📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 কখন মজুদদারি হারাম হয়

📄 কখন মজুদদারি হারাম হয়


বহু সংখ্যক ফকিহের মতে নিম্নোক্ত তিনটি শর্তে মজুদদারী হারাম: ১. গুদামজাতকৃত পণ্য যখন তার নিজের ও তার পোষ্যদের পুরো এক বছরের প্রয়োজনীয় পরিমাণের অতিরিক্ত হয়। কেননা এক বছরের জন্যে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস জমা করে রাখা জায়েয, যেমন রসূলুল্লাহ সা. করতেন।
২. যে সময় পণ্যের দাম সাধারণত বাড়ে সে সময়টার অপেক্ষায় থাকা, যাতে অতি চড়া মূল্যে বিক্রয় করা যায়। কেননা জনগণের মধ্যে তখন ঐ পণ্যের চাহিদা বাড়ে।
৩. এমন সময় গুদামজাত করা, যখন জনগণের গুদামজাতকৃত পণ্যের প্রয়োজন তীব্রতর হয়, যেমন খাদ্য ও বস্ত্র ইত্যাদি। পণ্য যদি এমন হয় যে, মুষ্টিমেয় কতিপয় ব্যবসায়ীর নিকট আছে, কিন্তু জনগণের মধ্যে তার চাহিদা নেই, তাহলে এ ধরনের পণ্য গুদামজাত করলে তা নিষিদ্ধ হবে না। কেননা এতে জনগণের কোনো ক্ষতি হয় না।
কতক আলেম শুধু খাদ্য জাতীয় পণ্য গুদামজাত করা হারাম মনে করেন। আর কতক আলেম সকল জিনিসের ক্ষেত্রেই মজুদদারী হারাম মনে করেন। কেননা গুদামজাতকৃত পণ্য মূল্য স্তরকে স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকতে দেয় না। কতক আলেম মনে করেন, নিজের উৎপাদন করা খেতের ফসল বা নিজের তৈরি জিনিস গুদামজাত করাতে দোষ নেই।
খিয়ার: ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিকে বহাল রাখা বা বাতিল করা এই দুটির কোন্টি ভালো হবে তা বিবেচনা করার সুযোগ চাওয়াকে 'খিয়ার' বলা হয়। খিয়ার কয়েক প্রকারের। নিম্নে এর বিবরণ দেয়া যাচ্ছে:
খিয়ারুল মজলিস: ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে যখন চুক্তি সম্পাদন করে, তখন তারা উভয়ে যতক্ষণ ঐ মজলিসে অর্থাৎ চুক্তি সম্পাদনের মজলিস তথা বৈঠকে আছে, ততক্ষণ ঐ চুক্তি বহাল রাখা বা বাতিল করার অধিকার উভয়ের থাকে। তবে চুক্তির মধ্যে যদি এই অধিকার উভয় পক্ষের সম্মতিতে বাতিল করা হয়ে থাকে, তাহলে এই অধিকার থাকবে না।
কখনো কখনো দু'পক্ষের এক পক্ষ তাড়াহুড়ার মধ্যে প্রস্তাব বা সম্মতি দিয়ে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই সে উপলদ্ধি করে যে, চুক্তিটি কার্যকর না করাতেই তার মংগল। এরূপ ক্ষেত্রে শরিয়ত তাকে এই অধিকার দিয়েছে, যাতে তাড়াহুড়ার কারণে তার যে ক্ষতি হতে যাচ্ছিল তা পূরণ হয়। ইমাম বুখারি ও মুসলিম হাকিম ইবনে হিযাম রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন:
'ক্রেতা ও বিক্রেতার চুক্তি প্রত্যাহারের অধিকার ততক্ষণ থাকবে, যতক্ষণ তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। তারা উভয়ে যদি সত্য কথা বলে ও স্পষ্ট ভাষায় মনোভাব ব্যক্ত করে, তবে তাদেরকে বরকত দেয়া হবে, আর যদি মিথ্যা বলে ও সত্য গোপন করে তবে তাদের বরকত নষ্ট হয়ে যাবে।'
অর্থাৎ শারীরিকভাবে একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত উভয়ের চুক্তি বহাল রাখা বা বাতিল করার অধিকার আছে। প্রত্যেক পরিস্থিতির প্রকৃতি অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন হওয়া বিচার্য। একটি ছোট বাড়িতে চুক্তি হয়ে থাকলে দু'জনের একজনের বাড়ি থেকে বের হওয়াকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ধরা হবে। আর বড় বাড়িতে হয়ে থাকলে বৈঠক স্থল থেকে দু'তিন কদম দূরে গেলেই তা বিচ্ছিন্নতা গণ্য হবে। আর যদি উভয়ে এক সাথে বের হয় এবং এক সাথে চলতে থাকে তাহলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়নি বিবেচিত হবে ও খিয়ার অর্থাৎ বাতিল করার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
এ ব্যাপারে যে মতটি সর্বাধিক অগ্রগণ্য তা হলো, প্রচলিত রীতিপ্রথা অনুসারেই বিচ্ছিন্ন হওয়া বা না হওয়া নির্ণয় করা হবে। প্রচলিত রীতিতে যা বিচ্ছিন্নতা গণ্য হয় শরিয়তের দৃষ্টিতে সেটাই বিচ্ছিন্নতা, আর যেটা প্রচলিত রীতিতে বিচ্ছিন্নতা নয়, সেটা শরিয়তেরও বিচ্ছিন্নতা নয়।
ইমাম বায়হাকি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন: তিনি (আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর) বলেন: আমি আমীরুল মু'মিনীন উসমান রা.এর নিকট তাঁর খয়বরের একটি জমির বিনিময়ে ওয়াদির একটি জমি বিক্রয় করলাম। বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর আমি পেছনের দিকে ফিরে চলে এলাম এবং তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম, যাতে তিনি বিক্রয় বাতিল করতে না পারেন। কেননা রীতি ছিলো, ক্রেতা ও বিক্রেতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিক্রয় চুক্তি বাতিল করার অধিকার রাখে। এটাই অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়ির অভিমত। ইমামদের মধ্যে শাফেয়ি ও আহমদও এই মত পোষণ করেন। তারা বলেন: 'খিয়ারুল মজলিস' ক্রয়-বিক্রয়, আপোষ মীমাংসা, ভাড়া দেয়া, এবং যাবতীয় আর্থিক লেনদেন জনিত চুক্তিতে প্রযোজ্য। বিয়ে, খুলা, ইত্যাদি, যাতে আর্থিক বিনিময় চাওয়া হয় না, তাতে 'খিয়ারুল মজলিস থাকে না। অনুরূপ মুযারাবা, শিরকা, ওযাকালা ইত্যাদিতেও প্রযোজ্য নয়।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেকের মতে, 'খিয়ারুল মজলিস' অবৈধ। কেবল কথার মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদনই যথেষ্ট এবং তা বাধ্যতামূলক। ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হয়ে গেলে এক মজলিসে থাকা অবস্থায়ও তা বাতিল করা যাবে না। তাদের মতে, হাদিসে যে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উল্লেখ আছে, তা কথার বিচ্ছিন্নতা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 কখন বাতিল করার অধিকার রহিত হয়

📄 কখন বাতিল করার অধিকার রহিত হয়


উভয় পক্ষ চুক্তির পর বাতিল করার অধিকার রহিত করলে তা রহিত হবে। একজন বাতিল করলে অপরজনের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে। দু'জনের একজন মারা গেলে এ অধিকার রহিত হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 খিয়ারুল শর্ত বা মেয়াদী অবকাশ

📄 খিয়ারুল শর্ত বা মেয়াদী অবকাশ


খিয়ারুশ শরত বা মেয়াদী অবকাশ: যখন ক্রেতা ও বিক্রেতার যে কোনো একজন এই শর্তে ক্রয় বা বিক্রয় করে যে, একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত সে উক্ত ক্রয় বা বিক্রয় বহাল রাখা বা বাতিল করার স্বাধীনতা বা অবকাশ পাবে, সে মেয়াদ বা অবকাশ যত দীর্ঘ হোকনা কেন তখন তাকে 'খিয়ারুশ শরত' বলা হয়। এ ধরনের শর্ত আরোপ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যে কিংবা যে কোনো একজনের জন্যে চলতে পারে। এ ধরনের শর্ত আরোপের বৈধতার উৎস হলো নিম্নোক্ত দু'টি হাদিস:
১. ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: 'যে কোনো ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে সম্পাদিত ক্রয় বা বিক্রয় চুড়ান্ত হবে না যতোক্ষণ তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। তবে শর্ত আরোপের অধিকার সংবলিত ক্রয়-বিক্রয় এর ব্যতিক্রম।' অর্থাৎ তারা উভয়ে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের সম্পাদিত ক্রয় বা বিক্রয় তাদের জন্য অপরিহার্য হবে না। তবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেও তারা উভয়ে বা একজনে যদি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পুনর্বিবেচনার অবকাশ গ্রহণ করে তাহলে সেই মেয়াদ পর্যন্তও ক্রয় বা বিক্রয় অপরিহার্য হবে না, বরং বাতিল করার সুযোগ থাকবে।
২. ইবনে উমর রা. থেকে আরো বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: 'যখন দুই ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয় করে, তখন উভয়ে যতোক্ষণ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হয় ততোক্ষণ বহাল রাখা বা বাতিল করার স্বাধীনতা তাদের সামনে অনুরূপ যখন উভয়ে বা একজন অপরজনকে অবকাশ দিয়ে ক্রয়-বিক্রয় করবে তখনও ক্রয়-বিক্রয় বহাল রাখা বা বাতিল করার স্বাধীনতা থাকবে।' যখন নির্ধারিত মেয়াদ অতিবাহিত হয়ে যাবে এবং ক্রয়-বিক্রয় নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে বাতিল হবে না, তখন ক্রয়-বিক্রয় বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। মেয়াদী অবকাশের শর্ত কথা বলেও বাতিল করা যাবে, আবার ক্রেতার কার্য দ্বারাও তা আপনা আপনি রহিত হতে পারে। যেমন সে যদি তার ক্রীত দ্রব্য ওয়াকফ বা দান করে দেয় কিংবা বিক্রয়ের ইচ্ছা ব্যক্ত করে, তা হলে রহিত হবে। কেননা এ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সে বিক্রয়টা মেনে নিয়েছে। যতোক্ষণ তার অবকাশ বহাল থাকবে, ততোক্ষণ তার পক্ষ থেকে পণ্যটি হস্তান্তরের উদ্যোগ নিষ্ফল হবে।
ইমাম আহমদের মতে পুনর্বিবেচনার অবকাশের মেয়াদ দুই পক্ষের সম্মতিক্রমে যতখুশি দীর্ঘ করা যেতে পারে। ইমাম আবু হানিফা ও শাফেয়ির মতে মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন দিন এবং ইমাম মালেকের মতে প্রয়োজন অনুযায়ী মেয়াদ নির্ধারণ করা যাবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 খিয়ারুল আয়র বা ত্রুটিজনিত অবকাশ

📄 খিয়ারুল আয়র বা ত্রুটিজনিত অবকাশ


খিয়ারুল আয়ব বা ত্রুটি জনিত অবকাশ: বিক্রয়ের সময় পণ্যের ত্রুটি গোপন করা হারাম: বিক্রয়ের সময় পণ্যের ত্রুটি ক্রেতার নিকট ব্যক্ত না করে বিক্রয় করা হারাম।

ফন্ট সাইজ
15px
17px