📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 দর নিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ

📄 দর নিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ


ইমাম আবুদাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা বিশুদ্ধ সনদে আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেন: লোকেরা বললো, হে রসূলুল্লাহ্, পণ্য মূল্য বেড়ে গেছে। সুতরাং আপনি মূল্য নির্দিষ্ট করে দিন। রসূলুল্লাহ্ সা. বললেন: মূল্য নির্দিষ্টকারী তো আল্লাহ। তিনি রিযিকদাতা, রিযিক হ্রাস-বৃদ্ধিকারী। আমি আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করতে চাই যে, কারো জান বা মালের ক্ষতি করে যুলুম করেছি- এমন অভিযোগ কেউ যেন আমার বিরুদ্ধে করতে না পারে।'
এ হাদিস থেকে আলেমগণ এ বিধি প্রণয়ন করেন যে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা নির্ধারণে হস্তক্ষেপ অবৈধ। কেননা তাতে যুলুমের ধারণা জন্মে। অথচ সাধারণ মানুষ আর্থিক লেনদেনে স্বাধীন। বাজার দর বেঁধে দেয়া এই স্বাধীনতার পরিপন্থী। বিক্রেতার স্বার্থ রক্ষার চেয়ে ক্রেতার স্বার্থ রক্ষা অগ্রগণ্য নয়। উভয়ের স্বার্থ যখন পরস্পর বিরোধী হয় তখন কিভাবে উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করা যায় তা ভেবে দেখতে উভয় পক্ষকে সুযোগ ও ক্ষমতা প্রদান করা জরুরী।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 প্রয়োজনের সময় মূল্য নিয়ন্ত্রণ বৈধ

📄 প্রয়োজনের সময় মূল্য নিয়ন্ত্রণ বৈধ


তবে ব্যবসায়ীরা যখন যুলুম করতে শুরু করে এবং এত বেশি মুনাফাখোরিতে লিপ্ত হয় যে, বাজারের ক্ষতি সাধন করে, তখন সরকারের পক্ষে হস্তক্ষেপ করা এবং জনগণের অধিকার রক্ষার খাতিরে, মজুতদারী রোধ করার জন্য এবং ব্যবসায়ীর লোভের কারণে জনগণের উপর যে যুলুম হচ্ছে তা প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে দেয়া অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে পণ্য মূল্য যখন বেড়ে যায়, তখন দর বেঁধে দেয়াকে ইমাম মালেক ও শাফেয়ি মযহাবের কেউ কেউ বৈধ মনে করেন। যায়দি মযহাবের একাংশও, যথা সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যা, রবীয়া ইবনে আব্দুর রহমান, ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আনসারী প্রমুখ সমাজের স্বার্থে প্রয়োজনীয় মনে হলে পণ্যমূল্য বেঁধে দেয়া জায়েয মনে করেন।
'হিদায়া' গ্রন্থের লেখক বলেন: 'শাসকের পক্ষে পণ্যমূল্য নির্ধারণ করা বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু যদি খাদ্য ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছাচারী আচরণ করে ও অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি করে এবং সরকার দর বেঁধে দেয়া ছাড়া জনগণের অধিকার রক্ষা করার আর কোনো বিকল্প খুঁজে না পায়, তাহলে বিজ্ঞজনদের সাথে পরামর্শক্রমে দর বেঁধে দিতে পারে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মজুদদারি

📄 মজুদদারি


মজুদদারী: সংজ্ঞা: কোনো পণ্য কিনে এমনভাবে আটকে রাখা বা গুদামজাত করা, যাতে বাজারে তার সরবরাহ কমে যায়, এবং গুদামজাতকারীরা তার মূল্য বাড়ানোর সুযোগ পায় আর জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একে মজুতদারী বলা হয়।
বিধান: শরিয়ত মজুতদারীকে হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কারণ এ দ্বারা লোভ, মুনাফাখুরী, অসাধুপনা ও জণগণকে কষ্ট দেয়ার মত খারাপ বৈশিষ্টগুলো লালন করা হয়।
১. ইমাম আবু দাউদ ও তিরমিযি মুয়াম্মার রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি মজুদদারীতে লিপ্ত হয়, সে অন্যায় করে।
২. আহমদ, হাকেম, আবু শায়বা ও বায্যার বর্ণনা করেন, রসূল সা. বলেন: যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন কোনো খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখে, সে আল্লাহ্ থেকে সম্পর্কচ্যুত এবং আল্লাহ্ তার থেকে দায়মুক্ত।
৩. রযীন তাঁর সংকলিত হাদিসগ্রন্থে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: সেই গুদামজাতকারী বান্দা বড়ই নিকৃষ্ট, জিনিসপত্র সস্তা হয়েছে শুনলে যার মন খারাপ হয়, আর দাম বেড়েছে শুনলে যে খুশি হয়।
৪. ইবনে মাজা ও হাকেম ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: সরবরাহকারী রিযিক প্রাপ্ত, আর মজুদদার অভিশপ্ত।
৫. সরবরাহকারী বলতে সেই ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে পণ্য নিয়ে আসে ও কম মূল্যে বিক্রয় করে।
৬. আহমদ ও তাবরানি মা'কিল ইবনে ইয়াসার রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেন: যে ব্যক্তি মুসলমানদের কোনো প্রয়োজনীয় মূল্য নিয়ে এমন কারসাজি করে, যাতে তার মূল্য বেড়ে যায়, তাকে দোযখের একটা বৃহৎ অংশে বসিয়ে দেয়া আল্লাহর অধিকার হয়ে দাঁড়ায়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কখন মজুদদারি হারাম হয়

📄 কখন মজুদদারি হারাম হয়


বহু সংখ্যক ফকিহের মতে নিম্নোক্ত তিনটি শর্তে মজুদদারী হারাম: ১. গুদামজাতকৃত পণ্য যখন তার নিজের ও তার পোষ্যদের পুরো এক বছরের প্রয়োজনীয় পরিমাণের অতিরিক্ত হয়। কেননা এক বছরের জন্যে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস জমা করে রাখা জায়েয, যেমন রসূলুল্লাহ সা. করতেন।
২. যে সময় পণ্যের দাম সাধারণত বাড়ে সে সময়টার অপেক্ষায় থাকা, যাতে অতি চড়া মূল্যে বিক্রয় করা যায়। কেননা জনগণের মধ্যে তখন ঐ পণ্যের চাহিদা বাড়ে।
৩. এমন সময় গুদামজাত করা, যখন জনগণের গুদামজাতকৃত পণ্যের প্রয়োজন তীব্রতর হয়, যেমন খাদ্য ও বস্ত্র ইত্যাদি। পণ্য যদি এমন হয় যে, মুষ্টিমেয় কতিপয় ব্যবসায়ীর নিকট আছে, কিন্তু জনগণের মধ্যে তার চাহিদা নেই, তাহলে এ ধরনের পণ্য গুদামজাত করলে তা নিষিদ্ধ হবে না। কেননা এতে জনগণের কোনো ক্ষতি হয় না।
কতক আলেম শুধু খাদ্য জাতীয় পণ্য গুদামজাত করা হারাম মনে করেন। আর কতক আলেম সকল জিনিসের ক্ষেত্রেই মজুদদারী হারাম মনে করেন। কেননা গুদামজাতকৃত পণ্য মূল্য স্তরকে স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকতে দেয় না। কতক আলেম মনে করেন, নিজের উৎপাদন করা খেতের ফসল বা নিজের তৈরি জিনিস গুদামজাত করাতে দোষ নেই।
খিয়ার: ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিকে বহাল রাখা বা বাতিল করা এই দুটির কোন্টি ভালো হবে তা বিবেচনা করার সুযোগ চাওয়াকে 'খিয়ার' বলা হয়। খিয়ার কয়েক প্রকারের। নিম্নে এর বিবরণ দেয়া যাচ্ছে:
খিয়ারুল মজলিস: ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে যখন চুক্তি সম্পাদন করে, তখন তারা উভয়ে যতক্ষণ ঐ মজলিসে অর্থাৎ চুক্তি সম্পাদনের মজলিস তথা বৈঠকে আছে, ততক্ষণ ঐ চুক্তি বহাল রাখা বা বাতিল করার অধিকার উভয়ের থাকে। তবে চুক্তির মধ্যে যদি এই অধিকার উভয় পক্ষের সম্মতিতে বাতিল করা হয়ে থাকে, তাহলে এই অধিকার থাকবে না।
কখনো কখনো দু'পক্ষের এক পক্ষ তাড়াহুড়ার মধ্যে প্রস্তাব বা সম্মতি দিয়ে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই সে উপলদ্ধি করে যে, চুক্তিটি কার্যকর না করাতেই তার মংগল। এরূপ ক্ষেত্রে শরিয়ত তাকে এই অধিকার দিয়েছে, যাতে তাড়াহুড়ার কারণে তার যে ক্ষতি হতে যাচ্ছিল তা পূরণ হয়। ইমাম বুখারি ও মুসলিম হাকিম ইবনে হিযাম রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন:
'ক্রেতা ও বিক্রেতার চুক্তি প্রত্যাহারের অধিকার ততক্ষণ থাকবে, যতক্ষণ তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। তারা উভয়ে যদি সত্য কথা বলে ও স্পষ্ট ভাষায় মনোভাব ব্যক্ত করে, তবে তাদেরকে বরকত দেয়া হবে, আর যদি মিথ্যা বলে ও সত্য গোপন করে তবে তাদের বরকত নষ্ট হয়ে যাবে।'
অর্থাৎ শারীরিকভাবে একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত উভয়ের চুক্তি বহাল রাখা বা বাতিল করার অধিকার আছে। প্রত্যেক পরিস্থিতির প্রকৃতি অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন হওয়া বিচার্য। একটি ছোট বাড়িতে চুক্তি হয়ে থাকলে দু'জনের একজনের বাড়ি থেকে বের হওয়াকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ধরা হবে। আর বড় বাড়িতে হয়ে থাকলে বৈঠক স্থল থেকে দু'তিন কদম দূরে গেলেই তা বিচ্ছিন্নতা গণ্য হবে। আর যদি উভয়ে এক সাথে বের হয় এবং এক সাথে চলতে থাকে তাহলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়নি বিবেচিত হবে ও খিয়ার অর্থাৎ বাতিল করার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
এ ব্যাপারে যে মতটি সর্বাধিক অগ্রগণ্য তা হলো, প্রচলিত রীতিপ্রথা অনুসারেই বিচ্ছিন্ন হওয়া বা না হওয়া নির্ণয় করা হবে। প্রচলিত রীতিতে যা বিচ্ছিন্নতা গণ্য হয় শরিয়তের দৃষ্টিতে সেটাই বিচ্ছিন্নতা, আর যেটা প্রচলিত রীতিতে বিচ্ছিন্নতা নয়, সেটা শরিয়তেরও বিচ্ছিন্নতা নয়।
ইমাম বায়হাকি আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন: তিনি (আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর) বলেন: আমি আমীরুল মু'মিনীন উসমান রা.এর নিকট তাঁর খয়বরের একটি জমির বিনিময়ে ওয়াদির একটি জমি বিক্রয় করলাম। বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর আমি পেছনের দিকে ফিরে চলে এলাম এবং তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম, যাতে তিনি বিক্রয় বাতিল করতে না পারেন। কেননা রীতি ছিলো, ক্রেতা ও বিক্রেতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিক্রয় চুক্তি বাতিল করার অধিকার রাখে। এটাই অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়ির অভিমত। ইমামদের মধ্যে শাফেয়ি ও আহমদও এই মত পোষণ করেন। তারা বলেন: 'খিয়ারুল মজলিস' ক্রয়-বিক্রয়, আপোষ মীমাংসা, ভাড়া দেয়া, এবং যাবতীয় আর্থিক লেনদেন জনিত চুক্তিতে প্রযোজ্য। বিয়ে, খুলা, ইত্যাদি, যাতে আর্থিক বিনিময় চাওয়া হয় না, তাতে 'খিয়ারুল মজলিস থাকে না। অনুরূপ মুযারাবা, শিরকা, ওযাকালা ইত্যাদিতেও প্রযোজ্য নয়।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেকের মতে, 'খিয়ারুল মজলিস' অবৈধ। কেবল কথার মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদনই যথেষ্ট এবং তা বাধ্যতামূলক। ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হয়ে গেলে এক মজলিসে থাকা অবস্থায়ও তা বাতিল করা যাবে না। তাদের মতে, হাদিসে যে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উল্লেখ আছে, তা কথার বিচ্ছিন্নতা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00