📄 যে সব জিনসে সম্পর্কে মৌনতা অবলম্বন করা হয়েছে
শরিয়ত যে সব জিনিস সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছে এবং তা হারাম হওয়া সম্পর্কে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তা সর্বসম্মত মূলনীতি 'সকল জিনিস মূলত হালাল' এর আওতায় হালাল। বস্তুত এটা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি। কুরআন ও সুন্নাহ্ একাধিক বাণী উক্ত মূলনীতির প্রতি সমর্থন জানায়। যেমন আল্লাহ বলেন: مَوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًان 'তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।' (আল বাকারা-২: আয়াত ২৯)।
২. দারু কুতনি আবু সা'লাবা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'আল্লাহ তোমাদের উপর কিছু কাজ ফরয করেছেন, সেগুলো অবহেলা করোনা। কিছু সীমা নির্ধারণ করেছেন, সেগুলো লংঘন করোনা এবং কিছু জিনিস সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন তোমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে, ভুলে গিয়ে নয়, কাজেই সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাবেনা।'
৩. সালমান ফারসি (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সা) কে পনির ও ঘি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: আল্লাহ্ তার কিতাবে যা যা হালাল করেছেন তা হালাল, আর আল্লাহ্ তার কিতাবে যা যা হারাম করেছেন তা হারাম, আর যা সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তা হচ্ছে সেই সব বিষয়, যার ব্যাপারে তিনি তোমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছেন।' (ইবনে মাজা ও তিরমিযি)।
৪. বুখারি ও মুসলিম সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে ইতিপূর্বে হারাম করা হয়নি এমন জিনিস সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে আর তার জিজ্ঞাসা করার কারণে ঐ জিনিসটি হারাম হয়ে যায়।'
৫. আবুদ দারদা (রা) সূত্রে বর্ণিত রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, আর যা হারাম করেছেন তা হারাম, আর যা সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তার ব্যাপারে অব্যাহতি দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ দেয়া অব্যাহতি গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ্ কোনো কিছু ভুলে যাওয়ার পাত্র নন। অত:পর তিনি সূরা মরিয়ামের ৬৪ নং আয়াতের এ অংশটি পাঠ করলেন: وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا 'তোমার প্রভু ভুলে যাওয়ার পাত্র নন।' (বাযযার)।
📄 অমানসিকৃত গোশত
অমুসলিম দেশ থেকে আমদানীকৃত গোস্ত দুই শর্তে খাওয়া হালাল:
১. আল্লাহ্ যে সকল জন্তুকে হালাল করেছেন, সেগুলোর গোস্ত হওয়া চাই।
২. শরিয়ত নির্দেশিত উপায়ে জবাই হওয়া চাই।
এই দুটো শর্ত যদি পূরণ না হয়, যদি তা শূকর বা অনুরূপ হারাম জন্তুর গোশত হয় অথবা শরিয়ত বহির্ভূত নিয়মে জবাই হয়ে থাকে, তাহলে তা নিষিদ্ধ এবং তা খাওয়া হালাল হবে না। আধুনিক বিজ্ঞানের সুবাদে যে সব সংবাদ মাধ্যমের প্রচলন হয়েছে, তার ফলে এখন ঐ শর্ত দুটি পূরণ হয়েছে কিনা জানা সহজ হয়ে গেছে। প্রায়ই এ সব গোশতের প্যাকেটের গায়ে এ বিষয়ে তথ্য লেখা থাকে এবং এই তথ্যের উপর নির্ভর করা যেতে পারে। কেননা প্রায়ই এগুলো সত্য হয়ে থাকে।
ইতিপূর্বেও ফকিহগণ এরূপ ক্ষেত্রের করণীয় সম্পর্কে ফতোয়া দিয়েছেন। শাফেয়ি মাযহাবের গ্রন্থাবলীর মধ্যে নীয়া 'আল-ইকনায়' বলা হয়েছে:
'কোনো ফাসেক অথবা কোনো ইহুদি বা খ্রিষ্টান যদি জানায় যে, সে এই ছাগলটি জবাই করেছে, তবে তা খাওয়া যাবে। কেননা সে জবাই করার যোগ্য। পক্ষান্তরে কোনো দেশে যদি মোশরেক ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক বাস করে, এবং জন্তুকে জবাই করেছে মোশরেক না মুসলমান, তা জানা যায়না, তাহলে খাওয়া হালাল হবেনা। কেননা জবাই হালাল পন্থায় হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তবে ঐ দেশে যদি মুসলমানদের সংখ্যা অধিক হয়, তাহলে খাওয়া যাবে।
📄 অযোগ্যপায় অবস্থায় হারাম খাওয়া জায়েয
যে ব্যক্তির হালাল খাদ্য সংগ্রহ করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তার জন্য মৃত প্রাণী, শূকর, অন্যান্য হারাম প্রাণীর গোস্ত অথবা অন্য কোনো হারাম খাদ্য বাঁচানো ও মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে খাওয়া শুধু জায়েয নয়, বরং ওয়াজিব। কারণ সূরা নিসার ২৯ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন: وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ط إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا 'তোমাদের নিজেদেরকে হত্যা করোনা। আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি দয়াময়।'
📄 অন্যোপায় অবস্থায় সীমারেখা
মানুষ তখনই অনন্যোপায় বলে বিবেচিত হবে, যখন ক্ষুধা তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় অথবা এমন রোগে আক্রান্ত করার উপক্রম হয়, যা তাকে মৃত্যুরমুখে নিক্ষেপ করতে পারে। যে ব্যক্তি এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়, সে আল্লাহর অনুগত না অবাধ্য, তাতে কিছু যায় আসে না। আল্লাহ বলেন: فَمَنِ اضْطُرْ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ 'কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ নাফরমান কিংবা সীমালংঘনকারী নয়, তার কোনো পাপ হবে না। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (হারাম খাদ্য খাওয়ার সময় একই পর্যায়ের অনন্যোপায় অপর ব্যক্তির হক গ্রাস করা, তাকে খেতে না দিয়ে একাকী খাওয়া ও তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া নাফরমানীর আওতাভুক্ত। আর যতটুকু খেলে তৃপ্তি হয়, মতান্তরে, যতোটুকু খেলে জীবন বাঁচে ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি দূরীভূত হয়, তার চেয়ে বেশি খাওয়া সীমালংঘনের পর্যায়ে পড়ে।)
ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেন: ফুজাই আমেরি (রা) রসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন: কী অবস্থায় আমাদের জন্য মৃত প্রাণী হালাল হয়? রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমাদের খাদ্য কী? ফুজাই বললেন: সকাল বিকাল শুধু তরল পানীয়। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: 'এটাই সেই ক্ষুধা, যা মৃত প্রাণী হালাল করে।' অত:পর তিনি তাদেরকে মৃত প্রাণী খাওয়ার অনুমতি দিলেন। ইবনে হাযম বলেন:
'অনন্যোপায় অবস্থার সীমারেখা হলো, পুরো একদিন ও এক রাত এমন অবস্থায় থাকতে হবে যে, কোনো খাদ্য ও পানীয় পাওয়া যাচ্ছেনা। এমতাবস্থায় সে যদি এমন কষ্টকর দুর্বলতার আশংকা করে যা দীর্ঘস্থায়ী হলে তাকে মৃত্যুর মুখে নিক্ষেপ করতে পারে অথবা তার জীবিকা উপার্জন বন্ধ করে দেবে, তবে তার জন্য এমন যে কোনো জিনিস খাওয়া ও পান করা বৈধ, যা ক্ষুধা ও পিপাসা জনিত মৃত্যু থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে। একদিন ও একরাত অনাহারে থাকার সীমারেখা উল্লেখ করেছি এ জন্য যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) রোযার জন্য পুরো একদিন ও একরাত একটানা পানাহার না করাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।
মালেকি মযহাব অনুসারে কেউ যদি একটানা তিনদিন অনাহারে কাটায়, তবে তার পক্ষে যে কোনো হারাম জিনিস খাওয়া জায়েয, চাই তা অন্যের সম্পদ হোক না কেন।
উল্লেখ্য, শাফেয়ি ও যায়দি মতানুসারে অন্য কিছু না পাওয়া গেলে মানুষের গোস্ত খাওয়াও জায়েয। তবে এ জন্য তারা কিছু শর্ত আরোপ করেন। কিন্তু হানাফি ও যাহেরি মযহাব অনুসারে মানুষের গোস্ত খাওয়া কোনো অবস্থায়ই জায়েয নেই।