📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিসের জবাব

📄 যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিসের জবাব


যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিসের জবাব
যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিস: জাবের বিন আব্দুল্লাহ বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন। -মুসলিম। রাফে বিন খাদীজ থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন। রাফে বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করলাম: "জমি ভাড়া দেয়া হারাম, না মাকরূহ? তিনি বললেন: "হারাম নয়, তবে তোমরা যাতে পরস্পরে সাহায্য সহযোগিতা করো, সেজন্য তোমাদেরকে এ থেকে বিরত থাকতে আদেশ দেয়া হয়েছে।" -আহমদ, আবু দাউদ।
জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে মুসলিম বর্ণনা করেন: আমরা আমাদের জমি ভাড়া দিতাম, অর্ধ ওয়াসাকের (নগদ অর্থে) বিনিময়ে। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: "যার জমি আছে, সে হয় নিজে চাষ করবে, না হয় তার ভাইকে চাষ করতে দেবে।" -মুসলিম।
এই হাদিসগুলোতে জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে খয়বরের হাদিস মুজারআ পদ্ধতিকে বৈধ ঘোষণা করেছে। এই দুটো হাদিসের মধ্যে কিভাবে সমন্বয় করা যায়? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ফকিহগণ কয়েকটি মত অবলম্বন করেছেন:
১. প্রথম মত: যৌথ কৃষি জায়েয। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর, জাবের, ইবনে আব্বাস, তাউস, ইবনে সিরীন, কাসেম, উরওয়া, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, যায়দ ইবনে আসলাম, আবু বকর বিন আব্দুল আযীয, ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ, আহমদ, ইসহাক, ইবনুল মুনযির, ইবনুল কাইয়েম ও যাহেরি মাযহাব এই মত পোষণ করেন। জাবের বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তারা বলেন: এ হাদিসে জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে নগদ অর্থ দ্বারা এবং সে পদ্ধতিতেই, যা নগদ অর্থ দিয়ে করা হতো। আর জমি ভাড়া দিয়ে নগদ অর্থ নেয়ার পরিবর্তে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হোক-এটাই রসূলুল্লাহ সা.-এর উদ্দেশ্য।
২. দ্বিতীয় মত: যৌথ কৃষি হারাম। ইবনে উমর, যায়দ বিন ছাবেত, সাঈদ বিন জুবাইর, ইমাম শাফেয়ি, আবু হানিফা ও আওযায়ি এই মত পোষণ করেন। তারা প্রমাণ দেন জাবের বিন আব্দুল্লাহ বর্ণিত হাদিস থেকে।
৩. তৃতীয় মত: যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ। কিন্তু তা কেবল তখনই যখন জমির মালিক নিজেই জমি চাষ করে। আর যখন সে তার জমি চাষ করেনা, তখন যৌথ কৃষি বৈধ। এই মতটি ইমাম মালেক ও সুফিয়ান ছাওরির।
৪. চতুর্থ মত: যৌথ কৃষি তখন বৈধ হবে, যখন উৎপাদিত ফসলের অংশীদারি নির্ধারিত হবে। যদি অনির্ধারিত থাকে, তাহলে বৈধ হবেনা। এই মতটি ইমাম মালিকের।
যে সকল ফকিহ মুজারআ-কে জায়েয বলেন, তারা জাবের বর্ণিত হাদিসকে ব্যাখ্যা করেন যে, নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেই জমি ভাড়া, যেখানে উৎপাদিত ফসলের অংশীদারিত্ব নির্ধারণ করা হয়না। অর্থাৎ জমি ভাড়া দেয়া হয়েছে বটে, কিন্তু ফসলের কোন্ অংশ কে পাবে তা ঠিক করা হয়নি। ফলে উভয়ের মধ্যে বিরোধ ও ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। আর যে হাদিসে নগদ অর্থ ও স্বর্ণ মুদ্রার বিনিময়ে জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে, সেটা নগদ অর্থ দ্বারা জমি ভাড়া দেয়া অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। এই সকল ফকিহ বলেছেন: নগদ অর্থ দ্বারা বা এমন জিনিস দ্বারা জমি ভাড়া দেয়া অবৈধ, যা জমি থেকে উৎপন্ন শস্যের অংশ নয়। নগদ অর্থ বা উৎপাদিত শস্যের অংশ ভিন্ন অন্য কিছু দিয়ে জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন এই জন্য যে, এই ভাড়া দেয়াতে এক পক্ষ লাভবান হবে, আর অপর পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ফলে ঝগড়ার সৃষ্টি হবে। আর এই যৌথ কৃষি বৈধ। ইবনুল কাইয়েম মুজারআ নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিস ও খয়বরের মুজারআ বিষয়ক হাদিসের সমন্বয় সাধন করে বলেন, মুজারআ বৈধ। আর নগদ অর্থে জমি ভাড়া দেয়া নিষিদ্ধ। এর কারণ হলো, যখন এক ব্যক্তি তার জমি অপর ব্যক্তিকে চাষ করতে দেয় এবং উৎপাদিত ফসলের অংশীদার হয়, তখন এতে উভয়ের মধ্যে সাহায্য সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নগদ অর্থে জমি ভাড়া দেয়, সে মূলত জমি জমা থেকে তার আয় রোজগার বৃদ্ধি করতে চায়। এতে পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয় এবং ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হয়।
মুসাকাত: মুসাকাত অর্থ ফলের গাছ ও ফলের বাগানে চুক্তি করা। এর পদ্ধতি হলো: ফলের গাছের মালিক বাগানে অপরের নিকট ফলের গাছের পরিচর্যা করার ও ফলের বাগানের অন্যান্য কাজকর্ম করার দায়িত্ব অর্পণ করবে এবং শর্ত দেবে যে, সে উৎপাদিত ফলের নির্দিষ্ট অংশ পাবে। চুক্তিটি ফলের গাছ থাকা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। মুসাকাত বৈধ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুদার বিনিময়ে জমি ভাড়া নেয়া

📄 মুদার বিনিময়ে জমি ভাড়া নেয়া


মুদার বিনিময়ে জমি ভাড়া নেয়া মুসাকাত বৈধ হওয়া সম্পর্কে আলেমদের কোনো মতভেদ নেই। রসূলুল্লাহ সা. খয়বরবাসীদেরকে উৎপন্ন ফলের অর্ধেক দেয়ার শর্তে তাদের বাগান ও ফসলের ক্ষেতগুলোতে কাজ করার দায়িত্ব দেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, এ চুক্তি বৈধ। মুসাকাত ও মুজারআতে পার্থক্য এই যে, মুসাকাতে ফলের বাগানের গাছগুলোকে কাজে লাগানো হয়। আর মুজারআতে ফলের বাগানের জমিকে কাজে লাগানো হয়।
মুগারাছা: মুগারাছা অর্থ চারা রোপণ করা। এ চুক্তি মুজারআ ও মুসাকাত থেকে পৃথক। এতে জমির মালিক তার জমি অপর কোনো ব্যক্তিকে দেয়, এ শর্তে যে, সে তাতে ফলবান চারা রোপণ করবে এবং সে তাতে উৎপাদিত ফলের নির্দিষ্ট অংশের মালিক হবে। এই চুক্তি চারা রোপণ করার মেয়াদ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই চুক্তির বৈধতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন বৈধ, কেউ বলেন অবৈধ। ইমাম আবু হানিফা, আহমদ, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়েম বলেন: মুগারাছা বৈধ। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো পতিত জমিকে আবাদ করবে, সে তার মালিকানা লাভ করবে।" আর যদি সেই জমির মালিক অন্য কেউ হয়, তবে জমির মালিক ও আবাদকারী উভয়ের সম্মতিক্রমে উৎপাদিত ফসলের অংশীদারি নির্ধারিত হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অবৈধ বর্গাচাষ

📄 অবৈধ বর্গাচাষ


অবৈধ বর্গাচাষ
শাফেয়ি, মালেক ও আবু হানিফার মতে, বর্গা চাষের কিছু পদ্ধতি অবৈধ। সেগুলো নিম্নরূপ:
১. যখন ফসলের নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ ফসলের মালিক পাবে বলে শর্ত আরোপ করা হয়। যেমন বলা হবে, আমি তোমার কাছে এই জমি ভাড়া দিলাম এবং আমি দশ ওয়াসাক গম নেবো। এটা অবৈধ।
২. যখন জমির মালিক নির্দিষ্ট কোনো অংশের ফসল পাবে বলে শর্তারোপ করে। যেমন বলা হবে, এই জমিটা তোমার। কিন্তু আমি এর থেকে এক তৃতীয়াংশ, বা এক চতুর্থাংশ গম নেবো। এটা অবৈধ।
৩. নদীর পাশে বা পানির কিনারায় ফসল হলে জমির মালিক তা পাবে বলে শর্তারোপ করা।
৪. যখন বর্গাচাষে বীজ কার থাকবে তা অনির্ধারিত থাকে।
৫. যখন বীজ হবে বর্গাচাষীর। কিন্তু জমির মালিকের পক্ষ থেকে কিছু কাজ করা ও শ্রম দেয়া শর্ত করা হয়।
৬. যখন চুক্তি দীর্ঘ মেয়াদের জন্য করা হয়। এই সকল পদ্ধতি নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, এতে এক পক্ষ লাভবান হয় ও অপর পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে উভয়ের মধ্যে বিরোধ ও ঝগড়ার সৃষ্টি হয়।
টিকাঃ
বর্গা চাষের বৈধ পদ্ধতি: বর্গা চাষের বৈধ পদ্ধতিগুলো নিম্নে দেওয়া হলো:
১. যখন ফসলের অংশীদারিত্ব নির্ধারণ করা হবে। যেমন বলা হবে, উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক তোমার ও অর্ধেক আমার। কিংবা এক তৃতীয়াংশ তোমার ও দুই তৃতীয়াংশ আমার।
২. যখন বর্গাচাষে জমির মালিকের পক্ষ থেকে কিছু শ্রম দেওয়া হবে।
৩. যখন বর্গাচাষের মেয়াদ নির্ধারিত থাকবে।
৪. যখন ফসলের বীজ জমির মালিকের থাকবে।
৫. যখন চুক্তি স্বল্প মেয়াদের জন্য করা হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পতিত জমি আবাদ করা

📄 পতিত জমি আবাদ করা


পতিত জমি আবাদ করা
ইসলাম পতিত জমিকে আবাদ করে তাকে কাজে লাগানোর প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। কেননা এতে আল্লাহর দীনের প্রচার হয়, সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এতে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়িত হয়। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি পতিত জমি আবাদ করবে, সে তার মালিকানা লাভ করবে।" -বুখারি, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী।
আবু দাউদ ও তিরমিযি সাঈদ বিন যায়দ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি এমন জমি আবাদ করবে, যা কারো মালিকানাধীন নয়, সে তার মালিকানা লাভ করবে।" উরওয়া বিন যুবাইর রা. বলেন: উমর রা. তার শাসন আমলে বলেছেন: "যে ব্যক্তি পতিত জমি আবাদ করবে, সে তার মালিকানা লাভ করবে।" ইবনুল কাইয়েম বলেন: রসূলুল্লাহ সা.-এর এই হাদিস এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের শাসনকালে এর বাস্তব প্রয়োগ দ্বারা প্রমাণিত যে, পতিত জমি আবাদ করা শরয়ী পন্থায় জমি মালিকানা লাভ করার একটি পন্থা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00