরা যখন কোনো জন্তু জবাই করবে তখন ভালোভাবে জবাই কর। ছুরিকে ভালোভাবে ধার দিতে হবে ও জবাই করা জন্তুকে শান্তি দিতে হবে।
২. ইবনে উমর (রা) বলেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) জবাই এর অস্ত্র ধার দিতে ও জন্তুর দৃষ্টির আড়ালে ধার দিতে আদেশ দিয়েছেন। (আহমদ)।
৩. জবাই করা জন্তুর প্রাণ নির্গত হওয়ার আগে তার ঘাড় ভাঙ্গা বা চামড়া ছাড়ানো মাকরূহ, দারু কুতনি আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রাণবায়ু নির্গত হওয়ার আগে তাড়াহুড়া করো না। তবে জবাই এর পূর্বে কেবলামুখী হওয়া মুস্তাহাব এমন কোনো কথা কুরআন বা হাদিসে নেই।