📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কৃষির ফযিলত

📄 কৃষির ফযিলত


পৃথিবীর বুকে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা, আল্লাহর দীনের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা, তাঁর বিধান কার্যকর করা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাঁর আদেশ মেনে চলার নীতিকে বাস্তব রূপ দেয়াই মুসলমানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এর ফলে পৃথিবীতে আল্লাহর খেলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। এই খেলাফত ব্যবস্থার ভিত্তি হলো কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ঐক্য। মুসলিম সমাজের নিরাপত্তা ও জীবনের মান উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। কৃষি মানবজাতির জীবন রক্ষার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমেই মানুষ খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা মেটায়। এ কারণে ইসলাম কৃষিকাজকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়েছে। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যদি তোমাদের কেউ দেখে, কেয়ামত আসন্ন, আর তার হাতে খেজুর চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে।" -আহমদ, বুখারি (আদাবুল মুফরাদ)। বুখারি ও মুসলিম আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: "রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি গাছ লাগাবে, অথবা ক্ষেতে ফসল রোপণ করবে, অতপর তা থেকে মানুষ বা পশু যা কিছুই খাবে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যৌথ কৃষি বা বর্গা চাষ

📄 যৌথ কৃষি বা বর্গা চাষ


যৌথ কৃষি বা বর্গা চাষ
যৌথ কৃষি বা বর্গা চাষ তিন রকমের: মুজারআ, মুসাকাত ও মুগারাছা।
মুজারআ: যৌথ কৃষির প্রথম পদ্ধতি মুজারআ, যা অর্থ হলো: জমির মালিক কর্তৃক অপর কোনো ব্যক্তিকে এ শর্তে নিজের জমি দেয়া যে, সে তাতে ফসলের বীজ বুনবে এবং উভয়ে উৎপাদিত ফসলের অংশীদার হবে। এই চুক্তি ফসল কাটা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ইবনুল মুনযির বলেছেন: মুজারআ বৈধ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যৌথ কৃষির বৈধতা

📄 যৌথ কৃষির বৈধতা


মুজারআ-র বৈধতা: মুজারআ বৈধ হওয়া সম্পর্কে সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উমর, উসমান, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, উমর বিন আব্দুল আযীয, হাসান বসরী, ইবনে সিরীন, যুহরি, আবু সাওর, আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ, আহমদ, ইসহাক, ইবনে হাযম, ইমামিয়া শীয়া ও যায়দিয়া শীয়াগণ এর পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা প্রমাণ দেন: খয়বরের অধিবাসীরা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এসে বললেন: হে রসূলুল্লাহ, আমাদেরকে খয়বরের জমিতে আগের মতোই কাজ করতে দিন। রসূলুল্লাহ সা. জবাবে বললেন: "তোমাদেরকে আমি কাজ করতে দেবো, কিন্তু উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক নেবে।" -বুখারি, মুসলিম।
হাদিসে যা বর্ণনা করা হয়েছে, তা হলো, রসূলুল্লাহ সা. খয়বরবাসীদেরকে তাদের বাগান ও জমিতে কাজ করতে দিলেন, এই শর্তে যে, তারা উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক নেবে। তারা উৎপাদিত ফল ফসল ও উৎপন্ন শস্যের অর্ধেক দিতো। ইবনুল মুনযির বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে তার অর্জিত ফসলের অর্ধেক দিতেন। এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, রসূলুল্লাহ সা. মুজারআ পদ্ধতিতে চুক্তি করেছেন।
কাযী বলেন, খয়বরের অধিবাসীরা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এসে চুক্তি করলো, খয়বরের জমি রসূলুল্লাহ সা. এর মালিকানাভুক্ত হওয়ায় তারা রসূল সা.-এর সাথে এ চুক্তি করলো যে, তারা সে জমিতে কাজ করবে এবং উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক রসূল সা. কে দেবে। এই চুক্তিকে মুজারআ বলা হয় এবং এই চুক্তি ইসলামে বৈধ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিসের জবাব

📄 যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিসের জবাব


যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিসের জবাব
যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিস: জাবের বিন আব্দুল্লাহ বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন। -মুসলিম। রাফে বিন খাদীজ থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন। রাফে বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করলাম: "জমি ভাড়া দেয়া হারাম, না মাকরূহ? তিনি বললেন: "হারাম নয়, তবে তোমরা যাতে পরস্পরে সাহায্য সহযোগিতা করো, সেজন্য তোমাদেরকে এ থেকে বিরত থাকতে আদেশ দেয়া হয়েছে।" -আহমদ, আবু দাউদ।
জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে মুসলিম বর্ণনা করেন: আমরা আমাদের জমি ভাড়া দিতাম, অর্ধ ওয়াসাকের (নগদ অর্থে) বিনিময়ে। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: "যার জমি আছে, সে হয় নিজে চাষ করবে, না হয় তার ভাইকে চাষ করতে দেবে।" -মুসলিম।
এই হাদিসগুলোতে জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে খয়বরের হাদিস মুজারআ পদ্ধতিকে বৈধ ঘোষণা করেছে। এই দুটো হাদিসের মধ্যে কিভাবে সমন্বয় করা যায়? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ফকিহগণ কয়েকটি মত অবলম্বন করেছেন:
১. প্রথম মত: যৌথ কৃষি জায়েয। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর, জাবের, ইবনে আব্বাস, তাউস, ইবনে সিরীন, কাসেম, উরওয়া, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, যায়দ ইবনে আসলাম, আবু বকর বিন আব্দুল আযীয, ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ, আহমদ, ইসহাক, ইবনুল মুনযির, ইবনুল কাইয়েম ও যাহেরি মাযহাব এই মত পোষণ করেন। জাবের বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তারা বলেন: এ হাদিসে জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে নগদ অর্থ দ্বারা এবং সে পদ্ধতিতেই, যা নগদ অর্থ দিয়ে করা হতো। আর জমি ভাড়া দিয়ে নগদ অর্থ নেয়ার পরিবর্তে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হোক-এটাই রসূলুল্লাহ সা.-এর উদ্দেশ্য।
২. দ্বিতীয় মত: যৌথ কৃষি হারাম। ইবনে উমর, যায়দ বিন ছাবেত, সাঈদ বিন জুবাইর, ইমাম শাফেয়ি, আবু হানিফা ও আওযায়ি এই মত পোষণ করেন। তারা প্রমাণ দেন জাবের বিন আব্দুল্লাহ বর্ণিত হাদিস থেকে।
৩. তৃতীয় মত: যৌথ কৃষি নিষিদ্ধ। কিন্তু তা কেবল তখনই যখন জমির মালিক নিজেই জমি চাষ করে। আর যখন সে তার জমি চাষ করেনা, তখন যৌথ কৃষি বৈধ। এই মতটি ইমাম মালেক ও সুফিয়ান ছাওরির।
৪. চতুর্থ মত: যৌথ কৃষি তখন বৈধ হবে, যখন উৎপাদিত ফসলের অংশীদারি নির্ধারিত হবে। যদি অনির্ধারিত থাকে, তাহলে বৈধ হবেনা। এই মতটি ইমাম মালিকের।
যে সকল ফকিহ মুজারআ-কে জায়েয বলেন, তারা জাবের বর্ণিত হাদিসকে ব্যাখ্যা করেন যে, নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেই জমি ভাড়া, যেখানে উৎপাদিত ফসলের অংশীদারিত্ব নির্ধারণ করা হয়না। অর্থাৎ জমি ভাড়া দেয়া হয়েছে বটে, কিন্তু ফসলের কোন্ অংশ কে পাবে তা ঠিক করা হয়নি। ফলে উভয়ের মধ্যে বিরোধ ও ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। আর যে হাদিসে নগদ অর্থ ও স্বর্ণ মুদ্রার বিনিময়ে জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে, সেটা নগদ অর্থ দ্বারা জমি ভাড়া দেয়া অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। এই সকল ফকিহ বলেছেন: নগদ অর্থ দ্বারা বা এমন জিনিস দ্বারা জমি ভাড়া দেয়া অবৈধ, যা জমি থেকে উৎপন্ন শস্যের অংশ নয়। নগদ অর্থ বা উৎপাদিত শস্যের অংশ ভিন্ন অন্য কিছু দিয়ে জমি ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন এই জন্য যে, এই ভাড়া দেয়াতে এক পক্ষ লাভবান হবে, আর অপর পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ফলে ঝগড়ার সৃষ্টি হবে। আর এই যৌথ কৃষি বৈধ। ইবনুল কাইয়েম মুজারআ নিষিদ্ধ হওয়া সংক্রান্ত হাদিস ও খয়বরের মুজারআ বিষয়ক হাদিসের সমন্বয় সাধন করে বলেন, মুজারআ বৈধ। আর নগদ অর্থে জমি ভাড়া দেয়া নিষিদ্ধ। এর কারণ হলো, যখন এক ব্যক্তি তার জমি অপর ব্যক্তিকে চাষ করতে দেয় এবং উৎপাদিত ফসলের অংশীদার হয়, তখন এতে উভয়ের মধ্যে সাহায্য সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নগদ অর্থে জমি ভাড়া দেয়, সে মূলত জমি জমা থেকে তার আয় রোজগার বৃদ্ধি করতে চায়। এতে পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয় এবং ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হয়।
মুসাকাত: মুসাকাত অর্থ ফলের গাছ ও ফলের বাগানে চুক্তি করা। এর পদ্ধতি হলো: ফলের গাছের মালিক বাগানে অপরের নিকট ফলের গাছের পরিচর্যা করার ও ফলের বাগানের অন্যান্য কাজকর্ম করার দায়িত্ব অর্পণ করবে এবং শর্ত দেবে যে, সে উৎপাদিত ফলের নির্দিষ্ট অংশ পাবে। চুক্তিটি ফলের গাছ থাকা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। মুসাকাত বৈধ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00