📄 জলচর ও স্থলচর প্রাণী
ইমাম ইবনুল আরাবী বলেন: জলচর ও স্থলচর প্রাণীর ব্যাপারে সঠিক মত হলো, তা নিষিদ্ধ। কেননা এগুলোর হালাল হওয়া ও হারাম হওয়া উভয়ের পক্ষেই প্রমাণ রয়েছে। তথাপি সতর্কতা বশত: আমরা হারাম হওয়ার পক্ষের প্রমাণকেই অগ্রাধিকার দেই। ইবনুল আরাবী ব্যতীত অন্যান্য আলেমগণ মনে করেন, সকল জলচর মৃত প্রাণী হালাল, যদিও তা স্থলে বসবাস করতে সক্ষম হয়। একমাত্র ব্যাঙ হারাম। কেননা এটাকে হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছ। আব্দুর রহমান ইবনে উসমান (রা) থেকে বর্ণিত: জনৈক চিকিৎসক রসূল (সা) কে ব্যাঙ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো, যা সে ওষুধে ব্যবহার করে। তখন রসূল (সা) তাকে ব্যাঙ হত্যা করতে নিষেধ করলেন। (আবুদাউদ, নাসায়ি, আহমদ)।
📄 সূচর হালাল প্রাণী
যে সকল হালাল স্থলচর প্রাণীর বিবরণ কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে পাওয়া যায় তা আমরা নিম্নে উল্লেখ করছি:
📄 চতুষ্পদ জন্তু
সূরা নাহলের ৫ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন: وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا : لَكُمْ فِيهَا دِى وَمَغْفِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ
'তিনি সৃষ্টি করেছেন চতুষ্পদ জন্তু, এতে রয়েছে তোমাদের জন্য শীতের সম্বল আরো রয়েছে অনেক উপকার। তা থেকে তোমরা কিছু সংখ্যক খেয়েও থাক।' সূরা মায়িদার ১নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْنُوْا بِالْعُقُودُ أُحِلَّتْ لَكُمْ بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ
'হে মুমিনগণ! তোমরা অংগীকার পূর্ণ কর। তোমাদের নিকট যা বর্ণিত হচ্ছে তা ব্যতীত চতুস্পদ জন্তু তোমাদের জন্য হালাল করা হলো।'
চতুষ্পদ হালাল জন্তু হচ্ছে: উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, বন্য গরু, বন্য উট ও হরিণ। এ সব প্রাণী সর্বসম্মতভাবে হালাল। হাদিস থেকে আরো জানা যায়, মুরগি, হাঁস, ঘোড়া, বুনো গাধা, খরগোশ, গুই সাপ, হায়েনা, পঙ্গপাল ও চড়ুই পাখিও হালাল। (ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানিফার মতে ঘোড়া খাওয়া মাকরূহ। কেননা আল্লাহ্ এটাকে আরোহণের জন্তু হিসাবে উল্লেখ করেছেন, খাওয়ার জন্তু হিসাবে নয়।) উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) সুত্রে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত, আবুয যুবায়ের বলেন: জাবিরকে গুই সাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বললেন: এটা খাবেনা। তিনি এটিকে নোংরা বলেও আখ্যায়িত করলেন। অন্য দিকে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেছেন: 'রসূলুল্লাহ্ (সা) গুই সাপকে হারাম করেন নি, আল্লাহ্ এ দ্বারা অনেককে উপকৃত করেন। এটা থেকে কেবল সাধারণ রাখালদের খাদ্যই সংগৃহীত হয়। আমার কাছে থাকলে আমি ওটা খেতাম।'
ইবনে আব্বাস (রা) খালিদ ইবনুল ওলীদ সূত্রে বর্ণনা করেন: তিনি রসূলুল্লাহ্ (সা) কে সাথে নিয়ে তার খালা মাইমুনা বিনতে হারেসের নিকট গেলেন। মাইমুনা রসূলুল্লাহ্ (সা) কে গুই সাপের গোশত খেতে দিলেন, যা তার জনৈকা আত্মীয়া নাজদ থেকে পাঠিয়েছিল। রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিয়ম ছিল, তাকে কিছু খেতে দিলে সেটি কি জিনিস না জানা পর্যন্ত খেতেন না। মহিলারা স্থির করেছিল, ওটা কিসের গোশ্ত তা তাকে জানাবে না। তারা দেখবে, তিনি ওটা কেমন আস্বাদন করেন এবং আস্বাদন করে চিনতে পারেন কিনা।
কিন্তু তিনি জিজ্ঞাসা করত: জানতে পেরে, তখন গোশতটি বর্জন করলেন ও অপছন্দ করলেন। তখন খালিদ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: ওটা কি হারাম? রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন না, তবে এটা এমন এক খাবার, যা আমার গোত্রে চালু নেই। তাই আমার অপছন্দ হলো। খালিদ বলেন: এরপর আমি গোস্তের পাত্রটি কাছে টেনে নিলাম, খেলাম এবং রসূলুল্লাহ্ (সা) আমার খাওয়া দেখছিলেন।
আব্দুর রহমান ইবনে আম্মার (রা) বর্ণনা করেন: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করলাম: হায়েনা কি খেতে পারবো? তিনি বললেন: হ্যাঁ, আমি বললাম: ওটা শিকার করা যাবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ, আমি বললাম: আপনি কি এটা রসূলুল্লাহ (সা) এর কাছ থেকে শুনেছেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। (তিরমিযি)।
ইমাম শাফেয়ি, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ও ইবনে হায্যও হায়েনা খাওয়া জায়েয মনে করেন। এ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ি বলেন: আরবরা এটা খুবই পছন্দ করে ও প্রশংসা করে এবং সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে অবাধে এর কেনাবেচা হয়। তবে হিংস্র বিধায় কিছু সংখ্যক আলেম এটি খাওয়া হারাম মনে করেন। কিন্তু উপরোক্ত হাদিস তাদের বিপক্ষে।
ইমাম আবু দাউদ ও আহমদ উল্লেখ করেছেন: ইবনে উমর (রা) কে সজারু সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সূরা আনয়ামের এ আয়াত পাঠ করলেন: 'বলুন, আমার কাছে যে ওহি এসেছে তাতে মৃত জন্তু, প্রবাহিত রক্ত, ও শূকরের গোশত ছাড়া আর কিছু নিষিদ্ধ পাইনা..। এ সময়ে ইবনে উমরের কাছে বসা জনৈক প্রবীণ ব্যক্তি বললেন, আমি আবু হুরায়রাকে বলতে শুনেছি: রসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে সজারু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: 'এটা নোংরা প্রাণী।' তখন ইবনে উমর (রা) বললেন: রসূলুল্লাহ্ (সা) যদি এ কথা বলে থাকেন, তবে তার কথাই শিরোধার্য।' তবে এই হাদিসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে ঈসা ইবনে নামিলা দুর্বল। এ জন্য শওকানি বলেন: হালালের সাধারণ মূলনীতি থেকে সজারুকে ব্যতিক্রমি করার জন্য এ হাদিস উপযুক্ত নয়। আর শওকানির বক্তব্যের আলোকে সজারু খাওয়া হালাল। ইমাম মালেক, আবু সাওর, শাফেয়ি ও লাইসের মতে সজারু খাওয়া বৈধ। কারণ আরবরা এটা পছন্দ করে এবং উল্লিখিত হাদিসটি দুর্বল। তবে হানাফিগণ এটাকে মাকরূহ মনে করেন। আয়েশা (রা) ইঁদুর সম্পর্কে বলেছেন: এটা হারাম নয়। অত:পর তিনি সূরা আন'আমের উপরোক্ত আয়াত পাঠ করেন।
ইমাম মালেকের মতে, কীটপতংগ, বিচ্ছু, পোকামাকড়, মৌমাছির বাচ্চা, খোরমার পোকা ইত্যাদি খাওয়া বৈধ। কুরতুবি বলেন: ইমাম মালেকের প্রমাণ হলো ইবনে আব্বাস ও আবু দারদার উক্তি: 'আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা হারাম, আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হালাল এবং যে সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন তা নির্দোষ।'
কীটযুক্ত তরিতরকারী সম্পর্কে ইমাম আহমদ বলেন: আমার মতে ওটা বর্জন করাই ভালো। তবে কেউ যদি তা নোংরা মনে না করে তাহলে খাওয়া যেতে পারে। তিনি কীটযুক্ত খোরমা বেছে খাওয়া ভালো বলে মত প্রকাশ করেন। বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট কিছু পুরানো খোরমা আনা হলে তিনি তা বাছতে লাগলেন, ও তা থেকে পোকা বের করতে লাগলেন। ইবনে কুদামা বলেন: এটাই উত্তম।
ইবনে শিহাব, উরওয়া, শাফেয়ি, হানাফি ফকিহগণ ও মদিনার কিছু আলেম বলেন: কীটপতঙ্গ, সাপ, ইঁদুর এবং যে সব জীব হত্যা করা জায়েয, তা খাওয়া জায়েয নেই। এগুলোকে জবাই করে কোনো লাভ নেই। চড়ুই খাওয়া সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: কেউ কোনো চড়ুই বা তার চেয়ে বড় কোনো প্রাণীকে তার অধিকার না দিয়ে হত্যা করলে আল্লাহ্ তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। জিজ্ঞাসা করা হলো: হে রসূলুল্লাহ, চড়ুই এর অধিকার কী? তিনি বললেন: তাকে জবাই করে খেতে হবে এবং তার মাথা কেটে ফেলে দেয়া চলবে না। (নাসায়ি) আবুদাউদ ও তিরমিযি বর্ণনা করেন, কোনো কোনো সাহাবি রসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাথে বন্য পাখির গোশত খেয়েছেন।
📄 শস্যভাবে বর্জিত হারাম খাদ্য
কুরআনে যে সব খাদ্য হারাম ঘোষিত হয়েছে তার সংখ্যা দশটিতে সীমিত। আল্লাহ্ বলেন:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ ۚ 'তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মরা জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ব্যতীত অপরের নামে জবাইকৃত পশু, শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, প্রহারে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃংগাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু, তবে যা তোমরা জবাই করতে পেরেছ তা ব্যতীত। আর যা মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয় তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ধারণ করা। এ সব পাপ কাজ।' (সূরা মায়িদা-৫: ৩)
মরা অর্থ স্বাভাবিকভাবে মৃত জন্তু। যেহেতু স্বাভাবিকভাবে মৃত জন্তু কোনো না কোনো রোগেই মারা গেছে, তাই তার গোশত খেলে ক্ষতি অবধারিত। আর রক্ত দ্বারা প্রবাহিত রক্ত বুঝানো হয়েছে। যেহেতু প্রবাহিত রক্ত রোগ-জীবাণুর বিকাশে অধিকতর সহায়ক, তাই এটা খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর শূকরের গোস্ত নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, এটা একটা নোংরা প্রাণী এবং যাবতীয় নোংরা ও অপবিত্র জিনিসই তার প্রিয়তম খাদ্য। অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, এর মাংস বিশ্বের সকল মহাদেশে, বিশেষত: গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলে ক্ষতিকর। এর গোশত প্রাণঘাতী কৃমি উৎপাদন করে। আরো জানা যায়, যৌন সততা বিনাশে এর প্রভাব রয়েছে। আর আল্লাহ ব্যতীত অপর নামে ও মূর্তিপূজার বেদীতে জবাইকৃত জন্তু খাওয়া নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য হলো তাওহিদের হেফাযত। হিংস্র পশুর আক্রমণে আহত হালাল জন্তুকে জীবিত অবস্থায় পেয়ে জবাই করলে তা খাওয়া হালাল হবে।
সূরা মায়িদার এ আয়াতে যে বিবরণ দেয়া হয়েছে, তা আসলে সূরা আনয়ামের ১৪৫ নং আয়াতেরই বিস্তারিত বিবরণ, যাতে বলা হয়েছে: 'বলুন, আমার কাছে যে ওহি প্রেরণ করা হয়েছে তাতে আমি মৃত, বহমান রক্ত, শূকরের গোস্ত, অথবা যা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করার কারণে অবৈধ, তা ছাড়া কোনো ভক্ষণকারীর জন্য কোনো হারাম খাদ্য পাই না। সূরা আনয়ামের আয়াতে চারটা জিনিস সংক্ষেপে আর এ আয়াতে বিস্তারিতভাবে সবকটা হারাম জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে।