📄 সংজ্ঞা
আরবিতে ওকালাহ্ শব্দের অর্থ কারো নিকট কোনো দায়িত্ব সমর্পণ করা। আর শরিয়তের পরিভাষায় এর অর্থ হলো, যে ক্ষেত্রে প্রতিনিধি নিয়োগ বৈধ, সে ক্ষেত্রে এক ব্যক্তি কর্তৃক অপর ব্যক্তিকে নিজের প্রতিনিধি নিয়োগ করা।
📄 ওকালার বৈধতা
ইসলাম প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে ওকালাহ্ বা প্রতিনিধি নিয়োগ বৈধ করেছে। কেননা সকল মানুষ নিজের কাজ নিজেই করতে সমর্থ হয় না। তাই সে অন্যকে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে বাধ্য হয়, যাতে সে তার প্রতিনিধি হয়ে তার কাজ সমাধা করে দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আসহাবুল কাহফ্ফের ঘটনা প্রসংগে বলেন: وَكَذَلِكَ بَعَثْنَهُمْ لِيَتَسَاءَلُوا بَيْنَهُمْ ، قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ كَمْ لَبِثْتُمْ ، قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ ، قَالُوا رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثْتُمْ فَابْعَثُوا ، أَحَدَكُمْ بِوَرِقِكُمْ هَذِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلْيَنْظُرْ أَيُّهَا أَزْكَى طَعَامًا فَلْيَأْتِكُمْ برزق منه وَلْيَتَلَطَّفْ وَلَا يُشْعِرَن بِكُمْ أَحَدَاهُ
'এ ভাবে আমি তাদেরকে জাগরিত করলাম যাতে তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললো: তোমরা কত কাল অবস্থান করেছো? কেউ কেউ বললো: একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ। কেউ কেউ বললো: তোমরা কত কাল অবস্থান করেছ, তা তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন। এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ নগরে প্রেরণ কর, সে যেন দেখে কোন্ খাদ্য উত্তম এবং তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে এবং কিছুতেই যেন তোমাদের সম্বন্ধে কাউকে কিছু জানতে না দেয়।' (সূরা কাহফ, আয়াত ১৯) অনুরূপ আল্লাহ্ ইউসুফ (আ) সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, তিনি বাদশাকে বললেন: اجْعَلْنِي عَلَي خَزَائِنِ الْأَرْضِ : إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ (سورة يوسف : ٥٥)
'আমাকে দেশের ধনসম্পদের উপর কর্তৃত্ব দেন আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও সুবিজ্ঞ।' এছাড়া বহু সংখ্যক হাদিসেও ওকালাহ্ বা প্রতিনিধি নিয়োগকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো: রসূলুল্লাহ্ (সা) আবু রাফে' ও জনৈক আনসারীকে প্রতিনিধি নিয়োগ করেছিলেন, ফলে তারা উভয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাথে মাইমুনা (রা) কে বিয়ে দেন। তা ছাড়া তিনি ঋণ পরিশোধে, 'হুদুদ' প্রমাণিত করায় ও তার বাস্তবায়ন ইত্যাদিতে প্রতিনিধি নিয়োগ করতেন এটা প্রমাণিত হয়েছে। মুসলমানদের ইজমা বা সর্বসম্মত মত থেকেও এটা শুধু বৈধ নয় বরং মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়। কেননা এটা সৎকাজে ও তাকওয়ায় এক ধরনের সহযোগিতা, যার জন্য কুরআনে আহ্বান জানানো হয়েছে ও সুন্নাহয় উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। وَتَعَاوَلُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوٰى وَلَا تَعَاوَلُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ : 'তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবেনা।' রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'বান্দা যতোক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে লিপ্ত থাকে, ততোক্ষণ আল্লাহ্ বান্দার সাহায্যে লিপ্ত থাকেন।'
'আল-বাহর' গ্রন্থে বলা হয়েছে: ওকালার বৈধতার পক্ষে ইজমা রয়েছে। ওকালাহ্ প্রতিনিধিত্ব না অভিবাবকত্ব সে সম্পর্কে দুটো মত রয়েছে। কেউ বলেন: এটা প্রতিনিধিত্ব এই হিসাবে যে, যে ব্যক্তি প্রতিনিধি নিয়োগ করে তার নির্দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা নিষিদ্ধ। আবার কেউ বলেন: এটা এ হিসাবে অভিভাবকত্ব যে, প্রতিনিধি নিয়োগকারীর আদেশের বিরোধিতা করে অপেক্ষাকৃত মংগলজনক কাজ করা বৈধ। যেমন বাকিতে বিক্রয় করার আদেশ দেয়া সত্ত্বেও প্রতিনিধির নগদ বিক্রয় করা।
📄 ওকালার মূল উপাদান
ওকালাহ্ অন্যান্য চুক্তির মতোই একটা চুক্তি। সুতরাং এর মূল উপাদান ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও প্রস্তাব গ্রহণ) ব্যতীত এটা শুদ্ধ হবে না। এতে কোনো নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করার বাধ্যবাধকতা নেই, বরং যে কোনো কথা বা কাজ দ্বারা প্রতিনিধিত্ব বুঝা গেলেই ওকালত শুদ্ধ হবে। চুক্তি সম্পাদনকারী উভয় পক্ষ যে কোনো অবস্থায় ওকালাহ্ চুক্তি বাতিল করারও অধিকারী। কেননা এটা বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, বরং বৈধ চুক্তি।
📄 শর্তযুক্ত ও শর্তহীন ওকালাহ্
ওকালাহর চুক্তি শর্তহীনভাবে, শর্তযুক্তভাবে, ভবিষ্যতের কোনো কাজের উপর নির্ভরশীল রেখে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমিত রেখে বা নির্দিষ্ট কাজের উপর নির্ভরশীল রেখেও করা যায়। শর্তহীন ওকালার উদাহরণ হলো: 'তোমাকে অমুক জিনিস কিনতে উকিল তথা প্রতিনিধি নিযুক্ত করলাম।' আর শর্তযুক্ত ওকালাহ্ উদাহরণ, যথা: 'এরূপ যদি ঘটে, তবে তুমি আমার প্রতিনিধি।' ভবিষ্যতের উপর নির্ভরশীল ওকালার উদাহরণ হলো, যথা: 'রমযান মাস সমাগত হলেই তোমাকে আমি প্রতিনিধি নিয়োগ করবো।' নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমিত ওকালাহর উদাহরণ হলো: 'তোমাকে অমুক কাজে এক বছরের জন্যে প্রতিনিধি নিযুক্ত করলাম।' এ হচ্ছে হানাফি ও হাম্বলি মযহাবের মত। শাফেয়ি মযহাব মতে ওকালাহ্ কোনো শর্তের অধীনে জায়েয নেই।
ওকালাহ্ বিনা মজুরিতেও হতে পারে, আবার মজুরির ভিত্তিতেও হতে পারে। মজুরি ভিত্তিক হলে নিয়োগকর্তা এরূপ শর্ত আরোপ করতে পারবে যে, নির্দিষ্ট মেয়াদের পরে ব্যতীত প্রতিনিধি নিজেকে প্রতিনিধিত্ব থেকে মুক্ত করতে পারবে না। করলে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। চুক্তিতে যদি প্রতিনিধির জন্য মজুরি নির্ধারিত হয়, তাহলে সে একজন চাকর বা মজুর গণ্য হবে এবং চাকর সংক্রান্ত যাবতীয় বিধি তার উপর প্রযোজ্য হবে। (কেউ যদি কাউকে বলে: 'এটা দশ মুদ্রায় বিক্রয় কর, বেশি দামে বিক্রয় করতে পারলে বেশিটুকু তোমার' তবে তা বৈধ হবে এবং বেশিটুকু সে পাবে। এটা ইস্হাক প্রমুখের মত, ইবনে আব্বাস এতে কোনো দোষ দেখেন না।