📄 জঘন্য জিনিস হারাম
এই বিবরণের পাশাপাশি পবিত্র কুরআন একটা সর্বব্যাপী মূলনীতি দিয়ে হারাম নির্ণয়ের উপায় জানিয়ে দিয়েছে। সেটি সূরা আরাফের ১৫৭ নং আয়াতে রয়েছে: وَتُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَيثَ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ
অপবিত্র জিনিসগুলো হারাম করে দেবেন। পবিত্র জিনিস বলে সেই সব জিনিস বুঝানো হয়েছে, যা কোনো নিষিদ্ধকারী ওহির বাণী ছাড়াই মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে পবিত্র মনে করে ও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। মানুষ যদি স্বতস্ফূর্তভাবে অপবিত্র মনে করে তবে তা হারাম।
ইমাম শাফেয়ি ও হাম্বলি মযহাবের মতানুসারে পবিত্র জিনিস হচ্ছে, যা শুধু আরবরা অর্থাৎ জনপদ ও নগরবাসীরা পবিত্র মনে করে ও যার প্রতি আকৃষ্ট হয়, গ্রামবাসী ও বেদুইনরা নয়। তবে 'আদ্দরারিল মুযিয়া' গ্রন্থে বলা হয়েছে, সাধারণ জনগণ যাকে পবিত্র মনে করে, সেটাই পবিত্র, শুধু আরবরা বা অভিজাত এলাকার অধিবাসীরা নয়। উক্ত গ্রন্থে বলা হয়েছে:
'কোনো কারণ বশত: নয় এবং অনভ্যস্ততা বশত:ও নয়, বরং কেবলমাত্র স্বতস্ফূর্তভাবে নোংরা ও অপবিত্র মনে করার কারণে যে প্রাণীকে সাধারণ মানুষ অপবিত্র মনে করে, সেটাই অপবিত্র। আর যদি কিছু লোক অপবিত্র মনে করে এবং কিছু লোক অপবিত্র মনে না করে, তবে অধিকাংশ মানুষের মনোভাবই গ্রহণযোগ্য হবে, যেমন পোকা মাকড় ও বহু জীবজন্তু কোনো নির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণ ছাড়াই জনসাধারণ খাওয়া বর্জন করেছে। বস্তুত: এ সব প্রাণী প্রধানত: নোংরা ও অপবিত্র মনে হওয়ার কারণে বর্জিত হয়েছে। এ সব নোংরা ও অপবিত্র জিনিসের মধ্যে থু থু, কফ, বীর্য, গোবর, উকুন ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত।
📄 পরিযিত যে সব প্রাণী হত্যার আদেশ দিয়েছে তা হারাম
যে সকল প্রাণীকে রসূলুল্লাহ্ (সা) হত্যা করতে আদেশ দিয়েছেন এবং যে সকল প্রাণীকে রসূলুল্লাহ্ (সা) হত্যার করতে নিষেধ করেছেন, বহু সংখ্যক আলেমের মতে তা হারাম। যে ক'টা প্রাণীকে হত্যা করতে রসূলুল্লাহ্ (সা) আদেশ দিয়েছেন তা হচ্ছে পাঁচটি: চিল, বিচ্ছু, কাক, ইঁদুর ও খেকি কুকুর। বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি ও নাসায়ি আয়েশা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: পাঁচটি প্রাণী পাপিষ্ঠ। হারাম শরীফে তাদেরকে হত্যা করা হবে: কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর, ও খেকি কুকুর।'
আর যে ক'টা প্রাণী হত্যা করতে রসূলুল্লাহ্ (সা) নিষেধ করেছেন তা হচ্ছে: পিপঁড়ে, মৌমাছি, হুদহুদ পাখি ও সারাদ পাখি। আবু দাউদ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) পিপঁড়ে, মৌমাছি, হুদহুদ ও সারাদ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।
ইমাম শওকানি এ মতটির পর্যালোচনা করে বলেন: 'বলা হয়েছে যে, কয়েকটি প্রাণীকে হত্যা করতে আদেশ দেয়া, যেমন পাঁচটি পাপিষ্ঠ প্রাণীকে এবং কয়েকটি প্রাণীকে হত্যা করতে নিষেধ করা, যেমন পিঁপড়ে, মৌমাছি, হুদহুদ, সারাদ, ব্যাঙ, এগুলোই নিষিদ্ধ হওয়াার অন্যতম কারণ। অথচ যে সকল প্রাণীকে রসূল (সা) হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন, বা হত্যা করতে নিষেধ করেছেন, সেগুলি খাওয়া নিষিদ্ধ এ কথা শরিয়তের কোনো বাণীতে জানা যায় না। তাই কেবল আদেশ ও নিষেধকে হারাম হওয়ার প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা যায় না। এ দুটির মধ্যে কোনো যৌক্তিক বা প্রথাগত বাধ্যবাধকতা নেই। সুতরাং হত্যা করার আদেশ ও নিষেধাজ্ঞাকে হারাম করার মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করার কোনো কারণ নেই। বরং যাকে হত্যা করার আদেশ দেয়া হয়েছে বা হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা যদি অপবিত্র প্রাণী হয়ে থাকে তবে তাতো সংশ্লিষ্ট আয়াতের আওতায়ই নিষিদ্ধ হবে। অন্যথায় তা হালাল হবে। কেননা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, সকল জিনিস মূলত: হালাল, যতোক্ষণ তা হারাম হওয়ার প্রমাণ না পাওয়া যায়।' (মালিকি মযহাবে কাকসহ যাবতীয় পাখি হালাল।)
📄 যে সব জিনসে সম্পর্কে মৌনতা অবলম্বন করা হয়েছে
শরিয়ত যে সব জিনিস সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছে এবং তা হারাম হওয়া সম্পর্কে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তা সর্বসম্মত মূলনীতি 'সকল জিনিস মূলত হালাল' এর আওতায় হালাল। বস্তুত এটা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি। কুরআন ও সুন্নাহ্ একাধিক বাণী উক্ত মূলনীতির প্রতি সমর্থন জানায়। যেমন আল্লাহ বলেন: مَوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًان 'তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।' (আল বাকারা-২: আয়াত ২৯)।
২. দারু কুতনি আবু সা'লাবা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'আল্লাহ তোমাদের উপর কিছু কাজ ফরয করেছেন, সেগুলো অবহেলা করোনা। কিছু সীমা নির্ধারণ করেছেন, সেগুলো লংঘন করোনা এবং কিছু জিনিস সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন তোমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে, ভুলে গিয়ে নয়, কাজেই সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাবেনা।'
৩. সালমান ফারসি (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সা) কে পনির ও ঘি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: আল্লাহ্ তার কিতাবে যা যা হালাল করেছেন তা হালাল, আর আল্লাহ্ তার কিতাবে যা যা হারাম করেছেন তা হারাম, আর যা সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তা হচ্ছে সেই সব বিষয়, যার ব্যাপারে তিনি তোমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছেন।' (ইবনে মাজা ও তিরমিযি)।
৪. বুখারি ও মুসলিম সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে ইতিপূর্বে হারাম করা হয়নি এমন জিনিস সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে আর তার জিজ্ঞাসা করার কারণে ঐ জিনিসটি হারাম হয়ে যায়।'
৫. আবুদ দারদা (রা) সূত্রে বর্ণিত রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, আর যা হারাম করেছেন তা হারাম, আর যা সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তার ব্যাপারে অব্যাহতি দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ দেয়া অব্যাহতি গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ্ কোনো কিছু ভুলে যাওয়ার পাত্র নন। অত:পর তিনি সূরা মরিয়ামের ৬৪ নং আয়াতের এ অংশটি পাঠ করলেন: وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا 'তোমার প্রভু ভুলে যাওয়ার পাত্র নন।' (বাযযার)।
📄 অমানসিকৃত গোশত
অমুসলিম দেশ থেকে আমদানীকৃত গোস্ত দুই শর্তে খাওয়া হালাল:
১. আল্লাহ্ যে সকল জন্তুকে হালাল করেছেন, সেগুলোর গোস্ত হওয়া চাই।
২. শরিয়ত নির্দেশিত উপায়ে জবাই হওয়া চাই।
এই দুটো শর্ত যদি পূরণ না হয়, যদি তা শূকর বা অনুরূপ হারাম জন্তুর গোশত হয় অথবা শরিয়ত বহির্ভূত নিয়মে জবাই হয়ে থাকে, তাহলে তা নিষিদ্ধ এবং তা খাওয়া হালাল হবে না। আধুনিক বিজ্ঞানের সুবাদে যে সব সংবাদ মাধ্যমের প্রচলন হয়েছে, তার ফলে এখন ঐ শর্ত দুটি পূরণ হয়েছে কিনা জানা সহজ হয়ে গেছে। প্রায়ই এ সব গোশতের প্যাকেটের গায়ে এ বিষয়ে তথ্য লেখা থাকে এবং এই তথ্যের উপর নির্ভর করা যেতে পারে। কেননা প্রায়ই এগুলো সত্য হয়ে থাকে।
ইতিপূর্বেও ফকিহগণ এরূপ ক্ষেত্রের করণীয় সম্পর্কে ফতোয়া দিয়েছেন। শাফেয়ি মাযহাবের গ্রন্থাবলীর মধ্যে নীয়া 'আল-ইকনায়' বলা হয়েছে:
'কোনো ফাসেক অথবা কোনো ইহুদি বা খ্রিষ্টান যদি জানায় যে, সে এই ছাগলটি জবাই করেছে, তবে তা খাওয়া যাবে। কেননা সে জবাই করার যোগ্য। পক্ষান্তরে কোনো দেশে যদি মোশরেক ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক বাস করে, এবং জন্তুকে জবাই করেছে মোশরেক না মুসলমান, তা জানা যায়না, তাহলে খাওয়া হালাল হবেনা। কেননা জবাই হালাল পন্থায় হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তবে ঐ দেশে যদি মুসলমানদের সংখ্যা অধিক হয়, তাহলে খাওয়া যাবে।