📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ক্রয়-বিক্রয়ে টাকা জনিত অবকাশ

📄 ক্রয়-বিক্রয়ে টাকা জনিত অবকাশ


ক্রয়-বিক্রয়ে ঠকা জনিত অবকাশ: ঠকা কখনো বিক্রেতার হয়। যেমন যে জিনিসের দাম পাঁচ মুদ্রা, তা তিন মুদ্রায় বিক্রয় করলো। আবার কখনো ক্রেতারও হয়। যেমন যে জিনিসের মূল্য তিন টাকা তা পাঁচ টাকায় ক্রয় করলো।
যখন কেউ ক্রয় বা বিক্রয় করে ঠকে, তখন তার ক্রীত জিনিস ফেরত দেয়া ও চুক্তি বাতিল করার অধিকার থাকে। তবে এ জন্যে শর্ত হলো, পণ্যের মূল্য সম্পর্কে সে অবহিত থাকবে না এবং দরকষাকষি করতে সক্ষম হবে না। কেননা এরূপ ক্ষেত্রে তাকে ঠকানো প্রতারণার শামিল, যা থেকে প্রত্যেক মুসলমানেরই মুক্ত থাকা জরুরি। যখন কোনো ক্রেতা বা বিক্রেতা এরূপ ঠকার শিকার হয়, তখন চুক্তি বাতিল করা বা বহাল রাখা তার ইচ্ছাধীন হয়ে যায়। তবে এখানে প্রশ্ন এই যে, শুধুমাত্র ঠকার শিকার হওয়াই কি এ ধরনের অধিকার পাওয়ার জন্যে যথেষ্ট?
কতক আলেমের মতে ঠকা অস্বাভাবিক ও মাত্রাতিরিক্ত ধরনের হওয়া চাই। কেউ কেউ বলেন: মূল্যের এক তৃতীয়াংশ পরিমাণ ঠকা হওয়া চাই। আবার অনেকের মতে, যে কোনো পর্যায়ের ঠকা হলেই এ অধিকার পাওয়া যাবে।
যেহেতু কোনো বিক্রয়ই সাধারণত পুরোপুরি ঠকা মুক্ত হয় না, সেহেতু ঠকা সম্পর্কে অনেকে এরূপ শর্ত আরোপ করেন। তাছাড়া ছোটখাট ঠকা সাধারণত সহনীয় ও ক্ষমার যোগ্য মনে করা হয়ে থাকে। সর্বাধিক উৎকৃষ্ট মত হলো, প্রচলিত রীতি ও প্রথা অনুযায়ীই ঠকার প্রকৃতি বা শর্ত নির্ণীত হবে। প্রচলিত রীতি ও প্রথার আলোকে যেটি ঠকা, সেটির ক্ষেত্রেই পণ্য ফেরত দেয়া বা নেয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যেটি প্রচলিত রীতি ও প্রথায় ঠকা নয়, তার ব্যাপারে ফেরত দেয়া বা নেয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। এটা ইমাম আহমদ ও ইমাম মালিকের অভিমত। তারা এর প্রমাণ হিসাবে বুখারি ও মুসলিম কর্তৃক ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিস উপস্থাপন করেন:
'হাব্বান ইবনে মুনকিয নামক এক ব্যক্তি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্ সা. কে জানানো হলো যে সে ব্যবসায় ঠকার শিকার হয়ে থাকে। রসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: যখন তুমি কারো সাথে কেনাবেচা করবে তখন বলবে: 'কোনো প্রতারণা নয়।' অর্থাৎ এ কথা যে বলবে, সে ঠকুক বা না ঠকুক, তার পণ্য ফেরত দেয়া বা নেয়ার অধিকার থাকবে।
ইবনে ইসহাক এই হাদিসের সাথে সংযোজন করেন: 'অত:পর প্রত্যেক পণ্যে তিন দিন পর্যন্ত তোমার চুক্তি পুনর্বিবেচনা করার অধিকার থাকবে। যদি তোমার নিকট সন্তোষজনক হয় তবে বহাল রাখ, সন্তোষজনক না হলে ফেরত দাও।' এরপর এই ব্যক্তি উসমান রা. এর আমল পর্যন্ত জীবিত ছিল এবং তখন তার বয়স হয়েছিল একশো ত্রিশ বছর। উসমান রা. এর আমলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তখন কেউ যখন কোনো জিনিস কিনতো এবং তাকে বলা হতো যে, তুমি ঠকবে, তখন সে ফিরে যেত। তখন কোনো সাহাবি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিত যে, রসূলুল্লাহ্ সা, তিন দিন পর্যন্ত পুনর্বিবেচনার অধিকার দিয়েছেন। তখন সে তার মুদ্রাগুলো ফিরিয়ে দিত। অধিকাংশ আলিমের অভিমত হলো, ঠকা দ্বারা পূনর্বিবেচনার
১৪০
অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। কেননা ক্রয়-বিক্রয় কার্যকর হওয়া সংক্রান্ত প্রমাণাদি ঠকা বা না ঠকার শর্তযুক্ত নয়। হাব্বান ইবনে মুনক্বিয সংক্রান্ত হাদিসের জবাবে তারা বলেন: লোকটি স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন ছিলো। আর যদি যে, ভালোমন্দ বাছাইবিচার করতে এতটা স্বল্পবুদ্ধির না হয় তার লেনদেন সেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালকের লেনদেনের সাথে তুলনীয় হবে যে, ভালোমন্দ বাছাইবিচার করতে পারে এবং তাকে ব্যবসায় লিপ্ত হবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে ঠকার ক্ষেত্রে তার পুনর্বিবেচনার অবকাশ প্রমাণিত হবে। আর যেহেতু রসূলুল্লাহ সা. তাকে ‘কোনো প্রতারণা নয়’একথা বলতে শিখিয়েছেন, তাই তার ক্রয়-বিক্রয় প্রতারণামুক্ত হওয়ার শর্তাধীন, সেহেতু এটা ‘খিয়ারুশ শরত্ব’ এর আওতাধীন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পরিষেব্য পণ্য ক্রয়

📄 পরিষেব্য পণ্য ক্রয়


পশ্চিমধ্যে পণ্য ক্রয়: পথিমধ্যে অর্থাৎ শহরে পণ্য পৌঁছার পূর্বে এবং পণ্যের মূল্য বিক্রেতার অবগত হওয়ার পূর্বে কেউ গিয়ে তা কিনে নেয়া বিক্রেতার ঠকার কারণ হতে পারে। এমতাবস্থায় ক্রেতা বাজার দরের চেয়ে সস্তায় পণ্য কিনতে পারে। বিক্রেতা যদি পরে বুঝতে পারে যে, তাকে ঠকানো হয়েছে, তবে সে তার ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য পণ্য ফেরত নেয়া ও বিক্রয় বাতিল করার অধিকার পাবে। কেননা ইমাম মুসলিম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. পণ্য বাজারে আনার পথে ক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: পথি মধ্যে পণ্য ক্রয় করো না। কেউ যদি তা করে তবে পণ্য বাজারে আসার পর বিক্রেতার বিক্রয় বাতিল করার অধিকার থাকবে।’ অধিকারশে আলেমের মতে এ হাদিসের নিষেধাজ্ঞা হারামের অর্থবোধক।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মূল্য বৃদ্ধির খাতিরে ক্রয়ের অভিনয়

📄 মূল্য বৃদ্ধির খাতিরে ক্রয়ের অভিনয়


মালিকের সাথে যোগসাজশপূর্বক পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির খাতিরে উচ্চতর মূল্য বলা, অথচ যে ব্যক্তি উচ্চতর মূল্য বলে, তার কেনার ইচ্ছা নেই। উচ্চতর মূল্যে কিনতে সাধারণ ক্রেতাদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এ রকম ক্রেতার অভিনয় করা হয়। বুখারি ও মুসলিম ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বিক্রেতাকে উচ্চতর মূল্যে বিক্রয়ের সুযোগ করে দেয়ার জন্য তৃতীয় ব্যক্তির উচ্চতর মূল্যে ক্রয়ের ভান করা নিষিদ্ধ করেছেন। সকল আলেম একমত হয়ে বলেছেন, এটা হারাম।
হাফেয ইবনে হাজার ‘ফাতহুল বারী’গ্রন্থে বলেন: এ ধরনের বিক্রেতার মাধ্যমে বিক্রয় বৈধ হবে কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইবনুল মুনযির বলেন: মুহাদ্দিসদের একটি গোষ্ঠীর মতে এ ধরনের বিক্রয় অবৈধ। যাহেরি মাযহাব ও ইমাম মালেকের একটি মত এর সমর্থক। কাজটি যদি মালিকের সাথে যোগসাজশ ক্রমে বা মালিকের উদ্যোগে হয়ে থাকে, তবে হাম্বলি মাযহাবের যে মতটি অধিকতর প্রসিদ্ধ, তদনুসারে এ ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনা ও ক্রয় বাতিলের অধিকার কার্যকর হবে। শাফেয়িদেরও একটি মত অদৃঢ়। তবে তাদের সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত হলো, বিক্রয় কার্যকর হবে তবে গুনাহ হবে। এটা হানাফি মাযহাবেরও অভিমত।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইকালা বা ক্রয়বিক্রয় প্রত্যাহার

📄 ইকালা বা ক্রয়বিক্রয় প্রত্যাহার


কোনো ব্যক্তি যদি একটি জিনিস ক্রয় করার পর বুঝতে পারে যে, জিনিসটির তার প্রয়োজন নেই অথবা কেউ একটা জিনিস বিক্রয় করার পর যদি বুঝতে পারে যে, জিনিসটি তার প্রয়োজনীয়, তাহলে সে উক্ত ক্রয় বা বিক্রয় বাতিল করার অনুমতি প্রার্থনা করতে পারবে। ইসলাম এরূপ ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের অনুমতি দিতে উদ্বুদ্ধ করছে।
ইমাম আবু দাউদ ও ইবনে মাজা আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে চুক্তি প্রত্যাহারের অনুমতি দেবে, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করবেন।’ এ ধরনের চুক্তি প্রত্যাহার দ্বারা বিক্রয় বাতিল হয়ে যায়। এটা বিক্রীত পণ্য ক্রেতার দখলে যাওয়ার আগে জায়েয। এতে ‘খিয়ারুল মজলিস’ ও ‘খিয়ারুশ শরত্ব’ থাকে না। এতে ‘শুক্ফা’ও (অর্থাৎ সংলগ্ন ভূমির মালিকের ক্রয়াধিকার) থাকে না। কেননা এটা বিক্রয় গণ্য হয় না। চুক্তি বাতিল হওয়ার পর ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে নিজ নিজ প্রাপ্য নিয়ে নেবে। ক্রেতা মূল্য ও বিক্রেতা পণ্য ফেরত নেবে। বিক্রীত পণ্য যদি নষ্ট
হয়ে গিয়ে থাকে বা চুক্তি স্বাক্ষরকারী মারা যায়, কিংবা মূল্যের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটায় তাহলে চুক্তি প্রত্যাহার অশুদ্ধ হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00