📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 শস্যভাবে বর্জিত হারাম খাদ্য

📄 শস্যভাবে বর্জিত হারাম খাদ্য


কুরআনে যে সব খাদ্য হারাম ঘোষিত হয়েছে তার সংখ্যা দশটিতে সীমিত। আল্লাহ্ বলেন:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ ۚ 'তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মরা জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ব্যতীত অপরের নামে জবাইকৃত পশু, শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, প্রহারে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃংগাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু, তবে যা তোমরা জবাই করতে পেরেছ তা ব্যতীত। আর যা মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ধারণ করা। এ সব পাপ কাজ।' (সূরা মায়িদা-৫: ৩)
মরা অর্থ স্বাভাবিকভাবে মৃত জন্তু। যেহেতু স্বাভাবিকভাবে মৃত জন্তু কোনো না কোনো রোগেই মারা গেছে, তাই তার গোশত খেলে ক্ষতি অবধারিত। আর রক্ত দ্বারা প্রবাহিত রক্ত বুঝানো হয়েছে। যেহেতু প্রবাহিত রক্ত রোগ-জীবাণুর বিকাশে অধিকতর সহায়ক, তাই এটা খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর শূকরের গোস্ত নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, এটা একটা নোংরা প্রাণী এবং যাবতীয় নোংরা ও অপবিত্র জিনিসই তার প্রিয়তম খাদ্য। অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, এর মাংস বিশ্বের সকল মহাদেশে, বিশেষত: গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলে ক্ষতিকর। এর গোশত প্রাণঘাতী কৃমি উৎপাদন করে। আরো জানা যায়, যৌন সততা বিনাশে এর প্রভাব রয়েছে। আর আল্লাহ ব্যতীত অপর নামে ও মূর্তিপূজার বেদীতে জবাইকৃত জন্তু খাওয়া নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য হলো তাওহিদের হেফাযত। হিংস্র পশুর আক্রমণে আহত হালাল জন্তুকে জীবিত অবস্থায় পেয়ে জবাই করলে তা খাওয়া হালাল হবে।
সূরা মায়িদার এ আয়াতে যে বিবরণ দেয়া হয়েছে, তা আসলে সূরা আনয়ামের ১৪৫ নং আয়াতেরই বিস্তারিত বিবরণ, যাতে বলা হয়েছে: 'বলুন, আমার কাছে যে ওহি প্রেরণ করা হয়েছে তাতে আমি মৃত, বহমান রক্ত, শূকরের গোস্ত, অথবা যা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করার কারণে অবৈধ, তা ছাড়া কোনো ভক্ষণকারীর জন্য কোনো হারাম খাদ্য পাই না। সূরা আনয়ামের আয়াতে চারটা জিনিস সংক্ষেপে আর এ আয়াতে বিস্তারিতভাবে সবকটা হারাম জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 জীবিত প্রাণীর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ

📄 জীবিত প্রাণীর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ


জীবিত প্রাণীর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা অংশও মৃত প্রাণীর মতো হারাম। আবু ওয়াকেদ লাইছি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো প্রাণীর দেহ থেকে যে অংশ কেটে নেয়া হয়, তা একটা মৃত দেহ।' (আবুদাউদ ও তিরমিযি। তিরমিযি) এটিকে হাসান আখ্যা দিয়ে বলেন: আলেমগণ এ হাদিস অনুসারেই কাজ করেন। তবে নিম্নোক্ত জিনিসগুলো হারাম নয়:
ক. মাছ ও পঙ্গপালের মৃতদেহ। এ দুটো পবিত্র ও হালাল। ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: দুটো মৃতদেহ ও দুটো রক্ত আমাদের জন্য হালাল: মৃতদেহ দুটো হলো মাছ ও পঙ্গপালের। আর রক্ত দুটো হলো, কলিজা ও প্লীহা। -আহমদ, শাফেয়ি, ইবনে মাজা, বায়হাকি ও দারু কুতনি কর্তৃক বর্ণিত। প্রাণীর মৃতদেহকে যখন হারাম ঘোষণা করা হয় তখন তার উদ্দেশ্য হলো, তার গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ করা। গোশত ছাড়া তার অন্যান্য অংশ পবিত্র এবং তা ব্যবহার করা হালাল।
খ. মৃত প্রাণীর হাড়, শিং, নখ, চুল, পালক ও চামড়া ও জাতীয় জিনিস পবিত্র। এগুলো অপবিত্র হওয়া সম্পর্কে কোনো প্রমাণ নেই। তাই এগুলো পবিত্র। কারণ যে কোনো জিনিসের মূল অবস্থা পবিত্রতা, যতোক্ষণ তার অপবিত্র হওয়ার প্রমাণ পাওয়া না যায়।
ইমাম যুহরি মৃত হাতি ও অন্যান্য প্রাণীর হাড় সম্পর্কে বলেন: 'অতীতের বহু সংখ্যক আলেমকে মৃত প্রাণীর হাড়ের তৈরি চিরুণী দিয়ে চুল আঁচড়াতে ও তার তেল ব্যবহার করতে দেখেছি। এতে তারা দোষের কিছু দেখতেন না। (বুখারি)।
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন: 'মাইমুনার জনৈকা মুক্ত দাসীকে একটা ছাগল সদকা দেয়া হলো। পরে ছাগলটি মারা গেল। রসূলুল্লাহ্ (সা) তা দেখে বললেন: 'তোমরা এর চামড়া নিয়ে পাকিয়ে তা দ্বারা উপকৃত হতে পারনা? লোকেরা বললো: ওটা তো মৃত প্রাণী। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আল্লাহ্ তো শুধু ওর গোস্ত খাওয়া হারাম করেছেন।' (ইবনে মাজা ব্যতীত অপর সবকটা সহিহ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত)।
বর্ণিত আছে, ইবনে আব্বাস (রা) সূরা আনয়ামের আয়াত: 'বলুন, আমার কাছে যে ওহি এসেছে তাতে আমি কোনো হারাম খাদ্য পাইনা ......' পাঠ করলেন এবং বললেন: আল্লাহ্ শুধু এগুলোর গোশত খাওয়া হারাম করেছেন। কিন্তু এর চামড়া, চামড়ার তৈরি জিনিস, দাঁত, হাড়, চুল ও পশম হালাল। -ইবনুল মুনযির ও ইবনে হাতিম। অনুরূপ মৃত প্রাণীর পেট থেকে বের করা জমাট দুধ হালাল। কেননা সাহাবিগণ যখন ইরাক জয় করলেন, তখন সেখানকার অগ্নি উপাসকদের তৈরি পনির খেয়েছিলেন, যা তাদের জবাই করা প্রাণীর পেট থেকে বের করা জমাট দুধ দিয়ে বানানো হতো। অথচ অগ্নি উপাসকরা মোশরেক এবং তাদের জবাই করা প্রাণী মৃত প্রাণীর পর্যায়ভুক্ত। সালমান ফারসি (রা) থেকে বর্ণিত: তাকে পনির ও ঘি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়। তিনি জবাব দেন: আল্লাহ্ তার কিতাবে যা যা হারাম করেছেন, তা হারাম। আর যা সম্পর্কে কিছুই বলেননি, তা বৈধ।' এটা সুবিদিত যে, সালমান যখন উমার ইবনুল খাত্তাবের পক্ষ থেকে মাদায়েনের প্রতিনিধি ছিলেন, তখন তাকে এ প্রশ্ন করা হয় এবং আসলে প্রশ্নটি ছিলো অগ্নি উপাসকদের পনির সম্পর্কে।
গ. রক্ত: স্বল্প পরিমাণ রক্ত হালাল। ইবনুল মুনযির বর্ণনা করেন, ইবনে জুরাইজ কুরআনের আয়াতে বর্ণিত 'বহমান রক্তের' ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন: জবাইকৃত জন্তুর রগের মধ্যে যে রক্ত থাকে, তাতে আপত্তি নেই। আর আবু মিজাল্লায ছাগল জবাইর স্থানে বা ডেগচির উপরি ভাগে যে রক্ত থাকে সে সম্পর্কে বলেন: ওতে কোনো অসুবিধা নেই, যা নিষিদ্ধ তা হচ্ছে বহমান রক্ত। -ইবনে হামিদ ও আবুশ শাইখ কর্তৃক বর্ণিত। আয়েশা (রা) বলেন: ডেগচির উপর রক্তের রেখা থাকা অবস্থায় আমরা গোশত খেতাম।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 গাধা ও খচ্চরের নিষেধাজ্ঞা

📄 গাধা ও খচ্চরের নিষেধাজ্ঞা


নিষিদ্ধ খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত গৃহপালিত গাধা ও খচ্চর। আল্লাহ বলেন: خَلَقَ الْخَيْلَ وَالْبِغَالَ وَالْحَمِيرَ لِتَرْكَبُوهَا وَزِينَةً . তোমাদের আরোহণের জন্য ও সৌন্দর্যের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা।' (সূরা নাহল: আয়াত ৮)।
এ ধারণা ঠিক নয় যে, হারাম খাদ্যের বিবরণ সংবলিত আয়াতের অর্থ আয়াতে বর্ণিত তালিকার মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা সীমাবদ্ধ এবং এগুলো ছাড়া আর কিছুই হারাম নয়। কুরতুবি এ ধারণা খন্ডন করে বলেন: এ আয়াত মক্কায় নাযিল হয়। এরপর রসূলুল্লাহ (সা) যদি কোনো জিনিস হারাম করে থাকেন বা কুরআনে অন্য কিছু হারাম করা হয়ে থাকে, তবে তাও এর সাথে যুক্ত হবে। রসূলুল্লাহ্ যা হারাম করেন, তা রসূলের মুখ দিয়ে আল্লাহ্রই একটি বর্ধিত হুকুম। এটাই অধিকাংশ ফকিহ ও হাদিস বিশারদর অভিমত।
১. ইমাম আবুদাউদ ও ইমাম তিরমিযি মিকদাদ ইবনে মাদীকারাব (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'জেনে রেখ, আমাকে কিতাব দেয়া হয়েছে, সেই সাথে অনুরূপ আরো কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রেখ, অচিরেই কোনো ব্যক্তি পরিতৃপ্ত অবস্থায় তার সুসজ্জিত খাটে বসে হয়তো বলবে: 'তোমরা এই কুরআনকে আঁকড়ে ধর, এতে যা হালাল পাও, তা হালাল বলে মেনে নাও, আর এতে যা হারাম পাও, তা হারাম বলে মেনে নাও। (অর্থাৎ হাদিসকে অগ্রাহ্য করে কেবল কুরআনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে) জেনে রেখ, গৃহপালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয়, কর্তন দাঁতধারী হিংস্র জন্তুও হালাল নয় এবং চুক্তিবদ্ধ নাগরিকের হারানো বস্তুও তার মালিক তার দাবি ছেড়ে না নিলে হালাল নয়। কোনো ব্যক্তি কোনো জনগোষ্ঠীর অতিথি হলে তার আপ্যায়ন করা তাদের কর্তব্য। যদি না করে তবে তার অধিকার রয়েছে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিস তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক হলেও আদায় করার।'
২. আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খয়বর দখল করলেন, তখন আমরা কিছু গাধা পেলাম। তা থেকে কিছু জবাই করে রান্না করলাম। এ সময় রসূলুল্লাহ্ (সা) ঘোষণা করলেন: সাবধান, আল্লাহ্ ও তার রসূল (সা) তোমাদেরকে এটা খেতে নিষেধ করেছেন। কেননা এটা অপবিত্র ও শয়তানের কাজ। তৎক্ষণাৎ ডেগচিগুলো উল্টে ফেলে দেয়া হলো। অথচ তখনো রান্না করা জিনিস তাতে টগবগ করছিল পাঁচটি সহিহ হাদিস গ্রন্থ।
৩. জাবির (রা) বলেন: খয়বরের যুদ্ধের দিন রসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে গাধা ও খচ্চর খেতে নিষেধ করেছেন, তবে ঘোড়া খেতে নিষেধ করেননি।
ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ্ (সা) গৃহপালিত গাধার অনুমতি দিয়েছেন। তবে বিশুদ্ধ বর্ণনা এই যে, ইবনে আব্বাস এ ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করে বলেন: আমি জানিনা, গৃহপালিত গাধা মানুষের পরিবহনের উপকরণ বিধায় এটি নষ্ট হবে ভেবে রসূলুল্লাহ্ (সা) নিষেধ করেছেন, না খয়বরে যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধা হারাম ঘোষণা করেছেন। (বুখারি)।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হিংস্র পশু ও পাখি হারাম

📄 হিংস্র পশু ও পাখি হারাম


ইসলাম যে সব প্রাণী হারাম করেছে, তন্মধ্যে হিংস্র পশু ও পাখি অন্যতম। ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন: প্রত্যেক কর্তন দাঁত বিশিষ্ট হিংস্র পশু ও প্রত্যেক নখরধারী পাখি রসূলুল্লাহ্ (সা) নিষিদ্ধ করেছেন। কর্তন দন্তধারী জন্তু দ্বারা সেই সব জন্তু বুঝায়, যারা মানুষের জান ও মালের উপর দাঁত বের করে আক্রমণ চালায়, যেমন: বাঘ, সিংহ, কুকুর, নেকড়ে বাঘ, চিতা বাঘ, বন্য বিড়াল। এ সব অধিকাংশ ফকিহের মতে হারাম। ইমাম আবু হানিফার মতে গোশত খায় এমন প্রত্যেক জন্তুই হিংস্র জন্তু। হাতি, হায়েনা, বিড়াল, ইঁদুর এ সবই তাঁর নিকট হারাম। ইমাম শাফেয়ির মতে মানুষের উপর আক্রমণ করে এমন জন্তুই নিষিদ্ধ হিংস্র জন্তু, যথা সিংহ ও বাঘ।
ইমাম মালিক মুয়াত্তা গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 'প্রত্যেক কর্তন দাঁতধারী হিংস্র জন্তু খাওয়া হারাম।' ইমাম মালিক হাদিসটি উদ্ধৃত করার পর বলেন: আমাদের নিকট এটাই কার্যকর মত। ইবনুল কাসেম বর্ণনা করেন, এগুলো খাওয়া মাকরূহ এবং এটাই অধিকাংশ সাহাবির মত। ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আবু হানিফার শিষ্যরা শিয়াল খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। আর ইবনে হাযম হাতি ও বেজী খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। বানর খাওয়া হারাম। আবু উমর বলেন: মুসলমানদের এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, বানর খাওয়া জায়েয নেই। কেননা রসূলুল্লাহ্ (সা) ওটা খেতে নিষেধ করেছেন। নখধারী পাখি বলতে সেই সব পাখিকে বুঝানো হয়েছে, যারা তাদের নখর দ্বারা আক্রমণ করে, যেমন চিল, শকুন, ঈগল ইত্যাদি। অধিকাংশ আলিমের নিকট এগুলো হারাম, যদিও তা ময়লা ভক্ষণকারী না হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00